
তেত্রিশ আর চৌতিরিশ
বিগত হয়ে যাওয়া পঞ্চাশ বছরে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বেশি (ইচ্ছে করেই ‘সম্ভবত’ শব্দটি ব্যবহারে বিরত থাকলাম) উদ্ধৃত কবিতাটির প্রথম লাইনটি একটি অভিযোগ: ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি।’
অর্ধ-শতাব্দী ধরে আমরা লাইনটিকে যেভাবে পড়েছি, তাতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হয়ে উঠেছেন বাঙালির অপেক্ষমান প্রতারিত বালক—যাকে বোষ্টুমি অন্তরাটুকু শোনায়নি, নাদের আলি তিনপ্রহরের বিল দেখায়নি, বরুণা যার বুকে আতরের গন্ধ হতে দেয়নি। কবিতাটি প্রবাদ হয়ে গেছে, আর প্রবাদ হলে কবিতার একটা ক্ষতি হয়: তাকে আর কেউ পড়ে না, সবাই ব্যবহার করে।
এ লেখাটি তবে কবিতাটিকে আবার পড়তে চায়, কিন্তু কেবল একটি কবিতা হিসেবে নয়— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিপুল কবিতারাজির মাঝখানে বসিয়ে।
তখন একটা অস্বস্তিকর পাটিগণিত চোখে পড়ে।
কবিতাটি ‘বন্দী, জেগে আছো’ বইয়ের, প্রকাশ ফাল্গুন ১৩৭৫, অর্থাৎ ১৯৬৯। তিন বছর পরে ‘আমার স্বপ্ন’ (১৯৭২)। সেখানে ‘চন্দনকাঠের বোতাম’ নামে একটি কবিতা আছে, যে কবিতাটিকে সুনীলপাঠকদের কাউকে তেমন একটা উদ্ধৃত করতে দেখা যায় না। কবিতাটি একটি দীর্ঘ তালিকা; প্রতিটি লাইন শুরু হয় ‘যেমন’ দিয়ে—
যেমন উপত্যকা থেকে ফিরে এসেছি বহুবার, পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা হয়নি
যেমন হাত অঞ্জলিবদ্ধ করেছি বহুবার, কখনো প্রার্থনা জানাইনি।’
যেমন নারীর কাছে মৃত্যুকে সমর্পণ করেছিলাম
মৃত্যুর কাছে নারীকে
যেমন বৃক্ষের কাছে জল্লাদের মতন গিয়েছি কুঠার হাতে
তালিকার মাঝখানে, প্রায় নিঃশব্দে, দুটি স্বীকারোক্তি:
ক) ‘যেমন ফিরে আসবো বলেও ফিরে যাইনি বেশ্যার কাছে।’
এবং
খ) ‘যেমন মনে মনে গ্রহণ করা অনেক শপথ কেউ শুনতে পায়নি বলেই মেনে
চলিনি।’
শেষে কবি জানান, এ হিসেব তিনি লিখছেন ‘এই চৌতিরিশ বছরে’, এক ট্রেনের জানলায় মুখ রেখে।’ তেত্রিশে বলেছিলেন, ‘কেউ কথা রাখেনি’। চৌতিরিশে লিখলেন, যে-শপথ কেউ শোনেনি, সেগুলো তিনি নিজেও মানেননি। মাঝখানে এক বছর। অভিযোগকারী আর অভিযুক্তের মধ্যে এইটুকুই দূরত্ব—এবং সুনীলের পুরো কবিজীবন মূলত এই এক বছরের দূরত্বকে বারবার পার হওয়ার গল্প।
‘কেউ কথা রাখেনি’ আসলে একটি স্বীকারোক্তি, যা অভিযোগের ছদ্মবেশ পরে আছে। ছদ্মবেশ শব্দটা এখানে আলগোছে ব্যবহার করছি না; দেখা যাবে, সেটাই তাঁর কবিতার মূল কারিগরি।
এই কবি বছর গোনেন, মুদির খাতায় যেমন দেনা লেখা থাকে।
• আঠাশে
আঠাশ বছর কাটলো, মৃত্যুর এখনো দেরী একশো আঠাশ।
নদীর ওপাড়ে শুকনো হাড়ের পাহাড়ে
সব বন্ধৃদের ভাঙা কবরখানায় ফুলমালা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে যাবো।’
(‘কাটামুণ্ডের দিবাস্বপ্ন’: ‘আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি’)।
• তেত্রিশে
‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ রাখেনি।’
(কেউ কথা রাখেনি”: ‘বন্দী, জেগে আছো’)
• চৌতিরিশে
‘যেমন মনে মনে গ্রহণ করা অনেক শপথ কেউ শুনতে পায়নি/ বলেই মেনে
চলিনি।’
(‘চন্দনকাঠের বোতাম’: ‘আমার স্বপ্ন’)
মৃত্যুরও ‘দেরি’, নিজেরও ‘দেরি’—এই শব্দটা তাঁর কবিতায় যত বার ফেরে, তত বার ফেরে খুব কম শব্দ। কথা কেন রাখা হয়নি, সে-প্রশ্নের প্রথম উত্তর এই শব্দটির ভেতরে।
দাঁড়াও, আমি আসছি
‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’ (১৯৬৬) বইয়ের একটি কবিতার নাম ‘আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়’। কবি এক পান্থনিবাসে পৌঁছেছেন; দরজা বন্ধ; ভিতর থেকে কেউ বলছে, গত বসন্ত-মেলায় সব ফুরিয়েছে, আর আলো নেই। তাঁর আগেই এক ‘রূপচোর’ যাত্রী এসে ‘ছেঁচে নিলো শেষ রূপ রস’। কবিতার শেষ:
আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়, জুতোয় পেরেক ছিল
পথে বড় কষ্ট, তবু ছুটে
এসেও পারি না, ধরতে ততক্ষণে লুট শেষ, দাঁড়িয়ে রয়েছে সব
ম্লান ওষ্ঠপুটে।
তিরিশের কোঠায় পা দেওয়া এক যুবক নিজের জীবনের কেন্দ্রীয় ভঙ্গিটি এভাবে ঠিক করে নিচ্ছেন: যে পৌঁছোয় লুটের পরে। একই বইয়ের ‘শেষ যাত্রী’ কবিতায়—‘শেষ ট্রেন ছেড়ে গেছে, এখন এ প্ল্যাটফর্মে আমরা সকলে’; ঘড়ি বেঁধে ঠিক-ঠিক ট্রেনে চেপে যারা চলে যায় তারা ‘আমাদেরই মাসতুতো ও পিসতুতো ভায়েরা’, আর প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা ক’জনের চায়ের খুচরোয় বেরোয় ‘দু’তিনটে অচল’ পয়সা।
দেরি এখানে সময়ের হিসেব নয়, নৈতিকতা। ‘আমার স্বপ্ন’-এর ‘দেরি’ কবিতায় সেই নৈতিকতার পুরো নকশা একটি কবিতার ভেতরে আঁকা আছে—
মাঝে মাঝে কাকে যেন হাত তুলে বলি দাঁড়াও, আমি আসছি টুকিটাকি কাজ সারতে অনেক বেলা হয়ে যায়।
মাঝখানে: ‘অসংখ্য দর্জিরা তৈরি করছে ছদ্মবেশ’, ‘অসংখ্য প্রতিশ্রুতির ওপর শ্যাওলা জমে’, নিশান উড়িয়ে চলে যায় মধ্যরাত্রির ট্রেন। শেষে তিনবার: ‘আমার দেরি হয়ে যায়, আমার দেরি হয়ে যায়, / আমার দেরি হয়ে যায়!’ প্রতিশ্রুতি, ছদ্মবেশ, দেরি—তিনটি শব্দ একটি কবিতায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে, এবং সুনীলের কবিতার তালা এই তিনটি চাবি একসঙ্গে ঘোরালে খোলে। কাকে বলা হচ্ছে ‘দাঁড়াও’? কবিতা তা জানায় না। যে-ই হোক, সে দাঁড়িয়ে থাকে; এই কবি পৌঁছোন না।
সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতিটি রাজনৈতিক, আর সবচেয়ে বড় দেরিও। ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ (‘সত্যবদ্ধ অভিমান’) কবিতার ধুয়ো: ‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়’। কেন অপরাধী? ‘আমারও কথা ছিল হাতিয়ার নিয়ে তোমার পাশে দাঁড়াবার।’
‘কথা ছিল’—ঠিক এই শব্দবন্ধ, ‘কেউ কথা রাখেনি’র সেই ‘কথা’। আর তার পরে: ‘কিন্তু আমার অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে!’ কবি জানাচ্ছেন, ট্রেনের জানলার পাশে, নদীর নির্জন রাস্তায়, শ্মশানতলায় তিনি তাঁর শপথ শুনিয়েছেন আকাশকে, বৃষ্টিকে, বৃক্ষকে, ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়কে—মানুষকে নয়।
‘চন্দনকাঠের বোতাম’-এর লাইনটি মনে পড়ে: শপথ কেউ শুনতে পায়নি বলেই মানা হয়নি। এখানে শপথ শোনানো হয়েছে এমন শ্রোতাদের, যারা কোনোদিন হিসেব চাইবে না। এটাই সুনীলের রাজনীতি—না বিপ্লবী, না নিন্দুক; একজন মানুষ যিনি জানেন তাঁর কথা ছিল, জানেন তিনি যাননি, এবং এই না-যাওয়াকে কোনোদিন যুক্তি দিয়ে ঢাকেননি। ‘সাবধান’ কবিতায় রাস্তার বাচ্চা ছেলেটা বমি করলে তিনি বলেন, ‘আমি ওর মৃত্যুর জন্য দায়ী’। ‘তিনজন মানুষ’-এ আমরণ অনশনে বসা তিন শ্রমিককে তেরো দিন ধরে দেখতে দেখতে বলেন, ‘আমি রাজনীতি-ফিতি বুঝি না!’—আর তার পরেই ভাতের থালার সামনে গা গুলিয়ে ওঠে, ‘সারা রাত আমার ঘুম আসে না’। ঘুম না-আসাই তাঁর একমাত্র রাজনৈতিক কাজ; সেটুকু তিনি লুকোননি।
এই অপরাধবোধ বয়সের সঙ্গে কমেনি, শুধু আরও নির্মম হয়েছে। ‘নীরা, হারিয়ে যেও না’-তে এক লাইনে একটা প্রজন্মের এপিটাফ: ‘যারা বিপ্লব এসে গেল বলেছিল, তারা লিখছে স্মৃতিকথা’। আর শেষ পর্বের ‘প্রাণের প্রহরী’-র ‘জানতে ইচ্ছে করে’ কবিতায় জঙ্গলের মাওবাদী ছেলেমেয়েদের কথা ভাবতে ভাবতে সত্তর-পেরোনো কবি লেখেন: ‘আমি আর সেই আমি নই / আমি আর আকাশের নীচে কখনও ঘুমোতে যাব না’—তবু ওদের কথা এত মনে পড়ে কেন? কবিতার শেষ: ‘যদি কানু সান্যাল বা অসীমের মতন ওরাও / কোনও একদিন বলে, আমরা ভুল করেছিলামৃ / সেদিন আর আমি বেঁচে থাকব না!’
