ফাবিহা বিনতে হক

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং ইউনিসেফের ২০২৪ সালে যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু এখনো কোনো না কোনোভাবে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে, যা জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বড় হুমকি।
‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’-এ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সীদের কিশোর হিসেবে গণ্য করা হবে। ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে কোনো কাজে নিয়োগ করা যাবে না। এমনকি বাবা-মা বা কোনো অভিভাবকও সন্তানকে কাজে দেওয়ার জন্য কারও সঙ্গে কোনো ধরণের চুক্তি করতে পারবেন না।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, চরম দারিদ্র্য ও অভাবের কারণে অনেক শিশুকে বাধ্য হয়েই শৈশবে কাজে নামতে হচ্ছে। এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই এটি একটি বড় সংকট। অনেক বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিশুদের শৈশব এভাবে শ্রমের বাজারে হারিয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অনেক আগে থেকেই শিশুরা কোনো না কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে প্রাচীন বা মধ্যযুগে এর ধরন ছিল আজকের চেয়ে আলাদা। তখন শিশুরা মূলত পরিবারের প্রয়োজনে ঘরোয়া কাজে সাহায্য করত। যেমন বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করা, পশু চরানো বা মায়ের সঙ্গে হাতের কাজ করা। এটি ছিল নিত্যদিনের কাজ।
উদাহরণ হিসেবে কানাডার শুরুর দিকের সমাজের কথা বলা যায়। ১৯ শতকের আগে সেখানে শিশুদের পরিবারের বড় ‘অর্থনৈতিক সম্পদ’ বা অ্যাসেট হিসেবে গণ্য করা হত। আদিবাসী সম্প্রদায়, নিউ ফ্রান্স এবং শুরুর দিকের ব্রিটিশ কানাডায় শিশুরা রোজকার রান্নাবান্না, চাষাবাদ ও পশুপালনের কাজে সাহায্য করত। অনেকে আবার বড় হয়ে ভালো কোনো পেশায় ঢোকার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষানবিসি বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপও করত।

তবে ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই ধারণায় পরিবর্তন আসে। মূল কারণ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসার। ১৯১১ সালের মধ্যে কানাডায় ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেকই স্কুলে যেতে শুরু করে। স্কুলে যাওয়ার হার যত বাড়তে থাকে, কাজে নিয়োজিত কিশোরদের সংখ্যাও তত কমতে থাকে। ১৯২১ সালে যেখানে ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলেদের কাজে যাওয়ার হার ছিল ৬৮ শতাংশ, ১৯৬১ সালে তা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৪০ শতাংশে নেমে আসে।
১৮-১৯ শতকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় যখন ‘শিল্প বিপ্লব’ বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশন শুরু হলো, তখন শিশুদের জীবনে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়ায় নতুন নতুন কারখানা তৈরি হতে লাগল, মাঠে চলে এল উন্নত যন্ত্র। এই দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে সস্তা শ্রমের বিশাল চাহিদা তৈরি হয়। আর তা মেটাতে কারখানার মালিকেরা টার্গেট করল অসহায়, দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারের শিশুদের। যেসব শিশু স্কুলে যেত না বা যাওয়ার সুযোগ ছিল না, তারা দলে দলে কারখানার কাজে ঢুকে পড়ল।
ভিক্টোরিয়ান যুগে এই শিশুশ্রম আক্ষরিক অর্থেই অমানবিক হয়ে উঠেছিল। ব্রিটেনের টেক্সটাইল মিল, হ্যামিল্টনের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা কেপ ব্রেটন ও ব্রিটিশ কলম্বিয়ার খনিগুলোতে শিশুদের দিন কাটত কারখানার অন্ধকারে। তখন পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরও ভারী শিল্প কারখানায় কাজ করতে পাঠানো হতো। কয়লা খনিগুলোতে এমন কিছু সরু ও অন্ধকার সুড়ঙ্গ থাকত, যার ভেতর কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষে ঢোকা অসম্ভব ছিল। কারখানার মালিকেরা তখন এই ছোট ছোট শিশুদের সেই সুড়ঙ্গে পাঠাত। বিষাক্ত গ্যাস আর ধসে পড়ার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এই অবুঝ শিশুরা মাইলের পর মাইল সেই সুড়ঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে কয়লা টেনে আনত। সামান্য একটু এদিক-ওদিক হলেই খনির ভেতরেই মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
শুধু খনি নয়, কারখানার ভেতরেও তাদের কাজের পরিবেশ ছিল ভয়ংকর। সপ্তাহে প্রায় ৫২ থেকে ৮০ ঘণ্টা পর্যন্ত তাদের একটানা খাটানো হতো। এত খাটাখাটুনির পর কপালে যে মজুরি জুটত, তা নিতান্তই কম। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যে টাকা পেত, শিশুদের দেওয়া হতো তার মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ।
