সরদার ফরিদ আহমদ

ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু'র পর জকসু। পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের জয়। কোথাও বড় জয়, কোথাও ভূমিধস। এই ধারাবাহিকতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবু দেখা যাচ্ছে, অনেক বিশ্লেষণে এই বিজয়কে খাটো করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। কেউ বলছেন, ‘বিকল্পের অভাব’। কেউ বলছেন, ‘প্যানেল কৌশল’। কেউ আবার এটিকে নিছক ‘অস্থায়ী ঢেউ’ হিসেবে দেখাতে চাইছেন।
রাজনীতিতে এমন ব্যাখ্যা নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যাখ্যাগুলো কি সম্পূর্ণ? নাকি সুবিধামতো কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে? নির্মোহভাবে দেখলে, ছাত্রশিবিরের এই বিজয় কোনো একক কারণে হয়নি। এটি একাধিক রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও সামাজিক বাস্তবতার ফল।
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর ছাত্র সংসদ ছিল না। ছিল না নিয়মিত নির্বাচন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল ছাত্রলীগের শাসন। তারা ছিল দুর্বিনীত, সহিংস, সন্ত্রাসী। অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনকে তারা মানতে পরেনি। ক্যাম্পাসে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছিল জিম্মি। ভয়ের সংস্কৃতি কায়েম করেছিল ছাত্রলীগ। ছিল কেবল ছাত্রলীগের রাজনীতি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যখন বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল থাকে, তখন অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।’ বাংলাদেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ঠিক সেটাই ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ জমেছে। প্রতিনিধি নেই। দাবি জানানোর পথ নেই। এই শূন্যতার মধ্যে যে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে সংগঠন টিকিয়ে রেখেছে, তার বাড়তি সুবিধা পাওয়াই স্বাভাবিক। শিবির সেই সংগঠনগুলোর একটি। তারা কীভাবে টিকে ছিল; তা নিয়ে কথা বলছেন, সমালোচনা করছেন। ‘গুপ্ত শিবির’ শব্দ যুগল তৈরি করা হয়েছে। এতে যে লাভ হচ্ছে না, তা তো প্রমাণিত। রাজনীতির নৈতিক বিচার চলে না। যারা নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারাও কতটুকু নৈতিক; সেই প্রশ্ন তো উঠতে পারে, উঠছেও। এটাই স্বাভাবিক। রাজনীতির মূল কথা হলো টিকে থাকা। শিবির সেই কাজটি করতে পেরেছে। এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা।
শিবিরের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সাংগঠনিক কাঠামো; নিয়মিত বৈঠক, পাঠচক্র, ক্যাডার তৈরি। এসব অনেকের অপছন্দ হতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে সংগঠন ছাড়া জয় আসে না। ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, আধুনিক রাজনীতির ভিত্তি হলো ‘ডিসিপ্লিনড অর্গানাইজেশন’। শিবির সেই মডেল অনুসরণ করে। অন্যদিকে ছাত্রদল, বামপন্থী জোট বা নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো সেখানে পিছিয়ে। অভ্যন্তরীণ বিভাজন, গ্রুপিং, নেতৃত্ব সংকট, নিয়মিত কর্মসূচির অভাব। ফলে ভোটের দিনে সংগঠিত উপস্থিতি দেখা যায় না। শিবির রাজনীতিটা করছে ছাত্রদেরকে নিয়ে। অন্যরা ক্যাম্পাসের চেয়ে বেশি সময় দেয় মূল রাজনীতিতে। মূল রাজনীতির নেতাদের খুশি করা, তাদের নামে স্লোগান দেওয়া; তাদের প্রধান কাজ। সাধারণ ছাত্ররা এসব আর পছন্দ করছে না।
জকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয় এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। নিজেরাই স্বীকার করছেন, গ্রুপিং বড় কারণ।
