এসএসসির ফল: এটা রাষ্ট্রেরও পরীক্ষা

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ২০: ৪৬
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

এসএসসির ফল প্রকাশের পর সবচেয়ে সহজ কাজ হলো বলা—এবার শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছে। পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য। ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। ইংরেজি ও গণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করেছে। মানবিক বিভাগের ফলও হতাশাজনক। কিন্তু এখানেই কি আমাদের থেমে থাকা উচিত?

না। বরং এবার সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত—ফেল করেছে কারা আর এর দায় কার?

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে পরীক্ষার ফলকে শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্যের মাপকাঠি বানানো হয়েছে। পাসের হার বাড়ানো হয়েছে, জিপিএ-৫ বেড়েছে। সেই সংখ্যাকে শিক্ষার অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০০১ সালে গ্রেড পদ্ধতি চালুর সময় জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র ৭৬ জন। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২। এবার তা নেমে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬-এ। সংখ্যার এই নাটকীয় ওঠানামা কী প্রমাণ করে? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন গুণগত নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে যে ফলাফলে এমন ওঠানামা ঘটল?

যদি এবার উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন হয়ে থাকে, সেটি অবশ্যই ভালো খবর। পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়ার কাজ জনপ্রিয়তা অর্জনের উপায় হতে পারে না। কিন্তু যথাযথ মূল্যায়নের পর যখন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়, তখন দায় কেবল পরীক্ষার্থীর নয়। প্রশ্ন উঠবে, শ্রেণিকক্ষে কী শেখানো হয়েছে, কীভাবে শেখানো হয়েছে এবং কেন এত শিক্ষার্থী শেখার ন্যূনতম স্তরেও পৌঁছাতে পারেনি।

বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের ফল আমাদের জন্য সতর্কসংকেত। প্রায় ১০ বছর বিদ্যালয়ে পড়ার পর একটি বড় অংশ যদি এই দুই মৌলিক বিষয়ে ব্যর্থ হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মেধা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে বিদ্যালয় ও শিক্ষকতার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। ৫৭টি প্রতিষ্ঠানে একজনও পাস না করা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি প্রতিষ্ঠানগত ব্যর্থতার বড় প্রমাণ।

এই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন পায়নি। করোনা মহামারি, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির দীর্ঘ বিরতি, বারবার কারিকুলাম ও শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তন, নতুন কারিকুলাম নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব কিছুর মধ্য দিয়ে তারা গেছে। তাদের শেখার ঘাটতি পূরণের জন্য রাষ্ট্র কী করেছে, সেই প্রশ্নেরও অনুসন্ধান দরকার।

অকৃতকার্যদের বিষয়টি আরও মানবিকভাবে দেখা জরুরি। বাংলাদেশে এসএসসির ফল শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়। এটি পরিবার ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। গ্রামের মানুষ পর্যন্ত জানে, কার ছেলে বা মেয়ে পাস করল, কে ফেল করল। ফলে ব্যর্থ শিক্ষার্থীর ওপর অপমান, হতাশার মতো মানসিক চাপ তৈরি হয়। তাদের জন্য কাউন্সেলিং, পুনরায় শেখার সুযোগ, পুনর্মূল্যায়ন এবং বিকল্প শিক্ষাপথের ব্যবস্থা কোথায়? আর যারা ফেল করেছে, তাদের কতজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান—সেই প্রশ্নও করতে হবে। কারণ শিক্ষার বৈষম্য শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার খাতাতেই ধরা পড়ে।

তাই পাসের হার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়। কমানোর কৃতিত্বও নয়। দরকার কঠিন আত্মসমালোচনা। কোন অঞ্চলে, কোন বিষয়ে, কোন শ্রেণির শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে—তার তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ চাই। দুর্বল বিদ্যালয়কে বিশেষ সহায়তা জোগাতে হবে, দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। অকৃতকার্যদের জন্য সামাজিক-মানসিক শুশ্রূষার কথা বিবেচনা করতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য যেন শিক্ষার্থীদের ফলাফলে কম প্রভাব ফেলে, সেই ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা ফেল করেছে। এখন রাষ্ট্রেরও পরীক্ষা। সে এই ব্যর্থতা থেকে কি শিক্ষা নেবে?

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত