নূরুল আলম আতিকের সাক্ষাৎকার

‘আমি তো ফেস্টিভ্যালের রুচি অনুযায়ী ছবি বানাতে পারি না’

নির্মাতা নূরুল আলম আতিকের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে এসেছে তাঁর শুরুর দিন, তারেক মাসুদের সঙ্গে পরিচয়, এনালগ থেকে ডিজিটাল হয়ে ওঠার সময়ের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানের এআই যুগ নিয়ে ভাবনা। একই সঙ্গে তিনি নতুন নির্মাতাদের জন্যও একটি কথা মনে করিয়ে দেন—নিজের মাটির গল্প, নিজের ভাষায় বলার সাহসই সবচেয়ে জরুরি। ঢাকা স্ট্রিমের পক্ষ থেকে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হুমায়ূন শফিক।

নূরুল আলম আতিক। ছবি নির্মাতার সৌজন্যে

ঢাকা স্ট্রিম: আপনার সৃজনশীল যাত্রার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? সিনেমার প্রতি কৌতূহল কি শুরু থেকেই ছিল?

নূরুল আলম আতিক: শুরুর দিকে আসলে সিনেমার চেয়ে টেকনোলজির প্রতি আমার একটা প্রাথমিক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। তখন ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর কিংবা আফটার ইফেক্টসের মতো মোশন গ্রাফিক্সের সফটওয়্যারগুলো নতুন পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো শিখতে শিখতে এক ধরণের ধারণা হলো যে স্থিরচিত্রকে কীভাবে চলমান ইমেজে রূপান্তর করা যায়।

পরবর্তী সময়ে সিনেমাতে যে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, সেটার একটা ওরিয়েন্টেশন আমি ওখান থেকেই পেয়েছিলাম। তবে সরাসরি সিনেমায় যুক্ত হওয়াটা ছিল আরও পরের ঘটনা।

ঢাকা স্ট্রিম: তারেক মাসুদের সঙ্গে আপনার পরিচয় এবং তাঁর অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

নূরুল আলম আতিক: তারেক ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার আগে, যখন আমি কলেজে পড়ি—৮৮ সালের দিকে। ৮৮-তে প্রথম শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হয়। এর আগে ৮৬-তে ফোরাম গঠিত হয়েছিল। সেই সময় থেকেই মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল এবং তারেক মাসুদদের সঙ্গে আমার পরিচয়।

মজার ব্যাপার হলো, তখন সিনেমার চেয়েও আমার বেশি আগ্রহ ছিল প্রকাশনা বা বইপত্রের দিকে। তারেক ভাই তখন ‘আদম সুরত’ বানাচ্ছেন। তখন এস এম সুলতানের কাজ দেখে এবং তারেক ভাইয়ের গল্প শুনে কৌতূহল হলো—আচ্ছা, একটা মানুষকে নিয়ে কি এভাবে সিনেমা বানানো সম্ভব? এই কৌতূহল থেকেই সুলতান এবং তারেক ভাইয়ের সঙ্গে আমার পথচলা শুরু।

এআই তো অলরেডি আমাদের জীবনে ঢুকে পড়েছে। চ্যাটজিপিটি বা ইমেজ জেনারেটরের মাধ্যমে এখন যেকোনো স্টাইলে ছবি তৈরি করা সম্ভব। গতকালই ইউটিউবে এআই দিয়ে বানানো একটা শর্ট ফিল্ম দেখছিলাম। হয়ত এখন কিছুটা কাঁচা, কিন্তু এক সময় এটা এতটাই নিখুঁত হবে যে হয়ত রক্ত-মাংসের ফিল্মমেকারের আর প্রয়োজনই হবে না।

ঢাকা স্ট্রিম: আপনি এক সময় ‘নৃ’ নামে একটি কাগজ বের করতেন। সাহিত্য এবং প্রকাশনার সেই সময়টি আপনার সিনেম্যাটিক চিন্তায় কতটুকু প্রভাব ফেলেছিল?

নূরুল আলম আতিক: ‘নৃ’-র প্রথম সংখ্যাটি ছিল সুলতানকে নিয়ে। আমি সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে বাংলায় ভর্তি হলাম। এটা নিয়ে পরিবারে একটা দুর্যোগও ঘটেছিল। আমি নিজে খুব ভালো লিখতে পারতাম না, তাই অন্যদের লেখা সংগ্রহ করে সম্পাদনার কাজ করতাম। তখন তারকোভস্কিকে নিয়ে একটা কমপ্লিট সংখ্যা করার জন্য আমরা দুই বছর কাজ করেছি। আহমদ ছফা ভাইয়ের সঙ্গেও তখন আমার যোগাযোগ তৈরি হয়।

সেই সময়টাতে সিনেমার চেয়েও মুদ্রিত রূপ বা চিন্তার জগতের সঙ্গে আমার সংযুক্তি ছিল বেশি। তবে সিনেমার লোকজনের সঙ্গে ওঠাবসা থাকায় তাঁদের চিন্তার একটা ছাপ তো পড়ছিলই।

ঢাকা স্ট্রিম: সিনেমার প্রযুক্তিগত বিবর্তন অর্থাৎ এনালগ ১৬ মিমি থেকে ডিজিটাল বা ভিডিওতে যাওয়ার যে সংগ্রাম, সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

নূরুল আলম আতিক: আমাদের সময়ে সিনেমা মানেই ছিল বিএফডিসি নির্ভরতা। নেগেটিভ ল্যাব, পজিটিভ করা, ডাবিং, এডিটিং—পুরো প্রসেসটা ছিল এনালগ এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ১৬ মিমি-তে কাজ করা কিছুটা সাশ্রয়ী হলেও তা ছিল অত্যন্ত জটিল। ‘আগামী’, ‘হুলিয়া’ বা তানভীর ভাইয়ের শুরুর কাজগুলো ডিএফপিতে তৈরি হয়েছে। আমরা যখন ‘চতুর্থ মাত্রা’ বা ‘ফুলকুমার’ বানাচ্ছি, তখন ১৬ মিমি ল্যাব প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এমনকি ফাইনাল প্রিন্ট করার জন্য আমাদের মাদ্রাজ (চেন্নাই) পর্যন্ত যেতে হয়েছে।

এই যে ল্যাবকেন্দ্রিক নির্ভরতা এবং বিপুল খরচ, এটা আমাকে ভাবিয়েছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ডিজিটাল টেকনোলজি ভবিষ্যতে সিনেমাকে কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে নিয়ে যাবে। সিনেমা তখন আর কেবল এফডিসি-তে বসে বানানোর বিষয় থাকবে না। এই ভাবনা থেকেই আমি তখন ভিডিও টেকনোলজির সম্ভাবনা নিয়ে লিখতে শুরু করি, যার জন্য আমাকে অনেকের গালাগালিও শুনতে হয়েছিল।

হয়ত শীঘ্রই দেখা যাবে সিনেমাটি। সংগৃহীত ছবি
হয়ত শীঘ্রই দেখা যাবে সিনেমাটি। সংগৃহীত ছবি

ঢাকা স্ট্রিম: বর্তমানে আমরা দেখছি টেকনোলজি এতটাই সহজলভ্য যে দেশের যেকোনো প্রান্তে বসে সিনেমা বানানো যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

নূরুল আলম আতিক: এটা চমৎকার একটা সময়। এখন গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী বা রাঙামাটিতে বসে দুর্ধর্ষ সব সিনেমা হচ্ছে। আমাদের নির্মাতারা বিদেশের ফেস্টিভ্যালে প্রশংসিত হচ্ছেন। তবে এর মধ্যেও একটা ভয়ের জায়গা আছে। এখন আমরা ‘রিলস’-এর যুগে আছি।

টেকনোলজির এই সহজলভ্যতা অনেক সময় সিনেমার নিজস্ব ভাষা বা গ্রামার থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। দর্শক এখন কেজিএফ বা অ্যানিমেল-এর মতো ছবি দেখতে চায়, আর নির্মাতারাও সেই সাপ্লাই চেইনের অংশ হয়ে পড়ছেন।

ঢাকা স্ট্রিম: বর্তমানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

নূরুল আলম আতিক: এআই তো অলরেডি আমাদের জীবনে ঢুকে পড়েছে। চ্যাটজিপিটি বা ইমেজ জেনারেটরের মাধ্যমে এখন যেকোনো স্টাইলে ছবি তৈরি করা সম্ভব। গতকালই ইউটিউবে এআই দিয়ে বানানো একটা শর্ট ফিল্ম দেখছিলাম। হয়ত এখন কিছুটা কাঁচা, কিন্তু এক সময় এটা এতটাই নিখুঁত হবে যে হয়ত রক্ত-মাংসের ফিল্মমেকারের আর প্রয়োজনই হবে না। তখন প্রশ্ন উঠবে—সিনেমা কি কেবল প্রযুক্তি, নাকি এটি আমাদের যৌথস্বপ্ন এবং স্মৃতির আখ্যান? সিনেমা যদি আমাদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে না পারে, তবে সেই সিনেমার আপন ভাষা তৈরি হবে না।

ঢাকা স্ট্রিম: আপনি বলছিলেন বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট সিনেমার ‘ওয়েভ’ বা আন্দোলন তৈরি হয়নি। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

নূরুল আলম আতিক: আমাদের এখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জহির রায়হান, তারেক মাসুদ বা মোরশেদুল ইসলামরা এসেছেন, কিন্তু তাঁরা কোনো শক্তিশালী ‘ওয়েভ’ বা সম্মিলিত ধারা তৈরি করতে পারেননি। যেমনটা আমরা পশ্চিমবঙ্গের সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল সেনের বেলায় দেখেছি। আমাদের এখানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ভালো কাজ হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর কোনো দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় বা সাংস্কৃতিক ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়নি।

