মস্তিষ্ককে অলস রাখছেন? বিপদ কিন্তু চুপিচুপি আসছে

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কমে যায় স্মৃতিশক্তি, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

তথ্যসূত্র:
তথ্যসূত্র:
এপি

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২০: ৪৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

বয়স বাড়লে আমরা শরীরের যত্ন নিতে শুরু করি। অনেকেই নিয়ম করে হাঁটি, ঘাম ঝরিয়ে ব্যায়াম করি, স্বাস্থ্যকর খাবার খাই। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক কীভাবে ভালো থাকবে তা নিয়ে কি চিন্তা করি?

আসলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কমে যায় স্মৃতিশক্তি, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। অনেকের ক্ষেত্রে আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়া-র মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। বয়স বাড়লেও মস্তিষ্ককে সচল ও সক্রিয় রাখা সম্ভব। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-তে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

শুধু শব্দ মেলালেই হবে না, দরকার বৈচিত্র্য

অনেকে ভাবেন, প্রতিদিন পত্রিকার শব্দজব্দ বা ‘ক্রসওয়ার্ড পাজল’ করলেই মস্তিষ্ক ভালো থাকবে। এতে শব্দ নিয়ে দক্ষতা বাড়ে ঠিকই, কিন্তু শুধু এটুকু দিয়ে মস্তিষ্ককে পুরোপুরি সুস্থ রাখা যায় না।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, হার্ট ভালো রাখার জন্য যেসব নিয়ম মানতে হয়, সেগুলো মস্তিষ্কের জন্যও সমান উপকারী। যেমন নিয়মিত ব্যায়াম করুন, প্রচুর তাজা ফলমূল ও শাকসবজি খান, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন, পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানোর চেষ্টা করুন ইত্যাদি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্কের জন্যও দরকার নানা ধরনের চর্চা। ভিন্ন ভিন্ন শখ ও অভ্যাস মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। এগুলো শুধু জ্ঞান বাড়ায় না, মস্তিষ্কের কোষগুলোকে দুর্বল হয়ে পড়া থেকেও রক্ষা করে। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক নিজেই বৈচিত্র্য পছন্দ করে। একই কাজ বারবার নয়, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জই আমাদেরকে বেশি সক্রিয় রাখে।

আজীবন শেখার মানসিকতা

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সারাজীবন নতুন কিছু শেখার মধ্যে থাকেন, তাঁদের আলঝেইমার ও স্মৃতিশক্তি কমার ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে।

আজীবন শেখা বলতে আসলে কী বোঝায়? এর মানে হলো, ছোটবেলা থেকে শুরু করে অবসর জীবন পর্যন্ত নানা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা। যেমন নিয়মিত বই পড়া, লেখালেখি করা, নতুন কোনো ভাষা শেখার চেষ্টা করা, দাবা খেলা, নতুন ধাঁধা মেলানো কিংবা সময় পেলেই জাদুঘর বা ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরে আসা।

ট এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন শিকাগোর রাশ ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের নিউরোসাইকোলজিস্ট আন্দ্রেয়া জ্যামি। তাঁর মতে, নতুন কিছু শেখার এই কাজগুলো আমাদের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে। মস্তিষ্ক তখন তার ভেতরে থাকা নানা জ্ঞানীয় (কগনিটিভ) অংশকে কাজে লাগাতে বাধ্য হয়।

শুরু করার কোনো বয়স নেই

অনেকেই ভাবতে পারেন, ‘আমার তো বয়স পার হয়ে গেছে, এখন আর নতুন কী শিখব!’ এই ধারণা একদম ভুল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্ক ভালো রাখার কাজ শুরু করতে পারেন যেকোনো বয়স থেকেই। বিশেষ করে মধ্যবয়স হলো মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। মস্তিষ্ককে সচল রাখতে আপনি অনেক কিছুই করতে পারেন। কেউ হয়তো গান শিখতে পারেন। কেউ নতুন কোনো স্কিল শিখতে পারেন। আবার কেউ মস্তিষ্কের ব্যায়াম হয় এমন গেম খেলতে পারেন।

মস্তিষ্ককে সচল রাখতে আপনি অনেক কিছুই করতে পারেন। সংগৃহীত ছবি
মস্তিষ্ককে সচল রাখতে আপনি অনেক কিছুই করতে পারেন। সংগৃহীত ছবি

গবেষক আন্দ্রেয়া জ্যামিট বলেন, ব্রেইন ভালো রাখতে নির্দিষ্ট একটি কাজই করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং আপনার এমন কিছু করা উচিত, যা করতে আপনি সত্যিই ভালোবাসেন। আর কাজটি শুধু শখের বশে দু-একদিন করলে হবে না। এর সঙ্গে নিয়মিত লেগে থাকতে হবে। তবেই আপনার মস্তিষ্ক এই কাজের সুফল পাবে।

