ইতিহাসের একটি বহুল উদ্ধৃত সত্য আছে— শাসকরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন না। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হলো। জুলাই সনদ হলো। সেই সনদের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট হলো। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ বললেন। অর্থাৎ জনগণ সরাসরি মত দিল। কিন্তু এখন সেই গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশ কার্যত বাতিলের পথে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘জনস্বার্থে’ নির্বাহী আদেশে বরখাস্ত করার বিধান রেখে দেওয়া হচ্ছে। দুটি বিষয় একই সুতোয় গাঁথা। একদিকে জনগণের সরাসরি মতকে দুর্বল করা। অন্যদিকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনমত। গণভোট সেই মতের সবচেয়ে সরাসরি প্রকাশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জাঁ-জাক রুশো বলেছিলেন, ‘জনগণের সাধারণ ইচ্ছাই সার্বভৌম।’ জনগণ যখন সরাসরি ভোট দেয়, তখন সেই রায়কে অগ্রাহ্য করা মানে সার্বভৌমত্বের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। জুলাই সনদের পক্ষে বিপুল সমর্থন ছিল। কিন্তু এখন সেই গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। সংসদের বিশেষ কমিটি এগুলো বর্তমান অধিবেশনে উত্থাপন না করার সুপারিশ করেছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদে উত্থাপন না হলে ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যায়। এখন প্রক্রিয়াগতভাবে বাতিল হলেও রাজনৈতিকভাবে এটি বড় বার্তা বহন করছে। জনগণের সরাসরি মতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অনীহা স্পষ্ট।
এখানেই দ্বিতীয় প্রশ্ন সামনে আসে। যেসব অধ্যাদেশ জনগণের অধিকার, সরকারের জবাবদিহি ও সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত– যেমন গণভোট, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন, দুদক– এগুলো কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কিন্তু যেসব অধ্যাদেশ নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ায়, সেগুলো রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ বরখাস্ত করার সুযোগ বহাল থাকছে। এতে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ উঠছে। সংস্কার নয়; নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে– এই ধারণা জোরালো হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার গণতন্ত্রের ভিত্তি। রবার্ট ডাল গণতন্ত্রের শর্ত হিসেবে অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার কথা বলেছেন। স্থানীয় সরকার এই দুই শর্তের বাস্তব ক্ষেত্র। মানুষ ভোট দেয়। প্রতিনিধিকে চেনে। জবাবদিহি চায়। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নির্বাহী আদেশে অপসারণের সুযোগ রাখলে সেই ভিত্তি দুর্বল হয়। ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘জনস্বার্থ’– এই শব্দগুলোর কোনো সংজ্ঞা নেই। ফলে ব্যাখ্যার ক্ষমতা পুরোপুরি সরকারের হাতে। আইনের অন্যান্য ধারার ওপর প্রাধান্য দিয়ে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। তদন্ত ছাড়াই অপসারণ সম্ভব। অভিযোগ ছাড়াই অপসারণ সম্ভব। বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই অপসারণ সম্ভব। এটি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করে এই ক্ষমতা তৈরি করা হয়েছিল। তখন যুক্তি ছিল– বিশেষ পরিস্থিতি। কিন্তু সেই অস্থায়ী ব্যবস্থা স্থায়ী আইনে পরিণত হচ্ছে। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট একদিনে ১ হাজার ৮৭৬ জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করা হয়েছিল। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা– সব স্তরে। এরপর প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ নির্বাচিত প্রতিনিধির জায়গায় আমলা বা রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি দায়িত্ব নেন। কিন্তু সেটি ছিল বিশেষ পরিস্থিতি। জুলাই বিপ্লবের পর শাসকগোষ্ঠীর প্রায় সবাই পালিয়ে গিয়েছিল। বিনা ভোটে নির্বাচিত কথিত জনপ্রতিনিধিদেরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যার ফলে অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এখন তো নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এখন কেন আগের মতোই হবে? দুঃখজনক হলো, এই প্রবণতা এখনো অব্যাহত। ইতোমধ্যে অনেক জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্টের একটি পর্যবেক্ষণ প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতা যখন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়। স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটছে। নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে প্রশাসক। জনগণের কাছে জবাবদিহির বদলে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ। এতে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি ক্ষয় হয়।
সরকার বলছে, বরখাস্ত হলে আদালতে যাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আদালতে যাওয়া সময়সাপেক্ষ। ব্যয়সাপেক্ষ। রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর। এর মধ্যেই প্রশাসক কাজ চালিয়ে যাবেন। অর্থাৎ বাস্তবে নির্বাহী সিদ্ধান্তই কার্যকর থাকবে।
আইনে আগে কী ছিল, সেটি মনে রাখা জরুরি। অপসারণের স্পষ্ট শর্ত ছিল। টানা তিন সভায় অনুপস্থিতি। নৈতিক স্খলন। আদালতের দণ্ড। ক্ষমতার অপব্যবহার। তদন্ত ও প্রক্রিয়া ছিল। অনাস্থা প্রস্তাবের সুযোগ ছিল। অর্থাৎ অপসারণ ছিল প্রক্রিয়াভিত্তিক। এখন সেটি নির্বাহী সিদ্ধান্তনির্ভর। এই পরিবর্তন গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম একটি দৈনিককে বলেছেন, কোনো সরকারই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী হতে দেয়নি। বরং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চেয়েছে। এই বক্তব্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর সাতটি কমিশন স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। বিকেন্দ্রীকরণের বদলে কেন্দ্রীকরণ।
বিএনপির নিজস্ব ঘোষণাপত্রেও ভিন্ন প্রতিশ্রুতি ছিল। তার ৩১ দফায় বলা হয়েছিল, স্থানীয় সরকার স্বশাসিত হবে। নির্বাহী আদেশে বরখাস্ত করা হবে না। আদালতের রায় ছাড়া অপসারণ নয়। এখন সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি নিজেই এখন নিজের কথা রাখছে না। এটি রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তৈরি করছে।
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেয়। কারণ দর্শানোর সুযোগ ছাড়া অপসারণ সেই অধিকারের পরিপন্থী। আইনজীবীরা বলছেন, এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ গণতান্ত্রিক শাসনের নীতির সঙ্গে খাপ খায় না।
এখানে গণভোট প্রশ্নটি আবার সামনে আসে। একদিকে জনগণ সরাসরি মত দেয়। অন্যদিকে সেই মতের ভিত্তিতে করা আইন বাতিলের পথে। আবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নির্বাহী আদেশে অপসারণের সুযোগ রাখা হয়। এই দুই সিদ্ধান্ত মিলিয়ে একটি প্রবণতা স্পষ্ট– জনগণের ভূমিকা সীমিত করা। নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানো। গণতন্ত্রের মূল দর্শনের সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক।
রুশো জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলেছেন। ডাল অংশগ্রহণের কথা বলেছেন। আরেন্ট ক্ষমতার উৎস হিসেবে জনগণের সম্মতির কথা বলেছেন। এই তিনটি ধারণাই স্থানীয় সরকার ও গণভোটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জনগণের মত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে না। বরং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে।
স্থানীয় সরকার শুধু প্রশাসনিক ইউনিট নয়। এটি রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র। এখানেই নেতৃত্ব তৈরি হয়। এখানেই জবাবদিহি শেখা হয়। এখানেই নাগরিক অংশগ্রহণ গড়ে ওঠে। এই স্তর দুর্বল হলে পুরো গণতন্ত্র দুর্বল হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিকে অপসারণের ভয় থাকলে তারা তো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহস কমবে। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমলানির্ভরতা। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে প্রশাসক বসালে সিদ্ধান্ত চলে যায় আমলাতন্ত্রের হাতে। এতে স্থানীয় সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হয়। জবাবদিহি কমে। নাগরিক অংশগ্রহণ কমে। উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয় না। এটি দীর্ঘমেয়াদে সুশাসনের জন্য ক্ষতিকর।
গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। গণভোট একটি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় সরকার আরেকটি। মানবাধিকার কমিশন, দুদক– এগুলোও প্রতিষ্ঠান। যখন এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, তখন ব্যক্তিনির্ভর শাসন জোরদার হয়। ব্যক্তিনির্ভর শাসন টেকসই নয়। ইতিহাসে এর অনেক উদাহরণ আছে।
সরকার বলছে, বরখাস্ত হলে আদালতে যাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আদালতে যাওয়া সময়সাপেক্ষ। ব্যয়সাপেক্ষ। রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর। এর মধ্যেই প্রশাসক কাজ চালিয়ে যাবেন। অর্থাৎ বাস্তবে নির্বাহী সিদ্ধান্তই কার্যকর থাকবে। এটি কার্যত ‘পরে বিচার’ নীতি। গণতান্ত্রিক শাসনে ‘আগে প্রক্রিয়া’ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথা অনেক বলা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই ধারারই পুনরাবৃত্তি। ইতিহাসের শিক্ষা এখানেই। একই ভুল বারবার করা হচ্ছে।
সমাধান কী? প্রথমত, গণভোটের রায়কে সম্মান করতে হবে। জনগণের সরাসরি মতকে আইনি কাঠামোয় রূপ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকারে নির্বাহী বরখাস্তের বিধান বাতিল করতে হবে। প্রক্রিয়াভিত্তিক অপসারণ ফিরিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করা যেতে পারে। অভিযোগ তদন্ত করবে। সুপারিশ দেবে। নির্বাহী নয়; প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হবে। চতুর্থত, দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে হবে। প্রশাসক নয়; নির্বাচিত প্রতিনিধি দায়িত্ব নেবে।
গণতন্ত্র কাগজে নয়, চর্চায় টিকে থাকে। গণভোটের রায় উপেক্ষা করা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নির্বাহী আদেশে অপসারণের সুযোগ রাখা– এ দুই সিদ্ধান্ত গণতন্ত্র চর্চাকে দুর্বল করে। জনগণ যখন ভোট দেয়, তখন তারা ক্ষমতা দেয়। সেই ক্ষমতাকে সম্মান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যথায় গণতন্ত্রের ভিত্তি ক্ষয়ে যায়।
বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে। গণভোটের রায় মানা হবে, নাকি উপেক্ষা করা হবে– এই প্রশ্ন শুধু আইনের নয়। এটি গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। স্থানীয় সরকার স্বাধীন হবে, নাকি নিয়ন্ত্রিত থাকবে– এই প্রশ্নও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলছে, জনগণের ক্ষমতা সংকুচিত হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। আর জনগণের ক্ষমতা বিস্তৃত হলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। সিদ্ধান্ত এখন সরকারের হাতে।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন