যাপন থেকে নির্মাণ: বাস্তবতার বদলে যাওয়ার ইতিহাস

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ০১
এআই জেনারেটেড ছবি

মানবসভ্যতা সম্ভবত এখন বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের তৃতীয় যুগে প্রবেশ করেছে। একসময় মানুষ কেবল বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করত, যাপন করত। পরে শিখল সেই বাস্তবকে ক্যামেরায় ধারণ করতে। আর এখন জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ভৌত অস্তিত্বহীন ব্যাপারকে বাস্তবের মতো নতুন মানুষ, দৃশ্য ও ঘটনাও নির্মাণ করা সম্ভব। এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত নয়। এটি মানুষের বাস্তবতা, সত্য, প্রমাণ ও জ্ঞান সম্পর্কে ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।

এই দীর্ঘ যাত্রার দুটি প্রতীকী মাইলফলক হতে পারে ১৮৮৮ এবং ২০২২–২৩ সাল। প্রথমটি বাস্তবকে ধারণ করার ক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। দ্বিতীয়টি বাস্তবের অনুরূপ নতুন দৃশ্য ও ঘটনা নির্মাণের ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের নাগালের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

যখন বাস্তবকে ধারণ করা সম্ভব হলো

আধুনিক চলচ্চিত্রশিল্পের সূচনা সাধারণত ১৮৯৫ সালের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে ১৮৮৮ সালে লুই ল্য প্রাঁসের পরীক্ষামূলক ক্যামেরায় চলমান দৃশ্য ধারণ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মাইলফলক। এর আগে মানুষ বাস্তবকে সংরক্ষণ করত ভাষা, লেখা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য কিংবা স্মৃতির মাধ্যমে। এসবই ছিল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে নির্মিত বাস্তবতার প্রতিরূপ। চলমান চিত্র ধারণের প্রযুক্তি প্রথমবারের মতো বাস্তব দৃশ্যের গতি ও পরিবর্তনকে যান্ত্রিকভাবে ধরে রাখার সুযোগ দিল।

এর কিছুদিন আগে, ১৮৭৭ সালে এডিসনের ফোনোগ্রাফ শব্দ ধারণ ও পুনরুৎপাদনের প্রযুক্তিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ মানুষ শুধু দৃশ্য নয়, শব্দকেও সংরক্ষণযোগ্য করে তুলছিল। বাস্তব তখন আর কেবল বর্তমান মুহূর্তে সীমাবদ্ধ রইল না। তাকে সংরক্ষণ, আবার দেখা এবং পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলো। মানুষ যেন প্রথমবার নিজের জীবনকে নিজের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখার ক্ষমতা অর্জন করল।

কিন্তু ক্যামেরাও বাস্তবের হুবহু প্রতিলিপি নয়

ক্যামেরা বাস্তবকে বিলুপ্ত করেনি। মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করে তাকে স্থায়ী, পুনরাবৃত্তিযোগ্য ও দূরবর্তী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো করে তুলেছে এই যন্ত্র। কিন্তু তা কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না। ক্লোজ-আপ, স্লো-মোশন, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল কিংবা সম্পাদনা দর্শকের অনুভূতি ও ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করে। ক্যামেরা তাই শুধু বাস্তবকে ধারণ করেনি, তাকে ফ্রেমও করেছে।

তবু ক্যামেরার সামনে সাধারণত কোনো মানুষ, বস্তু, স্থান বা ঘটনা উপস্থিত থাকতে হতো। পরে সিজিআই, ডিজিটাল কম্পোজিটিং ও অন্যান্য প্রযুক্তি এই সীমা দুর্বল করেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবসদৃশ দৃশ্য দ্রুত, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ও ব্যাপকভাবে তৈরি করার ক্ষমতা তখনও আজকের মতো সহজলভ্য ছিল না।

যখন বাস্তবের অনুরূপ নতুন দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব হলো

জেনারেটিভ এআইয়ের শিকড় ২০২৩-এর অনেক আগে। ২০১৪ সালের জিএএন-এর মতো প্রযুক্তি কৃত্রিমভাবে নতুন ছবি ও অন্যান্য ডেটা তৈরির সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। কিন্তু ২০২২–২৩ সালে টেক্সট-টু-ইমেজ ও টেক্সট-টু-ভিডিও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে এই ক্ষমতা গবেষণাগার থেকে সাধারণ ব্যবহারকারীর নাগালে চলে আসে।

