রাতুল আল আহমেদ

আপনার কি কখনো মনে হইছে বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতন একটা ঘটনা, যেটা বাংলাদেশের সব মানুষকে একছাতার নিচে এনেছিল, তার ঠিক দুই বছর পর আমরা সবাই আর একছাতার নিচে নাই? বরং কয়েকটা ছাতার নিচে দাঁড়ায়ে বর্তমান বাংলাদেশ একটা ‘নিখিল বাংলা কালচারাল ওয়ার সমিতি’তে পরিণত হয়েছে। এর ফলে যেটা হয়েছে, তা হলো গৃহযুদ্ধ একরকম ঠেকানো গেছে বটে, কিন্তু তা গিয়ে ঠেকেছে এক নিরন্তর সাংস্কৃতিক যুদ্ধে। ‘মুক্তি’ চাই নাকি ‘আজাদি’, ‘বিপ্লব’ হলেই দেশের মঙ্গল নাকি ‘ইনকিলাব’-ই ভালো, এই নিয়ে ক্রমাগত লড়াই চলছে।
কিন্তু এই লড়াই-ফ্যাসাদ কি কেবল লড়াইয়ের খাতিরেই? নাকি এই কালচারাল ওয়ারের আসল লক্ষ্য সমাজের ‘সত্য নির্মাণ’ করার জন্য ভাষার ওপর যে আধিপত্যবাদী বয়ান বা গ্রামসি যাকে বলেছিলেন হেজেমনি, তার দখল নেওয়া?
আলাপের শুরুতে তাহলে কালচারাল ওয়ার বা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ব্যাপারটা কী তা বোঝা যাক। কালচারাল ওয়ার কী, সেটা প্রখ্যাত মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী জেমস ডেভিসন হান্টার ১৯৯১ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী বই ‘কালচারাল ওয়ারস: দ্য স্ট্রাগল টু ডিফাইন আমেরিকা’তে সংজ্ঞায়িত করেছেন। হান্টার বলছেন, কালচারাল ওয়ার হলো মূলত ‘স্ট্রাগল ফর মোরাল অথরিটি’ বা নৈতিক কর্তৃত্বের লড়াই এবং সমাজের ‘বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করার’ সংগ্রাম। তাঁর মতে, আধুনিক সমাজ মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্বদর্শনে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর একদিকে রয়েছে ‘অর্থোডক্স’ বা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা বিশ্বাস করে নৈতিকতা এবং সত্য হলো চিরন্তন ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে নির্ধারিত। আরেকদিকে রয়েছে ‘প্রগ্রেসিভ’ বা প্রগতিশীল গোষ্ঠী, যারা মনে করে নৈতিকতা সময়ের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যুক্তির ভিত্তিতে বিবর্তিত হওয়া উচিত। এই দুই পক্ষ নিজেদের মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমাজের মোরাল পজিশন গড়ে তোলার যে ক্ষমতাকাঠামো রয়েছে, তা দখল করতে চায়। আর এটাই কালচারাল ওয়ার।

এবার বাংলাদেশে এই যুদ্ধ কীভাবে লাগল সেটা একটু খোঁজার চেষ্টা করি।
বাংলাদেশের সমাজে এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধ কীভাবে লাগল, তার শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরতে হবে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক পরের দিনগুলোতে। ৫ আগস্টের পর যখন দৃশ্যমান ফ্যাসিবাদের পতন ঘটল, তখন সমাজে প্রকট হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের কবলে থাকা বাংলাদেশের ‘আদর্শিক শূন্যতা’। দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র যে এককেন্দ্রিক সেক্যুলার ও জাতীয়তাবাদী বয়ান নির্মাণ করেছিল, যাকে অনেকে ফ্যাসিবাদের আদর্শিক খুঁটি বলে মনে করেন, তা হঠাৎ করেই ধসে পড়ে।

আইরিশ লেখক অ্যাঞ্জেলা নেগল ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর সাড়াজাগানো বই ‘কিল অল নর্মিজ’ -এ ঠিক এই পরিস্থিতির কথাই বলেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইন্টারনেটের এই লিডারলেস কাঠামো কোনো চিরস্থায়ী মুক্তি আনে না, বরং এক ধরনের আদর্শিক শূন্যতা বা ‘ভ্যাকুয়াম’ তৈরি করে। আর এই ভ্যাকুয়ামে ডানপন্থী সাবকালচারগুলো খুব সহজে তাদের আধিপত্যবাদী বয়ান প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ২০১০ সালের শুরুর দিকে আরব বসন্ত বা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের সময় সারা দুনিয়ার বুদ্ধিজীবীরা ভেবেছিলেন ইন্টারনেটের এই ‘লিডারলেস’ বা নেতৃত্বহীন আন্দোলন বুঝি পৃথিবীকে উদ্ধার করে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বাংলাদেশে ৫ আগস্টের পর ঠিক সেই শূন্যস্থানটিই তৈরি হয়েছে। আন্তোনিও গ্রামসি যাকে বলেছিলেন অর্গানিক ক্রাইসিস, বাংলাদেশের পরিস্থিতি যেন ঠিক তারই ক্ল্যাসিক উদাহরণ। গ্রামসির ভাষায়, ‘পুরোনো ব্যবস্থা মারা যাচ্ছে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থা তখনও জন্ম নিতে পারছে না। আর মাঝখানের সময়টাতে নানাবিধ বিকৃত বা মর্বিড উপসর্গের প্রাদুর্ভাব ঘটে।’ ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধ মূলত সেই রূপান্তরের যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ। স্বৈরাচারের পতনের পর যখন আর কোনো কমন এনিমি রইল না, তখন এক ছাতার নিচে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ খেয়াল করল তাদের গন্তব্য আসলে এক নয়।

আর এ যুদ্ধ লাগার প্রথম স্ফুলিঙ্গটি জ্বলেছিল অভ্যুত্থানের ওনারশিপ নির্ধারণের প্রশ্নে। রাজপথের রক্তে কার ভাগ বেশি? মাদ্রাসাছাত্রদের নাকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জেন-জি’দের? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সমাজ দ্রুত দুটো প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। নেগল যেমন দেখিয়েছিলেন, বিদ্রোহের প্রতীকগুলো, যেমন গাই ফকস মাস্ক যেকোনো পক্ষ দখল করে নিতে পারে, বাংলাদেশেও তেমনি বিপ্লবের ‘ওনারশিপ’ নিয়ে শুরু হলো দড়ি টানাটানি। একপক্ষ দাবি করল, এটি একটি সেক্যুলার গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান, আর অন্যপক্ষ দাবি করল এটি ইসলামী ইনকিলাব বা দ্বিতীয় স্বাধীনতা। অর্থাৎ, হান্টার যে ‘মোরাল অথরিটি’ বা সমাজের বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করার কথা বলেছিলেন, তার দখল নেওয়ার লড়াইটা শুরু হলো ঠিক এখান থেকেই।
আর এ লড়াই কিন্তু কেবল রাজনৈতিক রেটরিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। ‘বিপ্লব’ বনাম ‘ইনকিলাব’-এর এই প্রাথমিক বিভাজন খুব দ্রুতই রূপ নিল জাতীয় আত্মপরিচয় বা ‘ন্যাশনাল আইডেন্টিটি’ রিডিফাইন করার প্রকল্পে। একদিকে জাতীয় সংগীতের পরিবর্তনের দাবি বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন করে পাঠ করার প্রস্তাবনা, অন্যদিকে মাজার, বাউলদের আখড়া, নারীর পোশাক কিংবা ছায়ানট ও উদীচীর মতন প্রতিষ্ঠানে হামলা, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ‘প্রেশার গ্রুপের’ কাজ ছিল না। বরং এগুলো সমাজে নিজেদের ‘মোরাল অথরিটি’ সুনিশ্চিত করার একেকটি পরিকল্পিত মহড়া। রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নেওয়ার আগে যে সমাজের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা গ্রামসির সেই হেজেমনির দখল নেওয়া জরুরি, এই সমীকরণ বিবদমান সব পক্ষই ভালো করে বোঝে।
এসব তো ঘটছেই, এর মধ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে ভাষা নিয়ে আরেক গেঞ্জাম লাগল সোশ্যাল মিডিয়ায়। গেঞ্জামটা মূলত ভাষার ‘শুদ্ধিকরণ’ বনাম ‘ডিকলোনাইজেশন’ নিয়ে। একদল দাবি তুলল যে আমাদের বাংলা ভাষাকে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের তৈরি করা ‘সংস্কৃত-ঘেঁষা’ জেলখানা থেকে মুক্ত করতে হবে। আর এই মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে তারা হাজির করল একগুচ্ছ আরবি-ফারসি শব্দ, যেমন আজাদী, মজলুম, জালিম, ইনসাফ, জুলুম, ইনকিলাব বা সিলসিলার মতন শব্দগুচ্ছ। আরেকদলের দাবি, এগুলো চাপিয়ে দেওয়া ‘উর্দু’ শব্দ, আর ভাষার মাসে উর্দুর এ-হেন লম্ফঝম্ফ কদ্যপি বরদাশত করা হবে না। তাদের দাবি বাংলা ভাষায় রয়েছে একগাদা প্রমিত শব্দ, আর সেগুলোকেই ব্যবহার করতে হবে আমাদের।
