মতামত
রাজীব নন্দী

একটি বেফাঁস মন্তব্য। তারপর কয়েকটা মিম। এরপর ইনস্টাগ্রাম পেজ। দেখতে দেখতে সেই পেজই হয়ে গেল রাজপথের আন্দোলন। আড়াই মাস বয়স হওয়ার আগেই ভারতের রাজধানী কাঁপিয়ে দিল ককরোচ জনতা পার্টি—সিজেপি। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গত ১৬ মে এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ২০ জুন থেকে টানা অবস্থান এবং ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ—হিসাব করলে রাজপথের লড়াই প্রায় ৩৬ দিনের। জয় হলো ভারতীয় গণতন্ত্রের।
২০২৬ সালের দিল্লি থেকে এবার টাইমমেশিনে চলে যাই ২০২৪ সালের ঢাকায়। সেখানেও শুরুটা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে। কিন্তু ৩৬ দিনের মাথায় আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে আটকে থাকেনি। গুলি, মৃত্যু, গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ এবং কারফিউয়ের মধ্য দিয়ে সেটি সরকারের বৈধতা নিয়েই গণবিদ্রোহে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটে।
অর্থাৎ দুই দেশেই ছিল তরুণদের ক্ষোভ, একটি অপমানজনক শব্দ, ডিজিটাল সংগঠন এবং প্রায় একই সময়ের তীব্র আন্দোলন। কিন্তু ভারতে পড়ে গেলেন একজন মন্ত্রী; বাংলাদেশে পড়ে গেল পুরো সরকার। কারণ শুধু আন্দোলনের শক্তি নয়—মূল পার্থক্য ছিল সরকার আন্দোলনটিকে কীভাবে বুঝেছে, কীভাবে ফ্রেম করেছে এবং সংকট থেকে বের হওয়ার দরজা খোলা রেখেছে কি না।
ভারতে ‘ককরোচ’, বাংলাদেশে ‘রাজাকার’—দুটি শব্দই ক্ষমতার ভাষা থেকে বের হয়ে আন্দোলনকারীদের পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। যে পরিচয় দিয়ে তরুণদের ছোট করতে চাওয়া হয়েছিল, তরুণেরা সেটিই উল্টো নিজেদের প্রতিরোধের ব্র্যান্ড বানিয়ে নেয়। এটিই রাজনৈতিক যোগাযোগের ফ্রেমিং তত্ত্ব। ক্ষমতাসীন পক্ষ একটি ঘটনার অর্থ নির্ধারণ করতে চায়; কিন্তু জনগণ পাল্টা ফ্রেম তৈরি করলে শব্দের মালিকানা বদলে যায়। তখন ‘তেলাপোকা’ আর অপমান থাকে না, হয়ে যায় টিকে থাকার প্রতীক। একইভাবে বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ শব্দটি ব্যঙ্গ, স্লোগান ও ডিজিটাল প্রতিরোধের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধেই ফিরে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল।

জেন-জি রাজনীতি এখানেই আলাদা। এই প্রজন্ম প্রেস রিলিজ দিয়ে সত্য নির্ধারণ করে না। তারা মিমস বানায়, স্ক্রিনশট রাখে, হ্যাশট্যাগ ছোড়ে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমতাসীনদের বক্তব্যের পাল্টা ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়ে ফেলে। ডিজিটাল সিস্টেম আসার আগের যুগে সরকার ছিল একমাত্র ব্রডকাস্টার; এখন তা নয়।
রাজনৈতিক যোগাযোগের এজেন্ডা সেটিং তত্ত্ব বলে, গণমাধ্যম সব সময় মানুষকে কী ভাবতে হবে তা বলে না; তবে কোন বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে, সেটি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ক্ষমতা শুধু সংবাদমাধ্যমের হাতে নেই। একটি মিম পেজও জাতীয় আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণ করতে পারে।
সিজেপি প্রথমে ছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু বেকারত্ব, পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার মতো জমে থাকা ক্ষোভের সঙ্গে নামটি কানেক্ট করে। এরপর আন্দোলনে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, নাগরিক সমাজ, বিরোধী নেতা ও পরিচিত ব্যক্তিরা যুক্ত হন। যে ইস্যুকে সরকার পরীক্ষার প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে রাখতে চেয়েছিল, আন্দোলনকারীরা সেটিকে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত করে। বাংলাদেশেও একই ঘটনা ঘটে। শুরুতে বিষয়টি ছিল সরকারি চাকরির কোটা। কিন্তু মৃত্যু ও দমনের পর এজেন্ডা বদলে যায়। আলোচনা আর ‘কত শতাংশ কোটা’ নিয়ে থাকেনি; হয়ে যায় ‘কে গুলি করার নির্দেশ দিল’, ‘কেন এত মানুষ মারা গেল’ এবং ‘এই সরকারের নৈতিক বৈধতা আছে কি না’—এই প্রশ্নগুলো নিয়ে। অর্থাৎ সরকার পলিসি এজেন্ডা হারিয়ে ফেলেছিল; আন্দোলনকারীরা মোরাল এজেন্ডা দখল করে নিয়েছিল।
ভারতের ঘটনাকে একেবারে টেক্সটবুক ডেমোক্রেসি হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ হবে। সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট সরকারি নির্দেশে ভারতে ব্লক করা হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার হয়েছে; ২০ জুলাইয়ের সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হন এবং ২৫ জুলাইও পুলিশি অভিযান চলে। অর্থাৎ ভারত সরকার শুরুতে ক্ল্যাসিক ডিফেন্সিভ পিআর ব্যবহার করেছে—সমালোচনার প্ল্যাটফর্ম সীমিত করা, আন্দোলনের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিরাপত্তার ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করা। এগুলো সংকটের সমাধান করেনি; বরং আন্দোলনকারীদের বক্তব্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে: ‘আমাদের কথা শোনা হচ্ছে না।’