এত বছর ধরে যে-শপথ তিনি রাখেননি, শেষ বয়সে তার একমাত্র সান্ত্বনা: অন্তত অন্যেরা যেন সেটাকে ভুল না বলে। না-রাখা কথা এভাবেই একটা জীবনের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে।
কথা ছিল: একটি ব্যাকরণ
সুনীলের অন্তত তিনটি কবিতার নাম ‘কথা ছিল’, একটির নাম ‘কথা ছিল না’। এই শব্দবন্ধের ওপর আর কোনো বাঙালি কবির এত জোর নেই। বাক্যটি লক্ষ করার মতো: এতে কর্তা নেই। ‘কথা ছিল’—কার কথা? কে দিয়েছিল? ‘কেউ কথা রাখেনি’-তে প্রতিশ্রুতিদাতাদের নাম ছিল—বোষ্টুমি, নাদের আলি, বরুণা, বাবা। সত্তর দশক থেকে সুনীলের কবিতায় প্রতিশ্রুতিদাতা নামহীন হয়ে যায়। ‘কথা ছিল’ একটি কর্তাহীন অতীত; এমন এক ভবিষ্যতের ভূতকাল, যা কখনো ঘটেনি। বাংলা ব্যাকরণে এই কালের নাম নেই, সুনীল সেটা বানিয়ে নিয়েছেন।
• ‘দাঁড়াও সুন্দর’ (১৯৭৫)
সামনে দিগন্ত কিংবা অনন্ত থাকার কথা ছিল
অথচ কিছুটা গিয়ে
দেখি কানাগলি।
(‘কথা ছিল’)
একই কবিতায়:
সমস্ত নারীর মধ্যে একজনই নারীকে খুঁজেছি
এই রকমই কথা ছিল
স্নিগ্ধ ঊষাকালে’—
(‘কথা ছিল’)
আর তার পরে যে লাইনটি নীরা-পুরাণের গায়ে সরাসরি ছুরি: ‘চেয়ে দেখি, সত্য নয় / শুধুই তুলনা!’
• ‘এসেছি দৈব পিকনিকে’ (১৯৭৭)
এই দুরন্ত রাতের খেলা কথা ছিল
বনের মধ্যে রেশম, এত লাল রেশম, কথা ছিল?
হে সুন্দর, হে আনন্দ, এত সুদূর?
ফেরার পথ ভুলে যাবার কথা ছিল’;
(‘কথা ছিল’)
অন্য কবিতায়,
দেখোনি স্থাণুর কীট? দেখোনি সমস্ত দিন
ভুলের কাঁকর আর মুখ ভরা অনিচ্ছার ধুলো?
এ রকম কথা ছিল? যখন তখন সব
প্রয়াসে বিলিয়ে দেওয়া শপথ ছিলো না?
(‘ফেরা না ফেরা’)
• ‘মন ভালো নেই’ (১৩৮৩)
যাবার কথা ছিল ফেরার পথ নেই
এখন বেলা গেল।
(‘বেলা গেল’)
• ‘জাগরণ হেমবর্ণ’ (১৩৮১)
শপথগুলি ভুল করেছি
ভুল করেছি’; ‘স্বপ্নে আমার ফিরে যাওয়ার
কথা ছিল, স্বপ্নে আমার স্নান হলো না।
(‘সখী আমার’)
• ‘দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়’ (১৯৭৯)
এর মধ্যে শুধু কথা রাখা আর কথা ভাঙা
শুধু অন্যের কাছে, শুধু ভদ্রতার কাছে, শুধু দীনতার কাছে
কত জায়গায় ফিরে আসবো বলে আর ফেরা হয়নি।
(‘সেই লেখাটা’)
• ‘সাদা পৃষ্ঠা, তোমার সঙ্গে’
চেয়েছিলাম মানুষের মুক্তি, কিন্তু আমার হাতে পড়ছে বন্ধন
দূরত্বের আড়াল থেকে কেউ যেন ডাকছে, বুঝতে পারছি না ভাষা
ছোট ছোট আরাম, টুকিটাকি মোহজালে জড়িয়ে দিয়েছে সর্বাঙ্গ
এ রকম কথা ছিল না, এ রকম তো কথা ছিল না!
(‘স্বাধীনতার জন্য’)
এবং ‘কথা ছিল না’ কবিতাটি, যেখানে না-রাখা কথা আর নিজের মুখ প্রথমবার মুখোমুখি হয়:
রাস্তায় চলতে চলতে কেউ আমার মুখের সামনে হঠাৎ
চট করে একটা আয়না তুলে ধরলে
আমি চমকে উঠি, ভয় পাই, এ কে?
এমন গাম্ভীর্য, এমন ভুরুর ভাঁজ, কথা ছিল না,
কথা ছিল না!