শিশুদের এই অমানবিক অবস্থা দেখে সমাজের সচেতন মানুষ ও সমাজ সংস্কারকরা প্রতিবাদে নেমে পড়েন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, শিশুদের এভাবে বিপদে ঠেলে দিলে ভবিষ্যতে বড় কোনো বিপদ অপেক্ষা করছে। ১৮৭০ এবং ১৮৮০-র দশকে প্রথম আইনি প্রতিরোধের হাওয়া বইতে শুরু করে। কারখানা, কয়লাখনিতে শিশুশ্রম বন্ধ করতে বিভিন্ন প্রদেশে আইন পাস হতে থাকে। নোভা স্কোটিয়া এবং ব্রিটিশ কলম্বিয়া খনির কাজে শিশুদের নিয়োগের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১৯২৯ সালের মধ্যে আইনগতভাবে বেশির ভাগ প্রদেশেই ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কারখানার ভারী কাজ থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব হয়।
সংস্কারকেরা বুঝলেন, শুধু কাজ বন্ধ করলেই হবে না, শিশুদের স্কুলের দিকে টানতে হবে। তাই এসব প্রদেশে আইন করে স্কুলে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে শুরু করে। ওন্টারিওতে ১৮৯১ সালে একটি আইন করা হয়, যেখানে ৮ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯২১ সালে এই বয়স বাড়িয়ে ১৬ বছর করা হয়। নিয়ম করা হলো—যদি কোনো পরিবার সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে কাজে পাঠায়, তবে সেই পরিবারকে কড়া শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এই শিক্ষা আইন আর শ্রম আইন একে অপরকে শক্তি জুগিয়েছিল।
এরপর ১৯৩০-এর দশকে যখন বিশ্বজুড়ে ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা চরম অর্থনৈতিক মহামন্দা দেখা দিল, তখন কাজের বাজারে বড় পরিবর্তন এল। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরাই তখন বেঁচে থাকার তাগিদে শিশুদের কাজগুলো করতে শুরু করলেন। ফলে শিশুরা কাজের বাজার থেকে কিছুটা রেহাই পেল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশের স্বার্থে অনেক শিশুকে আবার জোর করে কারখানায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। যুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে স্কুলের নিয়মকানুন ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
বিংশ শতাব্দীতে এসে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াইটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না, এটি আন্তর্জাতিক রূপ নিল। ১৯২৬ সালে লিগ অব নেশনস ‘স্ল্যাভারি কনভেনশন’ বা দাসত্ব চুক্তি সই করে। ১৯৩০ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর পরিধি আরও বাড়িয়ে ‘ফোর্সড লেবার কনভেনশন’ আনে, যার মূল কথা ছিল কোনো মানুষকে জোর করে খাটানো যাবে না।
১৯৩৮ সালে আমেরিকার ‘ফেয়ার লেবার স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট’ ১৬ বছরের কম বয়সীদের কাজের ধরণ ও সময় বেঁধে দেয়। ১৯৭৩ সালে ‘মিনিমাম এজ কনভেনশন’ পাস হয়, যেখানে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সর্বনিম্ন বয়স নির্দিষ্ট করা হয়। ১৭২টি দেশ এতে সই করে। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ ‘শিশু অধিকার সনদ’ বা ‘কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড’ পাস করে, যা শিশুদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯২ সালে বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রম পুরোপুরি নির্মূল করতে এবং বিভিন্ন দেশকে সাহায্য করতে ‘আইপেক’ গঠিত হয়। ১৯৯৯ সালে ‘Worst Forms of Child Labour Convention’ পাস হয়, যেখানে শিশু পাচার, দাসত্ব, জোরপূর্বক যুদ্ধ এবং মাদকের মতো কাজে শিশুদের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ১৮৬টি দেশ এটি অনুমোদন করে।
২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বছরটিকে ‘শিশুশ্রম নির্মূলের আন্তর্জাতিক বছর’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই সমস্ত বৈশ্বিক প্রচেষ্টার ফলে বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রম আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং ইউনিসেফের ২০২৪ সালে যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু এখনো কোনো না কোনোভাবে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে, যা জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বড় হুমকি।
‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’-এ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সীদের কিশোর হিসেবে গণ্য করা হবে। ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে কোনো কাজে নিয়োগ করা যাবে না। এমনকি বাবা-মা বা কোনো অভিভাবকও সন্তানকে কাজে দেওয়ার জন্য কারও সঙ্গে কোনো ধরণের চুক্তি করতে পারবেন না।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, চরম দারিদ্র্য ও অভাবের কারণে অনেক শিশুকে বাধ্য হয়েই শৈশবে কাজে নামতে হচ্ছে। এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই এটি একটি বড় সংকট। অনেক বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিশুদের শৈশব এভাবে শ্রমের বাজারে হারিয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অনেক আগে থেকেই শিশুরা কোনো না কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে প্রাচীন বা মধ্যযুগে এর ধরন ছিল আজকের চেয়ে আলাদা। তখন শিশুরা মূলত পরিবারের প্রয়োজনে ঘরোয়া কাজে সাহায্য করত। যেমন বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করা, পশু চরানো বা মায়ের সঙ্গে হাতের কাজ করা। এটি ছিল নিত্যদিনের কাজ।
উদাহরণ হিসেবে কানাডার শুরুর দিকের সমাজের কথা বলা যায়। ১৯ শতকের আগে সেখানে শিশুদের পরিবারের বড় ‘অর্থনৈতিক সম্পদ’ বা অ্যাসেট হিসেবে গণ্য করা হত। আদিবাসী সম্প্রদায়, নিউ ফ্রান্স এবং শুরুর দিকের ব্রিটিশ কানাডায় শিশুরা রোজকার রান্নাবান্না, চাষাবাদ ও পশুপালনের কাজে সাহায্য করত। অনেকে আবার বড় হয়ে ভালো কোনো পেশায় ঢোকার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষানবিসি বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপও করত।

তবে ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই ধারণায় পরিবর্তন আসে। মূল কারণ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসার। ১৯১১ সালের মধ্যে কানাডায় ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেকই স্কুলে যেতে শুরু করে। স্কুলে যাওয়ার হার যত বাড়তে থাকে, কাজে নিয়োজিত কিশোরদের সংখ্যাও তত কমতে থাকে। ১৯২১ সালে যেখানে ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলেদের কাজে যাওয়ার হার ছিল ৬৮ শতাংশ, ১৯৬১ সালে তা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৪০ শতাংশে নেমে আসে।
১৮-১৯ শতকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় যখন ‘শিল্প বিপ্লব’ বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশন শুরু হলো, তখন শিশুদের জীবনে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়ায় নতুন নতুন কারখানা তৈরি হতে লাগল, মাঠে চলে এল উন্নত যন্ত্র। এই দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে সস্তা শ্রমের বিশাল চাহিদা তৈরি হয়। আর তা মেটাতে কারখানার মালিকেরা টার্গেট করল অসহায়, দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারের শিশুদের। যেসব শিশু স্কুলে যেত না বা যাওয়ার সুযোগ ছিল না, তারা দলে দলে কারখানার কাজে ঢুকে পড়ল।
ভিক্টোরিয়ান যুগে এই শিশুশ্রম আক্ষরিক অর্থেই অমানবিক হয়ে উঠেছিল। ব্রিটেনের টেক্সটাইল মিল, হ্যামিল্টনের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা কেপ ব্রেটন ও ব্রিটিশ কলম্বিয়ার খনিগুলোতে শিশুদের দিন কাটত কারখানার অন্ধকারে। তখন পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরও ভারী শিল্প কারখানায় কাজ করতে পাঠানো হতো। কয়লা খনিগুলোতে এমন কিছু সরু ও অন্ধকার সুড়ঙ্গ থাকত, যার ভেতর কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষে ঢোকা অসম্ভব ছিল। কারখানার মালিকেরা তখন এই ছোট ছোট শিশুদের সেই সুড়ঙ্গে পাঠাত। বিষাক্ত গ্যাস আর ধসে পড়ার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এই অবুঝ শিশুরা মাইলের পর মাইল সেই সুড়ঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে কয়লা টেনে আনত। সামান্য একটু এদিক-ওদিক হলেই খনির ভেতরেই মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
শুধু খনি নয়, কারখানার ভেতরেও তাদের কাজের পরিবেশ ছিল ভয়ংকর। সপ্তাহে প্রায় ৫২ থেকে ৮০ ঘণ্টা পর্যন্ত তাদের একটানা খাটানো হতো। এত খাটাখাটুনির পর কপালে যে মজুরি জুটত, তা নিতান্তই কম। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যে টাকা পেত, শিশুদের দেওয়া হতো তার মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ।
শিশুদের এই অমানবিক অবস্থা দেখে সমাজের সচেতন মানুষ ও সমাজ সংস্কারকরা প্রতিবাদে নেমে পড়েন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, শিশুদের এভাবে বিপদে ঠেলে দিলে ভবিষ্যতে বড় কোনো বিপদ অপেক্ষা করছে। ১৮৭০ এবং ১৮৮০-র দশকে প্রথম আইনি প্রতিরোধের হাওয়া বইতে শুরু করে। কারখানা, কয়লাখনিতে শিশুশ্রম বন্ধ করতে বিভিন্ন প্রদেশে আইন পাস হতে থাকে। নোভা স্কোটিয়া এবং ব্রিটিশ কলম্বিয়া খনির কাজে শিশুদের নিয়োগের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১৯২৯ সালের মধ্যে আইনগতভাবে বেশির ভাগ প্রদেশেই ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কারখানার ভারী কাজ থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব হয়।
