leadT1ad

বাংলাদেশের সুতিকাগারের ভোটার ইতিহাসের পাশে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের যুক্তি

তোজাম্মেল আযম
তোজাম্মেল আযম

বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়েছিল মুজিবনগরে। ছবি: উইকিপিডিয়া

বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়েছিল মুজিবনগরে। যে মাটিতে একদিন স্বাধীনতার শপথ হয়েছিল, আজ সেই মাটিতেই এক নতুন প্রজন্ম দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে—স্বাধীনতার ফল তারা কতটা পাচ্ছে? ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মুজিবনগর ও মেহেরপুরের নতুন ভোটাররা শুধু আবেগ নয়, যুক্তির ভিত্তিতে ভোট দিতে চাইছে।

মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুর গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হক (৭৫) সারাজীবন ভোট দিয়ে এসেছেন। তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তি। হিসাবের সুরে বলেন, আমি বিভিন্ন দল দেখেছি। ভোট দিয়েছি, মিছিল করেছি। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের পরবর্তন নেই, ছেলের চাকরি নেই, হাসপাতালে ওষুধ নেই। এবার ভাবনার পরিবর্তন দরকার। এই কথার মধ্যেই মেহেরপুর-মুজিবনগরের রাজনীতির সবচেয়ে গভীর বাস্তবতা ধরা পড়ে। এটা কোনো দলবিরোধী আবেগ নয়, এটা জীবনের হিসাব।

মুজিবনগর স্বাধীনতার প্রতীক হলেও এলাকাবাসীর অভিযোগ, উন্নয়নের বেলায় তারা প্রায়ই পেছনে পড়ে থাকে। পর্যটন, অবকাঠামো বা কর্মসংস্থানে এই ঐতিহাসিক স্থানটি যে গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তা তারা পায়নি।

আমঝুপি ইউনিয়নের দিনমজুর রহিম উদ্দিন বলেন, ১৭ এপ্রিল এলে বড় বড় নেতা আসে। ফুল দেয়, বক্তৃতা করে। তারপর আবার আমরা যেমন ছিলাম, তেমনই থাকি। তাঁর কাছে রাজনীতি মানে উৎসব নয়, বছরের বাকি ৩৬৪ দিনের জীবন।

মেহেরপুর ও মুজিবনগরের নতুন ভোটারদের বড় অংশ কৃষক পরিবার বা খেটে খাওয়া মানুষের সন্তান। তারা রাজনীতি দেখে সংসারের খাতা দিয়ে। মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী অর্পা খাতুন বলেন, আমার বাবা কৃষক। সার, বীজ, ডিজেলের দাম বাড়ে, কিন্তু ধানের দাম বাড়ে না। এই হিসাব যিনি বদলাতে পারবেন, তাকেই আমরা ভোট দেব। অর্পার ভাবনা রাজনীতি স্লোগানের নয়, হিসাবের।

কৃষি নির্ভর মেহেরপুর-মুজিবনগরের খেটে খাওয়া মানুষ এখন আর শুধু দল বদলের কথা বলছে না, তাদের চিন্তা বদলের কথা বলছে।

আগের প্রজন্ম যেখানে দল দিয়ে ভোট দিত, নতুন ভোটাররা সেখানে ব্যক্তি ও কাজ দিয়ে বিচার করছে। মুজিবনগরের ভবেরপাড়া গ্রামের তরুণ ভোটার সোহেল রানা বলেন, একই লোক বারবার এমপি হয়েছে। আমাদের গ্রামে শতভাগ বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ আছে। কিন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। তাহলে নাম বদলালেই কী লাভ? সোহেল রানার এই প্রশ্ন রাজনীতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গায় আঘাত করে।

মেহেরপুরের মানুষ উন্নয়ন দেখেছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের গুণগত মান নিয়েও তাদের ক্ষোভ আছে। মুজিবনগরের ইটভাটায় কাজ করা শ্রমিক হানিফ বলেন, বড় বড় বাজেট হয়। কিন্তু কাজ হয় নিম্নমানের। লাভ কারা পায় আমরা জানি। তার এই উপলব্ধিই নতুন ভোটারদের মনকে আরও কঠিন করে তুলছে।

কৃষি নির্ভর মেহেরপুর-মুজিবনগরের খেটে খাওয়া মানুষ এখন আর শুধু দল বদলের কথা বলছে না, তাদের চিন্তা বদলের কথা বলছে। কৃষক মোজাম্মেল হকের কণ্ঠে শেষ কথা—একই রাস্তা দিয়ে হাঁটলে গন্তব্য বদলায় না। এবার নতুন পথ চাই।

যে মুজিবনগর একদিন ইতিহাস বদলে ছিল, সেই মুজিবনগরের মানুষ এবার নিজেদের জীবন বদলাতে চায় ভোটের মাধ্যমে। এই পরিবর্তনের ইচ্ছাই হয়তো ২০২৬ সালের নির্বাচনে মেহেরপুরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠবে।

  • তোজাম্মেল আযম: মেহেরপুর সংবাদদাতা
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত