leadT1ad

বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেট: ঐতিহাসিক বঞ্চনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরাধীনতার স্বরূপ

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

ছবি: সংগৃহীত

কোন জাতির আত্মমর্যাদা ও বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয়ের প্রধান মাপকাঠি হলো তার শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা কেবল সনদের ব্যাপার নয়। সেই সনদ জাতির মনন বিকাশের হাতিয়ার। কিন্তু বাংলাদেশের গত পঞ্চান্ন বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কী দেখা যায়? দেখা যায়, শিক্ষা খাত সবসময়ই রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ এবং এর ব্যবহারিক প্রয়োগ—উভয় ক্ষেত্রেই এক ধরণের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। এই প্রবন্ধে শিক্ষার বর্তমান করুণ দশা, বাজেটের ঐতিহাসিক বঞ্চনা, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি এবং এর ফলে সৃষ্ট পরনির্ভরশীলতা নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই আলোচনায় কেবল মূলধারার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র তুলে ধরা হলো।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বাজেটের ক্রমহ্রাসমান ধারা

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের প্রথম বাজেটে শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দের অনুপাত ছিল সম্মানজনক। শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করতে। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে শিক্ষার অগ্রাধিকার কমতে থাকে। আশির দশকে সামরিক শাসনামলে প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়ন বেশি গুরুত্ব পায়। নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পর শিক্ষার হার বাড়ানোর চেষ্টা হলেও মানের দিকে নজর দেওয়া হয়নি।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ইউনেস্কো ও আইএলও-এর মতে, একটি উন্নয়নশীল দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা বাঞ্ছনীয়। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এই লক্ষ্য ছোঁয়া সম্ভব হয়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ কমেছে। বিগত কয়েক বছরে শিক্ষা বরাদ্দ জিডিপির ১.৭৬ থেকে ২ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি মিলিয়ে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার মধ্যে প্রকৃত শিক্ষা খাতের অংশ মোট বাজেটের মাত্র ১১ থেকে ১২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল ও ভুটান যেখানে জিডিপির ৩.৫ থেকে ৪ শতাংশ ব্যয় করে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। এই অপ্রতুল বাজেট দিয়ে ১৭ কোটি মানুষের গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। নীতিনির্ধারকরা শিক্ষাকে ‘বিনিয়োগ’ না ভেবে ‘ব্যয়’ হিসেবে দেখেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি জাতির জন্য আত্মঘাতী।

আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার দুষ্টচক্র

শিক্ষা বাজেটের যে সামান্য অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার বড় অংশই শ্রেণিকক্ষে পৌঁছায় না। এর প্রধান কারণ প্রবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আমলাদের আধিপত্য এত বেশি যে শিক্ষাবিদদের মতামত সেখানে গুরুত্ব পায় না। বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয় অবকাঠামো বা ভবন নির্মাণে, কারণ সেখানে ঠিকাদারি ও টেন্ডারের মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, প্রশিক্ষণ ও কারিকুলাম উন্নয়নের নামে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা অপচয় করা হয়। খিচুড়ি রান্না শেখা বা পুকুর খনন দেখার মতো প্রকল্পের নামে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিয়মিত প্রথায় পরিণত হয়েছে।

গত এক যুগে কারিকুলাম পরিবর্তনের নামেও বিশাল বাণিজ্য চলেছে। সৃজনশীল পদ্ধতি থেকে শুরু করে নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাঠ পর্যায়ে শিক্ষকদের প্রস্তুতির চেয়ে প্রকল্প ব্যয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে। প্রশিক্ষণের নামে যে অর্থ খরচ দেখানো হয়, তার বড় অংশই ভুয়া ভাউচার বা নিম্নমানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়। ফলে শিক্ষকরা আধুনিক পাঠদানে ব্যর্থ হন এবং শিক্ষার্থীরা গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির কারণে প্রকৃত শিক্ষা বাজেট শিক্ষার্থীদের উপকারে না এসে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের করুণ চিত্র

দেশের শিক্ষার ভিত্তি হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর, যা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। গ্রামের স্কুলগুলোতে জরাজীর্ণ ভবন, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাব এবং খেলার মাঠহীন পরিবেশ নিত্যচিত্র। অবকাঠামো খাতের টাকা লুটপাট হওয়ায় অনেক স্থানে শিক্ষার্থীদের খোলা আকাশের নিচে বা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করতে হয়। তবে অবকাঠামোর চেয়েও বড় সংকট শিক্ষকের মান ও মর্যাদা। বাংলাদেশে শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। একজন প্রাথমিক শিক্ষক যে বেতন পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারদরে পরিবার চালানো অসম্ভব। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসতে চায় না।

শিক্ষকদের তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্র শিক্ষাকে অবজ্ঞা করছে। শিক্ষকদের ভোটার তালিকা প্রণয়ন, টিকাদান বা জনগণনার মতো নানা সরকারি কাজে ব্যবহার করায় পাঠদান ব্যাহত হয়। আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত এখানে অত্যন্ত বেশি; অনেক স্কুলে একজন শিক্ষককে ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থীর ক্লাস নিতে হয়। বাজেটের অভাবে বিজ্ঞানাগার অকেজো থাকে এবং লাইব্রেরিতে বই থাকে না। ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভর করে বেড়ে ওঠে। এতে তাদের সৃজনশীলতা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়।

উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রুগ্ন দশা

বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা, যার মূল কাজ গবেষণা। কিন্তু বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার বরাদ্দ লজ্জাজনকভাবে কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণার জন্য বরাদ্দ থাকে মোট বাজেটের মাত্র ১ থেকে ১.৫ শতাংশের মতো, যা অনেক সময় উপাচার্যের বাসভবন সংস্কার বা বিদ্যুৎ বিলের চেয়েও কম হয়। ২০২৪ সালেও দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বরাদ্দ ছিল নামমাত্র।

শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি উচ্চশিক্ষাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নিয়োগ ও পদোন্নতি এখন মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ‘গণরুম’ সংস্কৃতি ও ছাত্র রাজনীতির অরাজকতা শিক্ষার পরিবেশ বিষিয়ে তুলেছে। আবাসন ও পুষ্টির অভাবে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। উচ্চতর গবেষণার ফেলোশিপ এতই নগণ্য যে গবেষকরা পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না। গবেষণাগারে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও লাইব্রেরিতে জার্নালের অপ্রতুলতা গবেষকদের হতাশ করে। ফলে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে ১০০০-এর মধ্যেও জায়গা পায় না। এই গবেষণাবিমুখতা আমাদের নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে বাধা দিচ্ছে এবং পরনির্ভরশীল করে রাখছে।

অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরনির্ভরশীলতা

অপ্রতুল বাজেট ও ভুল নীতিমালার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হলো জাতির অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরাধীনতা। রাষ্ট্র যখন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন অবকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও দেশ পরনির্ভরশীল থাকে। পদ্মা সেতু বা মেট্রো রেলের মতো মেগা প্রজেক্টগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য আমাদের চড়া দামে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ আমদানি করতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ইউনেস্কো ও আইএলও-এর মতে, একটি উন্নয়নশীল দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা বাঞ্ছনীয়। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এই লক্ষ্য ছোঁয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে যাদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা নেই। ফলে দেশে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে, অথচ শিল্প-কারখানাগুলোতে উচ্চপদে কাজ করার জন্য বিদেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। আমাদের মুখস্থনির্ভর শিক্ষা উদ্ভাবনী শক্তিতে আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। সফটওয়্যার বা ভারী শিল্পের জন্য আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। জাতি হিসেবে আমরা সস্তা শ্রমের জোগানদাতা হয়ে পড়ছি। আমাদের শ্রমিকরা বিদেশে অদক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করে সামান্য রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। অথচ দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করতে পারলে এই আয় কয়েকগুণ বেশি হতে পারতো।

শিক্ষা বাজেটের রাজনীতিকরণ ও বৈষম্য

বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এলাকায় অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়, যেখানে প্রয়োজন সেখানে অর্থ পৌঁছায় না। এমপিওভুক্তি নিয়ে দুর্নীতি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। রাজনৈতিক সুপারিশে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান এমপিও পেলেও যোগ্য প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হয়। বছর শেষে দেখা যায় উন্নয়ন বাজেটের (এডিপি) বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে গেছে অথবা শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে অপচয় করা হয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষার অবস্থা আরও করুণ; সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও কর্মবাজারের সাথে সিলেবাসের সংযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ। এছাড়া বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা—এই ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা সমাজে গভীর বৈষম্য তৈরি করছে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা বিদেশে চলে যাচ্ছে, আর বাকিরা দেশে থেকে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।

