মাইজভান্ডারি ও গণসংগীতশিল্পী কবিয়াল রমেশ শীলকে কি আমরা মনে রেখেছি

আজ ৬ এপ্রিল মাইজভান্ডারি ও গণসংগীতশিল্পী কবিয়াল রমেশ শীলের মৃত্যুদিন। তাঁর লেখা তিন শতাধিক মাইজভান্ডারি গান আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে বেশ গভীর। এসব গানে তিনি মাইজভান্ডারি ধারার ভাব, ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৩৭
মাইজভান্ডারি ও গণসংগীতশিল্পী কবিয়াল রমেশ শীলকে কি আমরা মনে রেখেছি

ইস্কুল খুইলাছেরে মাওলা, ইস্কুল খুইলাছে

গাউসুল আজম মাইজভান্ডারি ইস্কুল খুইলাছে’

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে জনপ্রিয় এই মাইজভান্ডারি গান। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই কালজয়ী সুর আর কথার পেছনে কে সেই নিভৃতচারী স্রষ্টা? তিনি কিংবদন্তি কবিয়াল ও গণসংগীতশিল্পী রমেশ শীল।

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্যভুবনে রমেশ শীল স্মরণীয় নাম। তবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি চর্চিত কেউ নন। বাংলা কবিগানের কিংবদন্তি, মাইজভান্ডারী মরমী গানের সাধক, গণসংগীত শিল্পী রমেশ শীল সমাজতন্ত্রের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে লড়াই করেছেন। বলে গেছেন মাটি ও মানুষের কথা।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর গোমদণ্ডী গ্রামে ১৮৭৭ সালের ৯ মে কবিয়াল রমেশ শীলের জন্ম। তাঁর বাবা চণ্ডীচরণ শীল ছিলেন পেশায় কবিরাজ। ছোটবেলা থেকেই রমেশের জীবন ছিল খুব কষ্টের। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি বাবাকে হারান। খুব অল্প বয়সেই সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। সেই কঠিন সময়ের কথা তিনি নিজেই লিখেছিলেন—

‘আমিই বালক, চালক, পালক, আমার আর কেহ নাই।

মায়ের অলংকার সম্বল আমার, বিক্রি করে খাই।’

এরপর জীবন চালানোর জন্য তিনি নিজের পূর্বপুরুষদের পেশাই বেছে নেন। ভাগ্য বদলানোর আশায় একসময় তিনি রেঙ্গুন (বর্তমান মিয়ানমার) চলে যান। সেখানে কিছুটা আর্থিক উন্নতি হলেও দেশের টান তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনে নিজের মাটিতে।

দেশে ফিরে রমেশ আবার কবিরাজির কাজ শুরু করেন। দিনের বেলায় এই কাজ করলেও, রাতে তিনি যেতেন পালাগান আর কবিগানের আসরে। সেখান থেকেই তাঁর কবিগানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে তিনি নিজেই কবিগান চর্চা শুরু করেন এবং এই পথেই এগিয়ে যান।

‘এই পুঁচকের সঙ্গে কি পালা করা যায়!’

রমেশ শীল কীভাবে কবিগানে নাম করলেন, এ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে দারুণ গল্প। অনেকটা তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের মতোই। উপন্যাসের মূল চরিত্র নিতাই যেমন কবিগানের সুযোগ পেয়ে নিজেকে মানুষের সামনে ‘কবি’ হিসেবে পরিচয় করান, রমেশ শীলের গল্পটা প্রায় এমনই।

রমেশ শীলের লেখা তিন শতাধিক মাইজভান্ডারি গান আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে বেশ গভীর। এসব গানে তিনি মাইজভান্ডারি ধারার ভাব, ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