(‘কথা ছিল না’)
কার সঙ্গে কথা ছিল? আয়না উত্তর দেয়: যে-লোকটা এখন ‘টিলার মতন উঁচু বাড়ির শিখরতলায়’ থাকে, ‘সংবাদপত্র অফিসের ঠাণ্ডা ঘরে’ বসে থাকে, তার সঙ্গে নয়। কথা ছিল অন্য একজনের সঙ্গে—নদীতীরে গাছের তলায় শুয়ে থাকা, ‘প্রথম নীরাকে ছোঁয়ার হৃৎস্পন্দন’-এর একজনের সঙ্গে। কবি তাদের সম্বোধন করেন ‘হে’ দিয়ে, দেবতাকে যেমন করে: ‘তোমরা আমায় ভুলে গেলে?’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল একজন কিশোর, রাখতে এসেছে এক প্রৌঢ়; মাঝখানে যে-লোকটা দাঁড়িয়ে, আয়নায় সে-ই অচেনা। এই কারণেই সুনীল কথা রাখতে পারেননি: কথা যে দিয়েছিল আর যে রাখতে এল, তারা এক মানুষ নয়।
যে লেখে, সে আমি নয়
এখানে সেই শব্দটায় ফিরতে হয়—ছদ্মবেশ। সুনীলের ‘আমি’কে আমরা বরাবর পড়েছি আত্মবিশ্বাসের উচ্চকণ্ঠ হিসেবে: ‘আমি সেই মানুষ, আমাকে চেয়ে দ্যাখো’; ‘দেখ্ রে নিন্দুক দেখ্, বাম হাতে কনিষ্ঠ আঙুলে/ ত্রিজগৎ ধরে আছি কেমন সহজে’। কিন্তু এই দ্বিতীয় উদ্ধৃতিটি ‘একা এবং কয়েকজন’ (১৯৫৮)-এর ‘সহজ’ কবিতা থেকে, আর সেই কবিতার ধুয়ো কী? ‘বিশ্বাস করো না’। পঁচিশ না পেরোনো কবি নিজেকে চেনাচ্ছেন এক ম্যাজিকওয়ালা হিসেবে—‘ছেঁড়া তাঁবু, ফাটা বাজনা, নানান সেলাই/ করা কালো কোর্তা’—এবং পাঠককে বারবার সাবধান করছেন, আমাকে বিশ্বাস কোরো না।
প্রথম বইয়েরই ‘মঞ্চ’ কবিতায় অভিনেতা নীলকণ্ঠ মজুমদার সম্রাটের সাজ খুলতে ভয় পায়: ‘নকল সাজেই বুঝি বাঁচতে হবে’। ‘বিবৃতি’-তে উনিশে বিধবা, উনত্রিশে গর্ভবতী এক মেয়ের কথা বলে কবি শেষ লাইনে ফিসফিস করেন: ‘এবং আড়ালে বলি, আমিই সে সুচতুর গোপন প্রেমিক’। স্বীকারোক্তি, কিন্তু আড়াল থেকে। এই ভঙ্গি তিনি আর কোনোদিন ছাড়েননি।
১৯৬৬-র বইয়ে ছদ্মবেশ পুরো কাঠামো হয়ে ওঠে। ‘জুয়া’: ‘অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় জীবন বদলে নিলাম আমি ও নিখিলেশ, / হাতঘড়ি ও কলম, পকেটবই, রুমাল’—ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর, ‘মুখভঙ্গি ও দুঃখ, হাসির মুহূর্ত’, সব বদল হয়। নিখিলেশ কে? সুনীলের আরেক নাম, তাঁর দ্বিতীয় জীবন, যাকে ফোন করে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তুই কি রোজ কণ্ডেনসড্ মিল্কে চা খেতিস? বইয়ের নাম-কবিতা এই নিখিলেশকেই ডাকে: ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’। সেখানে কবি জানাচ্ছেন, ‘আমি স্বপ্নের মধ্যে বাবুদের বাড়ির ছেলে/ সেজে গেছি রঙ্গালয়ে’; ‘আমি কপাল থেকে ঘামের মতন মুছে নিয়েছি পিতামহের নাম’; এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক: ‘তোর সঙ্গে/ জীবন বদল করে কোনো লাভ হলো না আমার’। কবিতার শেষে এক আশ্চর্য স্বীকার—নিজের দু’হাত যখন নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করে, তখন মনে হয় ‘ওরা সত্যিকারের’; নিজের চোখ দুটোও ‘এক পলক সত্যি চোখ’; ‘এ রকম সত্য পৃথিবীতে খুব বেশি নেই আর।’ যে-মানুষের কাছে নিজের হাত আর চোখ ছাড়া আর কিছু সত্যি নয়, সে কথা রাখবে কী দিয়ে?