মস্তিষ্কের ‘জমানো শক্তি’

আন্দ্রেয়া জ্যামিটের এই গবেষণায় ৫৩ থেকে ১০০ বছর বয়সী প্রায় দুই হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। গবেষণার শুরুতে তাঁদের কারোরই ডিমেনশিয়া ছিল না। তাঁদেরকে টানা আট বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার ফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো।

গবেষণায় দেখা যায়, যারা সারাজীবন নতুন কিছু শেখার সাথে যুক্ত ছিলেন, আলঝেইমার রোগটি তাঁদের অনেক দেরিতে আক্রমণ করেছে। আর যারা তেমন কিছু শিখতেন না, তাঁদের চেয়ে এরা অন্তত পাঁচ বছর বেশি সুস্থ জীবন কাটিয়েছেন।

এ ছাড়া এই গবেষণার সময় মারা যাওয়া ৯৪৮ জনের ময়নাতদন্ত করা হয়। দেখা যায়, মস্তিষ্কে আলঝেইমারের শারীরিক লক্ষণ থাকার পরও অনেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেশ ভালো স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। এর কারণ কী?

বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছে’ 'জ্ঞানীয় রিজার্ভ’ বা কগনিটিভ রিজার্ভ। সহজ কথায় এটি হলো মস্তিষ্কের নিজস্ব জমানো শক্তি বা ব্যাংক ব্যালেন্স। আপনি যখন নতুন কিছু শেখেন, তখন মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোর মধ্যে নতুন নতুন সংযোগ তৈরি হয়। বয়স বাড়লে বা কোনো রোগ হলে মস্তিষ্ক যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এই জমানো শক্তি কাজে লাগে। ফলে মস্তিষ্ক সহজে হার মানে না।

শরীরের যত্ন মানেই মস্তিষ্কের যত্ন

মস্তিষ্ককে ভালো রাখতে হলে শুধু বই পড়লে বা দাবা খেললেই হবে না। শরীরের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মাইয়ো ক্লিনিকের আলঝেইমার বিশেষজ্ঞ ডা. রোনাল্ড পিটারসেন বলেন, বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমবেই। একে পুরোপুরি ঠেকানোর উপায় নেই। তবে জীবনযাত্রা বদলালে এই রোগের ক্ষতি অনেকটাই ধীর করা যায়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সারাজীবন নতুন কিছু শেখার মধ্যে থাকেন, তাঁদের আলঝেইমার ও স্মৃতিশক্তি কমার ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে।

মধ্যবয়সে অনেক শারীরিক সমস্যা মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ আমাদের রক্তনালী নষ্ট করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল কমে যায়। আবার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, হার্ট ভালো রাখার জন্য যেসব নিয়ম মানতে হয়, সেগুলো মস্তিষ্কের জন্যও সমান উপকারী। যেমন নিয়মিত ব্যায়াম করুন, প্রচুর তাজা ফলমূল ও শাকসবজি খান, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন, পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানোর চেষ্টা করুন ইত্যাদি।

দ্রুত চিন্তার অভ্যাস

মস্তিষ্ককে সচল রাখতে ‘স্পিড ট্রেনিং’ বা দ্রুত চিন্তা করার অনুশীলন খুব কাজে দেয়। আপনি এমন কোনো গেম খেলতে পারেন যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এ ছাড়া বিজ্ঞানীরা একা একা না থেকে সামাজিক হওয়ার পরামর্শ দেন। যেমন আপনি কোনো বইয়ের ক্লাবে যোগ দিতে পারেন। সেখানে বই পড়ার পাশাপাশি অন্যের সঙ্গে আলোচনা করা যায়। এতে করে সামাজিক সম্পর্কও বাড়ে। যেকোনো আড্ডায় বা আলোচনায় মানুষকে খুব দ্রুত চিন্তা করে উত্তর দিতে হয়। এটা মস্তিষ্কের জন্য দারুণ ব্যায়াম হতে পারে।

মনে রাখবেন, বয়স বৃদ্ধি পাওয়া একটি প্রাকৃতিক নিয়ম। একে ঠেকানোর কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। কিন্তু বয়স বাড়লেও আমাদের মস্তিষ্ককে বৃদ্ধ হতে দেবেন না। মস্তিষ্ককে অলস বসিয়ে রাখবেন না। তাকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ দিন। নতুন কিছু শিখুন, পছন্দের কাজের পেছনে সময় দিন, শরীরকে সুস্থ রাখুন।

সম্পর্কিত