সাক্ষাৎকারে তাসলিমা আখতার
তাসলিমা আখতার। বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি ও সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য। রানা প্লাজা ধ্বংসস্তূপের চাক্ষুষ সাক্ষী ও বিভিন্ন সময়ে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনে অন্যতম অগ্রগ্রামী নেতৃত্ব। রানা প্লাজার সে সময়ের পরিস্থিতি, উদ্ধার কার্যক্রমে তাঁদের সম্পৃক্ততা ও বিচার কার্যক্রম নানা দিক নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন স্ট্রিমের প্রতিবেদক তৌফিক হাসান।
তৌফিক হাসান

স্ট্রিম: ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ধসের ঘটনা জানার পর সেখানে উপস্থিত হয়ে কী ধরনের পরিস্থিতি মুখোমুখী হয়েছিলেন?
তাসলিমা আখতার: সাভারে রানা প্লাজার কাছেই আমার এক বন্ধু চাকরি করতেন। তিনি প্রথম খবরটি আমাকে দেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি সেখানে রওনা হই। আমার তখনো ধারণা ছিল না যে ওখানে আসলে কী ঘটছে। ওখানে ভবন ধসেছে এতটুকুই আমি জানতে পারি। কিন্তু ওখানে যে কত মানুষ আটকা পড়ে আছে বা কত মানুষ মারা গেছে তাঁর কোন ধারনা সে সময় ছিল না। প্রথম যখন রানা প্লাজা পৌঁছাই তখন জায়গাটা খুবই গুমোট ছিল। মানুষজন তাদের আপনজনদেরকে খুঁজছিলো। ভিতরে আটকা পড়া যেসব মরদেহ বের করা যাচ্ছিলো সেগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো অধরচন্দ্র স্কুলে। জীবিত উদ্ধারকৃতদের এনাম মেডিকেলসহ আশপাশের মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। একপর্যায়ে রানা প্লাজা থেকে এনাম মেডিকেল পর্যন্ত পুরো রাস্তাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় থেকে শুধু মানুষজনের ছোটাছুটি আর হাহাকার তৈরি হয়। ওই অনুভূতিটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। সেখানে পৌঁছানোর পর আমি আঁচ করতে পারছিলাম যে ভবনে থাকা শ্রমিকদের বড় অংশ আটকা পড়েছে এবং তারা মারা যাচ্ছে।
স্ট্রিম: রানা প্লাজায় পৌঁছানোর পর কি কি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হোন আপনি?
তাসলিমা আখতার: আমি সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই আমার সংগঠনের অন্যান্য বন্ধুরাও সেখানে পৌঁছায়। আমার সঙ্গে ক্যামেরা ছিল। শ্রমিক আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে শ্রমিকদের উদ্ধার করার পাশাপাশি তাঁদের দুর্দশা ছবির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করি। ওইখানে শুধু ছবি তোলাই যেমন সম্ভব ছিলো না, তেমন উদ্ধার কাজও একলা করা সম্ভব ছিলো না। এজন্য ছবি তোলার পাশাপাশি উদ্ধার কাজে অন্যদের সহযোগিতা করা, অনেক শ্রমিকদের রক্ত প্রয়োজন হচ্ছিল তা জোগাড়ের চেষ্টা করার কাজও করতে হয়েছে। সে সময় শুধু মনে হচ্ছিলো কিভাবে মানুষজনকে উদ্ধার করা যায়।
স্ট্রিম: যখন আপনি ছবি তোলা ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করলেন তখন কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হচ্ছিলেন?
