ড. মো. আবু সালেহ

হিমালয়কন্যা নেপাল তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার বিস্ময়কর পালাবদলের সাক্ষী হয়েছে। ২০০৮ সালে দীর্ঘ ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একটি হিন্দু রাষ্ট্র থেকে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর ছিল নেপালের ইতিহাসের প্রথম বড় সন্ধিক্ষণ। তবে রাজতন্ত্র পরবর্তী দেড় দশকে দেশটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মুখ দেখেনি। ঘনঘন সরকার পরিবর্তন, দুর্নীতি এবং মাওবাদী ও মূলধারার দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই সাধারণ মানুষের মধ্যে এক গভীর রাজনৈতিক বিমুখতা তৈরি করেছিল।
গত দুই দশকের এই অস্থিরতা নেপালের গণতন্ত্রকে যে সংকটে ফেলেছিল, সাম্প্রতিক এই নির্বাচন তাকে সেই খাদ থেকে টেনে তোলার একটি সাহসী প্রচেষ্টায় রূপ নিয়েছে। নেপালের বর্তমান মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছে। দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালেন্দ্র শাহ ২৭ মার্চ, ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির বাসভবন ‘শীতল নিবাস’-এ শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর শপথ গ্রহণের পরপরই ১৪ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভাও শপথ গ্রহণ করে।
গত ৫ মার্চ, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর এই নতুন সরকার গঠিত হলো। এটি কেবল শাসক পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, বরং নেপালি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের এক নবতর সংগ্রাম।
নেপালের এই নির্বাচনের পটভূমি রচিত হয়েছিল ২০২৫ সালের মধ্যভাগে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। দীর্ঘ সময় ধরে নেপালি কংগ্রেস এবং সিপিএন-ইউএমএল-এর মতো প্রথাগত দলগুলো ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলেও তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান বা জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, নেপালের মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, যারা মূলত ‘জেন-জি’ প্রজন্মের প্রতিনিধি। এই প্রজন্ম আর ‘পুরোনোদের আদর্শিক সংঘাত’ দেখতে চায়নি। তারা চেয়েছিল মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিবান্ধব শাসনব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, ‘নেপালি তরুণরা কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, বরং সম্পূর্ণ সিস্টেমের আমূল সংস্কার চাইছে।’ ২০২৫-এর আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল প্রথাগত রাজনীতির প্রতি চরম অনাস্থা, যা শেষ পর্যন্ত এক ব্যালট বিপ্লবে রূপ নেয়।
এই নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের বিজয়ের পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ সক্রিয় ছিল।
প্রথমত, ডিজিটাল বিপ্লব ও সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন। বালেন্দ্র শাহ ও তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) প্রথাগত প্রচারণার চেয়ে টিকটক ও ফেসবুককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যা সরাসরি তরুণ ভোটারদের হৃদয়ে পৌঁছে গেছে।
দ্বিতীয়ত, আদর্শহীন বাস্তববাদী রাজনীতি। দীর্ঘ সময় ধরে নেপালি রাজনীতি সাম্যবাদ বা উদারবাদের মতো তত্ত্বের জালে আটকে ছিল। কিন্তু জেন-জি ভোটারদের কাছে এসব ‘ইজম’ বা তত্ত্বের চেয়ে ‘ফলাফল’ বা কাজের গুরুত্ব বেশি ছিল। তারা এমন এক নেতৃত্ব চেয়েছিল যারা রাস্তার গর্ত মেরামত করবে, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এই প্রজন্ম আদর্শিক সংঘাতের চেয়ে নাগরিক সেবাপ্রাপ্তিকে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিত্বের প্রভাব। বালেন্দ্র শাহর ইমেজ তরুণদের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং একজন পেশাদার স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং জনপ্রিয় র্যাপার। প্রকৌশলীর যৌক্তিক চিন্তাধারা এবং শিল্পীর সংবেদনশীলতা—এই দুইয়ের সংমিশ্রণ তাকে তরুণদের চোখে একজন ‘আধুনিক আইকন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর মধ্যে তারা এমন এক নেতার প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছে, যিনি বিজ্ঞান বোঝেন এবং মাটির মানুষের ভাষাও জানেন।
চতুর্থত, অভিবাসন সংকট। নেপালের অর্থনীতির একটি বড় অংশ রেমিট্যান্স নির্ভর হলেও প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণের দেশান্তরী হওয়া সমাজকাঠামোয় এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। বালেন শাহর ‘নেপালি মেধা নেপালেই ব্যবহার’ করার প্রতিশ্রুতি তরুণদের মধ্যে নতুন করে দেশপ্রেম জাগ্রত করেছে। বিদেশের মাটিতে শ্রম দেওয়ার চেয়ে নিজ দেশে সম্মানজনক জীবিকার যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, তা জেন-জি ভোটারদের জন্য এক শক্তিশালী নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে কাজ করেছে। সবশেষে, ‘ঘণ্টা’ প্রতীককে তারা একটি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা ঘুমন্ত প্রশাসনকে জাগিয়ে তোলার ইঙ্গিত বহন করে।