আজকের তরুণেরা বিদেশে পড়াশোনা করছে, তাঁদের মধ্যে একটা ওরিয়েন্টেশন আছে, কিন্তু তাঁরা যদি কেবল বিশ্বের বা ফেস্টিভ্যালের রুচি অনুযায়ী সিনেমা বানাতে চায়, তবে আমাদের শেকড়ের গল্পগুলো হারিয়ে যাবে।

আমার একটাই কথা—সিনেমাটা কেন বানাতে চাই, সেই কারণটা নিজের মধ্যে স্পষ্ট হতে হবে। কেবল টাকা বা অ্যাওয়ার্ডের জন্য নয়, নিজের মাটির গল্প, নিজের আপন ভাষায় বলার চেষ্টা করতে হবে।

ঢাকা স্ট্রিম: আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতিতে যে হীনম্মন্যতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা কাজ করে, সে বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

নূরুল আলম আতিক: আমাদের মধ্যে কলোনিয়াল হ্যাংওভার এখনও প্রবল। আমরা আমাদের শেকড়ের মানুষকে চিনি না। আমাদের জগদীশ চন্দ্র বসু, জীবনানন্দ দাশ বা লালন সাঁইয়ের মতো দার্শনিকদের আমরা ধারণ করতে পারি না। আমরা খুব নরম মানুষ, প্যাক-কাদার মানুষ। আমাদের কোনো যোদ্ধা ঐতিহ্য নেই বলে আমরা শৃঙ্খলা মেনে দাঁড়াতে জানি না। এমনকি আমরা মাটির উর্বরতা হারিয়ে ফেলছি, পলিথিন দিয়ে দেশটাকে ঢেকে দিচ্ছি।

এই যে দৃষ্টিভঙ্গিগত সীমাবদ্ধতা, এটাই আমাদের শিল্পের দীনতার বড় কারণ। ধর্মকে সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর যে চেষ্টা বর্তমানে চলছে, তা শিল্পকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ঢাকা স্ট্রিম: আপনার অনেক প্রতীক্ষিত ছবি ‘মানুষের বাগান’-এর বর্তমান অবস্থা কী?

নূরুল আলম আতিক: ‘মানুষের বাগান’ প্রায় ছয় বছর আগে কোভিডের আগে শেষ হয়েছিল। প্রযোজকের অন্যরকম আকাঙ্ক্ষা ছিল, তিনি হয়ত এটাকে আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যালে বড় কিছু হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি তো ফেস্টিভ্যালের রুচি অনুযায়ী ছবি বানাতে পারি না। শেষ পর্যন্ত শুনেছি তিনি ছবিটি একটি টিভি চ্যানেলের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। হয়ত শীঘ্রই দেখা যাবে। নির্মাতার সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই যখন এমন সিদ্ধান্ত হয়, তখন সৃজনশীল মানুষের কাজের জায়গাটা সংকুচিত হয়ে যায়।

ঢাকা স্ট্রিম: আপনার নতুন কাজ ‘লাল’ (এস এম সুলতানকে নিয়ে সিনেমা) নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

নূরুল আলম আতিক: শিল্পী সুলতানকে নিয়ে ‘লাল’ নামে একটি সিনেমার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। স্ক্রিপ্ট বারবার বদলাচ্ছে, ঘষামাজা চলছে। আশা করছি এই বছরই শুটিংয়ে যেতে পারব। এছাড়া কিছু নন-ফিকশন প্রোগ্রাম বা অনলাইন কন্টেন্ট নিয়ে রিসার্চ করছিলাম। সবকিছু ঠিক থাকলে কাজগুলো আবার শুরু করার ইচ্ছা আছে।

ঢাকা স্ট্রিম: নতুন নির্মাতাদের জন্য আপনার শেষ কোনো বার্তা বা পরামর্শ আছে কি?

নূরুল আলম আতিক: নতুনদের মধ্যে অনেকেই খুব ভালো কাজ করছে। যেমন চাকমা একটি ছেলের কাজ আমি দেখেছি, রাজশাহীর বা অন্যান্য অঞ্চলের নির্মাতারা খুব ইন্টারেস্টিং কাজ করছে। আমার একটাই কথা—সিনেমাটা কেন বানাতে চাই, সেই কারণটা নিজের মধ্যে স্পষ্ট হতে হবে। কেবল টাকা বা অ্যাওয়ার্ডের জন্য নয়, নিজের মাটির গল্প, নিজের আপন ভাষায় বলার চেষ্টা করতে হবে। দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ের মধ্যেই হয়ত আমাদের সিনেমার সত্যিকারের আপন ভাষা জন্ম নেবে।

সম্পর্কিত