তাসলিমা আখতার: সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিলো যে ওইখানে যে ধরনের উদ্ধার কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন সে ধরনের উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলো না। ফলে ওখানকার স্থানীয় শ্রমিক, আশেপাশের লোকজন কিংবা ছাত্র… প্রত্যেকের জন্যই এটা প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। তবে পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও দমকল বাহিনী যুক্ত হয়েছিলো। কিন্তু এই উদ্ধার কাজটা আসলে খুব কঠিন ছিল। বাংলাদেশে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর মতো আসলে কোন সরঞ্জাম নেই। ফলে আমরা অনেককেই বাঁচাতে পারিনি।

স্ট্রিম: রানা প্লাজার ঘটনার পর সেখানে আপনার তোলা মৃত দুই নারী-পুরুষের জড়িয়ে ধরার এক ছবি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই দৃশ্যটা কীভাবে আপনার নজরে এল?
তাসলিমা আখতার: আমি ২০০৭-০৮ সাল থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করি। সেই সময় থেকেই আমি ছবির মধ্য দিয়ে তাদের জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা চেষ্টা করে আসছি। সে কারণে সব সময়ই আমার সঙ্গে ক্যামেরা থাকে।
সেখানে প্রথম দিন থেকেই সিঁড়ির নিচে লাশ, দেয়াল দিয়ে পড়া রক্ত, মানুষের বাঁচার আকুতি, মানুষের মৃতদেহ আটকে থাকা ও শরীরের ভেতর দিয়ে রড যাওয়ার মতো ভয়াবহ সব দৃশ্যের মুখোমুখী হতে থাকি। আমি সে সময় এ দৃশ্যগুলো একটু দূর থেকে দেখছিলাম। বেশি কাছে যাওয়ার মত মানসিক অবস্থা আমার ছিল না।
রাত ১২টা কি ১টা বাজে। আমার বন্ধু আরিফ বলল যে চলেন পেছনের দিকে আপনাকে নিয়ে যাই। সেখানে অনেকগুলো মৃতদেহ আটকে আছে সেগুলো দেখবেন। আমি বললাম যে আমি সেগুলো দেখতে প্রস্তুত না। কিন্তু ও জোর করলো। বাধ্য হয়ে আমি গেলাম। গিয়ে দেখলাম যে অনেকগুলো মানুষের দেহ পড়ে আছে। তারা কেউ জীবিত নেই। তো ওই মানুষগুলোর মধ্যে ছবির সেই দুইজন মানুষও ছিলেন। আমি তাৎক্ষণিক ছবিটি তুলে সেখান থেকে বের হয়ে আসি। এর পরদিন আমি ছবিটা ফেসবুকে পোস্ট করি। সাধারণত আমি কোনো ছবি তুললে ফেসবুকের মধ্য দিয়ে মানুষকে জানানোর চেষ্টা করি। সেভাবে ওই ছবিটাও অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এছাড়া অন্যান্য ফটোগ্রাফাররাও অনেক ছবি তুলেছিলেন। তাদের ছবিও মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় যে রানা প্লাজার ঘটনার পর বাংলাদেশে যেমন মধ্যবিত্তের মধ্যে শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে, সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি সারা দুনিয়ার মানুষও শ্রমজীবী মানুষের ভয়াবহ জীবনের গল্পগুলো জানতে শুরু করেছে। আর এই ছবিটা সে ভূমিকাই পালন করেছে।
স্ট্রিম: রানা প্লাজা উদ্ধার কার্যক্রমের মধ্যে দীর্ঘ সময় আপনি সম্পৃক্ত ছিলেন। সে দুঃসময়ের স্মৃতি থেকে আমাদের কিছু জানাবেন?
তাসলিমা আখতার: রানা প্লাজার ঘটনার ১৩ বছর পার হয়ে গেছে। আর কোন আগের মত স্মৃতি তাজা নেই। কিন্তু আমি এখনও যখন আমার বই 'হাজার প্রাণের চিৎকার' পড়ি তখন আবার রানা প্লাজার ভিতরে ডুবে যাই।
সেখানে অনেক ভয়াবহ ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছি। যেমন আনজুয়ারা নামে একজন নারী শ্রমিক ছিলেন। তিনি তাঁর ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বারবার বলছিলেন, আমার ক্ষতিপূরণের দরকার নাই, কিন্তু আমার সন্তান ফেরত চাই। কিন্তু কোনভাবেই তাঁর ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে সেখানে তাঁর ছেলের হাড়গোড় ও একটা মোবাইল পাওয়া যায়। যা থেকে তিনি তাঁর ছেলেকে শনাক্ত করতে পারে। এইরকম গল্পগুলোর মুখোমুখি হওয়া খুব সহজ ছিল না।
রোজিনা নামে এক মেয়ে ছিলো। যার পায়ের নূপুরের ছবিও আলোড়ন তুলেছিলো। ও তিনদিন ওই ধ্বংসস্তূপ ভিতর আটকে ছিলো। পরে নিজেই নিজের হাত কেটে বের হয়ে আসে। আমার মনে আছে একদিন আমরা মর্গে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি এক মা-বাবা তাদের সন্তানকে খুঁজতেছে। এই সময় একটা জামা দেখেই মা তাঁর মেয়ে কে চিনতে পারলেন। এই ঘটনাগুলো যখন মনে আসে তখন শুধু মনে হয় আমি এই ভয়াবহ ঘটনাগুলোর সাক্ষী ছিলাম। যদি রাষ্ট্র কিংবা মালিক পক্ষ এই মানুষগুলোকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতো, শুধু মুনাফার যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা না করতো তাহলে হয়তো এরকম ঘটনা ঘটতো না।
স্ট্রিম: রানা প্লাজার ঘটনার পরে সেখানে উদ্ধার কার্যক্রমে যারা যুক্ত ছিলেন তাঁদের অবস্থা?
তাসলিমা আখতার: রানা প্লাজায় উদ্ধার কাজে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের প্রত্যেকেরই দীর্ঘদিন ধরে নানা রকম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু মানুষকে তো দিন শেষে বেঁচে থাকতে হয়, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে হয়। এছাড়া তার কোন পথ থাকে না। ফলে সেই স্বাভাবিক জীবনে তাঁরা ফিরেছেন। কিন্তু ক্ষতগুলো মনে রয়ে গেছে। সেগুলো কখনো ভোলা যায় না।
রানা প্লাজায় যারা উদ্ধারকর্মী ছিলেন তাদের অনেককেই আটকা পড়া শ্রমিকদের হাত পা কেটে বের করতে হয়েছে। কারো শরীর দিয়ে পোকা বের হচ্ছে সেই শরীরও বের করতে হয়েছে। আর পুরো জায়গাটা ভয়াবহ পচা গন্ধে ভরা ছিল। একটা মেয়ে এবং একটা ছেলে শ্রমিক আত্মহত্যা করেছিল। আমাদের পরিচিত একজন উদ্ধারকর্মী অনেকবার মানসিকভাবে প্রায় ভারসাম্যহীন অবস্থায় চলে যেতো। আমাদের বন্ধু হিমু রানা প্লাজা ঘটনার কয়েক বছর পরে আত্মহত্যা করে।
স্ট্রিম: আপনেরা বলছিলেন এই ঘটনায় ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক মারা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক মারা গেছে। কোন তথ্যটি সঠিক ছিল?
তাসলিমা আখতার: আমি এখনো বলবো রানা প্লাজার ঘটনায় ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক মারা গেছে। আমরা গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি থেকে তখন একটা তালিকা করি। প্রথমে আমরা নিখোঁজ তালিকা করা শুরু করি। পরবর্তী সময়ে যতগুলো তালিকা ছিল সরকারি সামরিক বাহিনীর তালিকা বা বিজিএমইএর তালিকা সবগুলো তালিকাকে ক্রস চেক করে আর নিজেরাও অনুসন্ধান করে ১ হাজার ১৭৫ জনের তালিকা তৈরি করি। আমরা কিন্তু সেই তালিকা শেয়ার করেছি। যখনই যে তথ্য পেয়েছি সেটা বিজিএমইএর সাথে বা সরকারের কাছেও শেয়ার করেছি। কিন্তু আমরা দেখেছি কিছু কিছু শ্রমিকের পরিবার ক্ষতিপূরণ পেলেও তাঁদের নাম যুক্ত করা হয়নি।
স্ট্রিম: রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়নি, বিচার সম্পূর্ণ হয়নি। কেনো হয়নি বলে মনে করেন?