এবারের নির্বাচনের ফলাফল ছিল এক রাজনৈতিক ভূমিকম্প। বালেন্দ্র শাহ প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি ভেঙে নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ভোটার উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৬২ শতাংশ, যার সিংহভাগই ছিল তরুণ ও প্রথমবার ভোট দেওয়া নাগরিক।
আরএসপি বড় বড় শহরগুলোসহ গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়লাভ করে, ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টি আসন পেয়ে বালেন্দ্র শাহর দল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এটি ১৯৫৯ সালের পর নেপালের নির্বাচনী ইতিহাসে কোনো দলের জন্য শ্রেষ্ঠ ফলাফল।
নেপালি কংগ্রেস তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি সিপিএন-ইউএমএল প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি তার নিজের আসন ঝাপা-৫-এ বালেন্দ্র শাহর কাছে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।
বিবিসি তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, ‘বালেন শাহর বিজয় মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় পপুলিস্ট রাজনীতির এক নতুন ঘরানা, যা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ নয় বরং সমস্যা সমাধানের রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।’
একজন প্রকৌশলী থেকে সরকারপ্রধান হওয়ার এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, নেপালের ভোটাররা এখন আর কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়, বরং যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
নির্বাচনের এই অভাবনীয় ফলাফল নেপালের প্রথাগত দলগুলোর জন্য ছিল এক বড় চপেটাঘাত।
নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএল-এর মতো দলগুলো এই ফলাফলকে প্রাথমিকভাবে ‘আবেগতাড়িত’ ও ‘পপুলিস্ট রাজনীতির জয়’ বলে অভিহিত করেছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছাড়া দেশ পরিচালনা করা অসম্ভব এবং এই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে ভেতরে ভেতরে তারা এক বিশাল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, যা তাদের নিজস্ব দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে।
অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।
নেপালের রাজনীতিতে ‘ডিপ স্টেট’ বলতে সাধারণত রাজতন্ত্র আমলের আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ এবং পর্দার আড়ালের সেই প্রভাবশালীদের বোঝানো হয়, যারা দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। তবে এই নির্বাচনে তারা কেন সফল হতে পারল না, তার প্রধান কারণ হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কোনো গোপন সমঝোতা বা ব্যাকডোর ডিল হওয়ার আগেই তা জনসমক্ষে চলে আসছিল।
দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, ডিপ স্টেটের পক্ষে রাজপথের এই গণজোয়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সম্ভব ছিল না।
তৃতীয়ত, বালেন শাহর মতো ‘আউটসাইডার’রা প্রথাগত রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থেকে লড়াই করায় ডিপ স্টেটের পুরোনো ফর্মুলাগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। হিমালয়ের রাজনীতিতে এবার পেশিবল ও গোপন ষড়যন্ত্রের চেয়ে ‘ব্যালট ও বাইট’ শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সবসময়ই নেপালের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারতের জন্য বালেন্দ্র শাহর উত্থান ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক বন্ধুদের পরিবর্তে একজন অপ্রথাগত ও জাতীয়তাবাদী নেতার আগমন দিল্লির কৌশলগত চিন্তায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বালেন শাহর ‘নেপাল ফার্স্ট’ নীতি ভারতের সাথে জলবিদ্যুৎ ও সীমান্ত চুক্তিতে নতুন করে দরকষাকষির ইঙ্গিত দিচ্ছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া এক বিশ্লেষণে বলেছে, ‘নেপালের নতুন নেতৃত্ব ভারতের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যেখানে পুরোনো সমীকরণগুলো আর কাজ নাও করতে পারে।’ তবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারত এখন নতুন এই নেতৃত্বের সঙ্গে এক ধরনের কাজের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।
