আশির দশকের শেষ প্রান্তের কোনো কোনো ভোরবেলার কথা মনে পড়ে। আমার কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। আমি দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি থেকে এগিয়ে যাচ্ছি মূল রাস্তায়। দাঁড়িয়ে আছেন আমার শিক্ষক। তাঁর সাইকেলের পেছনে বসিয়ে আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবেন। শহর থেকে কয়েক মাইল দূরের গ্রামের স্কুলে আমি পড়ি। সামনে বৃত্তি পরীক্ষা। স্কুলে বিশেষ পড়ার আয়োজন চলছে। আমি দূরে থাকি বলে স্কুলের স্যাররা নিজ দায়িত্বে আমার যাওয়ার বন্দোবস্ত করলেন। আমার সেই নাম ভুলে যাওয়া স্যার আসতেন আরও দূর থেকে। মনে পড়ে, স্যারের সাইকেলের পেছনে বসে গল্প করতে করতে স্কুলে যেতাম।
স্কুলের আলমারিতে ছিল অনেক পুরনো বই। বইগুলোর প্রতি আমার ছিল প্রচণ্ড লোভ। চক-ডাস্টার অথবা বেত আনার ফাঁকে আলমারির বইগুলো আমি ছুঁয়ে দেখতাম; একদিন হেডস্যার বললেন, পড়তে চাও? মাথা নাড়লাম। স্যার আমার হাতে কয়েকটা বই আর বাচ্চাদের উপযোগী পত্রিকা তুলে দিলেন। সারা দিন বসে সেই বইগুলো আমি পড়েছিলাম। পেছন ফিরে তাকালে এরকম অনেক দৃশ্য আমি দেখতে পাই। শ্রদ্ধায় আমার মাথা নুয়ে আসে। আমি আনন্দিত হয়ে উঠি এই ভেবে যে, আমার জীবনে শিক্ষকেরা কী নিবিড়ভাবে মিশে আছেন।
সাম্প্রতিক দৃশ্যগুলো খুবই ভয়াবহ। অভ্যুত্থান-উত্তর প্রেক্ষাপটে প্রায়শই আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা। অনেক শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে স্কুল বা কলেজ থেকে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পরিকল্পিতভাবে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ অভিযোগে বিচারের দাবিতে শিক্ষকদের হেনস্তা করা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে এসব কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
প্রতিনিয়ত আক্রমণ ও নিগ্রহের দৃশ্য দেখে মনেই হয়েছে যে, শিক্ষকেরাই বাংলাদেশের ‘জাতীয় শত্রু’; যেন তাদের কারণেই পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ। তারাই ক্ষমতায় ছিলেন; তারাই দুর্নীতি ও শোষণের অপার উৎস। যেন কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করে দিয়ে শিক্ষকেরাই কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যে বাড়ি কিনেছেন। সুইস ব্যাংকে তারাই কড়কড়ে নোট জমিয়েছেন। বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস-সম্পদ গ্রাস করার দায় তাদের ওপরই বর্তায়। ব্যাংক-বিমা খাত দখল ও ধ্বংসের দায়ভারও তাদের। অতএব, শিক্ষকদের ‘খতম করো’, ‘উৎখাত করো’। শিক্ষকেরা যদি ‘জাতীয় শত্রু’ না-ই হবেন, তাহলে তাদের ওপর এতো আক্রমণ আসবে কেন?
অথচ রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থেকে এই শিক্ষকেরাই জীবন বাজি রেখে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যুক্ত হয়েছিলেন প্রতিরোধ সংগ্রামে। ছাত্র-জনতার সঙ্গে মিতালি পাতিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা খানিকটা ‘স্বায়ত্তশাসন’ ভোগ করেন বলে তারা একটু বেশি উচ্চকিত ছিলেন। লিখে, বলে কিংবা সরাসরি অংশগ্রহণ করে তারা ঐতিহাসিক দায় শোধ করেছিলেন। কিন্তু ছাত্র-শিক্ষক সহাবস্থানের চেহারা পাল্টাতে সময় লাগে নি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় কখনো কখনো মনেই হয়, শিক্ষার্থী-শিক্ষক যেন পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। নির্বিকারভাবে ভুলে যাওয়া হচ্ছে ‘শিক্ষা’, ‘শিক্ষক’, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’--কোনোটিই বাংলাদেশের অপরাজনীতি থেকে মুক্ত ছিল না। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ছিল স্থানীয় প্রশাসনের নানামাত্রিক প্রভাব। কলেজের অধ্যক্ষকে তটস্থ থাকতে হয়েছে মন্ত্রী-এমপির ভয়ে; প্রতি সন্ধ্যায় তাকে হাজিরা দিতে হয় স্থানীয় এমপির দরবারে। একজন প্রধান শিক্ষক কিংবা অধ্যক্ষ কীভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবেন, সে ব্যাপারে নাক গলানো ছিল স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বাভাবিক কাজ; পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ না দেয়ায় এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের নিয়োগ বোর্ডকে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন সময়। মাদ্রাসাগুলোতেও ছিলো প্রায় একইরকম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব।
শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কী চাই? কোথায় পৌঁছুতে চাই? জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর ৩০টি লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নীতিজুড়ে জাতীয়তাবোধ, দেশাত্মবোধ, অসাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্যমুক্তি, মানবাধিকার, গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে আমরা একটি অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক রাষ্ট্রে বসবাস করছি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ, সরকারের আধিপত্য কতো ব্যাপক, তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বাংলাদেশের যেকোনো বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ জানেন বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বায়ত্তশাসন’ আসলে প্রচারণামাত্র। বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন সত্যই হাজির করে। উপাচার্যরা সবসময়ই রাজনৈতিক প্রভাববলয় থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। জ্ঞান, মেধা কিংবা প্রশাসনিক দক্ষতার তেমন কোনো প্রয়োজন পড়ে না। নিরঙ্কুশভাবে সরকার দলের সমর্থক এবং উপরমহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকলেই চলে। সঙ্গে থাকতে হবে অনুগত শিক্ষকসমাজ। দায়িত্বের প্রাথমিক পর্যায়ে না থাকলেও সমস্যা নেই। ইচ্ছেমতো বিভাগ খুলে নিয়োগ দিয়ে উপাচার্যের পক্ষে দলভারি করতে সমস্যা হয় না। এছাড়া নিয়মিত দল বদলকারী একটি-দুটি গোষ্ঠী সবসময়ই থাকে, সুবিধা নেয়ার জন্য যারা দু পা খাড়া করেই থাকেন। বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরনের চক্রের ভেতর আটকা পড়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতার জন্য কি কেবলই শিক্ষকেরাই দায়ী?
ব্রিটিশ আমলেও রাজনীতি ছিল। তখনও কংগ্রেস-মুসলিম লীগ ছিল, ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। শিক্ষকেরাও এসব দলের রাজনীতি করেছেন। সে সময়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রাজনীতি ছিল। কিন্তু রাজনীতি কি শিক্ষা, শিক্ষক আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে ফেলেছিল? বাংলাদেশের অনেক বড় বড় মানুষের স্মৃতিচারণমূলক লেখায় দেখতে পাব শিক্ষকদের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য। কিন্তু সবকিছু মিলিয়েই তারা ছিলেন শিক্ষক। রাজনৈতিক নেতারাও শিক্ষকদের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানাতেন। শিক্ষকরা জানতেন কোথায় কখন রাজনীতি ও প্রতিষ্ঠানের সীমাকে সংরক্ষিত রাখতে হবে। পেশাগত পরিচয় ও মতাদর্শিক পরিচয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় দূরত্বও বজায় রাখতেন তাঁরা। এই শিক্ষকেরাই জাতীয় প্রয়োজনে যুক্ত হয়েছেন মিছিল-সংগ্রামে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষক আর দলীয় রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, কেন এরকম ঘটেছে?