তাসলিমা আখতার: ১৩ বছরে বহু কিছু পরিবর্তন হইয়েছে। রানা প্লাজা ঘটনার ঠিক দুই মাসের মাথায় শ্রম আইন পরিবর্তন হয়। সেই শ্রম আইন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৮৭টা ধারা নিয়ে পরিবর্তন আসে। কিন্তু সেই পরিবর্তন আসলেও ক্ষতিপূরণের যে প্রয়োজনীয়তা, শাস্তির বিষয়টা এসব জায়গাগুলোতে বড় রকম কোনো পরিবর্তন এখন পর্যন্ত হয় নাই। ফলে বিচার সম্পন্ন হয় নাই। একটা মর্যাদাপূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি ২০১৩ সাল থেকেই আমরা করে আসছিলাম। কিন্তু সেটাও হয় নাই। আর সোহেল রানাসহ দোষী যারা ছিলেন তাদেরও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় নেই। কারণ তাঁরা প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। তাঁরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ভাবে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পেরেছেন।
স্ট্রিম: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
তাসলিমা আখতার: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

স্ট্রিম: ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ধসের ঘটনা জানার পর সেখানে উপস্থিত হয়ে কী ধরনের পরিস্থিতি মুখোমুখী হয়েছিলেন?
তাসলিমা আখতার: সাভারে রানা প্লাজার কাছেই আমার এক বন্ধু চাকরি করতেন। তিনি প্রথম খবরটি আমাকে দেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি সেখানে রওনা হই। আমার তখনো ধারণা ছিল না যে ওখানে আসলে কী ঘটছে। ওখানে ভবন ধসেছে এতটুকুই আমি জানতে পারি। কিন্তু ওখানে যে কত মানুষ আটকা পড়ে আছে বা কত মানুষ মারা গেছে তাঁর কোন ধারনা সে সময় ছিল না। প্রথম যখন রানা প্লাজা পৌঁছাই তখন জায়গাটা খুবই গুমোট ছিল। মানুষজন তাদের আপনজনদেরকে খুঁজছিলো। ভিতরে আটকা পড়া যেসব মরদেহ বের করা যাচ্ছিলো সেগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো অধরচন্দ্র স্কুলে। জীবিত উদ্ধারকৃতদের এনাম মেডিকেলসহ আশপাশের মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। একপর্যায়ে রানা প্লাজা থেকে এনাম মেডিকেল পর্যন্ত পুরো রাস্তাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় থেকে শুধু মানুষজনের ছোটাছুটি আর হাহাকার তৈরি হয়। ওই অনুভূতিটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। সেখানে পৌঁছানোর পর আমি আঁচ করতে পারছিলাম যে ভবনে থাকা শ্রমিকদের বড় অংশ আটকা পড়েছে এবং তারা মারা যাচ্ছে।
স্ট্রিম: রানা প্লাজায় পৌঁছানোর পর কি কি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হোন আপনি?