সাম্প্রতিক সব নির্বাচনেই দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা ব্যক্তি দেখে ভোট দিয়েছে। কমে গেছে প্যানেলের গুরুত্ব। এটি বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির একটি নতুন প্রবণতা। এটি অতীতেও কম-বেশি ছিল। কিন্তু এবার তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। জেন-জিরা ব্যক্তি দেখে। যাকে ভোট দেবে সে কেমন, সেটি যাচাই করে। তারা নিজের মতে চলে। তারা নিজের ভালো লাগা-মন্দ লাগাকেই প্রাধান্য দেয়। কে কী বললো সেটিকে পাত্তা দিতে রাজি নয় তারা।
শিবির তা বুঝেছে। তারা কৌশলী প্যানেল করেছে। শুধু নিজস্ব কর্মী নয়; মেধাবী মুখ, জুলাই আন্দোলনের মুখ, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী, ভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মানুষ, নারী নেতৃত্ব, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল শিক্ষার্থীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরেন্ট লাইপহার্ট বলেন, ‘কনসোসিয়েশনাল পলিটিক্স’ বা অংশীদারত্বমূলক রাজনীতি বিভক্ত সমাজে স্থিতিশীলতা আনে। শিবির-সমর্থিত প্যানেল সেই মডেল অনুসরণ করেছে, অন্তত নির্বাচনী কৌশলে।
জকসু নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট। বিজয়ী প্রার্থীদের বড় অংশ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভিপি, জিএস, এজিএস; সব জায়গায় এই পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে আন্দোলনের স্মৃতি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পুঁজি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চার্লস টিলি বলেছিলেন, ‘Collective action creates collective identity.’ জুলাই আন্দোলন সেই পরিচয় তৈরি করেছে। শিবির সেই পরিচয়কে নিজের প্যানেলের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে।
তরুণদের কাছে জুলাই অন্যরকম। তারা ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ বলে না, বলে ‘জুলাই বিপ্লব’। কেউ কেউ বলে ‘বর্ষা বিপ্লব’। তাঁদের কাছে রাজনীতিবিদরা আদর্শ নন, তাঁদের আদর্শ শহীদ শরিফ ওসমান হাদি। শিবির এটি বুঝেছে, ধারণ করতে পেরেছে। জকসুতে ইনকিলাব মঞ্চের দুজনকে প্যানেলে নিয়েছে। দুজনই বিজয়ী হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব কোনো একক সংগঠনের একচেটিয়া কৃতিত্ব নয়। কিন্তু অন্যরা এটি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।
নির্মোহ বিশ্লেষণে শিবিরের শক্তির পাশাপাশি অন্যদের দুর্বলতাও দেখতে হবে। ছাত্রদলের ভেতরের বিভাজন। শেষ মুহূর্তে জোট। মনোনয়ন নিয়ে বিতর্ক। বাম জোটের সীমিত সামাজিক ভিত্তি। জাতীয় ছাত্রশক্তির নতুনত্ব কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতা; সব মিলিয়ে একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
রাজনীতিতে জয় শুধু নিজের শক্তিতে হয় না। প্রতিপক্ষের দুর্বলতাও বড় ফ্যাক্টর। এটা অস্বীকার করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।
অন্য ছাত্র সংগঠনগুলো শিবিরের এজেন্ডা সেটিং থিওরির ফাঁদে পড়ে। এজেন্ডা সেটিং থিওরি হলো একটি গণমাধ্যম তত্ত্ব। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে, মিডিয়া সরাসরি মানুষের মতামতকে প্রভাবিত না করলেও, কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে হবে, তা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে; অর্থাৎ, মিডিয়া ঠিক করে কী নিয়ে মানুষ ভাববে, কিন্তু ঠিক কী ভাববে তা বলে দেয় না। মিডিয়া কোনো বিষয়ে যত বেশি মনোযোগ দেয়, জনগণও সেই বিষয়টিকে তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং আলোচনায় নিয়ে আসে।
অন্য ছাত্র সংগঠনগুলো কেবল শিবিরকে নিয়ে কথা বলে। কেবল শিবিরের সমালোচনা করে, আক্রমণ করে। তাদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করে। তারা সারাক্ষণ শিবির শিবির বলতে থাকে। নিজের কথা ভুলে যায়। নিজেরা কী করবে সেটি আর বলে না। তাদের সমর্থিত মিডিয়া এবং টকশোর আলোচকরাও একই ভূমিকা নামেন। এজেন্ডা সেটিং থিওরিতে আটকে পড়ে সবাই। এতে লাভ হয় শিবিরের। শিবির হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যেরা পিছিয়ে পড়ে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে তাই হয়েছে।
অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, শিবিরের কর্মীরা নিয়মিত সমস্যা শুনেছেন। একাডেমিক সহায়তা দিয়েছেন। ব্যক্তিগত সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটি বড় রাজনীতি নয়। কিন্তু ক্যাম্পাস রাজনীতিতে এই ‘মাইক্রো পলিটিক্স’ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম সামাজিক পুঁজি বা ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’-এর কথা বলেন। বিশ্বাস, নেটওয়ার্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা। শিবির সেই সামাজিক পুঁজি গড়ে তুলতে পেরেছে। ধীরে, নীরবে।
তরুণরা কী পছন্দ করে, কী পছন্দ করে না শিবির খুঁজে বের করে। সেই অনুযায়ী কর্মসূচি নেয়। তাদের নির্বাচনী প্রচারের অভিনবত্ব অন্যদের ছাড়িয়ে যায়। একটি উদাহরণ দিই। সাধারণভাবে বলা হয়, মেয়েরা বিড়াল পছন্দ করে। ডাকসু নির্বাচনের দুদিন আগে দেখা গেল শিবিরের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ বিড়াল কাঁধে নিয়ে ঘুরছেন, এমন একটি ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হলো সোশ্যাল মিডিয়া। টার্গেট শুধু মেয়েদের ভোট।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। আগের অনেক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে ভয় কাজ করত। এবার সে পরিবেশ নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক স্বাধীনভাবে ভোট দিয়েছেন। এতে সংগঠিত ও প্রস্তুত শক্তি লাভবান হয়েছে।
এই জায়গায় শিবির সুবিধা পেয়েছে। এটি তাদের কৌশল নয়। এটি সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ফল। জুলাই বিপ্লবের পরিবর্তিত পরিস্থিতি
সবাই নিরাপত্তা চায়। অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে সিট দখল, চাঁদাবাজি, সহিংসতার অভিযোগ আছে। সেখানে শিবিরের বিরুদ্ধে সরাসরি এমন অভিযোগ কম। এটি একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে।
এখানেই বিতর্ক। অনেক বিশ্লেষণে শিবিরের নাম উচ্চারণ করতেই অস্বস্তি। কেউ ‘সমর্থিত প্যানেল’ বলে দূরত্ব রাখছেন। কেউ কৃতিত্ব দিতে চান না। আবার কেউ অতিরঞ্জিত ভয় দেখাচ্ছেন। রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের কাজ ভয় দেখানো নয়। কিংবা পছন্দ–অপছন্দের রাজনীতি করা নয়। কাজ হলো বাস্তবতা বোঝা।
শিবিরের এই বিজয় মানেই ক্যাম্পাসে একমাত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে; এমন নয়। আবার এটিকে দুর্ঘটনাও বলা যাবে না।
এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। শিক্ষার্থীরা বলছেন-সংগঠন চাই। প্রতিনিধি চাই। কাজ চাই।
সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো ঘিরে একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই বলছেন, তারা গণতন্ত্রের পক্ষে। ভোটাধিকারের পক্ষে। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতার পক্ষে। কিন্তু একই সঙ্গে বলছেন, ভোটে ইসলামী ছাত্রশিবির কেন জিতবে? এই প্রশ্নই সমস্যার মূল। কারণ, এটি আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়। এটি সরাসরি ভোটারদের অবমাননা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা নিয়ে তাচ্ছিল্য।
গণতন্ত্রে ভোট মানে শুধু ব্যালট বাক্স নয়। ভোট মানে সিদ্ধান্তের অধিকার। ভোট মানে ভুল করার অধিকারও। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল বলেছিলেন, ‘ডেমোক্র্যাসি ইজ নট অ্যাবাউট চুজিং দ্য রাইট লিডার্স, বাট অ্যাবাউট অ্যালাউয়িং পিপল টু চুজ’। মানুষ যাকে চায়, তাকে বেছে নেবে—এটাই গণতন্ত্রের শর্ত।
কিন্তু আমরা কী দেখছি? ভোটের ফল পছন্দ না হলেই বলা হচ্ছে, ‘এরা বিভ্রান্ত’, ‘এরা বুঝে ভোট দেয়নি’, ‘এরা বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিয়েছে’—এই ভাষা গণতান্ত্রিক নয়। এটি এলিট মানসিকতা। নিজের মতকে একমাত্র বৈধ ধরে নেওয়ার প্রবণতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রাপ্তবয়স্ক। তারা নাগরিক। তারা আন্দোলন করেছে। জেল খেটেছে। গুমের শিকার হয়েছে। সেই শিক্ষার্থীদের বলা হচ্ছে--তারা নাকি ভোট দিতে জানে না। এটি ভয়ংকর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ শুম্পিটার গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, ‘কমপিটিটিভি স্ট্রাগল ফর পিপলস ভোট’ হিসেবে। এখানে জনগণ বিচারক, রায় দেয় তারা। বিশ্লেষকের কাজ সেই রায় বোঝা; বাতিল করা নয়।
কিন্তু আমাদের একাংশ সেটাই করছে। সমস্যা আরও গভীর। এই মানসিকতার ভেতরে একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, ‘ভোটাধিকার সবার আছে ঠিকই, কিন্তু সঠিকভাবে ব্যবহার করার অধিকার সবার নেই।’
এই ধারণাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। ইতিহাসে যত স্বৈরতন্ত্র এসেছে, সবাই এই যুক্তি ব্যবহার করেছে। কখনো বলা হয়েছে—জনগণ অশিক্ষিত। কখনো বলা হয়েছে—জনগণ ধর্মান্ধ। কখনো বলা হয়েছে—জনগণ আবেগী। ফল কী হয়েছে? ভোট স্থগিত, নির্বাচন বাতিল। ‘ভালো’র নামে ক্ষমতা কুক্ষিগত। জন স্টুয়ার্ট মিল সতর্ক করেছিলেন, ‘দ্য টাইর্যানি অব দ্য মেজোরিটি ইজ ডেঞ্জারাস, বাট দ্য টাইর্যানি অব দ্য ইনলাইটেনড ফিউ ইজ ওর্স’। নিজেদের ‘আলোকিত’ ভাবা মানুষ যখন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়, তখন গণতন্ত্র আরও বেশি বিপন্ন হয়।
আজ যারা বলছেন, ‘শিবির কেন জিতবে?’ তারা আসলে বলছেন, ‘আমাদের পছন্দ ছাড়া কেউ জিততে পারবে না।’ এটি রাজনীতি নয়। এটি আধিপত্যবাদ।
আরেকটি দিক আছে। এই বক্তব্যগুলো তরুণদের রাজনীতিবিমুখ করে। শিক্ষার্থীরা যদি দেখে ভোট দিলেই অপমান, তাহলে তারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তখন মাঠ ছেড়ে দেবে চরমপন্থীদের জন্য।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছিলেন, ‘পলিটিক্যাল ডিকেয় হেপেন্স হোয়েন পার্টিসিপেশন রেইসেস বা লেজিটিম্যাসি ইজ ডিনাইড’। অংশগ্রহণ হচ্ছে, কিন্তু বৈধতা দেওয়া হচ্ছে না। এটাই অবক্ষয়ের সূত্র।
ভোটে শিবির জিতেছে—এটি পছন্দ হতে পারে, নাও হতে পারে। কিন্তু এটিকে মেনে নেওয়াই গণতন্ত্রের পরীক্ষা। আজ শিবির, কাল অন্য কেউ। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই। যে সমাজে বলা হয় ‘ভোট দাও, কিন্তু ভুল দিও না’। সে সমাজে গণতন্ত্র টেকে না। গণতন্ত্র মানে ঝুঁকি। গণতন্ত্র মানে অনিশ্চয়তা। গণতন্ত্র মানে নিজের অপছন্দকেও সহ্য করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতাই আমাদের সবচেয়ে বেশি ঘাটতি।
ছাত্রশিবিরের এই বিজয়কে বোঝার জন্য শিবিরকে ভালোবাসা বা ঘৃণা করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নির্মোহ দৃষ্টি। রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার মানসিকতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিওভান্নি সার্তোরি বলেছিলেন, ‘পলিটিকস বিগিন উইথ ফ্যাক্টস নট উইশেস’।
পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিক জয় একটি ফ্যাক্ট। এই ফ্যাক্টকে অস্বীকার করলে বিশ্লেষণ দুর্বল হয়। আজ শিবির এগিয়ে। কাল অন্য কেউ এগোতে পারে। গণতন্ত্র মানে সেটাই। কিন্তু সেই পথে যেতে হলে অন্য সংগঠনগুলোকেও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। নিজেদের ঘর গোছাতে হবে। শুধু শিবিরকে দোষ দিয়ে বাস্তবতা বদলানো যাবে না।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু'র পর জকসু। পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের জয়। কোথাও বড় জয়, কোথাও ভূমিধস। এই ধারাবাহিকতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবু দেখা যাচ্ছে, অনেক বিশ্লেষণে এই বিজয়কে খাটো করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। কেউ বলছেন, ‘বিকল্পের অভাব’। কেউ বলছেন, ‘প্যানেল কৌশল’। কেউ আবার এটিকে নিছক ‘অস্থায়ী ঢেউ’ হিসেবে দেখাতে চাইছেন।
রাজনীতিতে এমন ব্যাখ্যা নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যাখ্যাগুলো কি সম্পূর্ণ? নাকি সুবিধামতো কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে? নির্মোহভাবে দেখলে, ছাত্রশিবিরের এই বিজয় কোনো একক কারণে হয়নি। এটি একাধিক রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও সামাজিক বাস্তবতার ফল।
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর ছাত্র সংসদ ছিল না। ছিল না নিয়মিত নির্বাচন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল ছাত্রলীগের শাসন। তারা ছিল দুর্বিনীত, সহিংস, সন্ত্রাসী। অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনকে তারা মানতে পরেনি। ক্যাম্পাসে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছিল জিম্মি। ভয়ের সংস্কৃতি কায়েম করেছিল ছাত্রলীগ। ছিল কেবল ছাত্রলীগের রাজনীতি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যখন বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল থাকে, তখন অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।’ বাংলাদেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ঠিক সেটাই ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ জমেছে। প্রতিনিধি নেই। দাবি জানানোর পথ নেই। এই শূন্যতার মধ্যে যে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে সংগঠন টিকিয়ে রেখেছে, তার বাড়তি সুবিধা পাওয়াই স্বাভাবিক। শিবির সেই সংগঠনগুলোর একটি। তারা কীভাবে টিকে ছিল; তা নিয়ে কথা বলছেন, সমালোচনা করছেন। ‘গুপ্ত শিবির’ শব্দ যুগল তৈরি করা হয়েছে। এতে যে লাভ হচ্ছে না, তা তো প্রমাণিত। রাজনীতির নৈতিক বিচার চলে না। যারা নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারাও কতটুকু নৈতিক; সেই প্রশ্ন তো উঠতে পারে, উঠছেও। এটাই স্বাভাবিক। রাজনীতির মূল কথা হলো টিকে থাকা। শিবির সেই কাজটি করতে পেরেছে। এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা।
শিবিরের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সাংগঠনিক কাঠামো; নিয়মিত বৈঠক, পাঠচক্র, ক্যাডার তৈরি। এসব অনেকের অপছন্দ হতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে সংগঠন ছাড়া জয় আসে না। ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, আধুনিক রাজনীতির ভিত্তি হলো ‘ডিসিপ্লিনড অর্গানাইজেশন’। শিবির সেই মডেল অনুসরণ করে। অন্যদিকে ছাত্রদল, বামপন্থী জোট বা নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো সেখানে পিছিয়ে। অভ্যন্তরীণ বিভাজন, গ্রুপিং, নেতৃত্ব সংকট, নিয়মিত কর্মসূচির অভাব। ফলে ভোটের দিনে সংগঠিত উপস্থিতি দেখা যায় না। শিবির রাজনীতিটা করছে ছাত্রদেরকে নিয়ে। অন্যরা ক্যাম্পাসের চেয়ে বেশি সময় দেয় মূল রাজনীতিতে। মূল রাজনীতির নেতাদের খুশি করা, তাদের নামে স্লোগান দেওয়া; তাদের প্রধান কাজ। সাধারণ ছাত্ররা এসব আর পছন্দ করছে না।
জকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয় এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। নিজেরাই স্বীকার করছেন, গ্রুপিং বড় কারণ।
সাম্প্রতিক সব নির্বাচনেই দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা ব্যক্তি দেখে ভোট দিয়েছে। কমে গেছে প্যানেলের গুরুত্ব। এটি বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির একটি নতুন প্রবণতা। এটি অতীতেও কম-বেশি ছিল। কিন্তু এবার তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। জেন-জিরা ব্যক্তি দেখে। যাকে ভোট দেবে সে কেমন, সেটি যাচাই করে। তারা নিজের মতে চলে। তারা নিজের ভালো লাগা-মন্দ লাগাকেই প্রাধান্য দেয়। কে কী বললো সেটিকে পাত্তা দিতে রাজি নয় তারা।
শিবির তা বুঝেছে। তারা কৌশলী প্যানেল করেছে। শুধু নিজস্ব কর্মী নয়; মেধাবী মুখ, জুলাই আন্দোলনের মুখ, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী, ভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মানুষ, নারী নেতৃত্ব, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল শিক্ষার্থীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরেন্ট লাইপহার্ট বলেন, ‘কনসোসিয়েশনাল পলিটিক্স’ বা অংশীদারত্বমূলক রাজনীতি বিভক্ত সমাজে স্থিতিশীলতা আনে। শিবির-সমর্থিত প্যানেল সেই মডেল অনুসরণ করেছে, অন্তত নির্বাচনী কৌশলে।
