leadT1ad

জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ

এক গ্রামীণ সমাজে সুফিবাদের অন্বেষণ: অবিশ্বাস্য রাজু চাচা

মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যামিলি ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: বিটুইন মেমোরিজ অ্যান্ড হিস্ট্রি’-এর একটি অধ্যায়ের অনুবাদ। বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা স্ট্রিমের জন্য অনুবাদ করবেন জি এইচ হাবীব। এবার প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় কিস্তি

জি এইচ হাবীব
মূল লেখা: মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান

স্ট্রিম গ্রাফিক

আমার কাছে রাজু চাচা এক অবিস্মরণীয় চরিত্র। এতদিন পরে পেছনে তাকিয়ে আজ মনে হয় তিনি ছিলেন, সম্ভবত, ঔপনিবেশিক বাংলা ও ঐতিহাসিক ভারতের একটি আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির প্রতিনিধি। কয়েক বছর ধরে তাঁকে চেনার পর মনে হয়েছিল মানুষটি আলাদা। তিনি যেদিন প্রথম এলেন সেদিনের কথা ভাবলে মনে হয় তিনি যেন একটি অতীন্দ্রিয়বাদী অভিযানে নেমেছিলেন এবং আমার বাবার মধ্যে একজন পথ প্রদর্শক বা মেন্টর খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। সেটা আমি তখন উপলব্ধি করতে পারিনি। তবে তারপরেও আমি এটুকু অন্তত বুঝতে পেরেছিলাম যে তাঁরা দুজন কখনো কখনো মাঝে মধ্যে রুমির বই হাতে নিয়ে গভীর আলোচনায় রত হতেন।

বহু পরে আমি অনুমান করতে পেরেছিলাম, তাঁরা দুজনে একটা ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয়ের আলাপে লিপ্ত ছিলেন—রুমির কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে ঐশ্বরিকতার অনুসন্ধান—যা আমার তরুণ বয়সের খোরাক ছিল না। আমার মনে আছে আমি যখন কেবলই ৭ম বা ৮ম শ্রেণির ছাত্র তখন আমার বাবা আমাকে এম এনামুল হকের বঙ্গে সুফি প্রভাব বইটি উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন আমি বইটি পড়ে তেমন কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে পরবর্তী জীবনে বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছিল আমার বাবা আল্লাহর কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণে বিশ্বাস করতেন – প্রার্থনা, ইবাদত (ধ্যান), জিকির (বার বার আল্লাহর নাম আবৃত্তি করা বা আওড়ানো), এবং তাঁকে ভালোবাসার মাধ্যমে। রাজু চাচা ও আমার বাবা নিজেদের কথাবার্তা ও ভাবনা চিন্তায় একটা সাযুজ্য অনুভব করতেন। তাঁরা সুফি কবিতা ও জিকিরের কৌশল বা পদ্ধতি নিয়ে কথা বলতেন।

আমার যতদূর মনে পড়ে, পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে লুঠতরাজ ও অগ্নিসংযোগ এবং ঢাকায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার বিশেষ কয়েকটি ঘটনা ছাড়া আমি ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক অশান্তি-অস্থিরতা এবং তীব্র পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে তাঁদের তেমন একটা কথা বলতে শুনিনি। যদিও এমনকি গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়া পাকিস্তান আন্দোলনের খবর তাঁদের অজানা ছিল না। বাবার প্রিয় কিছু ফারসি কবিতার বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ আমার নজরে পড়েছিল। বাবা সেগুলো দেখে দেখে আবৃত্তি করতেন। কিন্তু তখন আমি সেগুলো বুঝতে পারতাম না। ফারসি ধ্রুপদি রচনাগুলো সম্পর্কে বাবার চমৎকার ধারণা ছিল।

সুফিবাদ অনেক বেশি বহুত্ববাদী। সুফিবাদ মনে করে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা গোটা মানবজাতির দিকে প্রসারিত হওয়া উচিত। এবং যেকোনো ধরনের বিভাজন এড়িয়ে চলা উচিত।