তাসলিমা আখতার: আমি সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই আমার সংগঠনের অন্যান্য বন্ধুরাও সেখানে পৌঁছায়। আমার সঙ্গে ক্যামেরা ছিল। শ্রমিক আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে শ্রমিকদের উদ্ধার করার পাশাপাশি তাঁদের দুর্দশা ছবির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করি। ওইখানে শুধু ছবি তোলাই যেমন সম্ভব ছিলো না, তেমন উদ্ধার কাজও একলা করা সম্ভব ছিলো না। এজন্য ছবি তোলার পাশাপাশি উদ্ধার কাজে অন্যদের সহযোগিতা করা, অনেক শ্রমিকদের রক্ত প্রয়োজন হচ্ছিল তা জোগাড়ের চেষ্টা করার কাজও করতে হয়েছে। সে সময় শুধু মনে হচ্ছিলো কিভাবে মানুষজনকে উদ্ধার করা যায়।
স্ট্রিম: যখন আপনি ছবি তোলা ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করলেন তখন কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হচ্ছিলেন?
তাসলিমা আখতার: সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিলো যে ওইখানে যে ধরনের উদ্ধার কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন সে ধরনের উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলো না। ফলে ওখানকার স্থানীয় শ্রমিক, আশেপাশের লোকজন কিংবা ছাত্র… প্রত্যেকের জন্যই এটা প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। তবে পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও দমকল বাহিনী যুক্ত হয়েছিলো। কিন্তু এই উদ্ধার কাজটা আসলে খুব কঠিন ছিল। বাংলাদেশে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর মতো আসলে কোন সরঞ্জাম নেই। ফলে আমরা অনেককেই বাঁচাতে পারিনি।

স্ট্রিম: রানা প্লাজার ঘটনার পর সেখানে আপনার তোলা মৃত দুই নারী-পুরুষের জড়িয়ে ধরার এক ছবি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই দৃশ্যটা কীভাবে আপনার নজরে এল?
তাসলিমা আখতার: আমি ২০০৭-০৮ সাল থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করি। সেই সময় থেকেই আমি ছবির মধ্য দিয়ে তাদের জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা চেষ্টা করে আসছি। সে কারণে সব সময়ই আমার সঙ্গে ক্যামেরা থাকে।
সেখানে প্রথম দিন থেকেই সিঁড়ির নিচে লাশ, দেয়াল দিয়ে পড়া রক্ত, মানুষের বাঁচার আকুতি, মানুষের মৃতদেহ আটকে থাকা ও শরীরের ভেতর দিয়ে রড যাওয়ার মতো ভয়াবহ সব দৃশ্যের মুখোমুখী হতে থাকি। আমি সে সময় এ দৃশ্যগুলো একটু দূর থেকে দেখছিলাম। বেশি কাছে যাওয়ার মত মানসিক অবস্থা আমার ছিল না।
রাত ১২টা কি ১টা বাজে। আমার বন্ধু আরিফ বলল যে চলেন পেছনের দিকে আপনাকে নিয়ে যাই। সেখানে অনেকগুলো মৃতদেহ আটকে আছে সেগুলো দেখবেন। আমি বললাম যে আমি সেগুলো দেখতে প্রস্তুত না। কিন্তু ও জোর করলো। বাধ্য হয়ে আমি গেলাম। গিয়ে দেখলাম যে অনেকগুলো মানুষের দেহ পড়ে আছে। তারা কেউ জীবিত নেই। তো ওই মানুষগুলোর মধ্যে ছবির সেই দুইজন মানুষও ছিলেন। আমি তাৎক্ষণিক ছবিটি তুলে সেখান থেকে বের হয়ে আসি। এর পরদিন আমি ছবিটা ফেসবুকে পোস্ট করি। সাধারণত আমি কোনো ছবি তুললে ফেসবুকের মধ্য দিয়ে মানুষকে জানানোর চেষ্টা করি। সেভাবে ওই ছবিটাও অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এছাড়া অন্যান্য ফটোগ্রাফাররাও অনেক ছবি তুলেছিলেন। তাদের ছবিও মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় যে রানা প্লাজার ঘটনার পর বাংলাদেশে যেমন মধ্যবিত্তের মধ্যে শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে, সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি সারা দুনিয়ার মানুষও শ্রমজীবী মানুষের ভয়াবহ জীবনের গল্পগুলো জানতে শুরু করেছে। আর এই ছবিটা সে ভূমিকাই পালন করেছে।
স্ট্রিম: রানা প্লাজা উদ্ধার কার্যক্রমের মধ্যে দীর্ঘ সময় আপনি সম্পৃক্ত ছিলেন। সে দুঃসময়ের স্মৃতি থেকে আমাদের কিছু জানাবেন?
তাসলিমা আখতার: রানা প্লাজার ঘটনার ১৩ বছর পার হয়ে গেছে। আর কোন আগের মত স্মৃতি তাজা নেই। কিন্তু আমি এখনও যখন আমার বই 'হাজার প্রাণের চিৎকার' পড়ি তখন আবার রানা প্লাজার ভিতরে ডুবে যাই।
সেখানে অনেক ভয়াবহ ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছি। যেমন আনজুয়ারা নামে একজন নারী শ্রমিক ছিলেন। তিনি তাঁর ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বারবার বলছিলেন, আমার ক্ষতিপূরণের দরকার নাই, কিন্তু আমার সন্তান ফেরত চাই। কিন্তু কোনভাবেই তাঁর ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে সেখানে তাঁর ছেলের হাড়গোড় ও একটা মোবাইল পাওয়া যায়। যা থেকে তিনি তাঁর ছেলেকে শনাক্ত করতে পারে। এইরকম গল্পগুলোর মুখোমুখি হওয়া খুব সহজ ছিল না।
রোজিনা নামে এক মেয়ে ছিলো। যার পায়ের নূপুরের ছবিও আলোড়ন তুলেছিলো। ও তিনদিন ওই ধ্বংসস্তূপ ভিতর আটকে ছিলো। পরে নিজেই নিজের হাত কেটে বের হয়ে আসে। আমার মনে আছে একদিন আমরা মর্গে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি এক মা-বাবা তাদের সন্তানকে খুঁজতেছে। এই সময় একটা জামা দেখেই মা তাঁর মেয়ে কে চিনতে পারলেন। এই ঘটনাগুলো যখন মনে আসে তখন শুধু মনে হয় আমি এই ভয়াবহ ঘটনাগুলোর সাক্ষী ছিলাম। যদি রাষ্ট্র কিংবা মালিক পক্ষ এই মানুষগুলোকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতো, শুধু মুনাফার যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা না করতো তাহলে হয়তো এরকম ঘটনা ঘটতো না।
স্ট্রিম: রানা প্লাজার ঘটনার পরে সেখানে উদ্ধার কার্যক্রমে যারা যুক্ত ছিলেন তাঁদের অবস্থা?
তাসলিমা আখতার: রানা প্লাজায় উদ্ধার কাজে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের প্রত্যেকেরই দীর্ঘদিন ধরে নানা রকম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু মানুষকে তো দিন শেষে বেঁচে থাকতে হয়, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে হয়। এছাড়া তার কোন পথ থাকে না। ফলে সেই স্বাভাবিক জীবনে তাঁরা ফিরেছেন। কিন্তু ক্ষতগুলো মনে রয়ে গেছে। সেগুলো কখনো ভোলা যায় না।
রানা প্লাজায় যারা উদ্ধারকর্মী ছিলেন তাদের অনেককেই আটকা পড়া শ্রমিকদের হাত পা কেটে বের করতে হয়েছে। কারো শরীর দিয়ে পোকা বের হচ্ছে সেই শরীরও বের করতে হয়েছে। আর পুরো জায়গাটা ভয়াবহ পচা গন্ধে ভরা ছিল। একটা মেয়ে এবং একটা ছেলে শ্রমিক আত্মহত্যা করেছিল। আমাদের পরিচিত একজন উদ্ধারকর্মী অনেকবার মানসিকভাবে প্রায় ভারসাম্যহীন অবস্থায় চলে যেতো। আমাদের বন্ধু হিমু রানা প্লাজা ঘটনার কয়েক বছর পরে আত্মহত্যা করে।
স্ট্রিম: আপনেরা বলছিলেন এই ঘটনায় ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক মারা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক মারা গেছে। কোন তথ্যটি সঠিক ছিল?