কিন্তু, খেয়াল করলে দেখবেন, দুইপক্ষই, তা সে আমজনতার ভাষা হোক কি গণমানুষের, আসলে কেয়ার করে না। তাদের মূল লক্ষ্য হয় ভাষার বিদ্যমান হেজেমনিকে টিকিয়ে রাখা, নয়তো নতুন হেজেমনি তৈরি করা। দিনশেষে ক্ষমতাই লক্ষ্য, মানুষ নয়।
এই যে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা নিয়ে ডিজিটাল গেঞ্জাম লাগল, সেখানে ক্রসওয়াক নামক এক এজেন্সির একটা ক্রিয়েটিভ ক্যাম্পেইন বেশ ভাইরাল হলো। তাদের ক্যাপশনে লেখা—‘বাংলা ভাষা হোক আধিপত্যমুক্ত’। ওমা, আসলেই? খুব এজি আর বিপ্লবী শোনাল বটে, কিন্তু নেগলের সেই অ্যানালিটিকাল লেন্স দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটি মূলত একধরনের স্ল্যাক্টিভিজম বা সস্তা ইনসাইটহীন কন্টেন্ট। তারা ভাষার ভেতর থেকে কিছু শব্দ মুছে দিয়ে দেখাতে চাইল যে তারা ভাষাকে আধিপত্যমুক্ত করছে।
কিন্তু আধিপত্যমুক্তি আসলে কার কাছ থেকে? বস, আপনাদের অফিসের কেদারা কয়টা? যদি আপনার স্টাফকে জিজ্ঞেস করেন, সে তো আপনার দিকে আজিব চোখে তাকিয়ে থাকবে। কারণ, দস্তুরমতো কেদারা এখন ব্রাত্য, আর চেয়ার এখন স্বাভাবিক। বাংলায় প্রায় ৭৫,০০০ শব্দের মধ্যে তদ্ভব আর তৎসম বাদ দিলে যে প্রায় ৫০০০ বিদেশি শব্দ আছে, সেগুলো রেখেই কি আমরা ভাষাকে আধিপত্যমুক্ত করব, নাকি সেগুলো ফেলে ‘নব্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ থেকে আমদানি (এই যে, সেরেছে। আমদানিও যে আধিপত্যের ভাষা!)? এই ধরনের সিলেক্টিভ শব্দের ওপর কাঁচি চালানো মূলত নেগলের সেই ভার্চু সিগন্যালিংয়ের ক্ল্যাসিক উদাহরণ। এর মানে আপনি আসলে ভাষাকে মুক্ত করছেন না, বরং ইন্টারনেটের কালচারাল ওয়ারে একটা বিশেষ পক্ষ নিয়ে কুল সাজার চেষ্টা করছেন।
নেগলের ভাষায় বলতে গেলে, এটি হলো একধরনের ট্রান্সগ্রেশন বা সীমা লঙ্ঘন। এতদিন ধরে যে সেক্যুলার শুদ্ধ বাংলাকে আমরা নর্মি বা স্বাভাবিক বলে জানতাম, এই নতুন গোষ্ঠীর কাছে তা হলো এক ধরনের ক্যাথিড্রাল বা চিন্তার কারাগার। কালচারাল ওয়ারের এই ডামাডোলে আমরা যাকে গণমানুষের ভাষা বা ইনকিলাবি বুলি বলে বাহবা দিচ্ছি, তার শ্রেণিচরিত্রটিও তলিয়ে দেখা দরকার। ফ্রাঞ্জ ফানোঁ ক্রিওল ভাষার আলোচনায় দেখিয়েছিলেন, ভাষা কখনো গরিব বা ছোটলোকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না—তা সর্বদা ওপরতলা থেকে চুঁইয়ে পড়ে। ইতিহাসের দিকে উঁকি মারলে দেখবেন, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি বা ইংরেজি—কোনোটিই বাংলার গরিবের ভাষা ছিল না। এগুলো ছিল শাসকের ফরমানের ভাষা।
মেহনতি মানুষ কেবল কাজ হাসিল করার প্রয়োজনে প্রভুর ভাষার ভাঙা ভাঙা শব্দ রপ্ত করেছে। যেখানে গরিবদের শ্রম দিতে হতো—যেমন কলে-কারখানায়, স্টেশনে বা আদালতে—সেখানে ব্যবহৃত শব্দগুলোই তারা নিজেদের মতো করে গড়ে নিয়েছে। যেমন গ্যারেজের মেকানিক জানেন না ইংরেজি শক অ্যাবজর্ভার কী, তিনি জানেন সকেট জাম্পার । আরো আছে, রেডিওয়াটার (রেডিয়েটর), বা বাস কনট্রাক্টরের বস ডাইনে প্লাইস্টিক। আর এটিই ভাষার শ্রেণি বাস্তবতা। শব্দগুলো ওপর থেকে এসে নিচে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আজ যারা আজাদী, মজলুম কিংবা ইনসাফের লড়াইয়ে মেতেছেন, তারাও কি এই আশরাফ-আতরাফ দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে? মোটেও না। আজাদীতে ব্যস্ত থাকা শিক্ষিত লোকটি এটা বুঝবে না। কারণ, সে আশরাফ, আতরাফ নয়। তাকে ১০০ বছরের পুরোনো দলিল ধরিয়ে দিলেও সে দলিলের ভাষা বুঝবে না, অতটা আরবি-ফারসির এলেম তার নেই। আবার বঙ্কিম রচনাবলী ধরিয়ে দিলেও বুঝবে না, অতটা বাংলার এলেমও তার নেই। সে সেই মিডল ক্লাসের প্রতিনিধি, যার রাজনীতি আছে কিন্তু নিজস্ব ভাষা নেই। তার রাজনীতি হলো আশরাফ হওয়ার রাজনীতি, বড়লোক হওয়ার রাজনীতি। নেগলের ভাষায় বললে, তারা আসলে একধরনের ‘কালচারাল ক্যাপিটাল’ দখল করার ধান্দায় আছে। জান-জবান বা সিলসিলার মতো শব্দগুলো ব্যবহার করে তারা দেখাতে চায় তারা সাধারণের চেয়ে আলাদা এবং বৈপ্লবিক—যদিও তাদের এই ভাষা মেকানিকের সেই সকেটজাম্পারের বাস্তবতার ধারেকাছেও নাই।

আর্নেস্তো লাক্লাউ দেখিয়েছিলেন, রাজনৈতিক শব্দগুলো আসলে ফ্লোটিং সিগনিফায়ার। এগুলো সময়ের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে মানে পাল্টায় ফেলে। গণমানুষের ভাষা, স্বাধীনতা বা ফ্যাসিবাদ এই শব্দগুলোর কোনও স্থির বা শাশ্বত অর্থ নেই। রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের এজেন্ডা অনুযায়ী এই শব্দগুলোতে অর্থ আরোপ করে। বাংলাদেশে ইনকিলাব বা ইনসাফ বর্তমানে লাক্লাউয়ের এই তত্ত্বের ধ্রুপদী উদাহরণ। ঐতিহাসিকভাবে এই শব্দগুলো প্রতিরোধের ভাষা ছিল। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী একই শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে বৈধতা দিতে শুরু করেছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ যেটা সেটা হচ্ছে শব্দের আবেগগত শক্তি অক্ষুণ্ন থাকে, কিন্তু তার রেফারেন্ট বা নির্দেশক বদলে যায়।
ফলে নতুন এই বিপ্লবীরা ভাষাকে মুক্ত করার কথা বলেন, আরবি-ফারসি মিশিয়ে ‘জান-জবান’ দেওয়ার কথা বলেন, কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়ায় ভাষা যে আরও বেশি করে বড়লোকের বা করপোরেট আশরাফের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, সেই সত্যটি তারা বেমালুম চেপে যান। আজাদীর লড়াই করতে থাকা শিক্ষিত অংশটি এই সেন্সরশিপের প্রতিবাদ করে না। কারণ, দিনশেষে সেও বড়লোক হতে চায়, সেও স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে চায়। তাই তো সে আজাদী চায় ঢাকায়, এই যে আমজনতার কথা শত শত বছর ধরে বলে আসছেন বাউল, বা বাংলার বুকে যারা জান-জবানের ভাষা এনেছিল, সেই সুফিদের মাজার ভাঙা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাবেন না।
তাহলে কথা হলো, ইতিহাস পাল্টানো যায়, শব্দের অর্থ বদলে দেওয়া যায়, কিন্তু মানুষের মগজের গভীরে যে শ্রেণি-দ্বন্দ আর আশরাফ হওয়ার বাসনা প্রোথিত, তার সমাধান সস্তা ডিজিটাল ক্যাম্পেইনে নেই। আজাদের লড়াই করতে থাকা শিক্ষিত অংশটি যখন কোনো শব্দের ওপর সেন্সরশিপে সায় দেয় কিন্তু হিস্যা নিয়ে মাতম করে, তখন বুঝতে হবে এই ইনকিলাব আসলে কুশীলব বদলের একটা চটকদার নাটকমাত্র। একইসঙ্গে, যে চায় প্রগতি, সেও কিন্তু মজদুরের (উপস, স্যরি, নিপীড়িত) ভাষার ওপর সেন্সরশিপই দেয়। এর মধ্যে লস যেইটা হলো, তা হচ্ছে জুলাইয়ের সেই একছাতা আজ ভেঙে চুরমার, আর আমরা সবাই এখন এক কালচারাল ওয়ারের ক্লান্ত সিপাহি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার এই ভাইরাল ফিভারের সংক্রমণে আমরা সম্ভবত ভ্যাকুয়ামের দিকেই ছুটছি।

আপনার কি কখনো মনে হইছে বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতন একটা ঘটনা, যেটা বাংলাদেশের সব মানুষকে একছাতার নিচে এনেছিল, তার ঠিক দুই বছর পর আমরা সবাই আর একছাতার নিচে নাই? বরং কয়েকটা ছাতার নিচে দাঁড়ায়ে বর্তমান বাংলাদেশ একটা ‘নিখিল বাংলা কালচারাল ওয়ার সমিতি’তে পরিণত হয়েছে। এর ফলে যেটা হয়েছে, তা হলো গৃহযুদ্ধ একরকম ঠেকানো গেছে বটে, কিন্তু তা গিয়ে ঠেকেছে এক নিরন্তর সাংস্কৃতিক যুদ্ধে। ‘মুক্তি’ চাই নাকি ‘আজাদি’, ‘বিপ্লব’ হলেই দেশের মঙ্গল নাকি ‘ইনকিলাব’-ই ভালো, এই নিয়ে ক্রমাগত লড়াই চলছে।
কিন্তু এই লড়াই-ফ্যাসাদ কি কেবল লড়াইয়ের খাতিরেই? নাকি এই কালচারাল ওয়ারের আসল লক্ষ্য সমাজের ‘সত্য নির্মাণ’ করার জন্য ভাষার ওপর যে আধিপত্যবাদী বয়ান বা গ্রামসি যাকে বলেছিলেন হেজেমনি, তার দখল নেওয়া?