তালিকা দীর্ঘ, আর চার দশক ধরে একই সুরে বাঁধা। ‘চন্দনকাঠের বোতাম’: ‘যেমন মানুষের কাছে আমিও মানুষ সেজে থাকতে চেয়েছিলাম’। ‘জাগরণ হেমবর্ণ’-এর ‘অন্যলোক’: ‘যে লেখে, সে আমি নয় / কেন যে আমায় দোষী কর!’—যে লেখে, সে নীরার সঙ্গে পাহাড়-শিখরে, ‘কাঙাল হতেও তার লজ্জা নেই’; আর আমি? ‘টেবিলে মুখ গুঁজে’ বসে থাকি। পাশের কবিতা ‘আমিও ছিলাম’: ‘পাঁচজনে বলে পাঁচ কথা, আমি নিজেকে এখনো চিনি না।’ ‘স্মৃতির শহর”: ‘এই সময় পোশাক বদলাবার মতন / চরিত্রটাও কিছুক্ষণের জন্য বদলে নিতে হয়!’ ‘নীরা, হারিয়ে যেও না’-র ‘‘হাত” শুরুই হয় এক অসম্ভব প্রস্তাবে: ‘ধরা যাক, আজ থেকে আমি আমার বাবার নাম দিলুম / নিরাপদ হালদার’—তা হলে আমি কি ক্লাস এইটে পড়া রাধারমণ? ধরা যাক আমার মা চৌধুরী বাড়ির ঠিকে ঝি—তা হলে আমি কি দেশবন্ধু পার্কের ছিনতাইবাজ?
‘সেই মুহূর্তে নীরা’-র ‘বিকল্প খোঁজো’: ‘আমার পকেটে অন্য লোকের নামের আদ্যক্ষর বসানো রুমাল’; ‘তোমারই নামে এসেছে চিঠি, একটা শব্দও বুঝতে পারলে না তুমি।’ ‘যে যার অন্য বাড়ি’: ‘আমি খড়ি দিয়ে লেখা আমার নাম মুছে দিতাম!’ আর ‘জীবিকা ও সামাজিকতা’-য় নিজের সমস্ত বিদ্রোহ, পাহাড়ে-জঙ্গলে পালানো, ‘কিছু একটা ভাঙার অস্থিরতা’—সব কিছুর মূল্যায়ন এক লাইনে: ‘ওসব দু’দিনের মৌখিক ছদ্মবেশ’।
এমনকি নীরা—যাকে আমরা ভেবেছি তাঁর একমাত্র নিশ্চিত সত্য—তারও ছদ্মবেশ আছে। ‘নীরার হাসি ও অশ্রু’: ‘তার ছদ্মবেশ থেকে ভেসে আসে সামুদ্রিক ঘ্রাণ’। ‘নির্বাসন’ কবিতায় কার্জন পার্কের অন্ধকারে কেউ কবিকে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় লুকিয়েছিস নীরাকে?’ উত্তর: ‘জানি না কোথায় লুকিয়েছি নীরাকে, অথবা নীরা কোথায় / লুকিয়ে রেখেছে আমায়!’ প্রেমিক আর প্রেমিকা পরস্পরকে লুকিয়ে রাখছে—এটা প্রেমের কবিতা নয়, লুকোচুরির।
এই ছদ্মবেশকে উত্তর-আধুনিক খেলা ভাবলে ভুল হবে। এর উৎস অনেক পুরোনো, অনেক গরিব। এই কবি একটি নদী আর একটি দেশ হারিয়ে এসেছেন কৈশোরে; তাঁর প্রথম ‘আমি’ আড়িয়াল খাঁর ওপারে থেকে গেছে। ‘এসেছি দৈব পিকনিকে’-র ‘এখন আমি’ কবিতায় হিসেবটা পরিষ্কার: হাতের মুঠোয় ছিল একটা মস্ত বড় নদী, নদীর মধ্যে ছিল বাল্যকালের ভয়, ‘সমস্তই হারিয়ে গেল!’ শেষ লাইন: ‘এখন আমি মানুষ, আমি কঠিন একটি মানুষ!’ কঠিন মানুষটি হারানো বালকের কথা রাখতে পারে না, কারণ বালকটি অন্য দেশের নাগরিক—সীমান্তের ওপারে, যেখানে কবির যাওয়ার কথা ছিল এবং তিনি যাননি: ‘ফিরে যাইনি ধলভূমগড়ের লালধুলোর রাস্তায়/ দণ্ডকারণ্যে নির্বাসিতা ধাইমা’র কাছেও যাওয়া হয়নি’।
‘যদি নির্বাসন দাও’—১৯৭০-৭১-এর রক্তাক্ত বাংলাকে লেখা—কবিতার সেই বিখ্যাত শপথ, ‘আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো/ আমি বিষপান করে মরে যাবো!’, সুনীলের সবচেয়ে বড় প্রতিজ্ঞা, এবং সবচেয়ে স্পষ্টভাবে না-রাখা। তিনি নির্বাসিতই ছিলেন আজীবন; বিষপান করেননি। একই কবিতায় তিনি স্মৃতিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক?’, আর দেশের বিবরণে ঢুকিয়ে দেন একটি লাইন, যা নিজের দিকেও ফেরানো যায়: ‘শঠ তঞ্চকের এত ছদ্মবেশ’।
নিজের নাম ধরে ডাকা
যে মানুষ নিশ্চিত নয় সে কে, সে কী করে? সুনীলের কবিতায় সে নিজের নাম ধরে নিজেকে ডাকে। এই ভঙ্গি তাঁর কবিতায় এত বার আছে যে একে একটা আলাদা ধারা বলা যায়, এবং বাংলা কবিতায় এটি আর কারও নেই।
