জেনে অবাক হবেন যে ১০০-১৫০ বছর আগে বৃহত্তর ঢাকায় অর্ধেকের বেশি মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হতো শুধু ‘জ্বর’। চৌকিদারের খাতায় গড়মিল পরিসংখ্যান, দূষিত পানি, ভয়াবহ কলেরা আর সীমিত চিকিৎসা মিলিয়ে কেমন ছিল সেই সময়ের জনস্বাস্থ্য? ১৯১২ সালে প্রকাশিত বি সি অ্যালান-এর ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ঢাকা)’-এর তথ্য ঘেঁটে এই লেখায় জানা যাবে সেই সময়ের রোগব্যাধি, চিকিৎসাব্যবস্থা, স্যানিটেশন সংকট এবং মানুষের জীবনযাপনের বাস্তবতা সম্পর্কে।
গৌতম কে শুভ

ব্রিটিশ আমলে ১৯১২ সালে প্রকাশিত ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ঢাকা)’ যেন এক বিস্ময়কর সময়দর্পণ। এর পাতা উল্টালেই ধরা পড়ে এক শতাব্দীরও বেশি আগের ঢাকার জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থার এক অচেনা চিত্র।
আজকের ঢাকা যেখানে আধুনিক চিকিৎসা, পরিশোধিত পানি ও উন্নত স্যানিটেশনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেকালের ঢাকা ছিল একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতায় ঘেরা। নদী, বন্যা ও বিস্তীর্ণ জলরাশি চারপাশের পরিবেশকে প্রাকৃতিকভাবে শুদ্ধ করত, মানুষকে রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করত—এমন বিশ্বাস ঢাকাবাসীর মনে তখন প্রবল ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে অপরিকল্পিত বসতি, দূষিত পানির ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অজ্ঞতা বারবার সেই প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবলয়কে ভেঙে দিত।
শত বছর আগের ঢাকায় জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থা বোঝার জন্য শুধু রোগের তালিকা দেখা যথেষ্ট নয়। কীভাবে জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখা হতো, মানুষ কীভাবে রোগব্যাধিকে সংজ্ঞায়িত করত এবং কেমন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল—এই সবকিছুর সমন্বয়েই সেকালের প্রকৃত চিত্রটি ফুটে ওঠে।
সেকালে জন্ম ও মৃত্যুর হিসাব রাখার কোনো নির্ভুল বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছিল না। ১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন প্রথমবারের মতো মৃত্যুর হিসাব সংগ্রহের দায়িত্ব দেয় চৌকিদারদের ওপর। এরপর ১৮৭৬ সালে জন্মের তথ্য সংগ্রহ শুরু হলেও তা এতটাই ত্রুটিপূর্ণ ছিল যে শহর এলাকার বাইরে এই ব্যবস্থা অচিরেই বাতিল করতে হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ১৮৯২ সালে ঢাকার গ্রামাঞ্চলে পুনরায় জন্মের হিসাব রাখা চালু হয়।
ব্যবস্থাটা ছিল মোটামুটি এ রকম—চৌকিদাররা থানায় গিয়ে জন্ম-মৃত্যুর তথ্য জানাতেন। আর সেখান থেকে প্রতি মাসে একটি রিপোর্ট পাঠানো হতো সিভিল সার্জনের কাছে। এই রিপোর্ট যাচাই করার দায়িত্ব ছিল টিকাদান বিভাগের কর্মকর্তাদের।
কিন্তু বাস্তবে এই পুরো ব্যবস্থার পরতে পরতে ছিল বড় ধরনের গলদ। অনেক জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্ত হতো না, আবার কোথাও কোথাও অস্বাভাবিকভাবে কম সংখ্যা দেখানো হতো। ফলে সরকারি হিসাব আর বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়।
এই পরিসংখ্যানগত গড়মিল কতটা প্রকট ছিল, তা সেকালের সাভার ও নবাবগঞ্জের তুলনামূলক চিত্র থেকে স্পষ্ট হয়। দুটি অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থা ও জীবনযাত্রা প্রায় অভিন্ন হলেও সরকারি খাতায় সাভারে জন্মহার দেখানো হয়েছিল হাজারে ৫১ দশমিক ৯৮, আর নবাবগঞ্জে মাত্র ২৮ দশমিক ৯০। মৃত্যুহারেও ছিল এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এমন বিস্তর অসামঞ্জস্য তৎকালীন প্রশাসনকেও স্বীকার করতে বাধ্য করে যে এই পরিসংখ্যান পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
তবে ব্রিটিশ প্রশাসনের একটি সাধারণ মানদণ্ড ছিল—যে এলাকায় জন্মহার মৃত্যুহারের চেয়ে বেশি, সেখানে জনস্বাস্থ্য তুলনামূলক স্থিতিশীল বলে ধরে নেওয়া হতো।
হিসাবের যাবতীয় সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তৎকালীন ঢাকা জেলা ছিল গোটা বঙ্গপ্রদেশের অন্যতম স্বাস্থ্যকর অঞ্চল। ১৮৮৪ ও ১৮৯১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ১৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। ১৯০১ সালেও এই বৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা গোটা প্রদেশের গড় বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক বেশি।
এই ইতিবাচক জনস্বাস্থ্যের পেছনে স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসন সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিত প্রকৃতিকে। নদীবহুল ভূপ্রকৃতি, বর্ষার প্লাবন এবং বিস্তীর্ণ জলরাশি এক ধরনের প্রাকৃতিক পরিশোধন প্রক্রিয়া তৈরি করত। বন্যার তীব্র স্রোত নিচু জমির সমস্ত ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে যেত।
একইসঙ্গে বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর দিয়ে বয়ে আসা শীতল বাতাস মানুষের শরীরকে রোগ প্রতিরোধে সহায়ক করে তুলত। এই ধারণা শুধু লোকজ বিশ্বাসেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্রিটিশ গেজেটিয়ারের তথ্যমতে প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণেও এর প্রতিফলন পাওয়া যায়।
প্রকৃতির এই আশীর্বাদের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভৌগোলিক বিপদও। যেখানে পানি আশীর্বাদ, সেখানেই তা অভিশাপও। বিশেষ করে যেসব স্থানে পানি জমে থাকত, কিন্তু নির্গমনের পথ ছিল না, সেখানেই জন্ম নিত মরণব্যাধি। ঢাকার মানিকগঞ্জ ও মধুপুর অঞ্চলে এই সংকট ছিল সবচেয়ে প্রকট।

১৯১২ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, সেকালে অর্ধেকের বেশি মৃত্যুর কারণ হিসেবে কেবল ‘জ্বর’ শব্দটি লেখা হতো। কিন্তু এই জ্বর নির্দিষ্ট কোনো রোগ ছিল না। পরিবারের মানুষ ও হাতুড়ে চিকিৎসকেরা যেসব রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারত না, সেগুলোকেই সাধারণভাবে ‘জ্বর’ হিসেবে নথিভুক্ত করত।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মধুপুর জঙ্গল সংলগ্ন তখনকার কাপাসিয়া থানায় প্রতি হাজার মৃত্যুর মধ্যে ৮১৩ এবং রায়পুরায় ৭৩১ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে জ্বরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মানিকগঞ্জেও একই চিত্র বিরাজমান ছিল।
ব্রিটিশ কর্তাদের মতে, এর পেছনে মূল কারণ ছিল পরিবেশগত। পশ্চিমে ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদী পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। তার ওপর মাটির নিচে ‘নীল কাদামাটির’ শক্ত স্তর থাকার কারণে পানি মাটির গভীরে নামতে পারত না। সৃষ্ট এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা মশা ও রোগের বিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করত। এই অবস্থার কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে শরৎকালে, যখন বন্যার পানি নামতে শুরু করত, তখন এই জ্বরের প্রকোপ মহামারির আকার ধারণ করত।
কলেরা ছিল সেকালের ঢাকা অঞ্চলের অন্যতম ভয়ংকর প্রাণঘাতী রোগ। ধলেশ্বরী ও পদ্মার মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলোতে এই রোগ প্রতি বছর ফিরে আসত। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জ এলাকায় জনসংখ্যার চরম ঘনত্ব এবং নিরাপদ পানির তীব্র অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলত।
মানুষ তখন সাধারণ স্বাস্থ্যবিধির প্রতিও প্রায় সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। দূষিত পানি পান করতে হতো। পরিষ্কার নদী বা কুয়োর পানি পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা গ্রহণে অনেক মানুষের অনীহার কথা গেজেটিয়ারে উল্লেখ আছে। তখন পানি ফুটিয়ে বা ছেঁকে খাওয়ার ধারণা ছিল না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল পানির উৎস ও মলমূত্র ত্যাগের স্থানের নৈকট্য। অনেক ক্ষেত্রে যে পুকুর বা নদী থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করা হতো, তার পাশেই বা পানির ওপর মাচা করে পায়খানা তৈরি করা হতো। নদীর উন্মুক্ত পাড় ব্যবহৃত হতো শৌচাগার হিসেবে।
ঢাকা অঞ্চলের গ্রামগুলো নদীর পাড় ঘেঁষে অত্যন্ত ঘনভাবে গড়ে ওঠায় একবার কলেরার সংক্রমণ শুরু হলে তা খুব দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ত। মাছি এবং রোগীর ব্যবহৃত নোংরা কাপড়ের মাধ্যমে সংক্রমণ অনেক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ত। তবে মজার বিষয় হলো, জনাকীর্ণ ‘কার্তিক বারুণী মেলা’য় হাজারো মানুষ নৌকায় ও অস্থায়ী ঘরে বসবাস করলেও নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলার কারণে কলেরার প্রকোপ তুলনামূলক কম দেখা যেত।
১৮৭৬ সালে কলেরায় ৩০৫ এবং ১৮৮২ সালে ৫২৭ জন মারা যায়। ১৮৮২ সালের মহামারিতে ঢাকা শহরে চরম ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত মানুষ শহর ছেড়ে নৌকায় আশ্রয় নেয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং রাস্তায় রাস্তায় ধর্মীয় শোভাযাত্রাও বের হয়।
১৮৯৩ ও ১৮৯৫ সালে কলেরা ছিল পুরো জেলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ। ১৮৯৩ সালে ১৭ হাজার ৬১০ এবং ১৮৯৫ সালে ১৬ হাজার ৯৭০ জন মারা যায়। তবে ১৯১০ সালে ঢাকা শহরে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর কলেরায় মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত কমে ১৪১-এ নেমে আসে।
নারায়ণগঞ্জেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ১৯০৮ সালে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর আগে সেখানে প্রায়ই কলেরা ছড়াত। পরবর্তীতে এই ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়।
কলেরা ও জ্বর ছাড়াও আমাশয় ও ডায়রিয়া ছিল বহুল প্রচলিত রোগ। শহরাঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে এই রোগে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে প্লেগ মহামারির আকার নিলেও ঢাকা জেলা প্লেগ রোগ থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল। ১৮৯৯ সালে একটি সীমিত প্রাদুর্ভাবে কিছু মানুষ আক্রান্ত হওয়া ছাড়া এখানে প্লেগের বিস্তার ঘটেনি।
গুটিবসন্তে মৃত্যুহার ছিল বেশ কম, যার পেছনে টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। জেলায় প্রায় ১০০ জন টিকাদানকারী কাজ করতেন, যারা প্রতিটি টিকার জন্য দুই আনা করে পারিশ্রমিক নিতেন।
এ ছাড়া কৃমি, চর্মরোগ, হাঁপানি ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কুষ্ঠরোগের উপস্থিতিও ছিল, তবে প্রতি লাখে মাত্র ৩৯ জন এই রোগে আক্রান্ত হতো।
সেকালে ঢাকায় চিকিৎসাব্যবস্থার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে রবার্ট মিটফোর্ডের অর্থে প্রতিষ্ঠিত ‘মিটফোর্ড হাসপাতাল’। এই হাসপাতাল ধীরে ধীরে সমগ্র পূর্ববঙ্গ ও আসামের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়।

১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৮৬৭ সালে এখানে ৯২ শয্যা ছিল। ১৯০৭ সাল নাগাদ তা বেড়ে পুরুষদের জন্য ১৩৯ এবং নারীদের জন্য ৪২ শয্যায় উন্নীত হয়। একই প্রাঙ্গণে নারীদের জন্য ‘লেডি ডাফরিন হাসপাতাল’ও স্থাপিত হয়।