আলাপের শুরুতে তাহলে কালচারাল ওয়ার বা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ব্যাপারটা কী তা বোঝা যাক। কালচারাল ওয়ার কী, সেটা প্রখ্যাত মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী জেমস ডেভিসন হান্টার ১৯৯১ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী বই ‘কালচারাল ওয়ারস: দ্য স্ট্রাগল টু ডিফাইন আমেরিকা’তে সংজ্ঞায়িত করেছেন। হান্টার বলছেন, কালচারাল ওয়ার হলো মূলত ‘স্ট্রাগল ফর মোরাল অথরিটি’ বা নৈতিক কর্তৃত্বের লড়াই এবং সমাজের ‘বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করার’ সংগ্রাম। তাঁর মতে, আধুনিক সমাজ মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্বদর্শনে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর একদিকে রয়েছে ‘অর্থোডক্স’ বা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা বিশ্বাস করে নৈতিকতা এবং সত্য হলো চিরন্তন ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে নির্ধারিত। আরেকদিকে রয়েছে ‘প্রগ্রেসিভ’ বা প্রগতিশীল গোষ্ঠী, যারা মনে করে নৈতিকতা সময়ের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যুক্তির ভিত্তিতে বিবর্তিত হওয়া উচিত। এই দুই পক্ষ নিজেদের মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমাজের মোরাল পজিশন গড়ে তোলার যে ক্ষমতাকাঠামো রয়েছে, তা দখল করতে চায়। আর এটাই কালচারাল ওয়ার।

এবার বাংলাদেশে এই যুদ্ধ কীভাবে লাগল সেটা একটু খোঁজার চেষ্টা করি।
বাংলাদেশের সমাজে এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধ কীভাবে লাগল, তার শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরতে হবে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক পরের দিনগুলোতে। ৫ আগস্টের পর যখন দৃশ্যমান ফ্যাসিবাদের পতন ঘটল, তখন সমাজে প্রকট হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের কবলে থাকা বাংলাদেশের ‘আদর্শিক শূন্যতা’। দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র যে এককেন্দ্রিক সেক্যুলার ও জাতীয়তাবাদী বয়ান নির্মাণ করেছিল, যাকে অনেকে ফ্যাসিবাদের আদর্শিক খুঁটি বলে মনে করেন, তা হঠাৎ করেই ধসে পড়ে।

আইরিশ লেখক অ্যাঞ্জেলা নেগল ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাঁর সাড়াজাগানো বই ‘কিল অল নর্মিজ’ -এ ঠিক এই পরিস্থিতির কথাই বলেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইন্টারনেটের এই লিডারলেস কাঠামো কোনো চিরস্থায়ী মুক্তি আনে না, বরং এক ধরনের আদর্শিক শূন্যতা বা ‘ভ্যাকুয়াম’ তৈরি করে। আর এই ভ্যাকুয়ামে ডানপন্থী সাবকালচারগুলো খুব সহজে তাদের আধিপত্যবাদী বয়ান প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ২০১০ সালের শুরুর দিকে আরব বসন্ত বা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের সময় সারা দুনিয়ার বুদ্ধিজীবীরা ভেবেছিলেন ইন্টারনেটের এই ‘লিডারলেস’ বা নেতৃত্বহীন আন্দোলন বুঝি পৃথিবীকে উদ্ধার করে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বাংলাদেশে ৫ আগস্টের পর ঠিক সেই শূন্যস্থানটিই তৈরি হয়েছে। আন্তোনিও গ্রামসি যাকে বলেছিলেন অর্গানিক ক্রাইসিস, বাংলাদেশের পরিস্থিতি যেন ঠিক তারই ক্ল্যাসিক উদাহরণ। গ্রামসির ভাষায়, ‘পুরোনো ব্যবস্থা মারা যাচ্ছে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থা তখনও জন্ম নিতে পারছে না। আর মাঝখানের সময়টাতে নানাবিধ বিকৃত বা মর্বিড উপসর্গের প্রাদুর্ভাব ঘটে।’ ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধ মূলত সেই রূপান্তরের যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ। স্বৈরাচারের পতনের পর যখন আর কোনো কমন এনিমি রইল না, তখন এক ছাতার নিচে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ খেয়াল করল তাদের গন্তব্য আসলে এক নয়।