নেপালের প্রথম গণতান্ত্রিক যাত্রা ছিল রাজতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি, আর দ্বিতীয় এই যাত্রাটি হলো দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্থবিরতা থেকে মুক্তি। নতুন সরকারের সামনে প্রধান লক্ষ্য হলো ‘ই-গভর্নেন্স’ বা প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করা। তবে পথটি সহজ নয়।
ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ মোকাবিলা করা হবে বালেন শাহর প্রথম পরীক্ষা। নেপাল এখন একটি ‘ডেটা-চালিত’ প্রশাসনের দিকে এগোচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে।
হিমালয়ের পাদদেশে সূচিত এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ কেবল নেপালের সীমানায় আটকে নেই। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা—জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে কোনো রাজনৈতিক রাজবংশ বা পুরোনো দলই চিরস্থায়ী নয়।
নেপালের এই ‘জেন-জি বিপ্লব’ প্রমাণ করেছে যে ব্যালটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে গুণগত পরিবর্তন সম্ভব। বালেন শাহর নেতৃত্ব যদি সফল হয়, তবে তা প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি নতুন রাজনৈতিক পথরেখা হিসেবে কাজ করবে। সংকটের কালো মেঘ কাটিয়ে নেপাল এখন একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং আধুনিক গণতন্ত্রের দিকে পা বাড়াচ্ছে। বাধা অনেক থাকলেও, এই যাত্রায় তারুণ্যের যে জোয়ার দেখা গেছে, তা-ই নেপালের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

হিমালয়কন্যা নেপাল তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার বিস্ময়কর পালাবদলের সাক্ষী হয়েছে। ২০০৮ সালে দীর্ঘ ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একটি হিন্দু রাষ্ট্র থেকে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর ছিল নেপালের ইতিহাসের প্রথম বড় সন্ধিক্ষণ। তবে রাজতন্ত্র পরবর্তী দেড় দশকে দেশটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মুখ দেখেনি। ঘনঘন সরকার পরিবর্তন, দুর্নীতি এবং মাওবাদী ও মূলধারার দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই সাধারণ মানুষের মধ্যে এক গভীর রাজনৈতিক বিমুখতা তৈরি করেছিল।
গত দুই দশকের এই অস্থিরতা নেপালের গণতন্ত্রকে যে সংকটে ফেলেছিল, সাম্প্রতিক এই নির্বাচন তাকে সেই খাদ থেকে টেনে তোলার একটি সাহসী প্রচেষ্টায় রূপ নিয়েছে। নেপালের বর্তমান মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছে। দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালেন্দ্র শাহ ২৭ মার্চ, ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির বাসভবন ‘শীতল নিবাস’-এ শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর শপথ গ্রহণের পরপরই ১৪ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভাও শপথ গ্রহণ করে।
গত ৫ মার্চ, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর এই নতুন সরকার গঠিত হলো। এটি কেবল শাসক পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, বরং নেপালি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের এক নবতর সংগ্রাম।
নেপালের এই নির্বাচনের পটভূমি রচিত হয়েছিল ২০২৫ সালের মধ্যভাগে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। দীর্ঘ সময় ধরে নেপালি কংগ্রেস এবং সিপিএন-ইউএমএল-এর মতো প্রথাগত দলগুলো ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলেও তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান বা জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, নেপালের মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, যারা মূলত ‘জেন-জি’ প্রজন্মের প্রতিনিধি। এই প্রজন্ম আর ‘পুরোনোদের আদর্শিক সংঘাত’ দেখতে চায়নি। তারা চেয়েছিল মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিবান্ধব শাসনব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, ‘নেপালি তরুণরা কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, বরং সম্পূর্ণ সিস্টেমের আমূল সংস্কার চাইছে।’ ২০২৫-এর আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল প্রথাগত রাজনীতির প্রতি চরম অনাস্থা, যা শেষ পর্যন্ত এক ব্যালট বিপ্লবে রূপ নেয়।
এই নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের বিজয়ের পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ সক্রিয় ছিল।
প্রথমত, ডিজিটাল বিপ্লব ও সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন। বালেন্দ্র শাহ ও তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) প্রথাগত প্রচারণার চেয়ে টিকটক ও ফেসবুককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যা সরাসরি তরুণ ভোটারদের হৃদয়ে পৌঁছে গেছে।