সংস্কারকেরা বুঝলেন, শুধু কাজ বন্ধ করলেই হবে না, শিশুদের স্কুলের দিকে টানতে হবে। তাই এসব প্রদেশে আইন করে স্কুলে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে শুরু করে। ওন্টারিওতে ১৮৯১ সালে একটি আইন করা হয়, যেখানে ৮ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯২১ সালে এই বয়স বাড়িয়ে ১৬ বছর করা হয়। নিয়ম করা হলো—যদি কোনো পরিবার সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে কাজে পাঠায়, তবে সেই পরিবারকে কড়া শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এই শিক্ষা আইন আর শ্রম আইন একে অপরকে শক্তি জুগিয়েছিল।
এরপর ১৯৩০-এর দশকে যখন বিশ্বজুড়ে ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা চরম অর্থনৈতিক মহামন্দা দেখা দিল, তখন কাজের বাজারে বড় পরিবর্তন এল। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরাই তখন বেঁচে থাকার তাগিদে শিশুদের কাজগুলো করতে শুরু করলেন। ফলে শিশুরা কাজের বাজার থেকে কিছুটা রেহাই পেল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশের স্বার্থে অনেক শিশুকে আবার জোর করে কারখানায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। যুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে স্কুলের নিয়মকানুন ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
বিংশ শতাব্দীতে এসে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াইটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না, এটি আন্তর্জাতিক রূপ নিল। ১৯২৬ সালে লিগ অব নেশনস ‘স্ল্যাভারি কনভেনশন’ বা দাসত্ব চুক্তি সই করে। ১৯৩০ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর পরিধি আরও বাড়িয়ে ‘ফোর্সড লেবার কনভেনশন’ আনে, যার মূল কথা ছিল কোনো মানুষকে জোর করে খাটানো যাবে না।
১৯৩৮ সালে আমেরিকার ‘ফেয়ার লেবার স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট’ ১৬ বছরের কম বয়সীদের কাজের ধরণ ও সময় বেঁধে দেয়। ১৯৭৩ সালে ‘মিনিমাম এজ কনভেনশন’ পাস হয়, যেখানে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সর্বনিম্ন বয়স নির্দিষ্ট করা হয়। ১৭২টি দেশ এতে সই করে। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ ‘শিশু অধিকার সনদ’ বা ‘কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড’ পাস করে, যা শিশুদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯২ সালে বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রম পুরোপুরি নির্মূল করতে এবং বিভিন্ন দেশকে সাহায্য করতে ‘আইপেক’ গঠিত হয়। ১৯৯৯ সালে ‘Worst Forms of Child Labour Convention’ পাস হয়, যেখানে শিশু পাচার, দাসত্ব, জোরপূর্বক যুদ্ধ এবং মাদকের মতো কাজে শিশুদের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ১৮৬টি দেশ এটি অনুমোদন করে।
২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বছরটিকে ‘শিশুশ্রম নির্মূলের আন্তর্জাতিক বছর’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই সমস্ত বৈশ্বিক প্রচেষ্টার ফলে বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রম আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে।
.png)

প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ঢাকা নগরীও এমন অসংখ্য পরিবর্তনের সাক্ষী। একসময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবাব কিংবা সমাজের উচ্চবিত্তরা ঢাকায় আসেন। তাঁদের সঙ্গে আসেন নানা ধরনের কারিগর, শিল্পী ও পেশাজীবীরাও। ফলে কলকাতা ও উত্তর ভারতের অনেক পেশা একসময় ঢাকায় প্রচলিত ছিল। সময়ের আবর্তে সেই পেশাগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে
০৯ আগস্ট ২০২৬
‘যুদ্ধ’ শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর, ফেসবুকে ঢুকলেই ধ্বংসস্তূপ, আগুন আর মানুষের কান্নার ছবি। এত বেশি দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিউজফিড স্ক্রল করতে এখন আর আঙুল থেমে যায় না।
০৬ আগস্ট ২০২৬
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান নিয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু গবেষণা হয়েছে। আজকের লেখায় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তিনটি গবেষণা নিয়ে আলোচনা করব। গবেষণাগুলোতে এই গণঅভ্যুত্থানকে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন।
০৫ আগস্ট ২০২৬
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয় মঈদুল হাসানের বই ‘মূলধারা ৭১’। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এর দ্বিতীয় সংস্করণের সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও বইটির গুরুত্ব কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
২৯ জুলাই ২০২৬