আর এ যুদ্ধ লাগার প্রথম স্ফুলিঙ্গটি জ্বলেছিল অভ্যুত্থানের ওনারশিপ নির্ধারণের প্রশ্নে। রাজপথের রক্তে কার ভাগ বেশি? মাদ্রাসাছাত্রদের নাকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জেন-জি’দের? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সমাজ দ্রুত দুটো প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। নেগল যেমন দেখিয়েছিলেন, বিদ্রোহের প্রতীকগুলো, যেমন গাই ফকস মাস্ক যেকোনো পক্ষ দখল করে নিতে পারে, বাংলাদেশেও তেমনি বিপ্লবের ‘ওনারশিপ’ নিয়ে শুরু হলো দড়ি টানাটানি। একপক্ষ দাবি করল, এটি একটি সেক্যুলার গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান, আর অন্যপক্ষ দাবি করল এটি ইসলামী ইনকিলাব বা দ্বিতীয় স্বাধীনতা। অর্থাৎ, হান্টার যে ‘মোরাল অথরিটি’ বা সমাজের বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করার কথা বলেছিলেন, তার দখল নেওয়ার লড়াইটা শুরু হলো ঠিক এখান থেকেই।
আর এ লড়াই কিন্তু কেবল রাজনৈতিক রেটরিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। ‘বিপ্লব’ বনাম ‘ইনকিলাব’-এর এই প্রাথমিক বিভাজন খুব দ্রুতই রূপ নিল জাতীয় আত্মপরিচয় বা ‘ন্যাশনাল আইডেন্টিটি’ রিডিফাইন করার প্রকল্পে। একদিকে জাতীয় সংগীতের পরিবর্তনের দাবি বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন করে পাঠ করার প্রস্তাবনা, অন্যদিকে মাজার, বাউলদের আখড়া, নারীর পোশাক কিংবা ছায়ানট ও উদীচীর মতন প্রতিষ্ঠানে হামলা, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ‘প্রেশার গ্রুপের’ কাজ ছিল না। বরং এগুলো সমাজে নিজেদের ‘মোরাল অথরিটি’ সুনিশ্চিত করার একেকটি পরিকল্পিত মহড়া। রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নেওয়ার আগে যে সমাজের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা গ্রামসির সেই হেজেমনির দখল নেওয়া জরুরি, এই সমীকরণ বিবদমান সব পক্ষই ভালো করে বোঝে।
এসব তো ঘটছেই, এর মধ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে ভাষা নিয়ে আরেক গেঞ্জাম লাগল সোশ্যাল মিডিয়ায়। গেঞ্জামটা মূলত ভাষার ‘শুদ্ধিকরণ’ বনাম ‘ডিকলোনাইজেশন’ নিয়ে। একদল দাবি তুলল যে আমাদের বাংলা ভাষাকে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের তৈরি করা ‘সংস্কৃত-ঘেঁষা’ জেলখানা থেকে মুক্ত করতে হবে। আর এই মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে তারা হাজির করল একগুচ্ছ আরবি-ফারসি শব্দ, যেমন আজাদী, মজলুম, জালিম, ইনসাফ, জুলুম, ইনকিলাব বা সিলসিলার মতন শব্দগুচ্ছ। আরেকদলের দাবি, এগুলো চাপিয়ে দেওয়া ‘উর্দু’ শব্দ, আর ভাষার মাসে উর্দুর এ-হেন লম্ফঝম্ফ কদ্যপি বরদাশত করা হবে না। তাদের দাবি বাংলা ভাষায় রয়েছে একগাদা প্রমিত শব্দ, আর সেগুলোকেই ব্যবহার করতে হবে আমাদের।
কিন্তু, খেয়াল করলে দেখবেন, দুইপক্ষই, তা সে আমজনতার ভাষা হোক কি গণমানুষের, আসলে কেয়ার করে না। তাদের মূল লক্ষ্য হয় ভাষার বিদ্যমান হেজেমনিকে টিকিয়ে রাখা, নয়তো নতুন হেজেমনি তৈরি করা। দিনশেষে ক্ষমতাই লক্ষ্য, মানুষ নয়।
এই যে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা নিয়ে ডিজিটাল গেঞ্জাম লাগল, সেখানে ক্রসওয়াক নামক এক এজেন্সির একটা ক্রিয়েটিভ ক্যাম্পেইন বেশ ভাইরাল হলো। তাদের ক্যাপশনে লেখা—‘বাংলা ভাষা হোক আধিপত্যমুক্ত’। ওমা, আসলেই? খুব এজি আর বিপ্লবী শোনাল বটে, কিন্তু নেগলের সেই অ্যানালিটিকাল লেন্স দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটি মূলত একধরনের স্ল্যাক্টিভিজম বা সস্তা ইনসাইটহীন কন্টেন্ট। তারা ভাষার ভেতর থেকে কিছু শব্দ মুছে দিয়ে দেখাতে চাইল যে তারা ভাষাকে আধিপত্যমুক্ত করছে।