১৯০৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রায় ৪ হাজার ভর্তি রোগী এবং বহির্বিভাগে প্রায় ৩১ হাজার মানুষ চিকিৎসা নেয়। একই বছরে এখানে ৩ হাজার ৫১৫টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশাল অর্জন।
নারায়ণগঞ্জে ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল’। সেখানে ২০ পুরুষ ও ১০ নারী শয্যা ছিল। ১৯০৭ সালে এখানে ৬৫১ জন ভর্তি রোগী এবং প্রায় ১৭ হাজার বহির্বিভাগের রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করে। পুরো ঢাকা জেলায় মোট ২২টি ডিসপেনসারি বা চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল, তবে এর মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে রোগী ভর্তির ব্যবস্থা ছিল।
তখন চিকিৎসাব্যবস্থার বিস্তার ঘটলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল একেবারেই অপ্রতুল। ১৯০৭ সালে প্রতি দশ লাখ মানুষের জন্য ডিসপেনসারি ছিল মাত্র ৮টি। ১৯০১ সালের হিসাব অনুযায়ী, পুরো জেলায় মাত্র ১৬৪ ডিগ্রিধারী বা স্বীকৃত চিকিৎসক ছিলেন। এর বিপরীতে ২ হাজার ৬২৭ হাতুড়ে চিকিৎসক মানুষের চিকিৎসা করতেন।
১৯০১ সালে বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে মোট প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে রোগীর পরিসংখ্যান ছিল:
চর্মরোগ ও ঘা: প্রায় ৩০ হাজার
পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা ও ডায়রিয়া: ১৬ হাজার
ম্যালেরিয়া: ১২ হাজার ২০০
চোখ ও কানের রোগ: ৮ হাজার ২০০
শারীরিক আঘাত: ৬ হাজার
বাতজ্বর বা রিউম্যাটিজম: ৪ হাজার ২০০
কৃমি: ৪ হাজার
আমাশয়: ২ হাজার ৮০০
যৌনরোগ: ২ হাজার ৭০০
তৎকালীন ঢাকার চিকিৎসাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় বৈষম্য ছিল শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে। জেলার মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরে বাস করত, কিন্তু ১৯০৭ সালে চিকিৎসা নেওয়া মোট রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল এই দুই শহরের চিকিৎসাকেন্দ্রের সুবিধাভোগী।
তবে চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও শহরের স্যানিটারি বা পরিচ্ছন্নতার অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক ছিল না। প্রধান সড়কগুলো কিছুটা পরিষ্কার রাখা হলেও ভেতরের অলিগলিগুলো ছিল আবর্জনার স্তূপ। গেজেটিয়ারের তথ্যমতে, শহরে প্রায় ১৩ হাজার ব্যক্তিগত এবং ১২ পাবলিক টয়লেট ছিল। তবে বহু মানুষের কোনো স্যানিটেশন সুবিধাই ছিল না।
শহরের ড্রেনেজ বা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব ছিল প্রকট। অনেক জায়গায় পাকা ড্রেন থাকলেও তার কোনো নির্গমন পথ বা আউটলেট ছিল না। ফলে ড্রেনগুলো ময়লা ও মলমূত্রে ভরে স্থির হয়ে থাকত। সংকীর্ণ গলি, অন্ধকার ও বাতাসহীন পরিবেশ রোগজীবাণু ছড়ানোর অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি করত। ঢাকা অঞ্চলের গ্রাম এলাকার বাড়ির পাশে খোঁড়া গর্তে পানি জমে মশার বংশবিস্তার ঘটত এবং উন্মুক্ত নদী-নালা শৌচাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
সব মিলিয়ে ১৯১২ সালের ব্রিটিশ গেজেটিয়ারের এই খতিয়ান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও চিকিৎসাগত উন্নতি সাধিত হলেও, এক শতাব্দী আগের ঢাকার জনস্বাস্থ্যের মূল অন্তরায় ছিল প্রতিকূল পরিবেশ, ভঙ্গুর স্যানিটেশন এবং জীবনযাপনগত অজ্ঞতা।

ব্রিটিশ আমলে ১৯১২ সালে প্রকাশিত ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ঢাকা)’ যেন এক বিস্ময়কর সময়দর্পণ। এর পাতা উল্টালেই ধরা পড়ে এক শতাব্দীরও বেশি আগের ঢাকার জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থার এক অচেনা চিত্র।