কিন্তু ভারতের সরকার শেষ পর্যন্ত একটি সমাধানের পথ খোলা রেখেছিল। বিরোধী দল সংসদ ও রাজপথে সক্রিয় ছিল, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন এবং সবশেষে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে সরকার একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক মূল্য দিয়েছে।
এটি নিখুঁত সহনশীলতা নয়; বরং দেরিতে হলেও ড্যামেজ কনটেইনমেন্ট নীতি। সরকারের মেসেজ ছিল: ‘পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়, নির্দিষ্ট মন্ত্রী ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ওপর দায় সীমাবদ্ধ করা হবে।’ ফলে জনরোষকে সরকারবিরোধী সর্বাত্মক অভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ার আগে একটি বড় প্রতীকী সমঝোতা দেওয়া সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের সংকটে সরকারের বড় যোগাযোগগত ভুল ছিল আন্দোলনের মূল বক্তব্যকে স্বীকার না করে আন্দোলনকারীদের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তোলা। তাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে কখনো ‘রাজাকার’, কখনো বিরোধী দলের লোক, কখনো নাশকতাকারী বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ফ্রেম করা হয়।

পিআর-এর ভাষায় এটিকে বলা যায় ‘অভিযোগকারীকেই লক্ষ্যবস্তু বানানোর কৌশল’, পণ্ডিতি ভাষায় অ্যাটাক দ্য অ্যাকিউজার স্ট্র্যাটেজি। অর্থাৎ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের উত্তর না দিয়ে অভিযোগকারীর চরিত্র, উদ্দেশ্য বা দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এই কৌশল তখনই কাজ করে, যখন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি এবং অভিযোগকারীরা সমাজে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু আন্দোলনে যখন লাখো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়, তখন সবাইকে শত্রু বানানোর অর্থ হলো নিজের সমর্থনই হারিয়ে ফেলা। ঢাকার সরকার ভেবেছিল কঠোর ভাষা সমর্থকদের সংগঠিত করবে। বাস্তবে সেটি নিরপেক্ষ মানুষকেও আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ তরুণেরা অনুভব করে—তাদের কথা শোনা হচ্ছে না, বরং তাদের অপমান করা হচ্ছে। কমিউনিকেশন গ্যাপ তখন দ্রুত লেজিটিমেসিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৩ জুলাই এবং আবার ৪ ও ৫ আগস্ট ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। পাশাপাশি কারফিউ, সেনা মোতায়েন এবং যোগাযোগে ব্যাপক বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও ইন্টারনেট বন্ধ ও বলপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। পুরোনো রাজনৈতিক চিন্তায় ধারণা ছিল—যোগাযোগ বন্ধ করলে আন্দোলন দুর্বল হবে। কিন্তু জেন-জি যুগে ইন্টারনেট বন্ধের নিজস্ব রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। মানুষ ধরে নেয়, এমন কিছু ঘটছে যা সরকার দেখাতে চায় না। ফলে তথ্যের শূন্যস্থান পূরণ করে গুজব, পুরোনো ভিডিও, ভয় এবং সরকারের প্রতি আরও গভীর অবিশ্বাস। অর্থাৎ ইন্টারনেট বন্ধ ছিল শুধু একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি ছিল একটি ভয়াবহ পিআর সিগন্যাল। সরকারের অনিচ্ছাকৃত বার্তা দাঁড়ায়—‘আমাদের ব্যাখ্যা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য নয়, তাই দৃশ্যটাই বন্ধ করতে হচ্ছে।’
সংকটকালীন যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো—প্রতিটি বলপ্রয়োগের ঘটনার একটি যোগাযোগগত মূল্য রয়েছে। একটি গুলি শুধু একজন মানুষকে আহত করে না; তার ভিডিও লাখো মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের আন্দোলনে সহিংসতা, মৃত্যু ও দমনের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত হয়। গবেষণাতেও দেখা গেছে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ আন্দোলন দমনের বদলে নতুন এলাকায় প্রতিবাদ ও সংহতি বাড়িয়েছে। গবেষণার ভাষায়, দমন-পীড়ন একটি ‘ব্যাকফায়ার ইফেক্ট’ সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে দমনমূলক পদক্ষেপ উল্টো আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন ও অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দেয়। ভারতেও পুলিশি দমন ঘটেছে। কিন্তু সরকার শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে ন্যারেটিভ বদলানোর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশে বিপরীতে প্রতিটি নতুন মৃত্যু ও গ্রেপ্তার আগের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায় হিসেবে জমা হতে থাকে। ফলে সরকার নিজের এবং সংকটের মধ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা বলয় রাখতে পারেনি।
সিচুয়েশনাল ক্রাইসিস কমিউনিকেশন তত্ত্ব অনুযায়ী, জনগণ যখন মনে করে কোনো সংকট সরকার বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণযোগ্য ব্যর্থতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তখন তারা বেশি দায় আরোপ করে। দায় যত বেশি, শুধু আত্মপক্ষ সমর্থন দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া তত কঠিন। তখন প্রয়োজন সহমর্মিতা, দায়িত্ব স্বীকার, ক্ষতিপূরণ, তদন্ত এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ। ভারতের সরকার প্রথমে অস্বীকার কৌশল এবং লঘুকরণ কৌশল ব্যবহার করলেও শেষ পর্যন্ত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ বা কারেক্টিভ অ্যাকশন-এর দিকে যায়। মন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল সেই দৃশ্যমান অংশ। বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকার অস্বীকার কৌশল গ্রহণ করে। পরে দায় অন্যের ওপর চাপানোর কৌশল অনুসরণ করে এবং শেষ পর্যন্ত আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে জবরদস্তিমূলক কৌশল প্রয়োগ করে। এই ত্রিভুজে আটকা নিহতদের পরিবারের প্রতি বিশ্বাসযোগ্য সহমর্মিতা, স্বাধীন তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত অপসারণ কিংবা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংলাপ—কোনোটিই যথাসময়ে জনমনে দৃশ্যমান হয়নি। ফলে প্রতিটি সরকারি বক্তব্যকে মানুষ সমাধানের অংশ নয়, কভারআপের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
উইলিয়াম বেনোয়ার ইমেজ পুনরুদ্ধার তত্ত্ব অনুযায়ী, সংকটে একটি প্রতিষ্ঠান সাধারণত অস্বীকার, দায় এড়ানো, ক্ষতির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো, ভুল সংশোধন অথবা ক্ষমা চাওয়ার মতো কৌশল ব্যবহার করে। সবচেয়ে বড় ভুল হয় তখন, যখন বাস্তবে মানুষের ক্ষতি দৃশ্যমান, কিন্তু প্রতিষ্ঠান শুধু অস্বীকার করতেই থাকে। ভারতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ সরকারের সব ব্যর্থতা মুছে দেয়নি। তবে এটি জনগণকে অন্তত একটি পরিমাপযোগ্য ফলাফল দিয়েছে। তারা বলতে পেরেছে—আন্দোলনের কারণে ক্ষমতাবান একজনকে মূল্য দিতে হয়েছে।
বাংলাদেশে আন্দোলনকারীরা এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য ফলাফল পায়নি, যা দিয়ে তারা ঘরে ফিরতে পারত। একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ, পুলিশি দায় নির্ধারণ, হত্যার স্বাধীন তদন্ত কিংবা প্রধানমন্ত্রীর নিঃশর্ত ক্ষমা—কোনো কার্যকর সম্মানজনক প্রস্থান-ব্যবস্থা বা এক্সিট প্যাকেজ তৈরি হয়নি। ফলে আন্দোলনের দাবি ধাপে ধাপে বড় হয়েছে: কোটা সংস্কার থেকে বিচার, বিচার থেকে সরকারের পদত্যাগ।
রাজনীতিতে মন্ত্রীর পদত্যাগ অনেক সময় শুধু নৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সংকট সীমাবদ্ধকরণ কৌশল। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির ওপর ব্যর্থতার দায় কেন্দ্রীভূত করে বৃহত্তর সরকারকে বাঁচানো। ভারত শেষ পর্যন্ত সেই কৌশল ব্যবহার করেছে। সরকার বলেছে—ব্যবস্থা থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক দায় হিসেবে মন্ত্রী যাবেন। এতে রাষ্ট্র ও আন্দোলনের মধ্যে আলোচনার জায়গা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। বাংলাদেশে ক্ষমতার কাঠামো ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সরকারের প্রতিটি সাফল্য যখন এক ব্যক্তির অর্জন হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন ব্যর্থতাও শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তির ঘাড়েই আসে। সব ক্রেডিট কেন্দ্রের হলে ক্রাইসিসের ব্লেমগেমও কেন্দ্রেই জমা হয়। ব্যক্তিকেন্দ্রিক পিআর-এর এটিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
ভারতে বিরোধী দলের নেতা, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। বিরোধীরা সংসদে বিষয়টি তুলেছে, আন্দোলনস্থলে গেছে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য রাজপথের পাশাপাশি সংসদীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলও সক্রিয় ছিল। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বিরোধী দল, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারী রাজনৈতিক ক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে সংকট শুরু হলে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মাঝখানে বিশ্বাসযোগ্য সমন্বয়ক পাওয়া যায়নি। সরকার যা বলেছে আন্দোলনকারীরা বিশ্বাস করেনি; আন্দোলনকারীরা যা বলেছে সরকার সেটিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখেছে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য শুধু নির্বাচন নয়। গণতন্ত্রের আসল শক্তি হলো—সরকার ও জনগণের সংঘর্ষ হলে মাঝখানে কতগুলো দরজা খোলা থাকে। সংসদ, আদালত, সংবাদমাধ্যম, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং স্বাধীন তদন্ত—এই দরজাগুলো যত বেশি কার্যকর থাকে, সরকার পতন ছাড়া সংকট সমাধানের সম্ভাবনা তত বেশি।
না। ভারত সরকার সিজেপির অ্যাকাউন্ট ব্লক করেছে, পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে এবং শুরুতে আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। তাই এটিকে নিখুঁত সফলতা বলা যাবে না। তবে ভারতের সরকার শেষ মুহূর্তে হলেও বুঝেছে—প্রতিটি আন্দোলনকে রাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধ বানালে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি মন্ত্রিত্ব বিসর্জন দিয়ে তারা বৃহত্তর সরকারকে বাঁচানোর এবং ক্ষোভকে প্রাতিষ্ঠানিক সীমার মধ্যে ফেরানোর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের সরকার এই উপলব্ধিতে পৌঁছানোর আগেই সংকট পয়েন্ট অব নো রিটার্ন অতিক্রম করেছিল। তখন আর একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ যথেষ্ট ছিল না। কারণ মানুষের দাবি কোনো একটি নীতি বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না; রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট পুরো সরকারকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল।
ভারত এবং বাংলাদেশের গল্পের সবচেয়ে বড় পার্থক্য আন্দোলনকারীদের সাহসে নয়। দুই দেশের তরুণেরাই রাস্তায় নেমেছে, পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে রাজনৈতিক ময়দানে পরিণত করেছে। কিন্তু পার্থক্য তৈরি করেছে সরকারের শেষ সিদ্ধান্ত। ভারত একজন মন্ত্রীকে সরিয়ে সংকটের জন্য রাজনৈতিক এক্সিট রুট তৈরি করেছে। বাংলাদেশ আন্দোলনকে দাবি হিসেবে না দেখে অস্তিত্বের যুদ্ধ হিসেবে নিয়েছিল। ফলে প্রতিটি বক্তব্য, গুলি, গ্রেপ্তার ও ইন্টারনেট বন্ধ সরকার এবং জনগণের মধ্যকার শেষ সেতুগুলোও ভেঙে দেয়। পিআর-এর ভাষায় শিক্ষা খুব সোজা: মানুষের ক্ষোভকে অপমান করলে সেটি ট্রেন্ড হয়। ট্রেন্ডকে দমন করলে সেটি মুভমেন্ট হয়। মুভমেন্টকে শত্রু বানালে সেটি সরকার পরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়। তাই ৩৬ দিনে ভারতে একজন মন্ত্রী গেলেন এবং সরকার টিকে গেল। বাংলাদেশে ৩৬ দিনে সরকারই চলে গেল। কারণ গণতন্ত্র মানে সরকার কখনো চাপের মুখে পড়বে না—এটি নয়। গণতন্ত্র মানে হলো, পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ার আগেই সরকার জনগণের কথায় সাড়া দিতে জানে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বিলাসী’ গল্পে লিখেছিলেন—‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’ মজার ব্যাপার হলো, একটা শব্দও কখনো কখনো পুরো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ উল্টে দিতে পারে। বাংলাদেশে ‘রাজাকার’, ভারতে ‘তেলাপোকা’—দুটোই দেখিয়ে দিল, ভাষা শুধু ভাষা না; এটা পলিটিক্যাল ট্রিগারও। আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) একসময় ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল। কিন্তু ক্ষমতার দীর্ঘ যাত্রায় দলটি ধীরে ধীরে একদলীয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পরিবারতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী কাঠামোয় রূপ নিতে নিতে নিজের গণতান্ত্রিক ও মানবিক বৈশিষ্ট্য হারায়। একটি পুরোনো ও বিশাল দল শেষ পর্যন্ত নিজের ওজনেই অচল হয়ে পড়তে পারে। আবার একটি মিম পেজ মানুষের ক্ষোভের ভাষা ধরতে পারলে কয়েক সপ্তাহেই রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। কারণ ডিজিটাল যুগে প্রতিষ্ঠানের বয়স নয়, বরং নতুন প্রজন্মের সাথে নিজেকে নবায়ন করাই আসল ক্যাপিটাল।
অন্যদিকে ভারতে বিজেপিকে সমালোচনার যথেষ্ট কারণ থাকলেও, রাজনৈতিক সিস্টেমটা এখনো এমন যে বিরোধী দল, আদালত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সবাই মিলে ক্ষমতাসীনদের চাপে রাখে। বিজেপির ছাত্রসংগঠন এই আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশের ছাত্রলীগের মতো দেশজুড়ে পেটোয়া শক্তিতে পরিণত হয়নি; সাম্প্রতিক আন্দোলনেও ভারতের মতো একটি বিশাল দেশে সার্বিক ইন্টারনেট শাটডাউন বা দেশব্যাপী কারফিউয়ের প্রয়োজন হয়নি। এটা বিজেপির প্রশংসা না; এটা দুই দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্থক্যের কথা।
আরেকটা বিষয়—ভারতে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী কিন্তু বিলেতে নির্বাসনে ছিলেন না, যন্তর মন্তরে কোনো গুপ্ত বাহিনী ছিল না। আর হ্যাঁ, ভারতীয় সেনাবাহিনীর নজির নেই সংকটকালে ক্ষমতার দরজায় টোকা মারা বা রাজনৈতিক দল বিভক্ত থাকা। তাই একই ৩৬ দিনে বাংলাদেশে সরকার বদলে যায়, আর ভারতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সরকারকে পিছু হটতে হয়।
কথায় আছে—কেউ দেখে শেখে, কেউ ঠেকে শেখে। কে জানে, হয়তো বাংলাদেশের পরিণতিই দিল্লিকে একটু বেশি সতর্ক করে দিয়েছিল! আমাদের গ্রামে একটা কথা আছে—এক বন্ধু চুন খেয়ে মুখ পোড়ালে, আরেক বন্ধু দইও ফুঁ দিয়ে খায়। রাজনীতিও বোধহয় ঠিক তেমনই। পাশের বাড়ির ভুল যদি চোখের সামনে থাকে, তাহলে নিজের চালটা একটু হিসাব করে দেওয়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ। শেষ পর্যন্ত, রাজনীতিতে শুধু নিজের ইতিহাস থেকে নয়, প্রতিবেশীর ইতিহাস থেকেও শেখার নামই হয়তো পরিপক্বতা।

একটি বেফাঁস মন্তব্য। তারপর কয়েকটা মিম। এরপর ইনস্টাগ্রাম পেজ। দেখতে দেখতে সেই পেজই হয়ে গেল রাজপথের আন্দোলন। আড়াই মাস বয়স হওয়ার আগেই ভারতের রাজধানী কাঁপিয়ে দিল ককরোচ জনতা পার্টি—সিজেপি। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গত ১৬ মে এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ২০ জুন থেকে টানা অবস্থান এবং ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ—হিসাব করলে রাজপথের লড়াই প্রায় ৩৬ দিনের। জয় হলো ভারতীয় গণতন্ত্রের।
২০২৬ সালের দিল্লি থেকে এবার টাইমমেশিনে চলে যাই ২০২৪ সালের ঢাকায়। সেখানেও শুরুটা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে। কিন্তু ৩৬ দিনের মাথায় আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে আটকে থাকেনি। গুলি, মৃত্যু, গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ এবং কারফিউয়ের মধ্য দিয়ে সেটি সরকারের বৈধতা নিয়েই গণবিদ্রোহে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটে।
অর্থাৎ দুই দেশেই ছিল তরুণদের ক্ষোভ, একটি অপমানজনক শব্দ, ডিজিটাল সংগঠন এবং প্রায় একই সময়ের তীব্র আন্দোলন। কিন্তু ভারতে পড়ে গেলেন একজন মন্ত্রী; বাংলাদেশে পড়ে গেল পুরো সরকার। কারণ শুধু আন্দোলনের শক্তি নয়—মূল পার্থক্য ছিল সরকার আন্দোলনটিকে কীভাবে বুঝেছে, কীভাবে ফ্রেম করেছে এবং সংকট থেকে বের হওয়ার দরজা খোলা রেখেছে কি না।
ভারতে ‘ককরোচ’, বাংলাদেশে ‘রাজাকার’—দুটি শব্দই ক্ষমতার ভাষা থেকে বের হয়ে আন্দোলনকারীদের পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। যে পরিচয় দিয়ে তরুণদের ছোট করতে চাওয়া হয়েছিল, তরুণেরা সেটিই উল্টো নিজেদের প্রতিরোধের ব্র্যান্ড বানিয়ে নেয়। এটিই রাজনৈতিক যোগাযোগের ফ্রেমিং তত্ত্ব। ক্ষমতাসীন পক্ষ একটি ঘটনার অর্থ নির্ধারণ করতে চায়; কিন্তু জনগণ পাল্টা ফ্রেম তৈরি করলে শব্দের মালিকানা বদলে যায়। তখন ‘তেলাপোকা’ আর অপমান থাকে না, হয়ে যায় টিকে থাকার প্রতীক। একইভাবে বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ শব্দটি ব্যঙ্গ, স্লোগান ও ডিজিটাল প্রতিরোধের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধেই ফিরে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল।

জেন-জি রাজনীতি এখানেই আলাদা। এই প্রজন্ম প্রেস রিলিজ দিয়ে সত্য নির্ধারণ করে না। তারা মিমস বানায়, স্ক্রিনশট রাখে, হ্যাশট্যাগ ছোড়ে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমতাসীনদের বক্তব্যের পাল্টা ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়ে ফেলে। ডিজিটাল সিস্টেম আসার আগের যুগে সরকার ছিল একমাত্র ব্রডকাস্টার; এখন তা নয়।
রাজনৈতিক যোগাযোগের এজেন্ডা সেটিং তত্ত্ব বলে, গণমাধ্যম সব সময় মানুষকে কী ভাবতে হবে তা বলে না; তবে কোন বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে, সেটি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ক্ষমতা শুধু সংবাদমাধ্যমের হাতে নেই। একটি মিম পেজও জাতীয় আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণ করতে পারে।
সিজেপি প্রথমে ছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু বেকারত্ব, পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার মতো জমে থাকা ক্ষোভের সঙ্গে নামটি কানেক্ট করে। এরপর আন্দোলনে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, নাগরিক সমাজ, বিরোধী নেতা ও পরিচিত ব্যক্তিরা যুক্ত হন। যে ইস্যুকে সরকার পরীক্ষার প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে রাখতে চেয়েছিল, আন্দোলনকারীরা সেটিকে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত করে। বাংলাদেশেও একই ঘটনা ঘটে। শুরুতে বিষয়টি ছিল সরকারি চাকরির কোটা। কিন্তু মৃত্যু ও দমনের পর এজেন্ডা বদলে যায়। আলোচনা আর ‘কত শতাংশ কোটা’ নিয়ে থাকেনি; হয়ে যায় ‘কে গুলি করার নির্দেশ দিল’, ‘কেন এত মানুষ মারা গেল’ এবং ‘এই সরকারের নৈতিক বৈধতা আছে কি না’—এই প্রশ্নগুলো নিয়ে। অর্থাৎ সরকার পলিসি এজেন্ডা হারিয়ে ফেলেছিল; আন্দোলনকারীরা মোরাল এজেন্ডা দখল করে নিয়েছিল।
ভারতের ঘটনাকে একেবারে টেক্সটবুক ডেমোক্রেসি হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ হবে। সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট সরকারি নির্দেশে ভারতে ব্লক করা হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার হয়েছে; ২০ জুলাইয়ের সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হন এবং ২৫ জুলাইও পুলিশি অভিযান চলে। অর্থাৎ ভারত সরকার শুরুতে ক্ল্যাসিক ডিফেন্সিভ পিআর ব্যবহার করেছে—সমালোচনার প্ল্যাটফর্ম সীমিত করা, আন্দোলনের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিরাপত্তার ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করা। এগুলো সংকটের সমাধান করেনি; বরং আন্দোলনকারীদের বক্তব্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে: ‘আমাদের কথা শোনা হচ্ছে না।’
কিন্তু ভারতের সরকার শেষ পর্যন্ত একটি সমাধানের পথ খোলা রেখেছিল। বিরোধী দল সংসদ ও রাজপথে সক্রিয় ছিল, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন এবং সবশেষে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে সরকার একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক মূল্য দিয়েছে।
এটি নিখুঁত সহনশীলতা নয়; বরং দেরিতে হলেও ড্যামেজ কনটেইনমেন্ট নীতি। সরকারের মেসেজ ছিল: ‘পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়, নির্দিষ্ট মন্ত্রী ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ওপর দায় সীমাবদ্ধ করা হবে।’ ফলে জনরোষকে সরকারবিরোধী সর্বাত্মক অভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ার আগে একটি বড় প্রতীকী সমঝোতা দেওয়া সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের সংকটে সরকারের বড় যোগাযোগগত ভুল ছিল আন্দোলনের মূল বক্তব্যকে স্বীকার না করে আন্দোলনকারীদের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তোলা। তাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে কখনো ‘রাজাকার’, কখনো বিরোধী দলের লোক, কখনো নাশকতাকারী বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ফ্রেম করা হয়।

পিআর-এর ভাষায় এটিকে বলা যায় ‘অভিযোগকারীকেই লক্ষ্যবস্তু বানানোর কৌশল’, পণ্ডিতি ভাষায় অ্যাটাক দ্য অ্যাকিউজার স্ট্র্যাটেজি। অর্থাৎ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের উত্তর না দিয়ে অভিযোগকারীর চরিত্র, উদ্দেশ্য বা দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এই কৌশল তখনই কাজ করে, যখন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি এবং অভিযোগকারীরা সমাজে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু আন্দোলনে যখন লাখো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়, তখন সবাইকে শত্রু বানানোর অর্থ হলো নিজের সমর্থনই হারিয়ে ফেলা। ঢাকার সরকার ভেবেছিল কঠোর ভাষা সমর্থকদের সংগঠিত করবে। বাস্তবে সেটি নিরপেক্ষ মানুষকেও আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ তরুণেরা অনুভব করে—তাদের কথা শোনা হচ্ছে না, বরং তাদের অপমান করা হচ্ছে। কমিউনিকেশন গ্যাপ তখন দ্রুত লেজিটিমেসিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৩ জুলাই এবং আবার ৪ ও ৫ আগস্ট ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। পাশাপাশি কারফিউ, সেনা মোতায়েন এবং যোগাযোগে ব্যাপক বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও ইন্টারনেট বন্ধ ও বলপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। পুরোনো রাজনৈতিক চিন্তায় ধারণা ছিল—যোগাযোগ বন্ধ করলে আন্দোলন দুর্বল হবে। কিন্তু জেন-জি যুগে ইন্টারনেট বন্ধের নিজস্ব রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। মানুষ ধরে নেয়, এমন কিছু ঘটছে যা সরকার দেখাতে চায় না। ফলে তথ্যের শূন্যস্থান পূরণ করে গুজব, পুরোনো ভিডিও, ভয় এবং সরকারের প্রতি আরও গভীর অবিশ্বাস। অর্থাৎ ইন্টারনেট বন্ধ ছিল শুধু একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি ছিল একটি ভয়াবহ পিআর সিগন্যাল। সরকারের অনিচ্ছাকৃত বার্তা দাঁড়ায়—‘আমাদের ব্যাখ্যা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য নয়, তাই দৃশ্যটাই বন্ধ করতে হচ্ছে।’
সংকটকালীন যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো—প্রতিটি বলপ্রয়োগের ঘটনার একটি যোগাযোগগত মূল্য রয়েছে। একটি গুলি শুধু একজন মানুষকে আহত করে না; তার ভিডিও লাখো মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের আন্দোলনে সহিংসতা, মৃত্যু ও দমনের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত হয়। গবেষণাতেও দেখা গেছে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ আন্দোলন দমনের বদলে নতুন এলাকায় প্রতিবাদ ও সংহতি বাড়িয়েছে। গবেষণার ভাষায়, দমন-পীড়ন একটি ‘ব্যাকফায়ার ইফেক্ট’ সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে দমনমূলক পদক্ষেপ উল্টো আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন ও অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দেয়। ভারতেও পুলিশি দমন ঘটেছে। কিন্তু সরকার শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে ন্যারেটিভ বদলানোর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশে বিপরীতে প্রতিটি নতুন মৃত্যু ও গ্রেপ্তার আগের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায় হিসেবে জমা হতে থাকে। ফলে সরকার নিজের এবং সংকটের মধ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা বলয় রাখতে পারেনি।
সিচুয়েশনাল ক্রাইসিস কমিউনিকেশন তত্ত্ব অনুযায়ী, জনগণ যখন মনে করে কোনো সংকট সরকার বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণযোগ্য ব্যর্থতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তখন তারা বেশি দায় আরোপ করে। দায় যত বেশি, শুধু আত্মপক্ষ সমর্থন দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া তত কঠিন। তখন প্রয়োজন সহমর্মিতা, দায়িত্ব স্বীকার, ক্ষতিপূরণ, তদন্ত এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ। ভারতের সরকার প্রথমে অস্বীকার কৌশল এবং লঘুকরণ কৌশল ব্যবহার করলেও শেষ পর্যন্ত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ বা কারেক্টিভ অ্যাকশন-এর দিকে যায়। মন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল সেই দৃশ্যমান অংশ। বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকার অস্বীকার কৌশল গ্রহণ করে। পরে দায় অন্যের ওপর চাপানোর কৌশল অনুসরণ করে এবং শেষ পর্যন্ত আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে জবরদস্তিমূলক কৌশল প্রয়োগ করে। এই ত্রিভুজে আটকা নিহতদের পরিবারের প্রতি বিশ্বাসযোগ্য সহমর্মিতা, স্বাধীন তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত অপসারণ কিংবা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংলাপ—কোনোটিই যথাসময়ে জনমনে দৃশ্যমান হয়নি। ফলে প্রতিটি সরকারি বক্তব্যকে মানুষ সমাধানের অংশ নয়, কভারআপের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
উইলিয়াম বেনোয়ার ইমেজ পুনরুদ্ধার তত্ত্ব অনুযায়ী, সংকটে একটি প্রতিষ্ঠান সাধারণত অস্বীকার, দায় এড়ানো, ক্ষতির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো, ভুল সংশোধন অথবা ক্ষমা চাওয়ার মতো কৌশল ব্যবহার করে। সবচেয়ে বড় ভুল হয় তখন, যখন বাস্তবে মানুষের ক্ষতি দৃশ্যমান, কিন্তু প্রতিষ্ঠান শুধু অস্বীকার করতেই থাকে। ভারতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ সরকারের সব ব্যর্থতা মুছে দেয়নি। তবে এটি জনগণকে অন্তত একটি পরিমাপযোগ্য ফলাফল দিয়েছে। তারা বলতে পেরেছে—আন্দোলনের কারণে ক্ষমতাবান একজনকে মূল্য দিতে হয়েছে।
বাংলাদেশে আন্দোলনকারীরা এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য ফলাফল পায়নি, যা দিয়ে তারা ঘরে ফিরতে পারত। একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ, পুলিশি দায় নির্ধারণ, হত্যার স্বাধীন তদন্ত কিংবা প্রধানমন্ত্রীর নিঃশর্ত ক্ষমা—কোনো কার্যকর সম্মানজনক প্রস্থান-ব্যবস্থা বা এক্সিট প্যাকেজ তৈরি হয়নি। ফলে আন্দোলনের দাবি ধাপে ধাপে বড় হয়েছে: কোটা সংস্কার থেকে বিচার, বিচার থেকে সরকারের পদত্যাগ।
রাজনীতিতে মন্ত্রীর পদত্যাগ অনেক সময় শুধু নৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সংকট সীমাবদ্ধকরণ কৌশল। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির ওপর ব্যর্থতার দায় কেন্দ্রীভূত করে বৃহত্তর সরকারকে বাঁচানো। ভারত শেষ পর্যন্ত সেই কৌশল ব্যবহার করেছে। সরকার বলেছে—ব্যবস্থা থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক দায় হিসেবে মন্ত্রী যাবেন। এতে রাষ্ট্র ও আন্দোলনের মধ্যে আলোচনার জায়গা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। বাংলাদেশে ক্ষমতার কাঠামো ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সরকারের প্রতিটি সাফল্য যখন এক ব্যক্তির অর্জন হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন ব্যর্থতাও শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তির ঘাড়েই আসে। সব ক্রেডিট কেন্দ্রের হলে ক্রাইসিসের ব্লেমগেমও কেন্দ্রেই জমা হয়। ব্যক্তিকেন্দ্রিক পিআর-এর এটিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
ভারতে বিরোধী দলের নেতা, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। বিরোধীরা সংসদে বিষয়টি তুলেছে, আন্দোলনস্থলে গেছে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য রাজপথের পাশাপাশি সংসদীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলও সক্রিয় ছিল। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বিরোধী দল, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারী রাজনৈতিক ক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে সংকট শুরু হলে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মাঝখানে বিশ্বাসযোগ্য সমন্বয়ক পাওয়া যায়নি। সরকার যা বলেছে আন্দোলনকারীরা বিশ্বাস করেনি; আন্দোলনকারীরা যা বলেছে সরকার সেটিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখেছে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য শুধু নির্বাচন নয়। গণতন্ত্রের আসল শক্তি হলো—সরকার ও জনগণের সংঘর্ষ হলে মাঝখানে কতগুলো দরজা খোলা থাকে। সংসদ, আদালত, সংবাদমাধ্যম, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং স্বাধীন তদন্ত—এই দরজাগুলো যত বেশি কার্যকর থাকে, সরকার পতন ছাড়া সংকট সমাধানের সম্ভাবনা তত বেশি।
না। ভারত সরকার সিজেপির অ্যাকাউন্ট ব্লক করেছে, পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে এবং শুরুতে আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। তাই এটিকে নিখুঁত সফলতা বলা যাবে না। তবে ভারতের সরকার শেষ মুহূর্তে হলেও বুঝেছে—প্রতিটি আন্দোলনকে রাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধ বানালে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি মন্ত্রিত্ব বিসর্জন দিয়ে তারা বৃহত্তর সরকারকে বাঁচানোর এবং ক্ষোভকে প্রাতিষ্ঠানিক সীমার মধ্যে ফেরানোর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের সরকার এই উপলব্ধিতে পৌঁছানোর আগেই সংকট পয়েন্ট অব নো রিটার্ন অতিক্রম করেছিল। তখন আর একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ যথেষ্ট ছিল না। কারণ মানুষের দাবি কোনো একটি নীতি বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না; রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট পুরো সরকারকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল।
ভারত এবং বাংলাদেশের গল্পের সবচেয়ে বড় পার্থক্য আন্দোলনকারীদের সাহসে নয়। দুই দেশের তরুণেরাই রাস্তায় নেমেছে, পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে রাজনৈতিক ময়দানে পরিণত করেছে। কিন্তু পার্থক্য তৈরি করেছে সরকারের শেষ সিদ্ধান্ত। ভারত একজন মন্ত্রীকে সরিয়ে সংকটের জন্য রাজনৈতিক এক্সিট রুট তৈরি করেছে। বাংলাদেশ আন্দোলনকে দাবি হিসেবে না দেখে অস্তিত্বের যুদ্ধ হিসেবে নিয়েছিল। ফলে প্রতিটি বক্তব্য, গুলি, গ্রেপ্তার ও ইন্টারনেট বন্ধ সরকার এবং জনগণের মধ্যকার শেষ সেতুগুলোও ভেঙে দেয়। পিআর-এর ভাষায় শিক্ষা খুব সোজা: মানুষের ক্ষোভকে অপমান করলে সেটি ট্রেন্ড হয়। ট্রেন্ডকে দমন করলে সেটি মুভমেন্ট হয়। মুভমেন্টকে শত্রু বানালে সেটি সরকার পরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়। তাই ৩৬ দিনে ভারতে একজন মন্ত্রী গেলেন এবং সরকার টিকে গেল। বাংলাদেশে ৩৬ দিনে সরকারই চলে গেল। কারণ গণতন্ত্র মানে সরকার কখনো চাপের মুখে পড়বে না—এটি নয়। গণতন্ত্র মানে হলো, পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ার আগেই সরকার জনগণের কথায় সাড়া দিতে জানে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বিলাসী’ গল্পে লিখেছিলেন—‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’ মজার ব্যাপার হলো, একটা শব্দও কখনো কখনো পুরো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ উল্টে দিতে পারে। বাংলাদেশে ‘রাজাকার’, ভারতে ‘তেলাপোকা’—দুটোই দেখিয়ে দিল, ভাষা শুধু ভাষা না; এটা পলিটিক্যাল ট্রিগারও। আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) একসময় ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল। কিন্তু ক্ষমতার দীর্ঘ যাত্রায় দলটি ধীরে ধীরে একদলীয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পরিবারতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী কাঠামোয় রূপ নিতে নিতে নিজের গণতান্ত্রিক ও মানবিক বৈশিষ্ট্য হারায়। একটি পুরোনো ও বিশাল দল শেষ পর্যন্ত নিজের ওজনেই অচল হয়ে পড়তে পারে। আবার একটি মিম পেজ মানুষের ক্ষোভের ভাষা ধরতে পারলে কয়েক সপ্তাহেই রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। কারণ ডিজিটাল যুগে প্রতিষ্ঠানের বয়স নয়, বরং নতুন প্রজন্মের সাথে নিজেকে নবায়ন করাই আসল ক্যাপিটাল।
অন্যদিকে ভারতে বিজেপিকে সমালোচনার যথেষ্ট কারণ থাকলেও, রাজনৈতিক সিস্টেমটা এখনো এমন যে বিরোধী দল, আদালত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সবাই মিলে ক্ষমতাসীনদের চাপে রাখে। বিজেপির ছাত্রসংগঠন এই আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশের ছাত্রলীগের মতো দেশজুড়ে পেটোয়া শক্তিতে পরিণত হয়নি; সাম্প্রতিক আন্দোলনেও ভারতের মতো একটি বিশাল দেশে সার্বিক ইন্টারনেট শাটডাউন বা দেশব্যাপী কারফিউয়ের প্রয়োজন হয়নি। এটা বিজেপির প্রশংসা না; এটা দুই দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্থক্যের কথা।
আরেকটা বিষয়—ভারতে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী কিন্তু বিলেতে নির্বাসনে ছিলেন না, যন্তর মন্তরে কোনো গুপ্ত বাহিনী ছিল না। আর হ্যাঁ, ভারতীয় সেনাবাহিনীর নজির নেই সংকটকালে ক্ষমতার দরজায় টোকা মারা বা রাজনৈতিক দল বিভক্ত থাকা। তাই একই ৩৬ দিনে বাংলাদেশে সরকার বদলে যায়, আর ভারতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সরকারকে পিছু হটতে হয়।
কথায় আছে—কেউ দেখে শেখে, কেউ ঠেকে শেখে। কে জানে, হয়তো বাংলাদেশের পরিণতিই দিল্লিকে একটু বেশি সতর্ক করে দিয়েছিল! আমাদের গ্রামে একটা কথা আছে—এক বন্ধু চুন খেয়ে মুখ পোড়ালে, আরেক বন্ধু দইও ফুঁ দিয়ে খায়। রাজনীতিও বোধহয় ঠিক তেমনই। পাশের বাড়ির ভুল যদি চোখের সামনে থাকে, তাহলে নিজের চালটা একটু হিসাব করে দেওয়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ। শেষ পর্যন্ত, রাজনীতিতে শুধু নিজের ইতিহাস থেকে নয়, প্রতিবেশীর ইতিহাস থেকেও শেখার নামই হয়তো পরিপক্বতা।
.png)

একটি টার্মিনাল বিকল হলেই কেন গোটা দেশকে এমন পঙ্গু দশায় পড়তে হবে? এর পেছনে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ভঙ্গুর চিত্রটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৩ ঘণ্টা আগে
রাজধানীসহ সারা দেশে সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি নিছক সাময়িক কারিগরি বিভ্রাটের প্রতিফলন নয়। এটি জ্বালানি খাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
৪ ঘণ্টা আগে
ভারতের গণমাধ্যমের জন্য এটি অস্বস্তিকর সময়। আরও স্পষ্ট করে বললে, এটি আত্মসমালোচনার সময়। অনেক বছর ধরে যে সংকট জমে উঠছিল, তার বিস্ফোরণ ঘটেছে রাস্তায়। আর সেই বিস্ফোরণের নাম ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’। নামটি অদ্ভুত। কিন্তু এর ভেতরের বার্তা অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়।
৫ ঘণ্টা আগে
ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়ার সব ধাপ একে একে বলে দিলাম তাকে। কথা শুনে তরুণটি হতাশ হয়ে বললেন, লাইসেন্স পাওয়া তো খুব কঠিন মনে হচ্ছে, সময়ও লাগবে অনেক, টাকাও লাগবে অনেক। ভাই, অন্য কোন শর্টকাট উপায় কী আছে?
৮ ঘণ্টা আগে