কিন্তু আধিপত্যমুক্তি আসলে কার কাছ থেকে? বস, আপনাদের অফিসের কেদারা কয়টা? যদি আপনার স্টাফকে জিজ্ঞেস করেন, সে তো আপনার দিকে আজিব চোখে তাকিয়ে থাকবে। কারণ, দস্তুরমতো কেদারা এখন ব্রাত্য, আর চেয়ার এখন স্বাভাবিক। বাংলায় প্রায় ৭৫,০০০ শব্দের মধ্যে তদ্ভব আর তৎসম বাদ দিলে যে প্রায় ৫০০০ বিদেশি শব্দ আছে, সেগুলো রেখেই কি আমরা ভাষাকে আধিপত্যমুক্ত করব, নাকি সেগুলো ফেলে ‘নব্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ থেকে আমদানি (এই যে, সেরেছে। আমদানিও যে আধিপত্যের ভাষা!)? এই ধরনের সিলেক্টিভ শব্দের ওপর কাঁচি চালানো মূলত নেগলের সেই ভার্চু সিগন্যালিংয়ের ক্ল্যাসিক উদাহরণ। এর মানে আপনি আসলে ভাষাকে মুক্ত করছেন না, বরং ইন্টারনেটের কালচারাল ওয়ারে একটা বিশেষ পক্ষ নিয়ে কুল সাজার চেষ্টা করছেন।
নেগলের ভাষায় বলতে গেলে, এটি হলো একধরনের ট্রান্সগ্রেশন বা সীমা লঙ্ঘন। এতদিন ধরে যে সেক্যুলার শুদ্ধ বাংলাকে আমরা নর্মি বা স্বাভাবিক বলে জানতাম, এই নতুন গোষ্ঠীর কাছে তা হলো এক ধরনের ক্যাথিড্রাল বা চিন্তার কারাগার। কালচারাল ওয়ারের এই ডামাডোলে আমরা যাকে গণমানুষের ভাষা বা ইনকিলাবি বুলি বলে বাহবা দিচ্ছি, তার শ্রেণিচরিত্রটিও তলিয়ে দেখা দরকার। ফ্রাঞ্জ ফানোঁ ক্রিওল ভাষার আলোচনায় দেখিয়েছিলেন, ভাষা কখনো গরিব বা ছোটলোকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না—তা সর্বদা ওপরতলা থেকে চুঁইয়ে পড়ে। ইতিহাসের দিকে উঁকি মারলে দেখবেন, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি বা ইংরেজি—কোনোটিই বাংলার গরিবের ভাষা ছিল না। এগুলো ছিল শাসকের ফরমানের ভাষা।
মেহনতি মানুষ কেবল কাজ হাসিল করার প্রয়োজনে প্রভুর ভাষার ভাঙা ভাঙা শব্দ রপ্ত করেছে। যেখানে গরিবদের শ্রম দিতে হতো—যেমন কলে-কারখানায়, স্টেশনে বা আদালতে—সেখানে ব্যবহৃত শব্দগুলোই তারা নিজেদের মতো করে গড়ে নিয়েছে। যেমন গ্যারেজের মেকানিক জানেন না ইংরেজি শক অ্যাবজর্ভার কী, তিনি জানেন সকেট জাম্পার । আরো আছে, রেডিওয়াটার (রেডিয়েটর), বা বাস কনট্রাক্টরের বস ডাইনে প্লাইস্টিক। আর এটিই ভাষার শ্রেণি বাস্তবতা। শব্দগুলো ওপর থেকে এসে নিচে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আজ যারা আজাদী, মজলুম কিংবা ইনসাফের লড়াইয়ে মেতেছেন, তারাও কি এই আশরাফ-আতরাফ দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে? মোটেও না। আজাদীতে ব্যস্ত থাকা শিক্ষিত লোকটি এটা বুঝবে না। কারণ, সে আশরাফ, আতরাফ নয়। তাকে ১০০ বছরের পুরোনো দলিল ধরিয়ে দিলেও সে দলিলের ভাষা বুঝবে না, অতটা আরবি-ফারসির এলেম তার নেই। আবার বঙ্কিম রচনাবলী ধরিয়ে দিলেও বুঝবে না, অতটা বাংলার এলেমও তার নেই। সে সেই মিডল ক্লাসের প্রতিনিধি, যার রাজনীতি আছে কিন্তু নিজস্ব ভাষা নেই। তার রাজনীতি হলো আশরাফ হওয়ার রাজনীতি, বড়লোক হওয়ার রাজনীতি। নেগলের ভাষায় বললে, তারা আসলে একধরনের ‘কালচারাল ক্যাপিটাল’ দখল করার ধান্দায় আছে। জান-জবান বা সিলসিলার মতো শব্দগুলো ব্যবহার করে তারা দেখাতে চায় তারা সাধারণের চেয়ে আলাদা এবং বৈপ্লবিক—যদিও তাদের এই ভাষা মেকানিকের সেই সকেটজাম্পারের বাস্তবতার ধারেকাছেও নাই।