আজকের ঢাকা যেখানে আধুনিক চিকিৎসা, পরিশোধিত পানি ও উন্নত স্যানিটেশনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেকালের ঢাকা ছিল একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতায় ঘেরা। নদী, বন্যা ও বিস্তীর্ণ জলরাশি চারপাশের পরিবেশকে প্রাকৃতিকভাবে শুদ্ধ করত, মানুষকে রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করত—এমন বিশ্বাস ঢাকাবাসীর মনে তখন প্রবল ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে অপরিকল্পিত বসতি, দূষিত পানির ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অজ্ঞতা বারবার সেই প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবলয়কে ভেঙে দিত।
শত বছর আগের ঢাকায় জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থা বোঝার জন্য শুধু রোগের তালিকা দেখা যথেষ্ট নয়। কীভাবে জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখা হতো, মানুষ কীভাবে রোগব্যাধিকে সংজ্ঞায়িত করত এবং কেমন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল—এই সবকিছুর সমন্বয়েই সেকালের প্রকৃত চিত্রটি ফুটে ওঠে।
সেকালে জন্ম ও মৃত্যুর হিসাব রাখার কোনো নির্ভুল বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছিল না। ১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন প্রথমবারের মতো মৃত্যুর হিসাব সংগ্রহের দায়িত্ব দেয় চৌকিদারদের ওপর। এরপর ১৮৭৬ সালে জন্মের তথ্য সংগ্রহ শুরু হলেও তা এতটাই ত্রুটিপূর্ণ ছিল যে শহর এলাকার বাইরে এই ব্যবস্থা অচিরেই বাতিল করতে হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ১৮৯২ সালে ঢাকার গ্রামাঞ্চলে পুনরায় জন্মের হিসাব রাখা চালু হয়।
ব্যবস্থাটা ছিল মোটামুটি এ রকম—চৌকিদাররা থানায় গিয়ে জন্ম-মৃত্যুর তথ্য জানাতেন। আর সেখান থেকে প্রতি মাসে একটি রিপোর্ট পাঠানো হতো সিভিল সার্জনের কাছে। এই রিপোর্ট যাচাই করার দায়িত্ব ছিল টিকাদান বিভাগের কর্মকর্তাদের।
কিন্তু বাস্তবে এই পুরো ব্যবস্থার পরতে পরতে ছিল বড় ধরনের গলদ। অনেক জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্ত হতো না, আবার কোথাও কোথাও অস্বাভাবিকভাবে কম সংখ্যা দেখানো হতো। ফলে সরকারি হিসাব আর বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়।
এই পরিসংখ্যানগত গড়মিল কতটা প্রকট ছিল, তা সেকালের সাভার ও নবাবগঞ্জের তুলনামূলক চিত্র থেকে স্পষ্ট হয়। দুটি অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থা ও জীবনযাত্রা প্রায় অভিন্ন হলেও সরকারি খাতায় সাভারে জন্মহার দেখানো হয়েছিল হাজারে ৫১ দশমিক ৯৮, আর নবাবগঞ্জে মাত্র ২৮ দশমিক ৯০। মৃত্যুহারেও ছিল এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এমন বিস্তর অসামঞ্জস্য তৎকালীন প্রশাসনকেও স্বীকার করতে বাধ্য করে যে এই পরিসংখ্যান পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
তবে ব্রিটিশ প্রশাসনের একটি সাধারণ মানদণ্ড ছিল—যে এলাকায় জন্মহার মৃত্যুহারের চেয়ে বেশি, সেখানে জনস্বাস্থ্য তুলনামূলক স্থিতিশীল বলে ধরে নেওয়া হতো।
হিসাবের যাবতীয় সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তৎকালীন ঢাকা জেলা ছিল গোটা বঙ্গপ্রদেশের অন্যতম স্বাস্থ্যকর অঞ্চল। ১৮৮৪ ও ১৮৯১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ১৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। ১৯০১ সালেও এই বৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা গোটা প্রদেশের গড় বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক বেশি।