এসব প্রশ্নের জবাব নিহিত আর্থসামাজিক কাঠামোর ভেতর। বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন শিক্ষক বড়জোর ধারণ করেন ‘সাংস্কৃতিক ক্ষমতা’, অন্যদিকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আছে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা’; দুই ক্ষমতা পরস্পরকে কাছে টানে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে বৈধ, গ্রহণযোগ্য ও বিস্তৃত করার প্রয়োজনে দরকার পড়ে শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। সরকার/রাষ্ট্র তার চিন্তা, মতাদর্শ ও ক্ষমতা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে এই বর্গগুলোকেই যথাসাধ্য ব্যবহার করে থাকে। তার প্রমাণ, বিগত ষোল বছরের পাঠ্যবইয়ে ছিল আওয়ামী লীগ ও তার ভাবাদর্শের জয়গান, এখন যুক্ত হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের আখ্যান। আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য ও বক্তব্যও সম্প্রতি বাদ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ পাঠ্যপুস্তককেন্দ্রিক রাজনীতি সেই একই চক্রের অধীন। অথচ অভ্যুত্থানপূর্ব কালে বুদ্ধিবৃত্তিক জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ‘ইতিহাসের অত্যাচার’ থেকে মুক্তি চেয়েছিল।
রাষ্ট্র-পরিচালক হিসেবে সরকার বদলায়, আদর্শ বদলায়, তার ছাপ পড়ে শিক্ষায়। মতাদর্শ উৎপাদনের এই কারখানায় শিক্ষক একধরনের মধ্যস্থতাকারী। স্বেচ্ছায় অথবা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিধানে তিনি বা তারা এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত মতাদর্শ উৎপাদনে সহায়ক হয়ে ওঠেন। সমস্যা হলো, রাষ্ট্রের কর্মী হতে গিয়ে একজন শিক্ষক দলের কর্মীতে পরিণত হন। সমস্যা আরও প্রকট হয়, যখন সরকার বদলায়। কেননা সরকার বদলালেও একজন শিক্ষক চাইলেই প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্র বদলাতে পারেন না। বিগত সরকারের মতাদর্শের কুঁজ বহন করতে গিয়ে তিনি পড়ে যান প্রবল নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। যে দলের ছায়ায় তিনি গঠিত হন সেই দল সরে গেলে রক্ষাকর্তা হিসেবে কেউ তার পাশে দাঁড়ায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদতে তা-ই ঘটেছে।
বিগত সময়গুলোর তুলনায় এই সময় খানিকটা আলাদা। আশির দশকে এরশাদ কিংবা জাতীয় পার্টির স্বৈরচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগরিষ্ঠের যৌথ অবস্থান ছিল। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তার প্রতিফলন দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় কলেজগুলোতে ছাত্রদের মধ্যে দলীয় রাজনীতির প্রবল প্রকাশ থাকলেও শিক্ষকরা কোনো দলের অনুগামী হয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রতিপত্তি গড়ে তোলেন নি। বরং ছিল শিক্ষকদের নেতাভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ, সেই গ্রুপের প্রধান কয়েকজন হয়তোবা ছিল সরকার বা দলসমর্থক। তার মানে, এ কথা ভাবার সুযোগ ছিল না যে, ওই শিক্ষক গ্রুপ বা দল অনিবার্যভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ ও মার্কার অনুসারী গোষ্ঠী।
বাংলাদেশের প্রথম দেড়-দুই দশকের তুলনায় এখনকার বাস্তবতা সম্পূর্ণত ভিন্ন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়-- প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয় প্রধান হয়ে উঠেছে। শিক্ষা, সমাজ বা রাষ্ট্রগঠনের মতো বিষয়গুলো একেবারেই ‘সেকেলে’ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিবিদেরা একজন দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষকের পরিবর্তে চান একজন ভক্তিগদগদ ও অনুগত শিক্ষক। আবার মেধাবী ও দক্ষ হয়েও একজন শিক্ষক অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করতে চান রাজনীতিবিদের অনুগ্রহ ও কৃপা। অবাক হতে হয় এই দেখে যে, অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজ ঘুরে আসা পণ্ডিতবর্গও গুটিসুটি মেরে চুপটি করে ঢুকে পড়েন এ ধরনের রাজনীতিকীকরণে।
একদিন হেডস্যার বললেন, পড়তে চাও? মাথা নাড়লাম। স্যার আমার হাতে কয়েকটা বই আর বাচ্চাদের উপযোগী পত্রিকা তুলে দিলেন। সারা দিন বসে সেই বইগুলো আমি পড়েছিলাম। পেছন ফিরে তাকালে এরকম অনেক দৃশ্য আমি দেখতে পাই। শ্রদ্ধায় আমার মাথা নুয়ে আসে।
এই মিথোজীবিতা শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। আগের রাজনীতিবিদেরা শিক্ষকদের দায়িত্ব নিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানাতেন। এখন নাম লিখিয়ে, প্রায় ব্যাপটিজমের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরীক্ষা নেয়া হয়, যদিও চূড়ান্ত স্তরে রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতাই সত্য হিসেবে হাজির হয়। অথচ একজন শিক্ষকের এইসব প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার কথা নয়। এর জন্যও কি শিক্ষক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই দায়ী? নাকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও শাসন শিক্ষক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এই বাস্তবতা নির্মাণ করেছে?