রাজু চাচা যেদিন প্রথম আমাদের বাড়ি আসেন সেই দিনটির কথা আমার দিব্যি মনে পড়ে। তখন সবাই নামাজের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। আমার বাবা যখন তাঁর পড়াশোনার প্রিয় জায়গাটিতে ফিরে এসেছিলেন ততক্ষণে রাজু চাচা চেলে গেছেন। আমার মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এসেছিল? আপনি তাকে চেনেন?’ ‘বালিগাঁও (কাছের একটি গ্রাম) থেকে একজন লোক এসেছিল, তুমি তাকে চিনবে না।’ মা ফের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চায় সে?’ বাবা জবাব দিলেন, ‘তা, কিছু তো একটা চায় বটেই লোকটা।’ ‘কী?’ মা-র ত্বরিত প্রশ্ন। বাবা একটু হেসে রহস্য করে জবাব দিলেন, ‘এমন কিছু যা আমার কাছে নাই।’ মা যাতে আবার কিছু জিজ্ঞেস করতে না পারেন সেজন্য বাবা কিছু একটা নেবার জন্য পেছনের দিকে কাছারি ঘরে চলে গেলেন। মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। ‘যা আপনার কাছে নাই তা কী ক’রে লোকে আপনার কাছে চাইতে পারে!’ মনে হলো মা নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলেন। যা কারো কাছে নেই তা সে কী করে অন্যকে দেবে—এবার কি আমিই নিজেকে শুধালাম? আমার মনে হলো, যা একজন মানুষের কাছে নাই সেটা তার কাছে চাওয়া বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

প্রথম দেখার পর থেকে সেই আগন্তুক ধীরে ধীরে আমাদের একজন পারিবারিক সদস্যে পরিণত হলেন। তিনি বিশেষ করে মঙ্গলবার বা শুক্রবার আসতেন। আমাদের সঙ্গে খেতেন এবং বাবার সঙ্গে নামাজ পড়তেন। আমার বাবা মৌনভাবে জিকির করতেন আর রাজু চাচা উচ্চকণ্ঠে, চোখ বুজে। জিকির করার পদ্ধতির এই দুই ধরনের পার্থক্য সম্পর্কে আমি পরে জানতে পেরেছিলাম। নীরব জিকিরের উদগাতা সম্ভবত বাহাউদ্দিন নকশাবন্দি (১৩১৮-১৩৮৯), বুখারার মধ্যযুগীয় সুফি সাধক। আমাদের বাড়িতে অন্য যে অসংখ্য দরবেশ আসতেন তাঁরা সশব্দে জিকির করতেন। ১৯৯৫ সালে আমি মধ্য এশিয়া সফরে যাই। তখন আমি বুখারার উপান্তে বাহাউদ্দিনের মাজারে গিয়েছিলাম। স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টি সমাধিসৌধ ও মাদ্রাসা দখল করে নিয়েছিল। আমি খেয়াল করলাম, মাজারে যাওয়া দর্শনার্থীরা হঠাৎ সেই সমাধিসৌধে নীরবে জিকির এবং প্রার্থনা করতে শুরু করলেন।