এই ইতিবাচক জনস্বাস্থ্যের পেছনে স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসন সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিত প্রকৃতিকে। নদীবহুল ভূপ্রকৃতি, বর্ষার প্লাবন এবং বিস্তীর্ণ জলরাশি এক ধরনের প্রাকৃতিক পরিশোধন প্রক্রিয়া তৈরি করত। বন্যার তীব্র স্রোত নিচু জমির সমস্ত ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে যেত।
একইসঙ্গে বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর দিয়ে বয়ে আসা শীতল বাতাস মানুষের শরীরকে রোগ প্রতিরোধে সহায়ক করে তুলত। এই ধারণা শুধু লোকজ বিশ্বাসেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্রিটিশ গেজেটিয়ারের তথ্যমতে প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণেও এর প্রতিফলন পাওয়া যায়।
প্রকৃতির এই আশীর্বাদের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভৌগোলিক বিপদও। যেখানে পানি আশীর্বাদ, সেখানেই তা অভিশাপও। বিশেষ করে যেসব স্থানে পানি জমে থাকত, কিন্তু নির্গমনের পথ ছিল না, সেখানেই জন্ম নিত মরণব্যাধি। ঢাকার মানিকগঞ্জ ও মধুপুর অঞ্চলে এই সংকট ছিল সবচেয়ে প্রকট।

১৯১২ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, সেকালে অর্ধেকের বেশি মৃত্যুর কারণ হিসেবে কেবল ‘জ্বর’ শব্দটি লেখা হতো। কিন্তু এই জ্বর নির্দিষ্ট কোনো রোগ ছিল না। পরিবারের মানুষ ও হাতুড়ে চিকিৎসকেরা যেসব রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারত না, সেগুলোকেই সাধারণভাবে ‘জ্বর’ হিসেবে নথিভুক্ত করত।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মধুপুর জঙ্গল সংলগ্ন তখনকার কাপাসিয়া থানায় প্রতি হাজার মৃত্যুর মধ্যে ৮১৩ এবং রায়পুরায় ৭৩১ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে জ্বরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মানিকগঞ্জেও একই চিত্র বিরাজমান ছিল।
ব্রিটিশ কর্তাদের মতে, এর পেছনে মূল কারণ ছিল পরিবেশগত। পশ্চিমে ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদী পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। তার ওপর মাটির নিচে ‘নীল কাদামাটির’ শক্ত স্তর থাকার কারণে পানি মাটির গভীরে নামতে পারত না। সৃষ্ট এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা মশা ও রোগের বিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করত। এই অবস্থার কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে শরৎকালে, যখন বন্যার পানি নামতে শুরু করত, তখন এই জ্বরের প্রকোপ মহামারির আকার ধারণ করত।
কলেরা ছিল সেকালের ঢাকা অঞ্চলের অন্যতম ভয়ংকর প্রাণঘাতী রোগ। ধলেশ্বরী ও পদ্মার মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলোতে এই রোগ প্রতি বছর ফিরে আসত। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জ এলাকায় জনসংখ্যার চরম ঘনত্ব এবং নিরাপদ পানির তীব্র অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলত।
মানুষ তখন সাধারণ স্বাস্থ্যবিধির প্রতিও প্রায় সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। দূষিত পানি পান করতে হতো। পরিষ্কার নদী বা কুয়োর পানি পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা গ্রহণে অনেক মানুষের অনীহার কথা গেজেটিয়ারে উল্লেখ আছে। তখন পানি ফুটিয়ে বা ছেঁকে খাওয়ার ধারণা ছিল না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল পানির উৎস ও মলমূত্র ত্যাগের স্থানের নৈকট্য। অনেক ক্ষেত্রে যে পুকুর বা নদী থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করা হতো, তার পাশেই বা পানির ওপর মাচা করে পায়খানা তৈরি করা হতো। নদীর উন্মুক্ত পাড় ব্যবহৃত হতো শৌচাগার হিসেবে।