জকসু নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট। বিজয়ী প্রার্থীদের বড় অংশ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভিপি, জিএস, এজিএস; সব জায়গায় এই পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে আন্দোলনের স্মৃতি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পুঁজি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চার্লস টিলি বলেছিলেন, ‘Collective action creates collective identity.’ জুলাই আন্দোলন সেই পরিচয় তৈরি করেছে। শিবির সেই পরিচয়কে নিজের প্যানেলের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে।
তরুণদের কাছে জুলাই অন্যরকম। তারা ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ বলে না, বলে ‘জুলাই বিপ্লব’। কেউ কেউ বলে ‘বর্ষা বিপ্লব’। তাঁদের কাছে রাজনীতিবিদরা আদর্শ নন, তাঁদের আদর্শ শহীদ শরিফ ওসমান হাদি। শিবির এটি বুঝেছে, ধারণ করতে পেরেছে। জকসুতে ইনকিলাব মঞ্চের দুজনকে প্যানেলে নিয়েছে। দুজনই বিজয়ী হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব কোনো একক সংগঠনের একচেটিয়া কৃতিত্ব নয়। কিন্তু অন্যরা এটি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।
নির্মোহ বিশ্লেষণে শিবিরের শক্তির পাশাপাশি অন্যদের দুর্বলতাও দেখতে হবে। ছাত্রদলের ভেতরের বিভাজন। শেষ মুহূর্তে জোট। মনোনয়ন নিয়ে বিতর্ক। বাম জোটের সীমিত সামাজিক ভিত্তি। জাতীয় ছাত্রশক্তির নতুনত্ব কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতা; সব মিলিয়ে একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
রাজনীতিতে জয় শুধু নিজের শক্তিতে হয় না। প্রতিপক্ষের দুর্বলতাও বড় ফ্যাক্টর। এটা অস্বীকার করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।
অন্য ছাত্র সংগঠনগুলো শিবিরের এজেন্ডা সেটিং থিওরির ফাঁদে পড়ে। এজেন্ডা সেটিং থিওরি হলো একটি গণমাধ্যম তত্ত্ব। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে, মিডিয়া সরাসরি মানুষের মতামতকে প্রভাবিত না করলেও, কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে হবে, তা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে; অর্থাৎ, মিডিয়া ঠিক করে কী নিয়ে মানুষ ভাববে, কিন্তু ঠিক কী ভাববে তা বলে দেয় না। মিডিয়া কোনো বিষয়ে যত বেশি মনোযোগ দেয়, জনগণও সেই বিষয়টিকে তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং আলোচনায় নিয়ে আসে।
অন্য ছাত্র সংগঠনগুলো কেবল শিবিরকে নিয়ে কথা বলে। কেবল শিবিরের সমালোচনা করে, আক্রমণ করে। তাদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করে। তারা সারাক্ষণ শিবির শিবির বলতে থাকে। নিজের কথা ভুলে যায়। নিজেরা কী করবে সেটি আর বলে না। তাদের সমর্থিত মিডিয়া এবং টকশোর আলোচকরাও একই ভূমিকা নামেন। এজেন্ডা সেটিং থিওরিতে আটকে পড়ে সবাই। এতে লাভ হয় শিবিরের। শিবির হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যেরা পিছিয়ে পড়ে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে তাই হয়েছে।
অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, শিবিরের কর্মীরা নিয়মিত সমস্যা শুনেছেন। একাডেমিক সহায়তা দিয়েছেন। ব্যক্তিগত সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটি বড় রাজনীতি নয়। কিন্তু ক্যাম্পাস রাজনীতিতে এই ‘মাইক্রো পলিটিক্স’ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম সামাজিক পুঁজি বা ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’-এর কথা বলেন। বিশ্বাস, নেটওয়ার্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা। শিবির সেই সামাজিক পুঁজি গড়ে তুলতে পেরেছে। ধীরে, নীরবে।
তরুণরা কী পছন্দ করে, কী পছন্দ করে না শিবির খুঁজে বের করে। সেই অনুযায়ী কর্মসূচি নেয়। তাদের নির্বাচনী প্রচারের অভিনবত্ব অন্যদের ছাড়িয়ে যায়। একটি উদাহরণ দিই। সাধারণভাবে বলা হয়, মেয়েরা বিড়াল পছন্দ করে। ডাকসু নির্বাচনের দুদিন আগে দেখা গেল শিবিরের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ বিড়াল কাঁধে নিয়ে ঘুরছেন, এমন একটি ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হলো সোশ্যাল মিডিয়া। টার্গেট শুধু মেয়েদের ভোট।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। আগের অনেক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে ভয় কাজ করত। এবার সে পরিবেশ নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক স্বাধীনভাবে ভোট দিয়েছেন। এতে সংগঠিত ও প্রস্তুত শক্তি লাভবান হয়েছে।
এই জায়গায় শিবির সুবিধা পেয়েছে। এটি তাদের কৌশল নয়। এটি সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ফল। জুলাই বিপ্লবের পরিবর্তিত পরিস্থিতি
সবাই নিরাপত্তা চায়। অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে সিট দখল, চাঁদাবাজি, সহিংসতার অভিযোগ আছে। সেখানে শিবিরের বিরুদ্ধে সরাসরি এমন অভিযোগ কম। এটি একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে।
এখানেই বিতর্ক। অনেক বিশ্লেষণে শিবিরের নাম উচ্চারণ করতেই অস্বস্তি। কেউ ‘সমর্থিত প্যানেল’ বলে দূরত্ব রাখছেন। কেউ কৃতিত্ব দিতে চান না। আবার কেউ অতিরঞ্জিত ভয় দেখাচ্ছেন। রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের কাজ ভয় দেখানো নয়। কিংবা পছন্দ–অপছন্দের রাজনীতি করা নয়। কাজ হলো বাস্তবতা বোঝা।
শিবিরের এই বিজয় মানেই ক্যাম্পাসে একমাত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে; এমন নয়। আবার এটিকে দুর্ঘটনাও বলা যাবে না।
এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। শিক্ষার্থীরা বলছেন-সংগঠন চাই। প্রতিনিধি চাই। কাজ চাই।
সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো ঘিরে একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই বলছেন, তারা গণতন্ত্রের পক্ষে। ভোটাধিকারের পক্ষে। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতার পক্ষে। কিন্তু একই সঙ্গে বলছেন, ভোটে ইসলামী ছাত্রশিবির কেন জিতবে? এই প্রশ্নই সমস্যার মূল। কারণ, এটি আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়। এটি সরাসরি ভোটারদের অবমাননা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা নিয়ে তাচ্ছিল্য।
গণতন্ত্রে ভোট মানে শুধু ব্যালট বাক্স নয়। ভোট মানে সিদ্ধান্তের অধিকার। ভোট মানে ভুল করার অধিকারও। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল বলেছিলেন, ‘ডেমোক্র্যাসি ইজ নট অ্যাবাউট চুজিং দ্য রাইট লিডার্স, বাট অ্যাবাউট অ্যালাউয়িং পিপল টু চুজ’। মানুষ যাকে চায়, তাকে বেছে নেবে—এটাই গণতন্ত্রের শর্ত।
কিন্তু আমরা কী দেখছি? ভোটের ফল পছন্দ না হলেই বলা হচ্ছে, ‘এরা বিভ্রান্ত’, ‘এরা বুঝে ভোট দেয়নি’, ‘এরা বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিয়েছে’—এই ভাষা গণতান্ত্রিক নয়। এটি এলিট মানসিকতা। নিজের মতকে একমাত্র বৈধ ধরে নেওয়ার প্রবণতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রাপ্তবয়স্ক। তারা নাগরিক। তারা আন্দোলন করেছে। জেল খেটেছে। গুমের শিকার হয়েছে। সেই শিক্ষার্থীদের বলা হচ্ছে--তারা নাকি ভোট দিতে জানে না। এটি ভয়ংকর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ শুম্পিটার গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, ‘কমপিটিটিভি স্ট্রাগল ফর পিপলস ভোট’ হিসেবে। এখানে জনগণ বিচারক, রায় দেয় তারা। বিশ্লেষকের কাজ সেই রায় বোঝা; বাতিল করা নয়।
কিন্তু আমাদের একাংশ সেটাই করছে। সমস্যা আরও গভীর। এই মানসিকতার ভেতরে একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, ‘ভোটাধিকার সবার আছে ঠিকই, কিন্তু সঠিকভাবে ব্যবহার করার অধিকার সবার নেই।’