১২৩ বছর আগের কথা। আশ্বিন মাস, দুর্গাপূজার উৎসব চলছে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গীবাজারের মাঝিরঘাটে। সেকালের যেকোনো বড় উৎসব বা মেলায় কবিগান ছিল প্রধান আকর্ষণ। সেবারের আসরে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তখনকার বিখ্যাত দুই কবিয়াল মোহনবাঁশি ও চিন্তাহরণকে। চারদিকে প্রচারণাও চালানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

কিন্তু আসর শুরুর আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন চিন্তাহরণ। আয়োজকরা পড়লেন মহাবিপদে। তাৎক্ষণিকভাবে আরেক জনপ্রিয় কবি দীনবন্ধু মিত্রের কাছে ছুটে গেলেন। তিনি নিজে আসতে রাজি হলেন না, তবে আসর সামলাতে পাঠিয়ে দিলেন মাত্র ২১ বছর বয়সী নবীন কবিয়াল রমেশ শীলকে।

এত বড় আসর, সামনে হাজার হাজার দর্শক আর প্রতিপক্ষ অভিজ্ঞ প্রবীণ কবি! তরুণ রমেশকে মঞ্চে উঠতে দেখে অবজ্ঞার হাসি হেসে কবিয়াল মোহনবাঁশি ভাবলেন, এই পুঁচকের সঙ্গে কি পালা করা যায়!

রমেশ বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না। খুব শান্তভাবে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে পদ্যে উত্তর দিলেন—

‘উৎসব আর ভয়, লজ্জা কম নয়, কে বা হারাতে পারে কারে,

পুঁচকে ছেলে সত্যি মানি, শিশু ব্রজ ছিল জ্ঞানী, চেনাজানা হোক না আসরে।’

এই জবাব শুনে সবাই তো অবাক! এরপর রমেশ টানা আট ঘণ্টা গান আর কথায় পুরো আসর মাতিয়ে রাখেন। আর সেদিনই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম।

‘এখনো লোকে জাগিল না কেনে?’

‘কবিয়াল’ বললে তাঁর পুরো পরিচয়টা বোঝানো যায় না। তাঁর হাত ধরেই বাংলা কবিগান নতুন রূপ পায়। আগে কবিগানের বিষয়বস্তু ছিল পৌরাণিক কাহিনি, দেব-দেবী, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কিংবা নারী-পুরুষের বিতর্ক।

কিন্তু রমেশ শীল এই ধারা বদলে দেন। তিনি কবিগানে নিয়ে আসেন বাস্তব জীবনের গল্প। মানুষের সুখ-দুঃখ, খরা-বন্যা, গরিব মানুষের কষ্ট, মহাজনের শোষণ—সবকিছুই উঠে আসে তাঁর গানে। তিনি গেয়েছেন চাষি আর মজুতদারের লড়াই, যুদ্ধ আর শান্তির কথা, স্বৈরশাসন আর গণতন্ত্রের দ্বন্দ্ব, স্বাধীনতা আর পরাধীনতার প্রশ্ন। তাঁর কবিগান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা।

‘কবিয়াল’ বললে তাঁর পুরো পরিচয়টা বোঝানো যায় না। তাঁর হাত ধরেই বাংলা কবিগান নতুন রূপ পায়। আগে কবিগানের বিষয়বস্তু ছিল পৌরাণিক কাহিনি, দেব-দেবী, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কিংবা নারী-পুরুষের বিতর্ক।

ব্রিটিশ শাসনের সময়কার কষ্ট আর ইতিহাসও তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। মন্বন্তরের সময়, যখন মানুষ না খেয়ে মরছিল, তখন তিনি কষ্ট আর ক্ষোভ নিয়ে লিখেছিলেন—

‘দেশ জ্বলে যায় দুর্ভিক্ষের আগুনে,

এখনো লোকে জাগিল না কেনে?’

শিক্ষিত সমাজেও পৌঁছে দিয়েছিলেন মাইজভান্ডারি গান

রমেশ শীলের লেখা তিন শতাধিক মাইজভান্ডারি গান আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে বেশ গভীর। এসব গানে তিনি মাইজভান্ডারি ধারার ভাব, ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। গানে তিনি সহজ ভাষা ব্যবহার করতেন। সবাই গানের মর্ম অনুভব করতে পারত। ফলে উদার, মানবিক আর অসাম্প্রদায়িক মাইজভাণ্ডারী গানগুলো শুধু দরবারেই নয়, শিক্ষিত সমাজেও সমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বলা যায়, রমেশ শীলের সাধনা, জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই মাইজভান্ডারি গানের বিকাশ ঘটে। তিনি গানের আসল মেজাজ ঠিক রেখে, তার আধ্যাত্মিক ভাব বজায় রেখে, বাংলার লোকসংগীতের ধারার সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলিয়ে দেন। তাঁর গানে শব্দের সৌন্দর্য, কথার গঠন, ভাবের গভীরতা আর সুরের মাধুর্য মিলেমিশে অনন্য রূপ তৈরি করেছে। এই গানগুলো সহজেই মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

দরবারের প্রশংসা আর ভক্তির প্রকাশে রমেশের গানে উঠে আসে নানা অনুভূতি। ভালোবাসা, মায়া, বিশ্বাস, সাধনা, দয়া, আকুতি আর নিবেদন। সব মিলিয়ে তাঁর মাইজভান্ডারি গান হয়ে উঠেছে আবেগ, ভক্তি আর সৌন্দর্যের অপূর্ব মিশ্রণ।

মাঠে-ময়দানের রমেশ

রমেশ শীল কেবল পদ রচনার মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখেননি। সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী এই চারণকবি শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মাঠে-ময়দানেও সরাসরি কাজ করেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন—প্রতিটি ঐতিহাসিক সংগ্রামেই ছিল তাঁর অংশগ্রহণ।

রমেশ শীল। সংগৃহীত ছবি
রমেশ শীল। সংগৃহীত ছবি

১৯৫৪ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে নূরুল আমিনকে পূর্ব বাংলার গভর্নর হিসেবে বসানো হয়। সেই গভর্নর চট্টগ্রামে সফরে আসলে তাঁকে নিয়ে রমেশ শীল ব্যঙ্গাত্মক গান বাঁধেন। গানটি তখন মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে—

‘শোন ভাই আজগুবি খবর

মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন করে চট্টগ্রাম সফর।

দিনের তিনটা বেজে গেল পল্টনে সভা বসিল

হায় কি দেখিলাম কি ঘটিল।’

১৯৪৪ সালে রমেশ শীল কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে তাঁকে ‘বঙ্গের শ্রেষ্ঠতম কবিয়াল’ উপাধি দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের পক্ষে অবস্থান নেন। পরে সেই সরকার ভেঙে দেওয়া হলে, অন্যদের সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করা হয়। তাঁর লেখা ‘ভোট রহস্য’ বইটিও তখন সরকার বাজেয়াপ্ত করে।

এর ফলে তাঁকে দীর্ঘদিন জেলে থাকতে হয়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরোধিতা করায় তাঁর ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। জীবনের শেষ দিকে তিনি কঠিন অর্থকষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন।

রমেশ শীলের জীবনের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষ। সারাজীবন তিনি লিখেছেন মানুষের কথা, স্বপ্ন দেখেছেন বৈষম্যহীন একটি সমাজের। মানুষের মুক্তির জন্যই তিনি কলম ধরেছিলেন, গান করেছিলেন। এর বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

জীবিত অবস্থায় তিনি অনেক সম্মাননাও পেয়েছেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকায় কারাগারে থাকা অবস্থায় সহবন্দীরা তাঁকে সংবর্ধনা দেন। ১৯৬২ সালে বুলবুল একাডেমি এবং ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামে তিনি নাগরিক সংবর্ধনা পান। তবে এসব পুরস্কার বা সম্মাননা তাকে খুব একটা টানেনি। ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সম্পর্কিত