ঢাকা অঞ্চলের গ্রামগুলো নদীর পাড় ঘেঁষে অত্যন্ত ঘনভাবে গড়ে ওঠায় একবার কলেরার সংক্রমণ শুরু হলে তা খুব দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ত। মাছি এবং রোগীর ব্যবহৃত নোংরা কাপড়ের মাধ্যমে সংক্রমণ অনেক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ত। তবে মজার বিষয় হলো, জনাকীর্ণ ‘কার্তিক বারুণী মেলা’য় হাজারো মানুষ নৌকায় ও অস্থায়ী ঘরে বসবাস করলেও নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলার কারণে কলেরার প্রকোপ তুলনামূলক কম দেখা যেত।
১৮৭৬ সালে কলেরায় ৩০৫ এবং ১৮৮২ সালে ৫২৭ জন মারা যায়। ১৮৮২ সালের মহামারিতে ঢাকা শহরে চরম ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত মানুষ শহর ছেড়ে নৌকায় আশ্রয় নেয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং রাস্তায় রাস্তায় ধর্মীয় শোভাযাত্রাও বের হয়।
১৮৯৩ ও ১৮৯৫ সালে কলেরা ছিল পুরো জেলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ। ১৮৯৩ সালে ১৭ হাজার ৬১০ এবং ১৮৯৫ সালে ১৬ হাজার ৯৭০ জন মারা যায়। তবে ১৯১০ সালে ঢাকা শহরে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর কলেরায় মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত কমে ১৪১-এ নেমে আসে।
নারায়ণগঞ্জেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ১৯০৮ সালে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর আগে সেখানে প্রায়ই কলেরা ছড়াত। পরবর্তীতে এই ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়।
কলেরা ও জ্বর ছাড়াও আমাশয় ও ডায়রিয়া ছিল বহুল প্রচলিত রোগ। শহরাঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে এই রোগে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে প্লেগ মহামারির আকার নিলেও ঢাকা জেলা প্লেগ রোগ থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল। ১৮৯৯ সালে একটি সীমিত প্রাদুর্ভাবে কিছু মানুষ আক্রান্ত হওয়া ছাড়া এখানে প্লেগের বিস্তার ঘটেনি।
গুটিবসন্তে মৃত্যুহার ছিল বেশ কম, যার পেছনে টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। জেলায় প্রায় ১০০ জন টিকাদানকারী কাজ করতেন, যারা প্রতিটি টিকার জন্য দুই আনা করে পারিশ্রমিক নিতেন।
এ ছাড়া কৃমি, চর্মরোগ, হাঁপানি ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কুষ্ঠরোগের উপস্থিতিও ছিল, তবে প্রতি লাখে মাত্র ৩৯ জন এই রোগে আক্রান্ত হতো।
সেকালে ঢাকায় চিকিৎসাব্যবস্থার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে রবার্ট মিটফোর্ডের অর্থে প্রতিষ্ঠিত ‘মিটফোর্ড হাসপাতাল’। এই হাসপাতাল ধীরে ধীরে সমগ্র পূর্ববঙ্গ ও আসামের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়।

১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৮৬৭ সালে এখানে ৯২ শয্যা ছিল। ১৯০৭ সাল নাগাদ তা বেড়ে পুরুষদের জন্য ১৩৯ এবং নারীদের জন্য ৪২ শয্যায় উন্নীত হয়। একই প্রাঙ্গণে নারীদের জন্য ‘লেডি ডাফরিন হাসপাতাল’ও স্থাপিত হয়।
১৯০৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রায় ৪ হাজার ভর্তি রোগী এবং বহির্বিভাগে প্রায় ৩১ হাজার মানুষ চিকিৎসা নেয়। একই বছরে এখানে ৩ হাজার ৫১৫টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশাল অর্জন।
নারায়ণগঞ্জে ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল’। সেখানে ২০ পুরুষ ও ১০ নারী শয্যা ছিল। ১৯০৭ সালে এখানে ৬৫১ জন ভর্তি রোগী এবং প্রায় ১৭ হাজার বহির্বিভাগের রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করে। পুরো ঢাকা জেলায় মোট ২২টি ডিসপেনসারি বা চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল, তবে এর মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে রোগী ভর্তির ব্যবস্থা ছিল।
তখন চিকিৎসাব্যবস্থার বিস্তার ঘটলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল একেবারেই অপ্রতুল। ১৯০৭ সালে প্রতি দশ লাখ মানুষের জন্য ডিসপেনসারি ছিল মাত্র ৮টি। ১৯০১ সালের হিসাব অনুযায়ী, পুরো জেলায় মাত্র ১৬৪ ডিগ্রিধারী বা স্বীকৃত চিকিৎসক ছিলেন। এর বিপরীতে ২ হাজার ৬২৭ হাতুড়ে চিকিৎসক মানুষের চিকিৎসা করতেন।
১৯০১ সালে বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে মোট প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে রোগীর পরিসংখ্যান ছিল:
চর্মরোগ ও ঘা: প্রায় ৩০ হাজার
পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা ও ডায়রিয়া: ১৬ হাজার
ম্যালেরিয়া: ১২ হাজার ২০০
চোখ ও কানের রোগ: ৮ হাজার ২০০
শারীরিক আঘাত: ৬ হাজার
বাতজ্বর বা রিউম্যাটিজম: ৪ হাজার ২০০
কৃমি: ৪ হাজার
আমাশয়: ২ হাজার ৮০০
যৌনরোগ: ২ হাজার ৭০০
তৎকালীন ঢাকার চিকিৎসাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় বৈষম্য ছিল শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে। জেলার মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরে বাস করত, কিন্তু ১৯০৭ সালে চিকিৎসা নেওয়া মোট রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল এই দুই শহরের চিকিৎসাকেন্দ্রের সুবিধাভোগী।
তবে চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও শহরের স্যানিটারি বা পরিচ্ছন্নতার অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক ছিল না। প্রধান সড়কগুলো কিছুটা পরিষ্কার রাখা হলেও ভেতরের অলিগলিগুলো ছিল আবর্জনার স্তূপ। গেজেটিয়ারের তথ্যমতে, শহরে প্রায় ১৩ হাজার ব্যক্তিগত এবং ১২ পাবলিক টয়লেট ছিল। তবে বহু মানুষের কোনো স্যানিটেশন সুবিধাই ছিল না।
শহরের ড্রেনেজ বা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব ছিল প্রকট। অনেক জায়গায় পাকা ড্রেন থাকলেও তার কোনো নির্গমন পথ বা আউটলেট ছিল না। ফলে ড্রেনগুলো ময়লা ও মলমূত্রে ভরে স্থির হয়ে থাকত। সংকীর্ণ গলি, অন্ধকার ও বাতাসহীন পরিবেশ রোগজীবাণু ছড়ানোর অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি করত। ঢাকা অঞ্চলের গ্রাম এলাকার বাড়ির পাশে খোঁড়া গর্তে পানি জমে মশার বংশবিস্তার ঘটত এবং উন্মুক্ত নদী-নালা শৌচাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
সব মিলিয়ে ১৯১২ সালের ব্রিটিশ গেজেটিয়ারের এই খতিয়ান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও চিকিৎসাগত উন্নতি সাধিত হলেও, এক শতাব্দী আগের ঢাকার জনস্বাস্থ্যের মূল অন্তরায় ছিল প্রতিকূল পরিবেশ, ভঙ্গুর স্যানিটেশন এবং জীবনযাপনগত অজ্ঞতা।

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কমে যায় স্মৃতিশক্তি, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
২ ঘণ্টা আগে
অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য ফোনটা হাতে নিতেই ভাবি, ‘আচ্ছা, একটু রিলস দেখি… মাত্র পাঁচ মিনিট।’ তারপর কী হয়? পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘণ্টা হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। যখন হুঁশ ফেরে, দেখি রাত অনেক হয়ে গেছে।
৭ ঘণ্টা আগে
নির্মাতা নূরুল আলম আতিকের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে এসেছে তাঁর শুরুর দিন, তারেক মাসুদের সঙ্গে পরিচয়, এনালগ থেকে ডিজিটাল হয়ে ওঠার সময়ের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানের এআই যুগ নিয়ে ভাবনা। একই সঙ্গে তিনি নতুন নির্মাতাদের জন্যও একটি কথা মনে করিয়ে দেন—নিজের মাটির গল্প, নিজের ভাষায় বলার সাহসই সবচেয়ে জরুরি। ঢাকা স্ট্রিমে
১ দিন আগে
আপনার জীবনের প্রথম স্মৃতি কোনটি? খুব বেশিকিছু হয়ত আপনার মনে পড়বে না। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দুই বা তিন বছর বয়সের আগের কোনো কথা আমাদের মনে থাকে না। কখনো কি ভেবে দেখেছেন কেন এমন হয়?
১ দিন আগে