দ্বিতীয়ত, আদর্শহীন বাস্তববাদী রাজনীতি। দীর্ঘ সময় ধরে নেপালি রাজনীতি সাম্যবাদ বা উদারবাদের মতো তত্ত্বের জালে আটকে ছিল। কিন্তু জেন-জি ভোটারদের কাছে এসব ‘ইজম’ বা তত্ত্বের চেয়ে ‘ফলাফল’ বা কাজের গুরুত্ব বেশি ছিল। তারা এমন এক নেতৃত্ব চেয়েছিল যারা রাস্তার গর্ত মেরামত করবে, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এই প্রজন্ম আদর্শিক সংঘাতের চেয়ে নাগরিক সেবাপ্রাপ্তিকে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিত্বের প্রভাব। বালেন্দ্র শাহর ইমেজ তরুণদের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং একজন পেশাদার স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং জনপ্রিয় র্যাপার। প্রকৌশলীর যৌক্তিক চিন্তাধারা এবং শিল্পীর সংবেদনশীলতা—এই দুইয়ের সংমিশ্রণ তাকে তরুণদের চোখে একজন ‘আধুনিক আইকন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর মধ্যে তারা এমন এক নেতার প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছে, যিনি বিজ্ঞান বোঝেন এবং মাটির মানুষের ভাষাও জানেন।
চতুর্থত, অভিবাসন সংকট। নেপালের অর্থনীতির একটি বড় অংশ রেমিট্যান্স নির্ভর হলেও প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণের দেশান্তরী হওয়া সমাজকাঠামোয় এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। বালেন শাহর ‘নেপালি মেধা নেপালেই ব্যবহার’ করার প্রতিশ্রুতি তরুণদের মধ্যে নতুন করে দেশপ্রেম জাগ্রত করেছে। বিদেশের মাটিতে শ্রম দেওয়ার চেয়ে নিজ দেশে সম্মানজনক জীবিকার যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, তা জেন-জি ভোটারদের জন্য এক শক্তিশালী নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে কাজ করেছে। সবশেষে, ‘ঘণ্টা’ প্রতীককে তারা একটি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা ঘুমন্ত প্রশাসনকে জাগিয়ে তোলার ইঙ্গিত বহন করে।
এবারের নির্বাচনের ফলাফল ছিল এক রাজনৈতিক ভূমিকম্প। বালেন্দ্র শাহ প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি ভেঙে নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ভোটার উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৬২ শতাংশ, যার সিংহভাগই ছিল তরুণ ও প্রথমবার ভোট দেওয়া নাগরিক।
আরএসপি বড় বড় শহরগুলোসহ গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়লাভ করে, ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টি আসন পেয়ে বালেন্দ্র শাহর দল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এটি ১৯৫৯ সালের পর নেপালের নির্বাচনী ইতিহাসে কোনো দলের জন্য শ্রেষ্ঠ ফলাফল।
নেপালি কংগ্রেস তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি সিপিএন-ইউএমএল প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি তার নিজের আসন ঝাপা-৫-এ বালেন্দ্র শাহর কাছে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।
বিবিসি তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, ‘বালেন শাহর বিজয় মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় পপুলিস্ট রাজনীতির এক নতুন ঘরানা, যা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ নয় বরং সমস্যা সমাধানের রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।’
একজন প্রকৌশলী থেকে সরকারপ্রধান হওয়ার এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, নেপালের ভোটাররা এখন আর কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়, বরং যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
নির্বাচনের এই অভাবনীয় ফলাফল নেপালের প্রথাগত দলগুলোর জন্য ছিল এক বড় চপেটাঘাত।
নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএল-এর মতো দলগুলো এই ফলাফলকে প্রাথমিকভাবে ‘আবেগতাড়িত’ ও ‘পপুলিস্ট রাজনীতির জয়’ বলে অভিহিত করেছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছাড়া দেশ পরিচালনা করা অসম্ভব এবং এই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে ভেতরে ভেতরে তারা এক বিশাল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, যা তাদের নিজস্ব দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে।
অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।
নেপালের রাজনীতিতে ‘ডিপ স্টেট’ বলতে সাধারণত রাজতন্ত্র আমলের আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ এবং পর্দার আড়ালের সেই প্রভাবশালীদের বোঝানো হয়, যারা দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। তবে এই নির্বাচনে তারা কেন সফল হতে পারল না, তার প্রধান কারণ হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কোনো গোপন সমঝোতা বা ব্যাকডোর ডিল হওয়ার আগেই তা জনসমক্ষে চলে আসছিল।
দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, ডিপ স্টেটের পক্ষে রাজপথের এই গণজোয়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সম্ভব ছিল না।
তৃতীয়ত, বালেন শাহর মতো ‘আউটসাইডার’রা প্রথাগত রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থেকে লড়াই করায় ডিপ স্টেটের পুরোনো ফর্মুলাগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। হিমালয়ের রাজনীতিতে এবার পেশিবল ও গোপন ষড়যন্ত্রের চেয়ে ‘ব্যালট ও বাইট’ শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সবসময়ই নেপালের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারতের জন্য বালেন্দ্র শাহর উত্থান ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক বন্ধুদের পরিবর্তে একজন অপ্রথাগত ও জাতীয়তাবাদী নেতার আগমন দিল্লির কৌশলগত চিন্তায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বালেন শাহর ‘নেপাল ফার্স্ট’ নীতি ভারতের সাথে জলবিদ্যুৎ ও সীমান্ত চুক্তিতে নতুন করে দরকষাকষির ইঙ্গিত দিচ্ছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া এক বিশ্লেষণে বলেছে, ‘নেপালের নতুন নেতৃত্ব ভারতের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যেখানে পুরোনো সমীকরণগুলো আর কাজ নাও করতে পারে।’ তবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারত এখন নতুন এই নেতৃত্বের সঙ্গে এক ধরনের কাজের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।
নেপালের প্রথম গণতান্ত্রিক যাত্রা ছিল রাজতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি, আর দ্বিতীয় এই যাত্রাটি হলো দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্থবিরতা থেকে মুক্তি। নতুন সরকারের সামনে প্রধান লক্ষ্য হলো ‘ই-গভর্নেন্স’ বা প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করা। তবে পথটি সহজ নয়।
ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ মোকাবিলা করা হবে বালেন শাহর প্রথম পরীক্ষা। নেপাল এখন একটি ‘ডেটা-চালিত’ প্রশাসনের দিকে এগোচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে।
হিমালয়ের পাদদেশে সূচিত এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ কেবল নেপালের সীমানায় আটকে নেই। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা—জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে কোনো রাজনৈতিক রাজবংশ বা পুরোনো দলই চিরস্থায়ী নয়।
নেপালের এই ‘জেন-জি বিপ্লব’ প্রমাণ করেছে যে ব্যালটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে গুণগত পরিবর্তন সম্ভব। বালেন শাহর নেতৃত্ব যদি সফল হয়, তবে তা প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি নতুন রাজনৈতিক পথরেখা হিসেবে কাজ করবে। সংকটের কালো মেঘ কাটিয়ে নেপাল এখন একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং আধুনিক গণতন্ত্রের দিকে পা বাড়াচ্ছে। বাধা অনেক থাকলেও, এই যাত্রায় তারুণ্যের যে জোয়ার দেখা গেছে, তা-ই নেপালের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসমক্ষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং সে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ‘দুর্বল’ বলে ঠাট্টা করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টকে তাঁর বিয়ে নিয়ে খোঁটা দিয়েছেন।
২ মিনিট আগে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হলো। জুলাই সনদ হলো। সেই সনদের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট হলো। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ বললেন। অর্থাৎ জনগণ সরাসরি মত দিল। কিন্তু এখন সেই গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশ কার্যত বাতিলের পথে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বা ‘জনস্বার্থে’ নির্বাহী আদেশে বরখাস্ত করার বিধান রেখে
৩৬ মিনিট আগে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই—বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন। এটি মূলত কম্পিউটারের এমন একটি কৃত্রিম ক্ষমতা, যার মাধ্যমে যন্ত্র মানুষের মতো যৌক্তিক চিন্তা করতে, অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
২ ঘণ্টা আগে
২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা স্ট্রিম আয়োজিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি বিষয়ক একটি সময়োপযোগী গোলটেবিল আলোচনার পর এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশের নদীকূটনীতি এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ‘গঙ্গা টক: ইউএন ওয়াটার কনভেনশন ১৯৯৪’ শীর্ষক এই আলোচনায় আইন, কৌশলগত বিশ্লেষণ, পরিবেশ এবং নাগরিক সমাজবিষয়ক
২ ঘণ্টা আগে