অভ্যুত্থান-উত্তর কালে আশা করা গিয়েছিল, হয়তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অসুখবিসুখ সারবে, অন্ততপক্ষে কমবে। কিন্তু সাম্প্রতিকালে হাজির হয়েছে নতুন উপসর্গ--গণতন্ত্রের নামে এসেছে ‘মবতন্ত্র’। ওদিকে পুরনো অসুখও সারে নি। আত্মীয়-পরিজন নিয়োগ দিয়ে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের পরিবারতন্ত্র কায়েমের পথে। তাহলে নিশ্চয়ই এ কথাও বলা যায় যে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের মানুষের বহু ধরনের শিক্ষা হলেও ‘উচিৎ শিক্ষা’ হয় নি।
সত্যিকার অর্থে, বাংলাদেশের শিক্ষাবিষয়ক দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গিই আমার কাছে অস্পষ্ট লাগে। শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কী চাই? কোথায় পৌঁছুতে চাই? জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর ৩০টি লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নীতিজুড়ে জাতীয়তাবোধ, দেশাত্মবোধ, অসাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্যমুক্তি, মানবাধিকার, গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে আমরা একটি অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক রাষ্ট্রে বসবাস করছি। যে সরকার শিক্ষানীতিতে এসব প্রস্তাব হাজির করেছে সে সরকার স্বয়ং ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ও মানবিক পরিবেশ বজায় রাখে নি। অর্থাৎ, আমাদের দেশে শিক্ষার প্রায়োগিক ফল প্রায় শূন্য। ২০২৫ পেরিয়ে ফলাফলে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো পরিবর্তন আসে নি। এর জন্য কি শিক্ষকই দায়ী?
কিংবা ধরা যাক, একজন অভিভাবক ভাবছেন, তার সন্তানকে সব পরীক্ষায় এ-প্লাস পেতেই হবে। তিনি হয়তো এও ভাবছেন, ক্লাস কম হোক সমস্যা নেই, কিন্তু সপ্তাহে সপ্তাহে মাসে মাসে অবশ্যই পরীক্ষা নিতে হবে। অভিভাবক চাইছেন খাতাভরা নম্বর। শিক্ষার সিঁড়িয়ে পেরিয়ে তিনি তার সন্তানকে কোন স্তরে দেখতে চান? ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান পড়ার উপযোগী নয়, তাকে বিজ্ঞান বিভাগেই পড়ার সুযোগ দিতে হবে। অতঃপর ফেল। এর জন্যও কি শিক্ষকই দায়ী?
অনেক অভিভাবককে দেখেছি, যারা নিজেদের সন্তানের শিক্ষার হদিস রাখেন না, কিন্তু দায় চাপাতে চান শিক্ষক আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাঁধে। প্রচলিত কৌতুক হলো, নিজের দুর্ভাগ্যের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর জন্য আশপাশে দুই-একজন মানুষ রাখতে হয়। বাংলাদেশে শিক্ষক যেন সেই অধম, তার কাঁধে দায় চাপানোর জন্য সবাই প্রস্তুত। এই গোবেচারা প্রাণীর গলায় জুতা পরানো যায়; চড়-চাপড় দিলেও এরা গোসসা করে না। তবে তার জন্য সান্ত্বনা পুরষ্কার আছে; সেটি কী? সম্মান। যেমন আছে কাজী কাদের নেওয়াজের বিখ্যাত কবিতা ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’য়। হ্যাঁ, একসময় এসব ছিল। হয়তো সেসব পৌরাণিক যুগের গল্প। এখন এই গল্প খুবই হাস্যকর ও করুণ। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজে যুক্ত হতে গিয়ে কখনো কখনো সরকারি কর্মকর্তাদের মুখে শুনি, ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষকেরাই জাতির কারিগর’, তখন খুব হাসি পায়। ব্যঞ্জনাহীন এই মিথ্যে ক্লিশে সমাজ ও সংস্কৃতিতে কোনো অর্থই ধারণ করে না।
বাংলাদেশের যেকোনো বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ জানেন বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বায়ত্তশাসন’ আসলে প্রচারণামাত্র। বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন সত্যই হাজির করে। উপাচার্যরা সবসময়ই রাজনৈতিক প্রভাববলয় থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। জ্ঞান, মেধা কিংবা প্রশাসনিক দক্ষতার তেমন কোনো প্রয়োজন পড়ে না। নিরঙ্কুশভাবে সরকার দলের সমর্থক এবং উপরমহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকলেই চলে।
সমাজের আর সব মানুষের মতো শিক্ষকও ‘রাজনৈতিক প্রাণী’, সন্দেহ নেই। কিন্তু ‘রাজনীতি করা’ই তার কাজ নয়। তাঁর কাজ দৃষ্টিকে উন্মোচিত করা, অজানার পথকে সামনে হাজির করা, জ্ঞানের তৃষ্ণাকে বাঁচিয়ে রাখা। আমাদের মনে রাখা দরকার, শিক্ষকদের চিন্তা, মতপ্রকাশ ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতাকে যত খর্ব করা হবে, ততই পরাধীন হয়ে উঠবে নাগরিক সমাজ। একই সঙ্গে ভাবতে হবে শিক্ষকের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার কথা। নিয়মিত ‘পাতলা ডাল’ খাইয়ে তাদের দিয়ে ‘ঘি উৎপাদন’ করার মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
মূলত সব পেশার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা আছে। প্রতিটি পেশা তার সুনির্দিষ্ট ভূমিকার মাধ্যমেই রাষ্ট্রের উপরি ও গভীরকাঠামোকে বদলায়। তাই কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে কেবলই আমলাপ্রধান, পুলিশপ্রধান, সামরিক বাহিনীপ্রধান, শিক্ষকপ্রধান হওয়ার সুযোগ নেই। আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির রূপান্তরের ফলে প্রয়োজনের তাগিদেই এসব শ্রমবিভাগের সৃষ্টি। এই সবকিছুকে ঐক্যবিন্দুতে ধরে রাখতে সক্ষম রাষ্ট্রপরিচালনাকারী; এই সূত্রেই রাজনীতিবিদগণের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্রের যে অংশই কলুষিত হোক না কেন, সে অংশই দুর্বল হয়ে ওঠে; তার প্রভাব পড়ে অন্য একটি অংশে। কলুষের বিস্তার রাষ্ট্রের কাঠামোকেই ভেতর থেকে খেয়ে ফেলে ঘুণের মতো।
আর তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সাম্প্রতিক কালের বাংলাদেশে শিক্ষকদের ‘জাতীয় শত্রু’ হিসেবে দেখার যে প্রবণতা গড়ে উঠেছে, আখেরে তা শুভ কিছু বয়ে আনতে পারবে না। মাঝখান থেকে ভেঙে পড়বে শিক্ষার সহজাত বিন্যাস। সত্যিকার অর্থে, ‘জাতীয় শত্রু’ যদি কেউ হয়েই থাকে, তাহলে সেটি কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো পেশা নয়, কোনো গোত্র বা গোষ্ঠী নয় — বাংলাদেশের ‘জাতীয় রুচি’, যা শিক্ষকবান্ধব তো দূরের কথা, এখনও শিক্ষাবান্ধবই হয়ে উঠতে পারে নি। তার একটি নজির রেখে যাই।
একবার এক জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নে বাগধারা প্রয়োগ করে বাক্য লিখতে বলা হয়েছিল; খাতা দেখতে গিয়ে পেলাম অমোঘ এক বাক্য, ‘স্যারকে অপমানও করলাম, বেতনও দিলাম, মনে হচ্ছে গরু মেরে জুতা দান হলো।’ ‘জাতীয় রুচি’র এই খণ্ডচিত্রের পর বাংলাদেশের ‘জাতীয় শত্রু’ নিয়ে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ আছে কি?
- সুমন সাজ্জাদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও লেখক