ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ

আজকের সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ক্ষণিকের আনন্দ আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। মোবাইল স্ক্রলের তৃপ্তি, ফেসবুক বা রিলসের অন্তহীন প্রবাহ, কিংবা ভার্চুয়াল বিনোদনের সাময়িক স্বস্তি—এসবই আমাদের ক্লান্ত মনকে মুহূর্তের জন্য আরাম দেয়। কিন্তু এই স্বল্পস্থায়ী আনন্দের বিনিময়ে আমরা ধীরে ধীরে হারাচ্ছি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত। সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্যটি হলো—এই ক্ষয়ের সবচেয়ে বড় এবং নীরব শিকার হয়ে উঠছে আমাদের সন্তানরা।
আজ বাবা-মা হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে সন্তানের খাওয়া-পরা নিশ্চিত করা, ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, কিংবা একাধিক প্রাইভেট টিউটর ও কোচিংয়ের ব্যবস্থা করার মধ্যেই। আগের তুলনায় অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার ফলে এসব কিছুটা সহজ হয়েছে—এ কথা সত্য। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে গাড়ি আছে, হাতে আছে দামি স্মার্টফোন, পড়াশোনার জন্য আছে একাধিক গাইড ও কোচিং। কিন্তু সেই সক্ষমতার মোহে আমরা একটি মৌলিক সত্য ভুলে যাচ্ছি: সন্তানকে মানুষ করতে হলে তাকে সময় দিতে হয়, সান্নিধ্য দিতে হয়, এবং সবচেয়ে বেশি দিতে হয় মনোযোগ ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে পরিবারই সন্তানের প্রথম ও সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে কোনো পরীক্ষার খাতা নেই, কোনো পাঠ্যসূচিও নেই—কিন্তু প্রতিটি আচরণই সেখানে পাঠ হয়ে ওঠে। বাবা-মা কীভাবে কথা বলেন, মতভেদ হলে কীভাবে সমাধান করেন, বড়দের প্রতি কীভাবে সম্মান দেখান—এসব দেখেই সন্তান শেখে। এই বিদ্যালয়ে বইয়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন আদর-স্নেহ, শাসনের চেয়ে বেশি যুক্তিবোধ, আর নির্দেশের চেয়ে বেশি নিজের জীবনে তা প্রয়োগের উদাহরণ।
পরিবারের খাবার টেবিল হওয়া উচিত সেই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ—যেখানে শিক্ষক হবেন বাবা-মা ও মুরুব্বিরা, আর শিক্ষার্থী হবে সন্তানেরা। কিন্তু বাস্তবতায় আজ আমরা দেখি, একই টেবিলে বসে সবাই আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত। কেউ মোবাইলে রিলস দেখছে, কেউ মেসেজ দিচ্ছে, কেউ টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। খাবার আছে, কিন্তু সংলাপ নেই; একসঙ্গে বসা আছে, কিন্তু মানসিক উপস্থিতি নেই। এই নীরবতাই ধীরে ধীরে পরিবারকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।
সন্তান কখন ঘরে ফিরছে, কখন ঘুমাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে কিংবা কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে আমাদের সচেতন তদারকি দিন দিন শিথিল হয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান রাত পর্যন্ত বাইরে থাকলেও বাবা-মা ব্যস্ত থাকেন নিজেদের কাজে বা মোবাইলে। আমরা বাবারা ডুবে থাকছি ফেসবুক, রিলস কিংবা দোকানের আড্ডায়; মায়েরা সময় কাটাচ্ছেন প্রিয় সিরিয়াল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব আমাদের মুহূর্তের আনন্দ দেয়—কিন্তু এই আনন্দের বিনিময়ে যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ।
এই অবহেলার ফাঁকেই অনেক সন্তান ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেউ বন্ধুবান্ধবের চাপ বা কৌতূহল থেকে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কেউ অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসে, কেউ আবার নীরবে মানসিক চাপ, হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে থাকে। তখন বাবা-মায়ের ‘হুঁশ’ ফিরলেও বাস্তবতা নির্মম—সংশোধনের সুযোগ অনেকটাই ফুরিয়ে যায়। তখন প্রশ্ন আসে, ‘আগে বুঝলাম না কেন?’ কিন্তু সময় তখন আর ফিরে আসে না।
সন্তান মানুষ করার দায়িত্ব কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার বা টিউটরের একার নয়। তারা সহায়ক হতে পারে, বিকল্প নয়। সন্তানের জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষক বাবা-মাই। সময় দেওয়া, মনোযোগ দিয়ে শোনা, সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, ভুল করলে যুক্তি দিয়ে বোঝানো এবং ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া—এসবই একটি সুস্থ, দায়িত্বশীল ও মানবিক প্রজন্ম গঠনের মূল ভিত্তি।
অন্যথায় আমরা অজান্তেই এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে বাহ্যিক সাফল্য থাকবে—ভালো ফলাফল, ডিগ্রি, চাকরি থাকবে—কিন্তু ভেতরে থাকবে শূন্যতা, একাকিত্ব ও অনন্ত নিরানন্দ। তাই এখনই সময় থামার, ভাবার এবং ফিরে দেখার। ক্ষণিকের আনন্দের মোহ কাটিয়ে যদি আমরা পরিবারকে আবার জীবনের কেন্দ্রে না ফিরিয়ে আনি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করার মতো কোনো ভাষা, কোনো যুক্তি—হয়তো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি), বাংলাদেশ

আজকের সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ক্ষণিকের আনন্দ আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। মোবাইল স্ক্রলের তৃপ্তি, ফেসবুক বা রিলসের অন্তহীন প্রবাহ, কিংবা ভার্চুয়াল বিনোদনের সাময়িক স্বস্তি—এসবই আমাদের ক্লান্ত মনকে মুহূর্তের জন্য আরাম দেয়। কিন্তু এই স্বল্পস্থায়ী আনন্দের বিনিময়ে আমরা ধীরে ধীরে হারাচ্ছি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত। সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্যটি হলো—এই ক্ষয়ের সবচেয়ে বড় এবং নীরব শিকার হয়ে উঠছে আমাদের সন্তানরা।
আজ বাবা-মা হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে সন্তানের খাওয়া-পরা নিশ্চিত করা, ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, কিংবা একাধিক প্রাইভেট টিউটর ও কোচিংয়ের ব্যবস্থা করার মধ্যেই। আগের তুলনায় অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার ফলে এসব কিছুটা সহজ হয়েছে—এ কথা সত্য। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে গাড়ি আছে, হাতে আছে দামি স্মার্টফোন, পড়াশোনার জন্য আছে একাধিক গাইড ও কোচিং। কিন্তু সেই সক্ষমতার মোহে আমরা একটি মৌলিক সত্য ভুলে যাচ্ছি: সন্তানকে মানুষ করতে হলে তাকে সময় দিতে হয়, সান্নিধ্য দিতে হয়, এবং সবচেয়ে বেশি দিতে হয় মনোযোগ ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে পরিবারই সন্তানের প্রথম ও সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে কোনো পরীক্ষার খাতা নেই, কোনো পাঠ্যসূচিও নেই—কিন্তু প্রতিটি আচরণই সেখানে পাঠ হয়ে ওঠে। বাবা-মা কীভাবে কথা বলেন, মতভেদ হলে কীভাবে সমাধান করেন, বড়দের প্রতি কীভাবে সম্মান দেখান—এসব দেখেই সন্তান শেখে। এই বিদ্যালয়ে বইয়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন আদর-স্নেহ, শাসনের চেয়ে বেশি যুক্তিবোধ, আর নির্দেশের চেয়ে বেশি নিজের জীবনে তা প্রয়োগের উদাহরণ।
পরিবারের খাবার টেবিল হওয়া উচিত সেই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ—যেখানে শিক্ষক হবেন বাবা-মা ও মুরুব্বিরা, আর শিক্ষার্থী হবে সন্তানেরা। কিন্তু বাস্তবতায় আজ আমরা দেখি, একই টেবিলে বসে সবাই আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত। কেউ মোবাইলে রিলস দেখছে, কেউ মেসেজ দিচ্ছে, কেউ টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। খাবার আছে, কিন্তু সংলাপ নেই; একসঙ্গে বসা আছে, কিন্তু মানসিক উপস্থিতি নেই। এই নীরবতাই ধীরে ধীরে পরিবারকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।
সন্তান কখন ঘরে ফিরছে, কখন ঘুমাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে কিংবা কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে আমাদের সচেতন তদারকি দিন দিন শিথিল হয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান রাত পর্যন্ত বাইরে থাকলেও বাবা-মা ব্যস্ত থাকেন নিজেদের কাজে বা মোবাইলে। আমরা বাবারা ডুবে থাকছি ফেসবুক, রিলস কিংবা দোকানের আড্ডায়; মায়েরা সময় কাটাচ্ছেন প্রিয় সিরিয়াল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব আমাদের মুহূর্তের আনন্দ দেয়—কিন্তু এই আনন্দের বিনিময়ে যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ।
এই অবহেলার ফাঁকেই অনেক সন্তান ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেউ বন্ধুবান্ধবের চাপ বা কৌতূহল থেকে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কেউ অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসে, কেউ আবার নীরবে মানসিক চাপ, হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে থাকে। তখন বাবা-মায়ের ‘হুঁশ’ ফিরলেও বাস্তবতা নির্মম—সংশোধনের সুযোগ অনেকটাই ফুরিয়ে যায়। তখন প্রশ্ন আসে, ‘আগে বুঝলাম না কেন?’ কিন্তু সময় তখন আর ফিরে আসে না।
সন্তান মানুষ করার দায়িত্ব কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার বা টিউটরের একার নয়। তারা সহায়ক হতে পারে, বিকল্প নয়। সন্তানের জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষক বাবা-মাই। সময় দেওয়া, মনোযোগ দিয়ে শোনা, সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, ভুল করলে যুক্তি দিয়ে বোঝানো এবং ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া—এসবই একটি সুস্থ, দায়িত্বশীল ও মানবিক প্রজন্ম গঠনের মূল ভিত্তি।
অন্যথায় আমরা অজান্তেই এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে বাহ্যিক সাফল্য থাকবে—ভালো ফলাফল, ডিগ্রি, চাকরি থাকবে—কিন্তু ভেতরে থাকবে শূন্যতা, একাকিত্ব ও অনন্ত নিরানন্দ। তাই এখনই সময় থামার, ভাবার এবং ফিরে দেখার। ক্ষণিকের আনন্দের মোহ কাটিয়ে যদি আমরা পরিবারকে আবার জীবনের কেন্দ্রে না ফিরিয়ে আনি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করার মতো কোনো ভাষা, কোনো যুক্তি—হয়তো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি), বাংলাদেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আছেন সাতজন। তাঁরা মূলত বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এককভাবে প্রার্থী হওয়ার কারণে তাদেরকে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ বলা হয়। যদিও সংবিধান বা নির্বাচনি আইনে ‘বিদ্রোহী প্রার
১০ ঘণ্টা আগে
প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জীবন ও সম্পদের প্রাণহানিও ব্যাপক। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ডে মোট ৬৫০ জনের মৃত্যু ও ২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
এই মহাবিপদ থেকে বাঁচতে পাকিস্তানের সামনে এখন ‘বিচক্ষণ কূটনীতি’ এবং একমুখী আমেরিকা-নির্ভরতা কাটিয়ে চীন-রাশিয়া-তুরস্ক বলয়ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে প্রস্তাবিত ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন এবং নিজস্ব ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করাই হবে তাদের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
১ দিন আগে
বোরো মৌসুম মানে বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এই একটি মৌসুম থেকে। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষকের পুরো জীবন আবর্তিত হয় এই ফসলকে ঘিরে। হাল চাষ থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষকের শরীরে ঘাম, চোখে স্বপ্ন। কিন্তু এবার সেই স্বপ্নের গায়ে
২ দিন আগে