গঙ্গা প্রশ্ন: পানি, জ্বালানি, নদীর ওপর বাংলাদেশের অধিকার

২০২৬ সালের গঙ্গাচুক্তি নবায়নের প্রেক্ষাপটে তিন পর্বের একটি ধারাবাহিক প্রকাশনা। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৬: ৫৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা স্ট্রিম আয়োজিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি বিষয়ক একটি সময়োপযোগী গোলটেবিল আলোচনার পর এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশের নদীকূটনীতি এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ‘গঙ্গা টক: ইউএন ওয়াটার কনভেনশন ১৯৯৪’ শীর্ষক এই আলোচনায় আইন, কৌশলগত বিশ্লেষণ, পরিবেশ এবং নাগরিক সমাজবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হন—যাদের সবার কেন্দ্রীয় উদ্বেগ ছিল একটি বিষয়েই। তা হলো, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে, এবং এর নবায়নকে কোনোভাবেই একটি রুটিন আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যাবে না।

ঢাকা স্ট্রিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের আলোচনাগত অবস্থান শক্তিশালী করতে পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, কারিগরি সংস্থা এবং নাগরিক-সমাজের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে সক্রিয় করার আহ্বান জানান। এই যৌথ উদ্বেগ ও তাগিদ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে, গঙ্গা বিষয়ক বিতর্ককে কনফারেন্স কক্ষের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে সার্বজনীন বিতর্ক, জন-আলোচনা ও সিদ্ধান্তের প্রস্তুতির নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে আসার লক্ষ্যে তিন পর্বের এই ধারাবাহিক প্রকাশনা রচিত হলো।

এই ধারাবাহিক প্রকাশনায় তিনটি পরস্পর-সম্পর্কিত পর্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম পর্বে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান উজান–ভাটির কাঠামোগত ঐতিহাসিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে চুক্তিটিকে স্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে ইতিহাস বিষয়টির থেকে আইনী দিকে আলোকপাত করা হয়েছে, যেখানে বিশেষভাবে ফারাক্কা ব্যারাজকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পানি আইন ও প্রচলিত রীতিনীতির আলোকে উজানে একতরফা হস্তক্ষেপের বৈধতার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তৃতীয় পর্বে ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে একটি সংক্ষিপ্ত নীতিগত রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চাপের প্রেক্ষাপটে পানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌম ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের যে কৌশলগত অগ্রাধিকারসমূহ অনুসরণ করা প্রয়োজন, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। সম্মিলিতভাবে এই পর্বগুলো যুক্তি উপস্থাপন করে যে, গঙ্গা নদীর ভবিষ্যৎ কেবল একটি জলবিদ্যাগত প্রশ্ন নয়; বরং এটি জাতীয় অস্তিত্ব, আইনগত ন্যায়বিচার এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

চিত্রের বর্ণনা

মানচিত্রটি চীন, ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার জুড়ে বিস্তৃত গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা অববাহিকার আন্তঃসীমান্ত চরিত্র উপস্থাপন করে এবং উজান–ভাটির অসমতাসমূহকে তুলে ধরে, যা আঞ্চলিক পানি বণ্টন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোর মূল ভিত্তি বুঝতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

চিত্র ১: গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা নদী অববাহিকা, যেখানে প্রধান নদীসমূহ, আন্তর্জাতিক সীমানা, সেচ অঞ্চলসমূহ এবং ফারাক্কা ব্যারাজসহ গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদ অবকাঠামো প্রদর্শিত হয়েছে।

১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি কী?

বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তার ওপর ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি-এর মতো গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব খুব কম দ্বিপাক্ষিক চুক্তিই ফেলেছে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা ব্যারাজ পয়েন্টে গঙ্গা নদীর প্রবাহ বণ্টনের নীতিমালা নির্ধারণ করে। চুক্তিটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল উভয় পক্ষের জন্য ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করা—বিশেষত নিম্ন অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য—এবং একই সঙ্গে উজান অঞ্চলের উন্নয়ন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা।

এই চুক্তির পেছনে রয়েছে ফারাক্কা বাঁধকে কেন্দ্র করে কয়েক দশকের বিরোধ। ভারত ১৯৭৫ সালে একতরফাভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে, যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। চুক্তিতে নির্ধারিত বণ্টন সূত্র অনুযায়ী, ফারাক্কায় প্রতি দশ দিন অন্তর নদীর প্রবাহ পরিমাপ করা হবে। প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে পানি সমানভাবে ভাগ করা হবে। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে ৩৫ হাজার কিউসেক পাবে এবং অবশিষ্ট অংশ ভারত গ্রহণ করবে। প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত সর্বোচ্চ ৪০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি প্রত্যাহার করতে পারবে এবং অবশিষ্ট প্রবাহ বাংলাদেশে আসবে। বিশেষভাবে সংকটপূর্ণ শুষ্ক সময়কাল—১১ মার্চ থেকে ১০ মে—চুক্তিতে একটি পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে উভয় দেশ দশ দিন অন্তর পর্যায়ক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি গ্রহণ করে।

বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই চুক্তিটি মূলত একটি পরিমাণভিত্তিক পানি বণ্টন ব্যবস্থা হিসেবে নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ বিন্দুতে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এটি বাংলাদেশের জন্য পরিবেশগত প্রয়োজনীয় ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করে না। এছাড়াও উজানে ক্রমবর্ধমান পানি প্রত্যাহার, পলি প্রবাহের পরিবর্তন কিংবা গড়াই নদীর মতো শাখা নদীগুলোর স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনায় আনে না। তদুপরি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অস্থিরতা কিংবা সমগ্র অববাহিকাজুড়ে জলপ্রবাহ (হাইড্রোলজিক) পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো কোনো অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা এতে অন্তর্ভুক্ত নেই—যেসব সীমাবদ্ধতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বর্তমান পরিস্থিতি

প্রায় তিন দশক অতিক্রান্ত হলেও, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার আগ্রাসন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতির প্রেক্ষাপটে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিটি দক্ষিণ এশিয়ায় ন্যায়সঙ্গত আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাকেই প্রতিফলিত করে। চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার প্রাক্কালে উভয় দেশই বর্তমানে পর্যালোচনা ও পুনঃআলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, যা এই সময়টিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিটি ডিসেম্বর ২০২৬-এর পূর্বেই সংশোধনসহ নবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অস্তিত্বগত ঝুঁকির মুখে থাকা নিম্ন অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নৈতিক, আইনগত ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রস্তুতিসহ আলোচনায় প্রবেশ করা উচিত।

বাংলাদেশ নবায়ন প্রক্রিয়া সহজতর করার লক্ষ্যে উভয় পক্ষ থেকে তিনজন করে সদস্য নিয়ে একটি যৌথ কারিগরি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা দীর্ঘমেয়াদি নবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, কারণ পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য পূর্বানুমেয়তা ও স্থিতিশীলতা অত্যাবশ্যক। ভারত নীতিগতভাবে চুক্তি নবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করলেও, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যভিত্তিক ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থের বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখছে।

বাংলাদেশের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শুষ্ক মৌসুমে অধিকতর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা—বিশেষত সংকটকালীন সময়ে বরাদ্দ ৪০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা—এবং ধরলা, দুধকুমার, গোমতী, খোয়াই, মনু ও মুহুরীসহ অভিন্ন নদীগুলোর বিষয়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণ। এছাড়া তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা, যৌথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, বন্যা পূর্বাভাস এবং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনাও বাংলাদেশের প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে, ভারত নিজস্ব সেচ, নৌপরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে কিছু সমন্বয়ের বিষয় উল্লেখ করেছে, তবে উজান অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করতে পারে—এমন প্রতিশ্রুতি প্রদানে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান হাইড্রোলজিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই এই পারস্পরিক ভিন্নমুখী অগ্রাধিকারগুলো আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

প্রায়োগিক গবেষণায় দেখা যায়, চুক্তি কার্যকর থাকার সময়কাল (১৯৯৭–২০১৬) জুড়ে গঙ্গা নদীর শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং পরিবেশগত চাপ তীব্রতর হয়েছে। গঙ্গা–গড়াই নদী ব্যবস্থায় প্রবাহ হ্রাসের সঙ্গে চরম শুষ্ক বছরে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি অভ্যন্তরভাগে লবণাক্ততা বিস্তারের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক পাওয়া গেছে, যা জীব বৈচিত্র, কৃষি, পানীয় জল এবং জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

ভবিষ্যৎ চিত্র কী হতে পারে?

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পূর্বাভাস দেওয়ার আগে এ কথা স্বীকার করা জরুরি যে, গঙ্গা চুক্তির প্রভাব কেবল পানি ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশগত সহনশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত—যা বদ্বীপপ্রধান রাষ্ট্রসমূহের সামনে উপস্থিত অপ্রথাগত নিরাপত্তা হুমকির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমে পানির অংশীদারত্ব বৃদ্ধি করে এমন একটি সংশোধিত বণ্টন কাঠামো পরিবেশগত ও সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট সুফল বয়ে আনতে পারে, যদিও ভারতের উজানভিত্তিক রাজ্যগুলোতে এর বিরোধিতা দেখা দিতে পারে। তবে স্বাধীন দুটি দেশের মধ্যে যখন কোন চুক্তি হয়, তার রাজ্যগুলোতে তদসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান সে দেশেরই করা উচিত। একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে তা কার্যকর হবে কেবল তখনই, যদি এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হাইড্রোলজিক রূপান্তর মোকাবিলার জন্য অভিযোজনমূলক পর্যালোচনা ব্যবস্থা সংযুক্ত থাকে। চুক্তির আওতায় আরও নদী অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে অববাহিকাভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে, যদিও এতে কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ার সুষ্ঠু সম্ভাবনাও রয়েছে।

একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর ও বাধ্যতামূলক বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া বিষয়ক চুক্তিতে উল্লেখিত অনুচ্ছেদের সংযোজন। স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে, সুপরিকল্পিত চুক্তি ধারাগুলিও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহের মানদণ্ড এবং জলবায়ু অভিযোজন-সংক্রান্ত বিষয়াবলির সংযোজন চুক্তির স্থিতিস্থাপকতা আরও জোরদার করতে পারে, তবে এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কারিগরি ঐকমত্য।

করণীয় কী?

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিটি ডিসেম্বর ২০২৬-এর পূর্বেই সংশোধনসহ নবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অস্তিত্বগত ঝুঁকির মুখে থাকা নিম্ন অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নৈতিক, আইনগত ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রস্তুতিসহ আলোচনায় প্রবেশ করা উচিত। এ পরিপ্রেক্ষিতে ধাপে ধাপে অগ্রগতি—যেমন তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা, অভিযোজনযোগ্য ধারা সংযোজন এবং শুষ্ক মৌসুমে নিশ্চিত পানি প্রবাহে সীমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধি—বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়।

অতিরিক্ত অভিন্ন নদীসমূহকে চুক্তির আওতায় আনার উদ্যোগ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শুরু করা যেতে পারে, যদিও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি সম্পাদনে সময় লাগতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য অগ্রগতি তখনই অর্থবহ ও টেকসই হবে, যখন তা স্বচ্ছ বাস্তবায়ন ব্যবস্থা, কার্যকর নজরদারি কাঠামো এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত সহযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে; অন্যথায় চুক্তি নবায়ন কেবল নীতিগত আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

পরিশেষে, এই নবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে দক্ষিণ এশিয়া কেবল পরিমাণভিত্তিক পানি বণ্টনের সংকীর্ণ কাঠামোতেই আবদ্ধ থাকবে, নাকি জলবায়ু সহনশীল ও অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতার পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার পানিতে ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকার কোনো কূটনৈতিক সুবিধার বিষয় নয়; বরং এটি পরিবেশগত টিকে থাকা, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং পরিবর্তনশীল জলবায়ু প্রেক্ষাপটে সার্বভৌম মর্যাদার প্রশ্ন।

এই উদ্বোধনী পর্বে যেমনটি প্রতিপন্ন হয়েছে, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি কেবল কিউসেক ও সময়সূচি নির্ধারণের একটি কারিগরি চুক্তি নয়; এটি ক্ষমতা, ভূগোল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্বারা গঠিত একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অসম উজান–ভাটির সম্পর্কের ফলাফল। তবে ইতিহাস ও হাইড্রোলজি এককভাবে বাংলাদেশের অবস্থানে নিহিত ঝুঁকিগুলো ব্যাখ্যা করতে সক্ষম নয়। চুক্তিটির অন্তরালে তাই একটি আরও গভীর প্রশ্ন অনিবার্যভাবে উঠে আসে—উজানে একতরফা হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ, আদৌ কি অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক পানি আইনের মূল নীতিসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে কূটনৈতিক আলোচনার গণ্ডি অতিক্রম করে আইনগত বিশ্লেষণে প্রবেশ করা দরকার। সে কারণেই দ্বিতীয় পর্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ইতিহাস থেকে আইনগত পর্যালোচনায় স্থানান্তরিত হবে। সেখানে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন, ইউএন ওয়াটারকোর্সেস কনভেনশন এবং প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক বিচারিক দৃষ্টান্তের আলোকে উজানে একতরফা বাঁধ নির্মাণের বৈধতা বিশ্লেষণ করা হবে—যাতে নির্ণয় করা যায়, ফারাক্কা সহযোগিতার প্রতীক, নাকি আন্তঃসীমান্ত আইনগত দায়বদ্ধতার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত।

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

সম্পর্কিত