তাসলিমা আখতার: আমি এখনো বলবো রানা প্লাজার ঘটনায় ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক মারা গেছে। আমরা গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি থেকে তখন একটা তালিকা করি। প্রথমে আমরা নিখোঁজ তালিকা করা শুরু করি। পরবর্তী সময়ে যতগুলো তালিকা ছিল সরকারি সামরিক বাহিনীর তালিকা বা বিজিএমইএর তালিকা সবগুলো তালিকাকে ক্রস চেক করে আর নিজেরাও অনুসন্ধান করে ১ হাজার ১৭৫ জনের তালিকা তৈরি করি। আমরা কিন্তু সেই তালিকা শেয়ার করেছি। যখনই যে তথ্য পেয়েছি সেটা বিজিএমইএর সাথে বা সরকারের কাছেও শেয়ার করেছি। কিন্তু আমরা দেখেছি কিছু কিছু শ্রমিকের পরিবার ক্ষতিপূরণ পেলেও তাঁদের নাম যুক্ত করা হয়নি।
স্ট্রিম: রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়নি, বিচার সম্পূর্ণ হয়নি। কেনো হয়নি বলে মনে করেন?
তাসলিমা আখতার: ১৩ বছরে বহু কিছু পরিবর্তন হইয়েছে। রানা প্লাজা ঘটনার ঠিক দুই মাসের মাথায় শ্রম আইন পরিবর্তন হয়। সেই শ্রম আইন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৮৭টা ধারা নিয়ে পরিবর্তন আসে। কিন্তু সেই পরিবর্তন আসলেও ক্ষতিপূরণের যে প্রয়োজনীয়তা, শাস্তির বিষয়টা এসব জায়গাগুলোতে বড় রকম কোনো পরিবর্তন এখন পর্যন্ত হয় নাই। ফলে বিচার সম্পন্ন হয় নাই। একটা মর্যাদাপূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি ২০১৩ সাল থেকেই আমরা করে আসছিলাম। কিন্তু সেটাও হয় নাই। আর সোহেল রানাসহ দোষী যারা ছিলেন তাদেরও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় নেই। কারণ তাঁরা প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। তাঁরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ভাবে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পেরেছেন।
স্ট্রিম: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
তাসলিমা আখতার: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

জ্বালানি বাণিজ্যের পাশাপাশি চীন, রাশিয়া ও ইরান এখন ওমান উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় নিয়মিত যৌথ নৌ-মহড়া পরিচালনা করছে। এই সামরিক সমন্বয় সরাসরি বার্তা দিচ্ছে যে, এই দেশগুলো তাদের জ্বালানি সরবরাহ পথ রক্ষায় এবং সামুদ্রিক অবরোধ মোকাবিলায় একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
১৫ ঘণ্টা আগে
দেশে খুনের মতো গুরুতর সহিংস অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু কিছু রোমহর্ষক ঘটনা জনমনে ব্যাপক আলোড়ন ও ভীতির সঞ্চার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
১৭ ঘণ্টা আগে
এশীয় হাতি নিয়ে বাংলাদেশে নানা দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। একের পর এক হাতি হত্যাকাণ্ড কিংবা অপঘাতে মৃত্যু। কিছুদিন আগে ছিল পালা হাতির চাঁদাবাজি ও হাতির ওপর মাহুতের নির্মম অত্যাচার নিয়ে তুমুল আলোচনা। তারপর ঘটল চট্টগ্রামের চুনতিতে ট্রেনের ধাক্কায় হাতির মৃত্যু।
১ দিন আগে
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থায় জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বিশেষ করে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতা,
২ দিন আগে