আর্নেস্তো লাক্লাউ দেখিয়েছিলেন, রাজনৈতিক শব্দগুলো আসলে ফ্লোটিং সিগনিফায়ার। এগুলো সময়ের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে মানে পাল্টায় ফেলে। গণমানুষের ভাষা, স্বাধীনতা বা ফ্যাসিবাদ এই শব্দগুলোর কোনও স্থির বা শাশ্বত অর্থ নেই। রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের এজেন্ডা অনুযায়ী এই শব্দগুলোতে অর্থ আরোপ করে। বাংলাদেশে ইনকিলাব বা ইনসাফ বর্তমানে লাক্লাউয়ের এই তত্ত্বের ধ্রুপদী উদাহরণ। ঐতিহাসিকভাবে এই শব্দগুলো প্রতিরোধের ভাষা ছিল। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী একই শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে বৈধতা দিতে শুরু করেছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ যেটা সেটা হচ্ছে শব্দের আবেগগত শক্তি অক্ষুণ্ন থাকে, কিন্তু তার রেফারেন্ট বা নির্দেশক বদলে যায়।
ফলে নতুন এই বিপ্লবীরা ভাষাকে মুক্ত করার কথা বলেন, আরবি-ফারসি মিশিয়ে ‘জান-জবান’ দেওয়ার কথা বলেন, কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়ায় ভাষা যে আরও বেশি করে বড়লোকের বা করপোরেট আশরাফের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, সেই সত্যটি তারা বেমালুম চেপে যান। আজাদীর লড়াই করতে থাকা শিক্ষিত অংশটি এই সেন্সরশিপের প্রতিবাদ করে না। কারণ, দিনশেষে সেও বড়লোক হতে চায়, সেও স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে চায়। তাই তো সে আজাদী চায় ঢাকায়, এই যে আমজনতার কথা শত শত বছর ধরে বলে আসছেন বাউল, বা বাংলার বুকে যারা জান-জবানের ভাষা এনেছিল, সেই সুফিদের মাজার ভাঙা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাবেন না।
তাহলে কথা হলো, ইতিহাস পাল্টানো যায়, শব্দের অর্থ বদলে দেওয়া যায়, কিন্তু মানুষের মগজের গভীরে যে শ্রেণি-দ্বন্দ আর আশরাফ হওয়ার বাসনা প্রোথিত, তার সমাধান সস্তা ডিজিটাল ক্যাম্পেইনে নেই। আজাদের লড়াই করতে থাকা শিক্ষিত অংশটি যখন কোনো শব্দের ওপর সেন্সরশিপে সায় দেয় কিন্তু হিস্যা নিয়ে মাতম করে, তখন বুঝতে হবে এই ইনকিলাব আসলে কুশীলব বদলের একটা চটকদার নাটকমাত্র। একইসঙ্গে, যে চায় প্রগতি, সেও কিন্তু মজদুরের (উপস, স্যরি, নিপীড়িত) ভাষার ওপর সেন্সরশিপই দেয়। এর মধ্যে লস যেইটা হলো, তা হচ্ছে জুলাইয়ের সেই একছাতা আজ ভেঙে চুরমার, আর আমরা সবাই এখন এক কালচারাল ওয়ারের ক্লান্ত সিপাহি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার এই ভাইরাল ফিভারের সংক্রমণে আমরা সম্ভবত ভ্যাকুয়ামের দিকেই ছুটছি।

আপনার কি নতুন কোনো জায়গায় ইন্সটাগ্রামওয়ার্দি ছবি তোলার জন্য মন খাঁ খাঁ করছে? এদিকে কফিশপ বা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার বাজেট নেই, পার্কে গেলে পুলিশ দ্বারা ‘মাদকাসক্ত’ ট্যাগ ও মার খাওয়ার ভয়, আর রিসোর্টে যেতে চাইলে নির্ঘাত কিডনি বেচার পরিস্থিতি?
২ দিন আগে
ফেসবুক বা ইনস্টা স্ক্রল করলেই ইদানীং কিছু উইয়ার্ড রিল সামনে আসতেছে। যে সবজি বা ফলের পাতে থাকার কথা, তারা এখন স্ক্রিনে আইসা রীতিমতো তুইতোকারি করতেছে! করলা, শসা, আদা বা লেবু আপনার দিকে আঙুল তুইলা বলতেছে সে আপনার শরীরের কী কী উপকার করে, আর আপনি তারে অবহেলা কইরা কী কী ভুল করতেছেন।
৪ দিন আগে
ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ কিংবা ডিনার—ইকোনমিক ক্লাস বা জেন্ডার নিউট্রাল হিসাবে বাংলাদেশিদের বিগেস্ট কমফোর্ট ফুড কোনটা? যে কয়টা খাবারের নাম এই তালিকায় আসবে, তার মধ্যে যে আলুভর্তা থাকবে, তা প্রায় চোখ বন্ধ কইরাই বইলা দেয়া যায়।
৭ দিন আগেমিউজিয়াম নিয়ে বেশ কুখ্যাত একটা জোক আছে। অনেকেই বলেন, 'আ মিউজিয়াম ইজ আ প্লেস হোয়ার উই পে টু লুক এট আওয়ার অ্যানসেস্টরস ট্র্যাশ।' তবে আপনি যদি আমার মতো মিউজিওফাইল হন, তবে এই জোকে আপনার একটু বাট হার্টেড হবার চান্স আছে।
১১ দিন আগে