আধ্যাত্মিক বিষয়ে পারস্পরিক আগ্রহের ভিত্তিতে আমার বাবা এবং রাজু চাচার মধ্যে সদ্য তৈরি হওয়া সখ্যের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া এবং আরো দূর স্থানে যাকে সুফি ভ্রাতৃত্ব বলে তার একটা প্রভাব ছিল। আমাদেরটির মতো একটি কাছারিবাড়িসহ তিন চারটে ঢেউটিনের ছাউনি দেয়া ঘরসহ একটি বড় বসতবাটি ছিল রাজু চাচার। সামনে বড় পুকুর। তিনি অর্থবান ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু সারা বছরের খোরাকির ধান ফলাতেন। পাট এবং আরো কিছু শস্য বিক্রি করে তিনি নগদ অর্থ পেতেন। ভারতে অভিবাসী হওয়া হিন্দুদের জমি কেনার ব্যাপারে আমার বাবার মতোই তিনিও উৎসুক ছিলেন না। নিজের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট মানুষ তাঁর মতো আর একজন-ও দেখিনি আমি। কিন্তু তারপরেও, কথাবার্তা শুনে তাঁকে সুখী মনে হতো না। তাঁর জাগতিক অনুযোগের একটি বিষয় ছিল এই যে তাঁর বড় পুত্রটি দ্বিতীয় মহাযু্দ্ধে যোগ দিতে বার্মা (অধুনা মায়ানমার) গিয়েছিল। পরে সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। প্রথমে আশঙ্কা করা হয়েছিল সে নিহত হয়েছে, কিন্তু পরে জানা যায় তা সত্যি নয়। রাজু চাচা আমাদের জানান, যুদ্ধ শেষে সে একবার বাবা-মার সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি এসেছিল; কিছুদিন পর আবার বার্মা ফিরে যায়। সেখানে সে একটি বর্মি কন্যার প্রেমে পড়ে এবং বার্মাতেই থেকে যায়।

রাজু চাচার আরো দুটি ছেলে ছিল—কিন্তু তাঁরা বেশিদিন স্কুলের পড়ালেখা করেনি—এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচাইতে বড় আক্ষেপ। তাঁরা চাষাবাদ করে বাবাকে সাহায্য করে। একজনের বড় বড় চুল আর দাড়ি। কখনো কখনো সেও আমার বাবার সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলাপ আলোচনায় মগ্ন হতো।

আমার বাবা সামাজিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থী ছিলেন। যতটুকু প্রয়োজন এবং যাঁরা তাঁর কাছের ছিল, তার বাইরে তিনি যেতেন না। পড়তে তিনি খুব পছণ্দ করতেন, একেবারে আদ্যেপান্ত, এবং বার বার— ইতিহাস, ইসলাম, আধ্যাত্মিকতা, ইত্যাদি বিষয়ের যে কোনো কিছু হাতের কাছে পেলেই হলো, তিনি পড়তেন।

আমার বাবা সামাজিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থী ছিলেন। যতটুকু প্রয়োজন এবং যাঁরা তাঁর কাছের ছিল, তার বাইরে তিনি যেতেন না। পড়তে তিনি খুব পছণ্দ করতেন, একেবারে আদ্যেপান্ত, এবং বার বার— ইতিহাস, ইসলাম, আধ্যাত্মিকতা, ইত্যাদি বিষয়ের যে কোনো কিছু হাতের কাছে পেলেই হলো, তিনি পড়তেন। আমার একটি ছোট ভাই ছিল। যুদ্ধের সময়ে আড়াই বছর বয়েসে সে মারা যায়। তারপর থেকে বাবার মধ্যে মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে লেখা বই-পত্র পড়ার একটা প্রবণতা জন্মায়। ধার্মিক মনোভাবাপন্ন লোকজনের সঙ্গে তিনি অকালমৃত বাচ্চাদের মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে আলোচনা করতেন। আমার বাবা-মা ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে পড়াশোনার মাঝে প্রশান্তি খুঁজে পেতেন; তবে আমার বাবার এ ব্যাপারে বেশি আগ্রহ ছিল। আর আমার মা প্রতিদিন নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ দোয়া-দরূদ পড়তেন। বেশ কয়েক বছর তাঁরা সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি, তবে মধ্যবর্তী বছরেগুলোতে আমার কয়েকটি ছোট ভাই-বোন জন্মগ্রহণ করার ফলে তাঁরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। আমি জানতে পারি, রাজু চাচাও তাঁর এক শিশুপুত্রকে হারিয়েছিলেন; তিনিও তাঁর পুত্রশোকের কথা আমার বাবার সঙ্গে বলে হালকা হতে চাইতেন।

বাবা বাড়িতে কিছু পত্র-পত্রিকা রাখতেন। সেসব পত্রিকার সদ্য প্রকাশিত কপি বাড়িতে এলে তিনি সেগুলো পড়ায় মশগুল হয়ে যেতেন। অন্য সময়, স্কুলে পড়ানো বা অন্য কাজে ব্যস্ত না থাকলে তিনি নামাজ পড়তেন। মাঝে মাঝে তিনি আমাদের প্রতিবেশী দু একজনের সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক প্রশ্নের আলোচনায় রত হতেন। এই প্রতিবেশীরা প্রায়ই আমাদের কাছারি ঘরে আসতেন বা কখনো কখনো সন্ধ্যার গোড়ার দিকে বা ছুটির দিনগুলোতে যখন বাবা একটু হালকা মেজাজে থাকতেন তখন বারান্দায় এসে জুটতেন। অনেকটা ছোটো খাটো সেমিনারের মতন ছিল সেগুলো, নানা বিষয় বা সমস্যার কথা উঠে আসত সেখানে, তবে সাধারণত আলাপগুলো ছিল উন্মুক্ত।

আমাদের গ্রামের শিক্ষিত ও অশিক্ষিতদের মধ্যে আমার বাবা ছিলেন একজন সংযোগকারীর মতো। আমি জানি তাঁরা বাবার কাছে প্রায়ই কলকাতা বা দিল্লির সর্বশেষ খবরাখবর জানতে চাইতেন: কয়েক বছর ধরে ডাকে কলকাতা থেকে আসা খবরের কাগজ ছাড়াও আমার বাবা তাঁর কিছু সহকর্মীর কাছ থেকেও রাজনৈতিক খবরাখবর পেতেন এবং এই সহকর্মীদের কেউ কেউ প্রাদেশিক (আঞ্চলিক) ও জাতীয় রাজনীতির ব্যাপারে বেশ ওয়াকিবহাল ছিলেন। অবরে সবরে, অতিথি প্রতিবেশীরা সাধারণত পল্লী গান গাইতে ব্যবহৃত আমার বাবার বাদ্যযন্ত্রগুলো নাডাচাড়া করতেন। আমার মনে আছে তাঁদের একজন বাবাকে তাঁর কয়েক বছর ধরে জোগাড় করা তসবিহগুলোর ছড়া বেঁধে দেবার ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন।

রাজু চাচা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে তিনি আর বাবা একই মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন। মাঝে মধ্যে তাঁরা ঢাকা ও তার আশেপাশের মুসলিম মাজারগুলো পরিদর্শনে যেতেন। দরগার প্রতি তাঁদের এই ভক্তি-শ্রদ্ধা দুজনের বন্ধুত্বকে গাঢ় করেছিল। একবার তাঁরা বাউলদের বার্ষিক জমায়েতে যোগ দিতে নরসিংদী যান; আমার যতদূর মনে পড়ে, আমিও তাঁদের সঙ্গে গিয়েছিলাম। মাজারের প্রতি আমার বাবার ভক্তি-শ্রদ্ধা—দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের মধ্যে যে চর্চাটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে— গোড়া মুসলমানরা ভালোচোখে দেখতেন না। ইসলামের আক্ষরিক ভাষ্য (তাফসির) এবং সুফি আনুকূল্যমূলক চিন্তা-ভাবনার মধ্যে যে ব্যবধান—আজ আমি যতটুকু বুঝতে পারি—তার মূলে আছে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মতাত্ত্বিক বিভাজন, যা কিনা আজও চূড়ান্তভাবে মীমাংসিত হয়নি।

সুফিবাদ অনেক বেশি বহুত্ববাদী। সুফিবাদ মনে করে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা গোটা মানবজাতির দিকে প্রসারিত হওয়া উচিত। এবং যেকোনো ধরনের বিভাজন এড়িয়ে চলা উচিত। একনিষ্ঠ সুফিরা গভীর ও ছন্দোবদ্ধ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে তাঁদের মানসিক শক্তিকে সংহত করেন; তাঁরা উপবাস করেন, রাত্রি জাগেন এবং আল্লাহর বিভিন্ন নাম জিকির করেন। আমার মনে পড়ে, আমাদের বাড়িতে কোরানে উল্লিখিত আল্লাহর বিভিন্ন নামের অর্থ বিশ্লেষণ করা একটি ছোট বই ছিল। জীবনের পরবর্তী সময়ে আমি ভেবেছি খ্রিস্টানদের বিভিন্ন দল উপদলের মধ্যে যে নিরন্তর প্রার্থনা বলে একটি বিষয় আছে তার সঙ্গে সুফিদের জিকিরের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। মরমি পরমানন্দ কখনো কখনো বেশ উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে। আমি যে গাঁজা সেবন দেখেছিলাম তা এ ধরনের তুরীয় দশা অর্জনের চর্চা বা প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পক্ত, যদিও আমার তরুণতর বয়েসে আমি যেসব সুফি ধরনের ব্যক্তি দেখেছি তাঁদের সবার মধ্যে এই চর্চাটি ছিল না। সত্যি বলতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি এর বিপরীতটিই লক্ষ করেছি।

আমাদের বাড়িতে যে দু’জন প্রতিবেশী অলস সময় কাটাতেন তাঁদের একজন ছিলেন পল্লিগায়ক। যখন তাঁরা দুজন একসঙ্গে ছিলেন তখন তাঁরা কারো নামে কোনো খারাপ কথা বলতেন না। রাজু চাচা প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, ‘মারেফত কী? মারেফত কি মুসলমানদের কাছে শরিয়া থেকে আলাদা?’ আমাদের একজন তরুণ মৌলভী বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাকে কোরান পাঠ আর নামাজ পড়া শেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। মাঝে মাঝে আমি শরিয়া ও মারেফতের পারস্পরিক সাযুজ্য সম্পর্কে তাঁদের আলাপ করতে শুনেছি, তবে এই দুইয়ের মধ্যে ফারাকের ব্যাপারটি ঠিক ভালোভাবে বুঝতে পারিনি। ‘শরিয়াকে সমীহ না করে আপনি মারেফতে যেতে পারবেন না,’ এই বলে মৌলভি সাহেব চট করে বিতর্কে শামিল হতেন। আমার বাবা মারেফতে ডুব দেবার আগে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো অনুসরণ করার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতেন। তিনি এও স্মরণ করিয়ে দিতে চাইতেন যে ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত দরবেশরা শরিয়ার মৌলিক বিষয়গুলো পালন করতেন। ইসলামের নেহাত বাঁধাধরা চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্যই কেবল শরিয়ার প্রতি একনিষ্ঠ থাকার ব্যাপারে রাজু চাচার খানিকটা সংশয় ছিল। তিনি বলতেন, ‘দিনে পাঁচবার সেজদায় যাবার আগে আমি আল্লাহকে শর্তহীনভাবে ভালোবাসতে চাই।’ যতদূর মনে পড়ে রাজু চাচা সময়মতো নামাজ পড়তেন, তবে তিনি বিতর্ক উসকে দিতে আর উত্তর পাওয়ার জন্য তাঁর প্রশ্নগুলো উত্থাপন করতেন। আমাদের বহির্বাটি যখন মাঝেমাঝে এসব আধ্যাত্মিক আলাপ আলোচনায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠত, আমার ধারণা আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

