জুলাইয়ের ‘বিতর্কিত’ তথ্যচিত্র কে বানিয়েছে দায়িত্বশীলরাও জানেন না

তথ্যচিত্রটিতে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করা হলে অনুষ্ঠানে হট্টগোল ছড়িয়ে পড়ে। স্ট্রিম গ্রাফিক

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে দেখানো প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ তৈরি হলেও সেটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বা এর বাজেট নিয়ে কোনো তথ্য দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

ঘটনাটি গত ৫ আগস্টের। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে যৌথ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেই অনুষ্ঠানেই প্রদর্শিত হয় গণঅভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রটি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভিযোগ, তথ্যচিত্রটিতে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। তীব্র আপত্তি ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান জুলাইযোদ্ধারাও। একপর্যায়ে হট্টগোল ছড়িয়ে পড়ে অনুষ্ঠানস্থলে। বিরক্ত হয়ে অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যান বিদেশি কূটনীতিকরা। ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধান অতিথিও। কিন্তু নজিরবিহীন এই ঘটনার নেপথ্যে দায় কাদের?

প্রশ্নটির উত্তর জানতে স্ট্রিমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শাকিলুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তথ্যচিত্রটি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে অবগত আছি আমি। তবে আমি এখানে যোগদান করেছি মাত্র সপ্তাহখানেক হলো। এ কারণে বেশি কিছু বলতে পারব না। তবে যতটুকু জানি, তথ্যচিত্রটি নির্মাণের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দীন আহমেদ। বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেওয়া হয়েছিল, সেটা আমি জানি না।’

শাকিলুজ্জামান কোনো বিতর্ক না ছড়ানোর অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী তো অনুষ্ঠানে বলেছেনই, যেসব জায়গায় আপত্তি আছে সেগুলো সংশোধন করা হবে।’

কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন, মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) মো. জেহাদ উদ্দিন এবং প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) শেখ মো. আরিফুল ইসলাম। সদস্যসচিব ছিলেন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের। তবে ২৩ জুলাই হঠাৎ তাকে তথ্য অধিদপ্তরে (পিআইডি) বদলি করা হয়।

শাকিলুজ্জামান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ নিয়ে মিটিং হয়েছে। বিষয়টি কীভাবে সংশোধন করা যায়, সেখানে তা নিয়ে কথা বলেছেন কমিটির আহ্বায়ক জিয়াউদ্দীন আহমেদ।’

কমিটির সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস শেখ মো. আরিফুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয় কোন প্রতিষ্ঠান কাজটি করেছে? এর জবাবে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘এটা ছিল অফিসের সিদ্ধান্ত। কমিটিতে আমি একজন সদস্য ছিলাম শুধু। যারা আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব ছিলেন, তারাই সবকিছু নির্ধারণ করেছেন।’

তথ্যচিত্রের কোনো রিভিউ হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নের জবাবে আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘না। তবে পরে এটা নিয়ে মিটিং হয়েছে। মন্ত্রিসভা থেকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এখন হয়তো নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হবে।’ এই তথ্যচিত্রের জন্য বাজেট কত ধরা হয়েছিল—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছি না। এই মুহূর্তে আমার মনে নেই।’

এবার যোগাযোগ করা হয় কমিটির আহ্বায়ক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) জিয়াউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি সভাপতি হলেও এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানি না। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। সেখানে আমাদের ও মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য দেওয়া আছে।’ অবশ্য ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে সব প্রশ্নের জবাব মিলবে না বলেও জানান তিনি।

কমিটি ও মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা জানতে সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির খোঁজ করে স্ট্রিম। কিন্তু তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজে সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি। অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, কাজটি করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা। তার মতামত জানতে স্ট্রিম থেকে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তথ্যচিত্র বানানোর বিষয়ে ফেসবুকে তার অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্ট পাওয়া যায়। এতে তিনি জানান, তথ্যচিত্রটি বানানোর ক্ষেত্রে তিনি যুক্ত নন। তিনি লেখেন, ‘আমার কোনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম বা এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। কোনো প্রকার আর্থিক সুবিধা গ্রহণের সঙ্গেও আমি কখনোই যুক্ত ছিলাম না। আজ প্রদর্শিত ডকুমেন্টারিটি কে বা কারা তৈরি করেছে, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ অনবগত। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বা এর অধীন কোনো দপ্তরের সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক, দাপ্তরিক ও ব্যবসায়িক সংযোগ নেই।’

অভিযোগ আছে, প্রথমে তথ্যচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ভিডিও ও ছবি ছিল। পরে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একজনের নির্দেশনায় সেই অংশ বাদ দিয়ে বিএনপির কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত