ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপর্যয়ের শঙ্কা

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৫৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানের একমাত্র সচল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহর সাম্প্রতিক ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র হামলার শিকার হয়েছে। পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা কেবল ইরান নয়, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি হলে তা শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সর্বশেষ শনিবারের হামলায় প্ল্যান্টের নিকটবর্তী এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে একজন নিরাপত্তারক্ষী নিহত এবং একটি পার্শ্ববর্তী ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা।

এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বুশেহর স্থাপনায় অন্তত চারবার হামলা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, পারমাণবিক নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।

এদিকে পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, বুশেহরে বড় ধরনের হামলা হলে এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তেজস্ক্রিয় দূষণ, পরিবেশগত ক্ষতি এবং মানবিক সংকট সব মিলিয়ে গোটা অঞ্চলের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কী এই বুশেহর প্ল্যান্ট?

রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত বুশেহর প্ল্যান্ট ইরানের উপকূলীয় শহর বুশেহরে অবস্থিত। এই শহরে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বসবাস করে। ১৯৭৫ সালে জার্মান কোম্পানির মাধ্যমে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে রাশিয়ার পরমাণু শক্তি মন্ত্রণালয় এটি সম্পন্ন করে। বর্তমানে সেখানে শতাধিক রুশ কর্মী অবস্থান করছেন, যদিও সাম্প্রতিক হামলার পর কিছু কর্মী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেখানে একটি কার্যকর রিঅ্যাক্টর রয়েছে। বুশেহর ইউনিট-১ বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। আরও দুটি ইউনিট ২০২৯ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা।

বুশেহরে হামলা হলে কী হতে পারে?

ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধে বুশেহর পারমাণবিক স্থাপনাটি ইতিমধ্যে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি কোনো পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা ব্যবহৃত জ্বালানি সংরক্ষণাগারে সরাসরি আঘাত লাগে, তাহলে মারাত্মক তেজস্ক্রিয় পদার্থ, বিশেষ করে সিজিয়াম-১৩৭ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ ধরনের তেজস্ক্রিয় কণিকা বাতাস ও পানির মাধ্যমে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য মাটি, খাদ্য এবং পানির উৎসকে দূষিত করতে পারে। সরাসরি সংস্পর্শে এলে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) দীর্ঘদিন ধরে বুশেহর প্ল্যান্টে হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে আসছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সতর্ক করে বলেছেন, এই স্থাপনায় সরাসরি হামলা হলে বিপুল মাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার প্রভাব ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, যদি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কুলিং সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে রিঅ্যাক্টর গলনের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে তেজস্ক্রিয় লিকেজ ছড়িয়ে পড়ে কয়েক শ কিলোমিটার এলাকায় মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

উপসাগরের পানিতে ঝুঁকি

বুশেহরে ক্ষতি হলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের পানিও দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেজস্ক্রিয়তা সামুদ্রিক প্রাণিজগৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং উপসাগরের অগভীর পানির কারণে এই প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে।

আরও বড় সমস্যা হলো পানীয় জলের সংকট। উপসাগরীয় বেশিরভাগ দেশ সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে ব্যবহার করে। কিন্তু এসব পানি শোধনাগার তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছাঁকতে সক্ষম নয়। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের অ্যালান আইর বলেন, পানিতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে পানি শোধনাগার কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বুশেহরে হামলা হলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এমন ঘটনা ঘটলে সমুদ্র সম্পূর্ণ দূষিত হয়ে যাবে এবং কাতারে তিন দিনের মধ্যে পানির সংকট দেখা দেবে। তখন পানি থাকবে না, মাছ থাকবে না, কিছুই থাকবে না; কোনো জীবনই থাকবে না।

আইনি অবস্থান কী?

আন্তর্জাতিক আইনে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিরুদ্ধে সুরক্ষা রয়েছে। জেনেভা কনভেনশনের প্রোটোকল-১-এর ৫৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিপজ্জনক শক্তি বহনকারী স্থাপনা যেমন পারমাণবিক কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা নিষিদ্ধ। এ ধরনের হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি বা পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি থাকলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছেন, ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রের ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলো যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, বুশেহরের ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে না। ২০২২ সালে রাশিয়ার হামলার পর জাপোরিঝিয়া ইস্যুতে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দেশগুলো কঠোর নিন্দা জানায়। কিন্তু বুশেহরের ঘটনায় এখনো তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

অতীতের পারমাণবিক দুর্ঘটনা

২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্রে ভূমিকম্পের পর রিঅ্যাক্টর গলে যায়। এ ঘটনায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টর বিস্ফোরণের ফলে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষ নিহত ও অসুস্থ হয় এবং লক্ষাধিক মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

সব মিলিয়ে, বুশেহর পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিবেশ, পানি, খাদ্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সম্পর্কিত