লেখা:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ইরানে হামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? তার ব্যাখ্যা ছিল খুবই সাধারণ। তিনি বলেছেন, হামলা চালানোর জন্য এটাই ছিল আমাদের শেষ ও সেরা সুযোগ। যারা ট্রাম্পের মানসিকতা সম্পর্কে অবগত, তারা জানেন যে তিনি দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল মেনে চলেন না। হোয়াইট হাউসে কাটানো প্রতিটি দিন তাঁর কাছে যেন রিয়েলিটি শোয়ের একটি পর্বের মতো। সেখানে তিনি প্রতিপক্ষের ওপর সবসময় আধিপত্য বিস্তার করতে বা তাদেরকে পরাস্ত করতে চান। আর ইরানের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ তো যুক্তরাষ্ট্রের চিরস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই পরিচিত।
অবশ্য, ইরান যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আসন্ন বা তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি করেছিল, ট্রাম্পের এমন দাবি প্রমাণ করা কঠিন। কারণ, ইরানের সামরিক বাহিনী এবং তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে অতীতের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। শুধু ইরান নয়, ভেনিজুয়েলা বা নাইজেরিয়া, সিরিয়া, ইরাকে থাকা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো গোষ্ঠীগুলোও যে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এমন দাবি করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। তবুও, ট্রাম্প প্রশাসন গত এক বছরে এই সমস্ত গোষ্ঠী বা দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ট্রাম্প নিয়মিতভাবে অন্য দেশে ক্ষমতা পরিবর্তন এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিপরীত প্রচার চালিয়েছিলেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, তিনি কখনোই সামরিক হামলার বিরোধিতা করেননি। বিশেষত যে আক্রমণগুলোতে আমেরিকানদের প্রাণহানির ঝুঁকি খুব কম থাকে, সেগুলোতে তার পূর্ণ সমর্থন সবসময় ছিল।
২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধ জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর তার প্রশাসন শুধু ওবামা আমলের শুরু করা আইএস খিলাফত উৎখাতের কাজ শেষ করেনি, বরং আইএসের শীর্ষ নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকেও হত্যা করতে সক্ষম হয়। বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পেছনেও প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশ ছিল।
হয়তো এই কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন এখন চূড়ান্ত আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ইরান এখন ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে আছে বলে তারা মনে করে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিও কাজ করেছে। যেমন প্রতিপক্ষের ওপর উভয় দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ, হামলার পেছনে আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদের সমর্থন বা অন্তত নীরব সম্মতি এবং হামলার প্রতিক্রিয়ায় সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেয়ার মতো মার্কিন সক্ষমতার মত বিষয়।
তাছাড়া, পূর্ববর্তী কিছু সফল পদক্ষেপ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে একধরনের আত্মবিশ্বাসও জন্মেছে। যেমন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরার পর অনেকের ধারণা ছিল সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, কিন্তু বাস্তবে সেরকম কিছু হয়নি।
ইরানে হামলা করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল এমনটা নয়। বরং এটি ছিল ট্রাম্পের নিজস্ব ইচ্ছার ফল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো আশা করছে যে, যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের বর্তমান সরকার পরিবর্তন হলে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে আমেরিকাকে আর এতটা সময় ও মনোযোগ দিতে হবে না। ট্রাম্পের ন্যাটোভুক্ত মিত্রদের ওপর ক্ষোভ বা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পেছনে একই ধরনের মানসিকতা কাজ করছে—আমেরিকা এখন বিদেশের মাটিতে কম জড়াতে চায়।
অবশ্য, এই দাবিটিকে কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ, এই প্রশাসন ইরাক আক্রমণের ২৩ বছর পর আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়েছে। এই পদক্ষেপ চরম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, এটাই সম্ভবত ইরানের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের পরেই ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেই সময় থেকে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্যই হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতা করা।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনই বছরের পর বছর ধরে ইরানকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষক’ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কারণ ইরান প্রতিনিয়তই গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকার এবং ইরাকের শিয়া গোষ্ঠীদের সমর্থন ও সহায়তা দিয়ে আসছে। এই গোষ্ঠীগুলোর কারণে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে কয়েকশ আমেরিকান এবং হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এমনকি ইরানি এজেন্টরা ট্রাম্প এবং অন্যান্য শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদেরও হত্যা করার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইরান এবং তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রশাসনের প্রচুর রাজনৈতিক শক্তি ও সম্পদ ব্যয় করিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ইরানের বিপুল সংখ্যক জনগণ বর্তমানে শাসকগোষ্ঠীর বিপক্ষে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথমবারের মতো তারা একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বিষয়ে এতটা আশাবাদী হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের সাথে সাম্প্রতিক সংঘাতকে অতীতের ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধগুলোর’ চেয়ে আলাদা বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি ইরাক নয়, এটি অনন্তকাল চলবে না।’
ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এই যুদ্ধের সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে সচেতন। ২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধের সময় যে ব্যাপক জনসমর্থন ছিল, ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প সেই সমর্থন পাচ্ছেন না। ডেমোক্র্যাট নেতারা এই হামলাকে অসাংবিধানিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে সমালোচনা করেছেন। এমনকি, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা প্রায় ৮০% হলেও, এই হামলার পক্ষে তাদের মাত্র ৫৫% এর সমর্থন রয়েছে।
তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন তাদের এলোমেলো ও স্ববিরোধী বার্তার কারণে নিজেদের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। তারা এই হামলার পক্ষে নানা ধরনের যুক্তি দিচ্ছে। কখনো বলছে আসন্ন হামলা ঠেকাতে, কখনো বলছে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করতে, আবার কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোতে অর্থায়ন বন্ধের কথা বলছে। এমনকি শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের কথাও উঠেছে।
সম্প্রতি তারা জানিয়েছে যে, ইসরায়েল ইরানের ওপর যে হামলা চালিয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে যোগ দিতেই হতো। কারণ ইরানের প্রতিক্রিয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এমনিতেই জড়িয়ে পড়তো। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রাম্প ইরানে সরাসরি মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারছে না, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন আমেরিকানরা মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় দেশের অর্থনীতি নিয়ে বেশি চিন্তিত। কারণ, গত ২০ বছরের মধ্যে বৈদেশিক নীতি আমেরিকার নির্বাচনে খুব বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়—কেন ট্রাম্প এমন একটি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপে জড়াচ্ছেন, যেখানে তার নিজ দলের ভেতরেও পূর্ণ সমর্থন নেই?
এর একটি বড় কারণ হলো, মার্কিন সংবিধানে একজন প্রেসিডেন্টকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার চেয়ে বৈদেশিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগ যেমন ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ ট্যারিফ বা অভ্যন্তরীণভাবে সেনা মোতায়েনের ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে, কিন্তু বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি যেকোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারেন।
ট্রাম্প এটা ভালো করেই জানেন যে, ইরানের সাথে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানো সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা ইতোমধ্যেই এই আশঙ্কায় ভুগছে যে, ইরানের সস্তা ড্রোনগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাদের অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে। ট্রাম্প নিজে যদিও বলছেন যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে চলতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা টিকিয়ে রাখা কঠিন।
অন্যদিকে, ইরান সরকার এখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। শাসকগোষ্ঠীর কঠোর নিরাপত্তা বাহিনী এবং তাদের টিকে থাকার প্রবল ইচ্ছা—এর পাশাপাশি আমেরিকায় যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থনের অভাব—এসব দিক বিবেচনা করলে, সময় হয়তো ইরানের পক্ষেই কাজ করবে।
দেশে বাড়তে থাকা বিরোধিতার মুখে ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত চাইবে ইরানের সাথে সংঘাত দীর্ঘমেয়াদী না হোক। তবে ইতিহাস সাক্ষী, এমন যেকোনো পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা প্রস্থানের কৌশল থাকা অত্যন্ত জরুরি।
জ্যারেড মন্ডশেইন : সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউএস স্টাডিজ সেন্টারের গবেষণা পরিচালক
(মতামত কলামটি এশিয়া পোস্ট থেকে ভাবানুবাদকৃত। ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ইরানে হামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? তার ব্যাখ্যা ছিল খুবই সাধারণ। তিনি বলেছেন, হামলা চালানোর জন্য এটাই ছিল আমাদের শেষ ও সেরা সুযোগ। যারা ট্রাম্পের মানসিকতা সম্পর্কে অবগত, তারা জানেন যে তিনি দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল মেনে চলেন না। হোয়াইট হাউসে কাটানো প্রতিটি দিন তাঁর কাছে যেন রিয়েলিটি শোয়ের একটি পর্বের মতো। সেখানে তিনি প্রতিপক্ষের ওপর সবসময় আধিপত্য বিস্তার করতে বা তাদেরকে পরাস্ত করতে চান। আর ইরানের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ তো যুক্তরাষ্ট্রের চিরস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই পরিচিত।
অবশ্য, ইরান যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আসন্ন বা তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি করেছিল, ট্রাম্পের এমন দাবি প্রমাণ করা কঠিন। কারণ, ইরানের সামরিক বাহিনী এবং তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে অতীতের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। শুধু ইরান নয়, ভেনিজুয়েলা বা নাইজেরিয়া, সিরিয়া, ইরাকে থাকা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো গোষ্ঠীগুলোও যে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এমন দাবি করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। তবুও, ট্রাম্প প্রশাসন গত এক বছরে এই সমস্ত গোষ্ঠী বা দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ট্রাম্প নিয়মিতভাবে অন্য দেশে ক্ষমতা পরিবর্তন এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিপরীত প্রচার চালিয়েছিলেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, তিনি কখনোই সামরিক হামলার বিরোধিতা করেননি। বিশেষত যে আক্রমণগুলোতে আমেরিকানদের প্রাণহানির ঝুঁকি খুব কম থাকে, সেগুলোতে তার পূর্ণ সমর্থন সবসময় ছিল।
২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধ জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর তার প্রশাসন শুধু ওবামা আমলের শুরু করা আইএস খিলাফত উৎখাতের কাজ শেষ করেনি, বরং আইএসের শীর্ষ নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকেও হত্যা করতে সক্ষম হয়। বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পেছনেও প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশ ছিল।
হয়তো এই কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন এখন চূড়ান্ত আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ইরান এখন ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে আছে বলে তারা মনে করে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিও কাজ করেছে। যেমন প্রতিপক্ষের ওপর উভয় দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ, হামলার পেছনে আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদের সমর্থন বা অন্তত নীরব সম্মতি এবং হামলার প্রতিক্রিয়ায় সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেয়ার মতো মার্কিন সক্ষমতার মত বিষয়।
তাছাড়া, পূর্ববর্তী কিছু সফল পদক্ষেপ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে একধরনের আত্মবিশ্বাসও জন্মেছে। যেমন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরার পর অনেকের ধারণা ছিল সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, কিন্তু বাস্তবে সেরকম কিছু হয়নি।
ইরানে হামলা করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল এমনটা নয়। বরং এটি ছিল ট্রাম্পের নিজস্ব ইচ্ছার ফল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো আশা করছে যে, যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের বর্তমান সরকার পরিবর্তন হলে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে আমেরিকাকে আর এতটা সময় ও মনোযোগ দিতে হবে না। ট্রাম্পের ন্যাটোভুক্ত মিত্রদের ওপর ক্ষোভ বা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পেছনে একই ধরনের মানসিকতা কাজ করছে—আমেরিকা এখন বিদেশের মাটিতে কম জড়াতে চায়।
অবশ্য, এই দাবিটিকে কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ, এই প্রশাসন ইরাক আক্রমণের ২৩ বছর পর আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়েছে। এই পদক্ষেপ চরম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, এটাই সম্ভবত ইরানের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের পরেই ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। সেই সময় থেকে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্যই হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতা করা।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনই বছরের পর বছর ধরে ইরানকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষক’ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কারণ ইরান প্রতিনিয়তই গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকার এবং ইরাকের শিয়া গোষ্ঠীদের সমর্থন ও সহায়তা দিয়ে আসছে। এই গোষ্ঠীগুলোর কারণে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে কয়েকশ আমেরিকান এবং হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এমনকি ইরানি এজেন্টরা ট্রাম্প এবং অন্যান্য শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদেরও হত্যা করার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইরান এবং তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রশাসনের প্রচুর রাজনৈতিক শক্তি ও সম্পদ ব্যয় করিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ইরানের বিপুল সংখ্যক জনগণ বর্তমানে শাসকগোষ্ঠীর বিপক্ষে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথমবারের মতো তারা একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বিষয়ে এতটা আশাবাদী হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের সাথে সাম্প্রতিক সংঘাতকে অতীতের ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধগুলোর’ চেয়ে আলাদা বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি ইরাক নয়, এটি অনন্তকাল চলবে না।’
ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এই যুদ্ধের সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে সচেতন। ২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধের সময় যে ব্যাপক জনসমর্থন ছিল, ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প সেই সমর্থন পাচ্ছেন না। ডেমোক্র্যাট নেতারা এই হামলাকে অসাংবিধানিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে সমালোচনা করেছেন। এমনকি, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা প্রায় ৮০% হলেও, এই হামলার পক্ষে তাদের মাত্র ৫৫% এর সমর্থন রয়েছে।
তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন তাদের এলোমেলো ও স্ববিরোধী বার্তার কারণে নিজেদের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। তারা এই হামলার পক্ষে নানা ধরনের যুক্তি দিচ্ছে। কখনো বলছে আসন্ন হামলা ঠেকাতে, কখনো বলছে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করতে, আবার কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোতে অর্থায়ন বন্ধের কথা বলছে। এমনকি শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের কথাও উঠেছে।
সম্প্রতি তারা জানিয়েছে যে, ইসরায়েল ইরানের ওপর যে হামলা চালিয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে যোগ দিতেই হতো। কারণ ইরানের প্রতিক্রিয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এমনিতেই জড়িয়ে পড়তো। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রাম্প ইরানে সরাসরি মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারছে না, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন আমেরিকানরা মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় দেশের অর্থনীতি নিয়ে বেশি চিন্তিত। কারণ, গত ২০ বছরের মধ্যে বৈদেশিক নীতি আমেরিকার নির্বাচনে খুব বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়—কেন ট্রাম্প এমন একটি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপে জড়াচ্ছেন, যেখানে তার নিজ দলের ভেতরেও পূর্ণ সমর্থন নেই?
এর একটি বড় কারণ হলো, মার্কিন সংবিধানে একজন প্রেসিডেন্টকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার চেয়ে বৈদেশিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগ যেমন ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ ট্যারিফ বা অভ্যন্তরীণভাবে সেনা মোতায়েনের ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে, কিন্তু বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি যেকোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারেন।
ট্রাম্প এটা ভালো করেই জানেন যে, ইরানের সাথে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানো সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা ইতোমধ্যেই এই আশঙ্কায় ভুগছে যে, ইরানের সস্তা ড্রোনগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাদের অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে। ট্রাম্প নিজে যদিও বলছেন যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে চলতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা টিকিয়ে রাখা কঠিন।
অন্যদিকে, ইরান সরকার এখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। শাসকগোষ্ঠীর কঠোর নিরাপত্তা বাহিনী এবং তাদের টিকে থাকার প্রবল ইচ্ছা—এর পাশাপাশি আমেরিকায় যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থনের অভাব—এসব দিক বিবেচনা করলে, সময় হয়তো ইরানের পক্ষেই কাজ করবে।
দেশে বাড়তে থাকা বিরোধিতার মুখে ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত চাইবে ইরানের সাথে সংঘাত দীর্ঘমেয়াদী না হোক। তবে ইতিহাস সাক্ষী, এমন যেকোনো পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা প্রস্থানের কৌশল থাকা অত্যন্ত জরুরি।
জ্যারেড মন্ডশেইন : সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউএস স্টাডিজ সেন্টারের গবেষণা পরিচালক
(মতামত কলামটি এশিয়া পোস্ট থেকে ভাবানুবাদকৃত। ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

সব প্রজন্মেই এটা দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের প্রজন্মে দেখেছি, আমার কন্যাদের সময়েও সেটা ঘটেছে; বর্তমান সময়েও তা দেখছি। সমাজ ও দেশভেদেও এর পরিবর্তন হয়নি। সব দেশে, সব প্রজন্মেই বয়স্করা বলেছেন, তরুণরা অস্থিরমতি, হঠকারী এবং প্রগলভ। তারা শুধু সবকিছু ভাঙ্গতে চায়, বদলাতে চায় সামাজিক বিধি-বিধান, রীতি-নীতি, ফ্যাশ
৫ ঘণ্টা আগে
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রবিন্দুগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তেহরানের আগ্রাসী নীতির বাস্তবায়ন ঘটাচ্ছে।
৮ ঘণ্টা আগে
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কাজ করবে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতাকে বিকশিত-উদ্ভাসিত করার লক্ষ্য নিয়ে। বাংলাদেশ শুধু বাঙালির নয়, শুধু মুসলমানের দেশ নয়। এখানে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবার সম অধিকার রয়েছে।
৯ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির বাড়ি ও কার্যালয়ে বিমান হামলার মধ্য দিয়ে। হামলার সময় খামেনি তাঁর উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। এই আকস্মিক হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
১ দিন আগে