শিক্ষাখাতে বাজেট

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণে শিক্ষা খাতের বরাদ্দকে সাধারণত দুটি প্রধান ভাগে দেখানো হয়: ১) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ২) শিক্ষা মন্ত্রণালয় (যার অধীনে মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা থাকে)। ২০১৬ সালের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়: ‘মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ’ এবং ‘কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ’।

পুরনো সরকারগুলোর আমলে (যেমন—জিয়াউর রহমান বা এরশাদ আমল) বাজেটে মাদ্রাসা, কারিগরি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট অঙ্কের বিভাজন পাওয়া দুষ্কর, কারণ তখন সমন্বিতভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরাদ্দ দেওয়া হতো। তবে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট ডকুমেন্ট এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার (যেমন: সিপিডি, ব্যানবেইস) প্রতিবেদনের আলোকে বিভিন্ন শাসনামলের প্রতিনিধিত্বমূলক বছরগুলোর একটি তুলনামূলক সারণী নিচে উপস্থাপন করা হলো।

এখানে ‘মোট শিক্ষা বাজেট’ বলতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (উভয় বিভাগ) সম্মিলিত বরাদ্দকে বোঝানো হয়েছে।

সারণী: বিভিন্ন শাসনামলে শিক্ষা বাজেটের তুলনামূলক চিত্র (কোটি টাকা ও শতাংশে)

সারণি
সারণি

দ্রষ্টব্য: ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কলামে মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, মাদ্রাসা ও কারিগরি—সব মিলিয়ে দেখানো হয়েছে। ২০১৬-এর পর থেকে এটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

২০১৬ পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটকে ‘মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ’ এবং ‘কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ’—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উপরের সারণীতে যোগফল দেখানো হয়েছে।

খাতওয়ারি সুনির্দিষ্ট বিভাজন (সাম্প্রতিক বাজেটের আলোকে)

পুরনো আমলে মাদ্রাসা বা কারিগরির আলাদা হিসাব পাওয়া কঠিন হলেও, সাম্প্রতিক (২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫) বাজেটের আলোকে এই উপখাতগুলোর বঞ্চনার চিত্রটি নিচে দেওয়া হলো:

২০২৪-২৫ অর্থবছরের খাতওয়ারি বরাদ্দ বিশ্লেষণ:

সারণি-২
সারণি-২

উল্লেখিত সারণীতে দেখা যাচ্ছে, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ—যেখানে দেশের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী এবং কর্মমুখী শিক্ষার মূল দায়িত্ব ন্যস্ত—সেখানে পুরো শিক্ষা বাজেটের মাত্র ১২.৪৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাদ্রাসার অংশ আরও কম, কারণ এই টাকার একটি বড় অংশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর জন্য। মাদ্রাসার জন্য যে সামান্য বরাদ্দ থাকে, তা দিয়ে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ বা বিজ্ঞানাগার তৈরি অসম্ভব। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সরকারগুলো মাদ্রাসাকে 'ভোট ব্যাংক' হিসেবে ব্যবহার করলেও বাজেটে তাদের ঠকিয়েছে।

উপসংহার

গত পঞ্চান্ন বছরে বাজেটের আকার ও জিডিপি বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার সেই অনুপাতে বাড়েনি। ২ শতাংশের কম জিডিপি বরাদ্দ দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব। এই অবহেলা কেবল দুর্নীতিবাজদের পকেট ভারী করছে, কিন্তু রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিচ্ছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আগের সামরিক সরকারগুলোর সময়েও বাজেটে মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট অংকের বিভাজন পাওয়া দুরুহ ছিল; এই স্বচ্ছতার অভাব আজও ভিন্ন আঙ্গিকে বিদ্যমান।

যতদিন রাষ্ট্র শিক্ষাকে ‘খরচ’ না ভেবে ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে না দেখবে এবং বাজেটে জিডিপির অন্তত ৫-৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করবে না, ততদিন বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আমাদের প্রকৌশলী বা চিকিৎসকরা গবেষণা করবে না এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হবে না। এই শৃঙ্খল ভাঙতে হলে শিক্ষা বাজেটে আমূল পরিবর্তন এবং আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার সংস্কার অপরিহার্য। অন্যথায়, উন্নয়নের জৌলুস থাকলেও জাতি হিসেবে আমরা মেধাশূন্য ও পঙ্গু হয়েই থাকব।

  • মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত