সুমন সুবহান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘কঠিন’ হামলার হুমকির পরপরই ইরানের কৌশলগত বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসসহ একাধিক শহরে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে। আর এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করার পর সমগ্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
এই মার্কিন আগ্রাসনের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ইরান ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করেছে। বৈশ্বিক তরল জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনকারী এই জলপথটি অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে।
পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশগুলোর দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই মুখোমুখি সামরিক অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) ওমান উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান পরিকল্পিতভাবে এই হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছে, যদিও মার্কিন সেন্টকম একে একটি সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে দুই পাইলটকে অক্ষত উদ্ধারের কথা জানায়। তবে ট্রাম্প এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি ইরানি আঘাত হিসেবে গণ্য করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেতে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের প্রায় ২০টি সামরিক স্থাপনায় একযোগে বিমান হামলা চালায়।
এই হামলার পর হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘আমরা গতকাল তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি এবং আজকেও তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি।’
একই সাথে তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ইরানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে এবং দেশটি দ্রুত একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে যাচ্ছে। তিনি তেহরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তারা যদি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে সই করতে রাজি না হয়, তবে পরবর্তী ধাপে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
সেন্টকমের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী প্রায় চার ঘণ্টা ধরে ইরানের অভ্যন্তরে একযোগে জোরালো হামলা চালায়। মূলত হরমুজ উপকূল এবং এর আশেপাশের সামরিক অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ইরানের অভ্যন্তরে থাকা প্রায় ২০টি সুনির্দিষ্ট সামরিক নিশানায় নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে তাদের বাহিনী।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্যমতে, মার্কিন হামলায় প্রধান প্রধান বিস্ফোরণগুলো ঘটেছে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের নৌঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস। সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের পাশাপাশি মার্কিন হামলা প্রতিহত করতে কর্তৃপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার বিকট শব্দ পাওয়া গেছে।
এদিকে মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুসারে, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখের নিকটবর্তী জাস্ক অঞ্চল এবং গোরগানসহ দেশের অন্যান্য কৌশলগত পয়েন্টে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে, কেশম দ্বীপ ও সিরিক বন্দরে মার্কিন বাহিনীর চালানো বিমান হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং দুটি বেসামরিক পানির ট্যাংক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরান কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানেই থাকেনি, বরং অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে পাল্টা আঘাত হেনেছে। আইআরজিসি প্রেস উইংয়ের দাবি অনুযায়ী, তারা ড্রোন ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশে (বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডান) অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোর মোট ২১টি নিশানায় একযোগে সফল হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি জানায়, তারা জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ৪টি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এতে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং প্রধান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। যদিও জর্ডান ও মার্কিন বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ৫টি ক্ষেপণাস্ত্রই আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে এবং কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
অন্যদিকে আল জাজিরা আন্তর্জাতিক সংবাদের প্রতিবেদন অনুসারে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর ও শেখ ইসা বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালানো হলে বাহরাইন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে তা প্রতিহত করে। এছাড়া কুয়েতের আলী আল সালেম ও আহমদ আল জাবের মার্কিন বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালানো হয় এবং কুয়েত সামরিক বাহিনী উচ্চ সতর্কতায় থেকে এগুলো প্রতিহত করার কথা নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাবটি পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। ইরানি সংবাদ সংস্থা মেহের-এর পরিবেশিত সামরিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইরানের সামরিক হাই কমান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
আইআরজিসি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই নির্দেশ অমান্য করে কোনো জাহাজ অবৈধভাবে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং ইতিমধ্যে হরমুজে প্রবেশ করতে যাওয়া দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও তেহরান দাবি করেছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা বা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। এই বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন হতে থাকে।
বর্তমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই গত বুধবার সকালে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধিদল জরুরি ভিত্তিতে ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে। সিএনএন ডিপ্লোম্যাটিক ব্যুরোর দেওয়া বিশেষ প্রতিবেদন ও কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কাতার মূলত ওয়াশিংটনের সাথে পরোক্ষ আলোচনা করে দুই পক্ষের মধ্যকার বিদ্যমান মতপার্থক্যগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
মধ্যস্থতাকারী এই দলটি দুই দেশকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঠের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন আলোচনার টেবিল ছেড়ে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানের দিকেই বেশি ঝুঁকছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন প্রশাসনকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দৃঢ়তা পরীক্ষা করছে। নিরাপদ থাকতে চাইলে মার্কিন বাহিনীকে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে হবে।’
অন্যদিকে, তেহরানের অবস্থান জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটন বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সব ধরনের ‘কূটনৈতিক যোগাযোগ’ পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই নজিরবিহীন সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘটনা বিশ্বকে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এই সংকট আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে এক ধ্বংসাত্মক বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ করণীয় হলো—উভয় পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধের ময়দান থেকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জ্বালানি পথকে সচল করা।
ওয়াশিংটন যদি উসকানিমূলক হুমকি বন্ধ না করে এবং তেহরান যদি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেয়, তবে জ্বালানি সংকটের চরম ধাক্কায় বিপর্যস্ত হবে বৈশ্বিক অর্থনীতি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘কঠিন’ হামলার হুমকির পরপরই ইরানের কৌশলগত বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসসহ একাধিক শহরে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে। আর এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করার পর সমগ্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
এই মার্কিন আগ্রাসনের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ইরান ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করেছে। বৈশ্বিক তরল জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনকারী এই জলপথটি অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে।
পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশগুলোর দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই মুখোমুখি সামরিক অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) ওমান উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান পরিকল্পিতভাবে এই হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছে, যদিও মার্কিন সেন্টকম একে একটি সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে দুই পাইলটকে অক্ষত উদ্ধারের কথা জানায়। তবে ট্রাম্প এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি ইরানি আঘাত হিসেবে গণ্য করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেতে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের প্রায় ২০টি সামরিক স্থাপনায় একযোগে বিমান হামলা চালায়।
এই হামলার পর হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘আমরা গতকাল তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি এবং আজকেও তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি।’
একই সাথে তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ইরানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে এবং দেশটি দ্রুত একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে যাচ্ছে। তিনি তেহরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তারা যদি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে সই করতে রাজি না হয়, তবে পরবর্তী ধাপে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
সেন্টকমের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী প্রায় চার ঘণ্টা ধরে ইরানের অভ্যন্তরে একযোগে জোরালো হামলা চালায়। মূলত হরমুজ উপকূল এবং এর আশেপাশের সামরিক অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ইরানের অভ্যন্তরে থাকা প্রায় ২০টি সুনির্দিষ্ট সামরিক নিশানায় নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে তাদের বাহিনী।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্যমতে, মার্কিন হামলায় প্রধান প্রধান বিস্ফোরণগুলো ঘটেছে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের নৌঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস। সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের পাশাপাশি মার্কিন হামলা প্রতিহত করতে কর্তৃপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার বিকট শব্দ পাওয়া গেছে।
এদিকে মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুসারে, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখের নিকটবর্তী জাস্ক অঞ্চল এবং গোরগানসহ দেশের অন্যান্য কৌশলগত পয়েন্টে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে, কেশম দ্বীপ ও সিরিক বন্দরে মার্কিন বাহিনীর চালানো বিমান হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং দুটি বেসামরিক পানির ট্যাংক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরান কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানেই থাকেনি, বরং অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে পাল্টা আঘাত হেনেছে। আইআরজিসি প্রেস উইংয়ের দাবি অনুযায়ী, তারা ড্রোন ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশে (বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডান) অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোর মোট ২১টি নিশানায় একযোগে সফল হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি জানায়, তারা জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ৪টি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এতে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং প্রধান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। যদিও জর্ডান ও মার্কিন বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ৫টি ক্ষেপণাস্ত্রই আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে এবং কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
অন্যদিকে আল জাজিরা আন্তর্জাতিক সংবাদের প্রতিবেদন অনুসারে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর ও শেখ ইসা বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালানো হলে বাহরাইন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে তা প্রতিহত করে। এছাড়া কুয়েতের আলী আল সালেম ও আহমদ আল জাবের মার্কিন বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালানো হয় এবং কুয়েত সামরিক বাহিনী উচ্চ সতর্কতায় থেকে এগুলো প্রতিহত করার কথা নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাবটি পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। ইরানি সংবাদ সংস্থা মেহের-এর পরিবেশিত সামরিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইরানের সামরিক হাই কমান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
আইআরজিসি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই নির্দেশ অমান্য করে কোনো জাহাজ অবৈধভাবে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং ইতিমধ্যে হরমুজে প্রবেশ করতে যাওয়া দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও তেহরান দাবি করেছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা বা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। এই বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন হতে থাকে।
বর্তমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই গত বুধবার সকালে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধিদল জরুরি ভিত্তিতে ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে। সিএনএন ডিপ্লোম্যাটিক ব্যুরোর দেওয়া বিশেষ প্রতিবেদন ও কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কাতার মূলত ওয়াশিংটনের সাথে পরোক্ষ আলোচনা করে দুই পক্ষের মধ্যকার বিদ্যমান মতপার্থক্যগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
মধ্যস্থতাকারী এই দলটি দুই দেশকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঠের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন আলোচনার টেবিল ছেড়ে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানের দিকেই বেশি ঝুঁকছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন প্রশাসনকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দৃঢ়তা পরীক্ষা করছে। নিরাপদ থাকতে চাইলে মার্কিন বাহিনীকে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে হবে।’
অন্যদিকে, তেহরানের অবস্থান জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটন বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সব ধরনের ‘কূটনৈতিক যোগাযোগ’ পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই নজিরবিহীন সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘটনা বিশ্বকে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এই সংকট আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে এক ধ্বংসাত্মক বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ করণীয় হলো—উভয় পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধের ময়দান থেকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জ্বালানি পথকে সচল করা।
ওয়াশিংটন যদি উসকানিমূলক হুমকি বন্ধ না করে এবং তেহরান যদি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেয়, তবে জ্বালানি সংকটের চরম ধাক্কায় বিপর্যস্ত হবে বৈশ্বিক অর্থনীতি।

তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে দেশের সব শ্রেণির মানুষেরই বিশেষ আগ্রহ ছিল। উন্নয়ন সহযোগীদেরও আগ্রহ কম থাকার কথা নয়। বাজেটে প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে সরকার কিছু করে কিনা, সে বিষয়েও ছিল জিজ্ঞাসা।
২০ ঘণ্টা আগে
ব্যক্তি ও পরিবার যেভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলায়, সরকার সেভাবে মেলাবে না, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে এটা বেশি করে প্রযোজ্য। আমাদের তো উন্নয়নের চাহিদা এখনও বিরাট। কিছুটা উন্নয়ন দেখতে পেলে এর চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তথ্য-উপাত্ত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে যাওয়ার পর আমরা আবার সহজেই জানতে পার
১ দিন আগে
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থান ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা দেশটির নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। দেশের প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর মধ্যে তিস্তা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ কারণে নদীটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
২ দিন আগে
রেহান আসিফ আসাদ, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি পেশাদার। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আগে বুধবার (১০ জুন) স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপে তিনি তুলে ধরেছেন সিম ট্যাক্স, স্টার্টআপ তহবিল, ডেটা সেন্টারসহ ডিজিটাল অবকাঠামো ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা।
২ দিন আগে