‘নির্বাসন’ (১৯৬৬): ‘আমি নাস্তিকের গলায় নিজের ছায়াকে ডাকি’, তারপর ‘এবার আমি নিজের নাম / চেঁচাই খুব জোরে’। ‘বাড়ি ফেরা’ (‘বন্দী, জেগে আছো’): গভীর রাতে একা ফিরে, ‘বন্ধ দরজার সামনে থেমে / তিনবার নিজের নাম ধরে ডাকবো’, তারপর আলো জ্বেলে ‘আয়নায় নিজের মুখ চিনে নিয়ে বারান্দা পেরিয়ে ঢুকবো ঘরে’। মানুষ নিজের বাড়িতে ঢোকার আগে নিজেকে ডাকে না; ভূত ডাকে, বা সে, যে জানে না সে ফিরে এসেছে কি না। ‘রাত্রির রঁদেভু’-র ‘কবিতা গদ্য’-য় রাত একটা চল্লিশে এক অদৃশ্য কণ্ঠ কবিকে গালাগাল দেয়; কবি বারবার জিজ্ঞেস করেন, ‘কে তুমি, কে তুমি, মুখ দেখাও!’ কণ্ঠস্বর উত্তর দেয়: ‘আমি রাস্তার একটা বাঁক, তোমার জামার একটা হারানো / বোতাম, সুনীল!’ চন্দনকাঠের সেই হারানো বোতামটা এতদিনে কথা বলল, এবং কবিকে নাম ধরে ডাকল। ‘সেই মুহূর্তে নীরা’-র ‘’মায়া-সংসার”: ‘ডাকো কার নাম ধরে, কেউ নেই, নাম নেই, নাম ছাড়া কিছু নেই’। ‘সোনার মুকুট থেকে’-র ‘‘মধ্যরাত্রির নিরালায়”: হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর ‘ফিরে এলো অন্য একজন মানুষ / আয়নায় অন্য মুখ’, ধুয়ো—‘চেনা হলো না, চেনা হলো না’। ‘দাঁড়াও সুন্দর’-এর ‘‘ভুল সময়ে”: ‘আমি ভুল সময়ে জন্মেছি তাই আমায় কেউ চিনতে পারে না / আমার টেবিল চেয়ারে বসে থাকার কথা ছিল না’—ভুল সময়, অচেনা মুখ, কথা ছিল না: তিনটিই এক লাইনে। এবং ‘‘কেউ আমায় চিনতে পারে না” নামে আস্ত একটি কবিতা।
এই ধারার সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটি ুকেউ নাম ধরে ডাকবে?”—‘নিরুদ্দিষ্টের বিজ্ঞাপনের প্রতিটি মুখই খুব চেনা মনে হয় মনে হয় যেন কখনও দেখেছি আয়নায়’।
খবরের কাগজের নিরুদ্দেশ-বিজ্ঞাপনের প্রতিটি মুখ কবির নিজের মুখ। শেষহীন রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়, ‘কেউ কি আমার নাম ধরে ডাকবে?/ কেউ বাল্যসঙ্গীর কণ্ঠস্বরে বলবে, তোমারই/ প্রতীক্ষায় ছিলাম!’ এখানে এসে ‘কেউ কথা রাখেনি’ পুরোপুরি উল্টে যায়। সেই কবিতায় বালক অপেক্ষা করছিল বড়দের জন্য—বোষ্টুমি, নাদের আলি, বাবা; ‘পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি’। এই কবিতায় একজন প্রৌঢ় শুনতে চাইছেন, বালক তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে: তোমারই প্রতীক্ষায় ছিলাম। যে আসেনি, সে এবার কবি নিজে। কথা রাখেননি সুনীল—সেই বালকের কাছে, যে জিজ্ঞেস করেছিল ‘আমি আর কত বড় হবো?’, এবং যাকে বড় হয়ে তিনি ফিরে গিয়ে বলেননি: এই যে আমি, তোমার নাম ধরে ডাকছি। পাঁচ খণ্ডের কবিতা সেই না-বলা ডাকের নিরুদ্দেশ-বিজ্ঞাপন।
না-বলা কথা
‘কথা’ শব্দটার আরেকটা অর্থ উচ্চারণ। কথা রাখা আর কথা বলা। সুনীলের কবিতা যেমন না-রাখা কথার, তেমনই না-বলা কথার। ‘বন্দী, জেগে আছো’-র ‘‘মূক ব্যবহার” কবিতার শুরু: ‘নিজের গলার স্বর যন্ত্রে শুনবো, এ যন্ত্র বলবে ‘ভালোবাসি’/ আর কেউ বলেনি, আমি কারুক্কে বলিনি।’ ১৯৬৯ সালে একজন কবি চাইছেন একটা যন্ত্র তাঁকে ‘ভালোবাসি’ বলুক, কারণ কেউ বলেনি এবং তিনিও বলেননি। এই একটি লাইনে নীরা-কবিতার চল্লিশ বছর ব্যাখ্যা হয়ে যায়: নীরা সেই একজন, যাকে কথাটা কোনোদিন বলা হয়নি, তাই বলা হয়েছে হাজার কবিতায়।
‘সেই মুহূর্তে নীরা’-র ‘‘কথা” কবিতাটি এই না-বলার সবচেয়ে সরাসরি স্বীকারোক্তি: ‘আমি তোমাকে দেখি, তোমার সঙ্গে কথা বলা হয় না’। সে বৃষ্টিতে ট্যাক্সি খুঁজছে, আমি চলন্ত ট্রামে; সে ফরাসি চলচ্চিত্র উৎসব থেকে বেরোচ্ছে, আমি মুচির সামনে ছেঁড়া চটি সেলাই করাচ্ছি; সে মনুমেন্টের চূড়া থেকে হাতছানি দেয়, আমাকে নেমে যেতে হয় পাতাল রেলে—আবার সেই দেরি, সেই ভুল সময়। শেষে: ‘দু’ একটা না-বলা কথা সারাজীবন বৈদূর্যমণির মতন/ দীপ্যমান হয়ে থাকে বুকের মধ্যে’। শেষ পর্বের ‘বাংলা চার অক্ষর’-এর ‘হাওয়ায় উড়ছে’ এই অসাক্ষাৎকেই নারী-পুরুষের চিরকালীন ভুল বলে চিহ্নিত করে: ‘কোনোদিন ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায় / মুখোমুখি দেখা না হওয়ার অতৃপ্তি’।
‘নীরার জন্য কবিতার ভূমিকা’-য় এই না-বলার কারিগরি সবচেয়ে স্পষ্ট। কবিতাটি মধ্যরাতে ঘুমন্ত নীরার দিকে ছুটে যায়, তার বিছানায় সারারাত শুয়ে থাকে, সকালে পায়ের কাছে মরা প্রজাপতির মতো লুটোয়—‘তুমি জানতে পারবে না’। কবি বহু দূরে; ‘আমার ভয়ঙ্কর হাত তোমাকে ছোঁবে না’। কথার বদলে পাঠানো হচ্ছে কবিতা, স্পর্শের বদলে অক্ষর। এক দশক পরে ‘নীরা, হারিয়ে যেও না’-তে একই কথা, আরও নগ্ন: ‘আমি তোমাকে ছুঁইনি’। ‘দাঁড়াও সুন্দর’-এর ুএকটি কথা”: ‘একটি কথা বাকি রইলো থেকেই যাবে/ মন ভোলালো ছদ্মবেশী মায়া’—আবার ছদ্মবেশ, না-বলা কথার ঠিক পাশে। আর ‘মন ভালো নেই’-এর সেই বিখ্যাত ধুয়োর দ্বিতীয় লাইনটা কেউ মনে রাখে না: ‘কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই / চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখেনি’।
এখানে সুনীলের কবিতার একটা সংজ্ঞা দেওয়া যায়: কবিতা হলো সেই জিনিস, যা মানুষ লেখে কথা রাখার বদলে, কথা বলার বদলে। এটা নিন্দা নয়। কথা না-রাখা মানুষ যদি জানে সে কথা রাখেনি, এবং সেই জানাটাকে চল্লিশ বছর ধরে লিখে রাখে, তবে সেই লেখা অন্য এক রকমের কথা রাখা হয়ে ওঠে—দেনার খাতা, যা শোধ হয় না, কিন্তু কোনোদিন ছেঁড়াও হয় না।
কবিতা কিছুই দেয়নি
‘কথা’-র তৃতীয় অর্থ: কাহিনি। বাংলায় উপন্যাস-লেখককে বলে কথাসাহিত্যিক। সুনীলের জীবনের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপটি এখানে—যে-কবি কথা রাখেননি, তিনি বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় কথাকারদের একজন হয়ে উঠলেন। এই রূপান্তরকে তিনি নিজে কীভাবে দেখেছেন? বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে। কবিতার কাছে দেওয়া কথা রাখেননি বলে।
‘রাত্রির রঁদেভু’-র ‘‘কবিতা গদ্য” একটি বিচারসভা, রাত একটা চল্লিশে। অভিযোগকারী অদৃশ্য: হারামজাদা ছেলে, ‘হঠাৎ গদ্যের দিকে ঢলাঢলি / করতে গেলি কেন?’; ‘কৃত্তিবাসের পৃষ্ঠা ছেড়ে কেন গেলি খবরের কাগজের গদ্যের দিকে’; ‘বিশ্বাসঘাতক! গদ্যের বর্ম পরেছিস’। অভিযুক্তের জবাবে বুক কেঁপে ওঠে: ‘টাকা নয়, দু’ মুঠো ভাত, তখন প্রায় খেতে পেতাম না’; ‘গদ্য তবু মজুরি দেয়, কবিতা যে কিছুই দেয়নি’। কবিতা কিছুই দেয়নি—তবু তিনি কবিতা ছাড়েননি; ‘সাদা পৃষ্ঠাকে কালো করার প্রতিজ্ঞা’ নিয়ে ‘অন্ধের মতন এক সুদীর্ঘ সফর, প্রতিটি দিন অসমাপ্ত’। ‘‘কথা ছিল না”-তেও একই কাঁটা: ‘আমার কথা ছিল না সংবাদপত্র অফিসের ঠাণ্ডা ঘরে […] বসে থাকার’। ‘নীরা ও জীরো আওয়ার’-এ এক সকাল সাড়ে দশটায় তিনি ‘প্রবন্ধ ও রম্যরচনা, অনুবাদ, পাঁচ বছর আগের / শুরু করা উপন্যাস, সংবাদপত্রের জন্য জল-মেশানো / গদ্য থেকে’ সব ভেঙেচুরে উঠে দাঁড়াতে চান—এবং আমরা জানি, ওঠেননি; পাঁচ বছর আগে শুরু করা উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত লেখা হয়েছিল, এবং তার পরে আরও অগণন।
সবচেয়ে সূক্ষ্ম ইঙ্গিতটি ১৯৬৬-র ‘একটি কবিতা লেখা’-য়। কবি একটা কবিতা শেষ করতে পারছেন না, শেষ লাইনটা আসছে না, খিদে পেয়েছে, আর—‘আজ বিকেলে কথা রাখতে হবে’। এইটুকু। কবিতা ফেলে তিনি কথা রাখতে যাবেন—কার কাছে, কী কথা, কবিতা বলে না। কিন্তু যে-পুরোনো লাইনটা বারবার দাবি জানাচ্ছে কবিতায় ঢোকার জন্য, সেটা: ‘কেন ফিরে এলে?’ কথা রাখতে গেলে কবিতা অসমাপ্ত থাকে; কবিতায় ফিরে এলে কেউ জিজ্ঞেস করে, কেন ফিরে এলে। এই দোটানাই সুনীলের দুই জীবন। গদ্যে তিনি কথা রেখেছেন—পাঠকের কাছে, সংসারের কাছে, ‘ভদ্রতার কাছে, দীনতার কাছে’। কবিতায় লিখে রেখেছেন, সেই কথা রাখতে গিয়ে কোন কথাগুলো রাখা হয়নি।
আবার দেখা হবে
তবে একটি প্রতিশ্রুতি তিনি কোনোদিন ভাঙেননি, কারণ সেটি রাখা যায় শুধু বারবার উচ্চারণ করে। ‘স্বর্গ নগরীর চাবি’-র ‘‘একটাই তো কবিতা”: একটাই তো কবিতা লিখতে হবে, অথচ শব্দ তাকে দেখায় না; রাতে সিগারেট ধরিয়ে মনে হয় ‘এ এক ভুল মানুষের জীবন / ভুল মানুষেরা কবিতা লেখে না’; তবু—‘লিখে যাচ্ছি/ লিখে যাবো, সারা জীবন ধরে / আবার দেখা হবে, আবার দেখা হবে, আবার দেখা হবে!’ ‘সেই মুহূর্তে নীরা’ শুরু হয় যে-কবিতায়, তার শেষ লাইন: ‘জীবন ভোর প্রতিধ্বনি/ আবার দেখা হবে!’ হাসপাতালে নার্সের কপালের গোল আয়নাকেও তিনি এই প্রশ্নই করেন: ‘আর কি ফিরে আসবো, আবার দেখা হবে?’
‘আবার দেখা হবে’ এমন একটি কথা, যার কোনো তারিখ নেই, তাই যার দেরি হয় না। সুনীল তাঁর সমস্ত না-রাখা কথাকে এই তারিখহীন কথাটির ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ‘সাদা পৃষ্ঠা, তোমার সঙ্গে’-র ‘‘উৎসর্গ” একটি দীর্ঘ দানপত্র—এই নাও আমার সমস্ত দৃষ্টিপাত, এই নাও প্রবাসের চিঠি, ‘এই নাও নদীর স্রোতের মতো সব প্রতিশ্রুতি’, ‘এই নাও উজ্জ্বল ব্যর্থতা’—এবং শেষ লাইন, দুটি শব্দ: ‘কিছু দেবে?’ যে দিতে পারেনি, সে সব দিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করছে, কিছু দেবে? এর চেয়ে সৎ ভিক্ষা বাংলা কবিতায় কম আছে।
এখন ‘কেউ কথা রাখেনি’ আবার পড়া যাক। ‘নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো?’—এই প্রশ্ন বালকের নয়, একজন তেত্রিশ বছরের মানুষের, যে জানে সে যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে এবং তিনপ্রহরের বিল দেখতে যায়নি। ‘বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই’—এখানে ‘আমাদের’ শব্দটি বাবা ও ছেলেকে একই দিকে বসায়; দেখা হয়নি শুধু বাবার নয়, ছেলেরও, যে দেখতে যায়নি। ‘ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি’—গেটের এপারে যে-বালক, চল্লিশ বছর পরে সে গেটের ওপারে; এবং ওপার থেকে সে একবারও ফিরে তাকায়নি। কবিতাটি এত বাঙালির বুকে বসে গেছে তার কারণ হয়তো এই: প্রত্যেক পাঠক জানে সে একই সঙ্গে সেই বালক এবং গেটের ওপারের সেই লোক; প্রত্যেকেই কারও কাছে বোষ্টুমি, কারও কাছে নাদের আলি। কবিতাটি আমাদের অভিযোগ করতে দেয়, আর অভিযোগের আড়ালে স্বীকার করতে দেয়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সারা জীবন এই আড়ালটুকু ব্যবহার করেছেন, এবং সারা জীবন সেটা খুলেও দেখিয়েছেন—‘‘বিশ্বাস করো না” থেকে ‘‘কেউ নাম ধরে ডাকবে?” পর্যন্ত।
‘কেউ কথা রাখেনি’—এই বাক্যের ‘কেউ’ শব্দটির ভিতরে তিনি নিজের নামটি রেখে দিয়েছিলেন। বিপুল কবিতা তার নিরুদ্দেশ-বিজ্ঞাপন। আর প্রতিটি কবিতার নিচে, অদৃশ্য কালিতে যেন লেখা মাত্র দুটি শব্দ: দাঁড়াও, আসছি।
- সৈকত আরেফিন: প্রাবন্ধিক ও গবেষক
.png)