এই ধারণাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। ইতিহাসে যত স্বৈরতন্ত্র এসেছে, সবাই এই যুক্তি ব্যবহার করেছে। কখনো বলা হয়েছে—জনগণ অশিক্ষিত। কখনো বলা হয়েছে—জনগণ ধর্মান্ধ। কখনো বলা হয়েছে—জনগণ আবেগী। ফল কী হয়েছে? ভোট স্থগিত, নির্বাচন বাতিল। ‘ভালো’র নামে ক্ষমতা কুক্ষিগত। জন স্টুয়ার্ট মিল সতর্ক করেছিলেন, ‘দ্য টাইর্যানি অব দ্য মেজোরিটি ইজ ডেঞ্জারাস, বাট দ্য টাইর্যানি অব দ্য ইনলাইটেনড ফিউ ইজ ওর্স’। নিজেদের ‘আলোকিত’ ভাবা মানুষ যখন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়, তখন গণতন্ত্র আরও বেশি বিপন্ন হয়।
আজ যারা বলছেন, ‘শিবির কেন জিতবে?’ তারা আসলে বলছেন, ‘আমাদের পছন্দ ছাড়া কেউ জিততে পারবে না।’ এটি রাজনীতি নয়। এটি আধিপত্যবাদ।
আরেকটি দিক আছে। এই বক্তব্যগুলো তরুণদের রাজনীতিবিমুখ করে। শিক্ষার্থীরা যদি দেখে ভোট দিলেই অপমান, তাহলে তারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তখন মাঠ ছেড়ে দেবে চরমপন্থীদের জন্য।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছিলেন, ‘পলিটিক্যাল ডিকেয় হেপেন্স হোয়েন পার্টিসিপেশন রেইসেস বা লেজিটিম্যাসি ইজ ডিনাইড’। অংশগ্রহণ হচ্ছে, কিন্তু বৈধতা দেওয়া হচ্ছে না। এটাই অবক্ষয়ের সূত্র।
ভোটে শিবির জিতেছে—এটি পছন্দ হতে পারে, নাও হতে পারে। কিন্তু এটিকে মেনে নেওয়াই গণতন্ত্রের পরীক্ষা। আজ শিবির, কাল অন্য কেউ। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই। যে সমাজে বলা হয় ‘ভোট দাও, কিন্তু ভুল দিও না’। সে সমাজে গণতন্ত্র টেকে না। গণতন্ত্র মানে ঝুঁকি। গণতন্ত্র মানে অনিশ্চয়তা। গণতন্ত্র মানে নিজের অপছন্দকেও সহ্য করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতাই আমাদের সবচেয়ে বেশি ঘাটতি।
ছাত্রশিবিরের এই বিজয়কে বোঝার জন্য শিবিরকে ভালোবাসা বা ঘৃণা করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নির্মোহ দৃষ্টি। রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার মানসিকতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিওভান্নি সার্তোরি বলেছিলেন, ‘পলিটিকস বিগিন উইথ ফ্যাক্টস নট উইশেস’।
পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিক জয় একটি ফ্যাক্ট। এই ফ্যাক্টকে অস্বীকার করলে বিশ্লেষণ দুর্বল হয়। আজ শিবির এগিয়ে। কাল অন্য কেউ এগোতে পারে। গণতন্ত্র মানে সেটাই। কিন্তু সেই পথে যেতে হলে অন্য সংগঠনগুলোকেও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। নিজেদের ঘর গোছাতে হবে। শুধু শিবিরকে দোষ দিয়ে বাস্তবতা বদলানো যাবে না।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের সাথে নির্বাচনী আসন সমঝোতায় যুক্ত হয়েছেন। তার দল গোটা আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত ছিলো এবং সেভাবেই বক্তব্য-বিবৃতি রাখতেন। তিনি বিএনপি সর
৬ ঘণ্টা আগে
বিশ্বের কোনো এক প্রান্তের রাজপথে জনতা হয়তো ‘মুক্তি’ চাইছে, আর অন্য প্রান্তে সেই একই ‘মুক্তি’র স্লোগান দিয়ে তৈরি হচ্ছে মিসাইলের নিশানা। এই অদ্ভুত সময়ে, বিশ্বরাজনীতিতে ‘জনপ্রিয় নেতা’ কথাটির মানে খুঁজে বের করা বড্ড কঠিন।
৬ ঘণ্টা আগে
ইরানে চলমান বিক্ষোভ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভের মূল কারণ অর্থনৈতিক হতাশা। তবে দ্রুতই তা রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিচ্ছে।
১০ ঘণ্টা আগে
সিরিয়া কি তবে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার পথে? উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে সুওয়াইদা—সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ও ইসরায়েলি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে এক চরম চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একতার সুতো এখন চরম অনিশ্চয়তায় দুলছে।
১ দিন আগে