আমাদের বাড়ির কাছেই বাস করতেন যে প্রতিবেশী মৌলভী তিনি অগ্নিবান ছুঁড়তেন: ‘কিন্তু, কোরান আর হাদিস অনুযায়ী তো শরিয়া পালন বাধ্যতামূলক: সেখানো কোনো ছাড় নাই।’ অবরে সবের রাজু চাচা ও মৌলভী এরকম উত্তপ্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়তেন, এমনকি তা চিৎকার চেঁচামেচি অব্দি গড়াতো। আমার বাবা তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন, রাজু চাচার সামান্য শিক্ষাগত অবস্থা নিয়ে তাঁর নিজের মধ্যে কোনো হীনম্মন্যতা ছিল না: তিনি খুব দক্ষতার সঙ্গে তাঁর তেড়িয়া প্রশ্নগুলো তুলে ধরতেন, যেসব প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর দলের কারো জানা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির দিনগুলিতে বাড়িতে এলে আমি সচরাচর তাঁর সম্পর্কে নানা কিছু জানতে চাইতাম; ততদিনে আমার প্রিয় চাচা মারা গেছেন। আমাদের বাড়ির সেসব ছোট কিন্তু অনানুষ্ঠানিক জমায়েতে এ ধরনের আধ্যাত্মিক আলাপ-আলোচনা এই বিষয়টির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে আমাদের গ্রামে ও তার পার্শ্ববর্তী এলকায় একটি সুফি ধারা বিদ্যমান ছিল, তবে আমার বাবা কখনোই মূলত সুফি ধারার রচনা থেকে পাওয়া তাঁর সুফি পক্ষপাত বা অনুরাগকে কেন্দ্র করে কোনো পরম্পরা বা সিলসিলা (আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার) তৈরি করেননি।।

অবশ্য, সুফি সংসর্গ ও পল্লি গানের যে মিশ্রণের চর্চা আমার বাবা করেছিলেন তা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে সর্বজনীনভাবে জনপ্রিয় ছিল না। এবং বার দুয়েক তিনি গ্রাম পরিষদের একজন সদস্য ও একজন স্থানীয় রাজনীতিকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি ছিলেন আমার সবচাইতে বড় চাচার সমসাময়িক এবং স্বাভাবিকভাবেই আমার বাবার চাইতে বয়সে বড়। অবিশ্বাস্য রকমের ধূর্ত এই মানুষটির কাছ থেকে আমার বাবা যতটা সম্ভব দূরে থাকলেও, একটা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখতেন। একদিন সেই প্রতিবেশী আমার বাবাকে বললেন, ’শুনলাম কিছু লোক বেশ রাত অব্দি গান বাদ্য করে, আর তারপর বাড়ি ফিরে আমাদের গ্রামের লোকজনের বাসায় চুরি করে! কথাটা কি সত্যি?’ আমার বাবা তো আকাশ থেকে পড়লেন; লোকটি যা বোঝাতে চাইছিলেন তা আপত্তিকর। তিনি সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাবে বললেন, ‘ভাই, আমি এমন লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করি না যারা চুরি করে। আপনার সেটা জানার কথা।’ আমাদের সেই প্রতিবেশী বাবার চাইতে ঢের বেশি ধূর্ত আর বৈষয়িক; তিনি বললেন, ‘না না, আপনার নৈতিকতা নিয়ে কে প্রশ্ন করবে? তবে কিনা, লোকজন এসব নিয়ে বলাবলি করছে।’ একটু আগে তিনি যে অভিযোগের তীর ছুঁড়েছিলেন সেটা থেকে খানিকটা সরে এলেন। এরপর তিনি বাজারের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন, কিন্তু একটু পর খানিক দূর যাওয়ার পর তিনি থেমে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন, তারপর গলার স্বর আরো মোলায়েম করে আমার বাবাকে বললে, ‘বোঝেনই তো, সময়টা ভালো নয়। এলাকায় মাঝে মধ্যেই হিন্দু-মুসলমান সংঘাত বেধে যাচ্ছে। আমাদের সাবধান থাকতে হবে। এই কথাটাই কেবল বলতে চাইছিলাম আপনাকে।’

আমার বাবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও অস্থিরতার বিরোধী ছিলেন। তিনি জবাব দিলেন, ‘সেটা আমি বুঝি, ভাই। আমি খেয়াল রাখবো। তাঁরা মাঝে মধ্যে গান-বাদ্য করার জন্য আসেন, কারো কোনো ক্ষতি করবে না। এটা আমার নিজের বাড়ি, বারোয়ারি গান-বাজনা করার জায়গা

বিষয়:

সুফিবাদ
Ad 300x250

সম্পর্কিত