এখন কোনো ক্যামেরা, অভিনেতা বা বাস্তব ঘটনার প্রত্যক্ষ ধারণ ছাড়াই এমন ছবি, কণ্ঠ ও ভিডিও তৈরি করা যায়। আর তা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চোখ ও কানের কাছে বাস্তব বলে প্রতীয়মান হতে পারে। এখানে বাস্তবকে আর কেবল ধারণ করা হচ্ছে না। বাস্তবের দৃশ্যমান ও শ্রাব্য বৈশিষ্ট্য থেকে শেখা মডেলের সাহায্যে নতুন দৃশ্য ও ঘটনাও নির্মাণ করা হচ্ছে।

ডিপফেক ও সিনথেটিক মিডিয়া এই পরিবর্তনকে আরও গভীর করেছে। বাস্তব মানুষের মুখ, কণ্ঠ বা পরিচয় ব্যবহার করে যা আসলে ঘটেনি এমন ঘটনা তৈরি করা সম্ভব। ফলে ‘ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বলেই সত্য’—এই পুরোনো ধারণাটিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

বাস্তবতার তিন স্তর

এই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে তিনটি স্তরে দেখা যেতে পারে।

প্রথমটি প্রত্যক্ষ বাস্তবতা—যা আমরা নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করি ও যাপন করি।

দ্বিতীয়টি রেকর্ড করা বাস্তবতা—যা ক্যামেরা, অডিও রেকর্ডার বা অন্য কোনো মাধ্যমে বাস্তব ঘটনার চিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত হয়।

তৃতীয়টি কৃত্রিম বা সিনথেটিক বাস্তবতা—যা কোনো বাস্তব ঘটনার সরাসরি ধারণ নয়। কিন্তু বাস্তবের দৃশ্যমান ও শ্রাব্য বৈশিষ্ট্য এমনভাবে অনুকরণ করে যে তা মানুষের কাছে বাস্তব বলে মনে হতে পারে।

এই তৃতীয় স্তর নিছক কল্পনা নয়। এর উপাদান বাস্তব পৃথিবী থেকেই নেওয়া। কিন্তু এর নির্মিত মানুষ, স্থান বা ঘটনা বাস্তবে কখনো ঘটেনি। সাহিত্য, চিত্রকলা ও সিনেমা বহুদিন ধরেই বাস্তবে ঘটেনি এমন কিছু বাস্তবের মতো উপস্থাপন করে আসছে। এআই সেই ক্ষমতাকে স্বয়ংক্রিয়, দ্রুত ও ব্যাপক করে তুলেছে।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে: বাস্তবতা, সত্য, প্রমাণ ও বিশ্বাসযোগ্যতা এক জিনিস নয়।

বোদ্রিয়ারের হাইপাররিয়েলিটি এবং এআই

এই পরিবর্তনকে বোঝার ক্ষেত্রে ফরাসি দার্শনিক জাঁ বোদ্রিয়ারের সিমুলেশন ও হাইপাররিয়ালিটি-এর ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত সিমুলাক্রা এন্ড সিমুলেশন গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছিলেন যে আধুনিক সমাজে প্রতিরূপ ও সিমুলেশন এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে প্রতিরূপ আর কোনো সহজ ‘মূল বাস্তবতার’ দিকে নির্দেশ না করে নিজেরাই বাস্তবতার অভিজ্ঞতা তৈরি করতে শুরু করে।

জেনারেটিভ এআই এই ধারণাকে নতুন প্রযুক্তিগত মাত্রা দিয়েছে। আগে সিমুলেশন মূলত বাস্তবের প্রতিরূপ তৈরি করত। এখন এআই এমন প্রতিরূপও তৈরি করতে পারে যার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট বাস্তব ঘটনা নেই। একটি কাল্পনিক মানুষ, বক্তৃতা কিংবা যুদ্ধের দৃশ্য—সবই বাস্তবের দৃশ্যমান নিয়ম অনুসরণ করে তৈরি হতে পারে।

ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘এটি বাস্তব কি না’ থাকছে না। এখন প্রশ্ন হবে—‘এটি আমাদের কাছে বাস্তব হিসেবে কাজ করছে কি না?’

ভিডিও আর প্রমাণের সমার্থক নয়

এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হতে পারে সাংবাদিকতা ও বিচারব্যবস্থায়। দীর্ঘদিন ধরে ‘ক্যামেরায় ধরা পড়েছে’—এই বাক্যটির মধ্যে এক ধরনের স্বতঃসিদ্ধ বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল। কিন্তু এখন ভিডিওর ক্ষেত্রে প্রশ্ন শুধু ‘এটি কী দেখাচ্ছে’ নয়। তার আগে প্রশ্ন হবে—‘এটি আদৌ কোনো বাস্তব ঘটনার ধারণ করা ভিডিও, নাকি তা কৃত্রিমভাবে নির্মিত?’

ভবিষ্যতের আদালতে তাই ভিডিওর বিষয়বস্তুর পাশাপাশি তার উৎস, মেটাডাটা, প্রুভনেন্স, সংরক্ষণ ও সম্পাদনার ইতিহাস এবং ডিজিটাল ফরেনসিক সত্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। কোনো ভিডিও যাচাই মানে শুধু দৃশ্যটি দেখা নয়। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে এর উৎস, সময়, স্থান, প্রেক্ষাপট ও কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও যাচাই করা।

আরও বড় বিপদ হলো, একটি সত্যিকারের ভিডিওকেও ভবিষ্যতে ‘এআই জেনারেটেড’ বলে অস্বীকার করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ এআইয়ের যুগে মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করানো যেমন সম্ভব, তেমনি সত্যকেও মিথ্যা বলে অস্বীকার করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে প্রমাণের প্রতি মানুষের আস্থাই দুর্বল হতে পারে।

বাস্তব আসলে কী?

এই পরিবর্তনের গভীরে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন। এতদিন বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অনেকাংশে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং যান্ত্রিকভাবে ধারণ করা প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু যখন এমন দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব যার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার দৃশ্যগত পার্থক্য সহজে ধরা যায় না। তখন বাস্তবকে শনাক্ত করার কাজটিও একটি প্রযুক্তিগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক কাজ হয়ে ওঠে।

আগে আমরা প্রমাণ দেখে বাস্তবতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতাম। এখন প্রমাণটি আদৌ প্রমাণযোগ্য কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। ভবিষ্যতের বড় বিতর্ক তাই শুধু প্রযুক্তিকে ঘিরে নয়, সত্য নির্ধারণের সামাজিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোকে ঘিরেও হবে।

সংকট যেমন, সম্ভাবনাও তেমন

তবে এই পরিবর্তনকে শুধু সংকট হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। চলমান চিত্র ধারণের প্রযুক্তি চলচ্চিত্র, সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও গণযোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা করেছিল। তেমনি জেনারেটিভ এআই সৃজনশীলতা, গবেষণা, নকশা, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বাস্তবে যা তৈরি করা ব্যয়বহুল, বিপজ্জনক বা অসম্ভব, তার সিমুলেশন শিক্ষা ও গবেষণায় বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।

প্রশ্ন তাই প্রযুক্তির ক্ষমতা নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ এই ক্ষমতাকে কোন নৈতিক, আইনি ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ব্যবহার করবে।

১৮৮৮ সালে মানুষ এমন এক প্রযুক্তির দিকে এগোল যা চলমান বাস্তবতাকে ধারণ ও সংরক্ষণ করতে পারে। ২০২২–২৩ সালে জেনারেটিভ এআই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাল যেখানে বাস্তবের অনুরূপ নতুন দৃশ্য ও ঘটনা নির্মাণ ক্রমেই সহজ ও সাধারণ হয়ে উঠল।

প্রথম যুগে মানুষ বাস্তবকে যাপন করেছে। পরে তাকে ধারণ করেছে। এখন তার অনুরূপ নতুন বাস্তব নির্মাণ করছে। এই যাত্রা তাই শুধু প্রযুক্তির ইতিহাস নয়। একই সঙ্গে তা বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ইতিহাস।

কিন্তু নির্মিত বাস্তবতা সত্যিকারের বাস্তবতার মতোই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠলে আমরা কীভাবে জানব কোনটি সত্য?

ভবিষ্যতের ইতিহাস সম্ভবত শুধু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে না যে মানুষ কী কী যন্ত্র তৈরি করেছিল। সে ইতিহাস লিখবে— ‘বাস্তব’ বলে মানুষ যা বুঝত, কীভাবে সেই ধারণাটিই বদলে গেল।

  • মিল্লাত হোসেন: লেখক, অনুবাদক ও আইনবিদ
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত