‘পুশ-ইন’ এবং ‘অবাঞ্ছিত’ নাগরিকেরা

ঈশিতা দস্তিদার
ঈশিতা দস্তিদার

স্ট্রিম গ্রাফিক

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে পাঠানোর প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। এই তথ্য জানাচ্ছে খোদ বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)। বাংলাদেশের অভিযোগ, ভারত আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কিছু মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ভারত এসব পদক্ষেপকে ‘অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন’ বলে বর্ণনা করছে। দুই দেশের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো সামনে চলে এসেছে।

খুব শীঘ্রই নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, ওই বৈঠকে ‘পুশ-ইন’ ইস্যুকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও অভিবাসীদের ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিএসএফের হাতে তুলে দিচ্ছে । আসামের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বিভিন্ন জেলায় ডিটেনশন সেন্টারও গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলা ভাষাভাষী বহু মানুষ বর্তমানে সীমান্তের শূন্যরেখায় অমানবিক পরিস্থিতিতে জীবন কাটাচ্ছেন। তারা আটকে পড়েছেন বিএসএফ ও বিজিবির টানাপোড়েনের মধ্যে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে খাদ্য ও পানির জন্য হাহাকার করছেন তারা। এই দুর্দশার ছবি, ভিডিও ও সংবাদ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে।

পরিস্থিতি এমন যে, ভারত মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, আর বাংলাদেশ তাদের প্রবেশ ঠেকাচ্ছে। সীমান্তজুড়ে উভয় পক্ষই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এক পক্ষ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে উসকে দিচ্ছে, আর অন্য পক্ষ কাঁটাতারের বেড়া আরও শক্তিশালী করছে।

সীমান্ত অঞ্চলে গবেষণা করবার অভিজ্ঞতা আছে আমার। তখন দেখেছি, সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই সীমান্ত পারাপার করে। অনেক সময় তারা বিজিবি ও বিএসএফ—উভয় বাহিনীর নজর এড়িয়েই যাতায়াত করে। জীবিকার সন্ধানে বহু মানুষ কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে। তাদের ‘অবৈধ’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘গরু চোর’ বলে চিহ্নিত করলেই সীমান্ত সমস্যার সমাধান হবে না। এসব অঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভিন্ন ভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের মানুষ অবাধে চলাচল করেছে। সেখানে দেশভাগের মাধ্যমে সীমারেখা টেনে বা নানা তকমা এঁটে কি সেই মানবিক সম্পর্কগুলো ছিন্ন করা সম্ভব? অনিশ্চিত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা আজ নো ম্যানস ল্যান্ডে অপেক্ষা করছে, তাদেরও হয়তো কিছু বলার আছে। প্রশ্ন হলো, তাদের কথা শোনার মতো কেউ কি আছে?

যদিও রাজনীতি বিজ্ঞান দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তকে মূলত একটি ভৌগোলিক সীমানা হিসেবে দেখেছে। চেষ্টা করেছে সীমান্তকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বোঝার। আধুনিক রাষ্ট্র এখন শুধু মানচিত্রে সীমারেখা টেনেই সীমান্ত নির্ধারণ করে না। সে পরিচয় যাচাই, নাগরিকত্ব নির্ধারণ, আটক, নজরদারি ও বহিষ্কারের নীতির মাধ্যমেও সীমান্তের ধারণাকে কার্যকর করে তোলে। পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি একাধিক হোল্ডিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা আর সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকদের আটক করার ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সীমান্ত এখন আর শুধু ভৌগোলিক রেখা নয়। তা একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

‘পুশ-ইন’ ঘটনাকে বোঝার ক্ষেত্রে ইতালীয় দার্শনিক গিওরগিও আগামবেনের ‘বেয়ার লাইফ’ ধারণাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এই ধারণা বলছে, মানুষ রাজনৈতিক, আইনি ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে কেবল জৈবিক অস্তিত্বে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন তারা সার্বভৌম ক্ষমতার সামনে সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে যায়। ফলে কার্যকর কোনো আইনি সুরক্ষা আর পায় না। ‘পুশ-ইন’-এর শিকার মানুষদের পরিস্থিতি এই অবস্থার সঙ্গে মিলে যায়। ভারত তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বাংলাদেশও তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বাস্তবে তারা আইনের আওতায় থেকেও সুরক্ষার বাইরে অবস্থান করে। শারীরিকভাবে তাদের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বীকৃতি অনিশ্চিত। তারা যেন নাগরিকত্বের পরিসীমার বাইরের মানুষ। কার্যত তাদের এই অবস্থান নির্ধারণ করে দুই রাষ্ট্র। এটি গভীর মর্মান্তিক এক বাস্তবতা।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বহুদিন ধরেই গুলি, আটক, চোরাচালান, নিখোঁজ হওয়া আরও বিভিন্ন রকম সীমান্ত-সহিংসতা চলমান। ‘পুশ-ইন’ সেই সহিংসতারই একটি রূপ। এখানে মানুষকে সরাসরি হত্যা করা হয় না। কিন্তু তাদের এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়, যেখানে নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা এবং সামাজিক অস্তিত্ব বলতে কিছু আর থাকে না।

‘পুশ-ইন’ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন— কেন রাষ্ট্র কিছু মানুষকে ‘বৈধ ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে? কেন তাদের ‘অবাঞ্ছিত’ বলে চিহ্নিত করে? ‘অবৈধ অভিবাসী’ পরিচয় কোনো স্বাভাবিক পরিচয় নয়। এটি রাষ্ট্র ও আইনের হাতে নির্মিত একটি শ্রেণিবিভাগ।

একজন মানুষ শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় হতে পারেন। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে তার জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়কে হুমকি হিসেবে জাহির করা হতে পারে। ফলে তিনি একদিকে অর্থনৈতিক উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হন। অন্যদিকে নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাকে অবাঞ্ছিত হিসেবে দেখা হয়। এই স্ববিরোধিতাই আছে ‘পুশ-ইন’ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক বাস্তবতা রয়েছে। দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, নদীভাঙন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ও মৌসুমি শ্রম-অভিবাসন—সবকিছু মিলিয়ে এই সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে সামাজিকভাবে উন্মুক্ত। এটি নিরেট নয়। এর মাঝে অনেক ছিদ্র রয়ে গেছে। ভারত সীমান্তের বড় অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করলেও সেই বেড়া সর্বত্র দেয়ালের মতো কাজ করতে পারে না। সীমান্ত এলাকার দরিদ্র মানুষ নিয়মিতই বেড়া কেটে বা ফাঁকফোকর খুঁজে সীমান্ত অতিক্রম করে। কেউ সীমান্তের ওপারে মেয়ের বিয়ে দেন। কারও স্বামী বা ছেলে দিনে কাজ করতে ওপারে যায় আবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব দৈনন্দিন কাজের জন্য তাদের পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট না থাকে। তার প্রয়োজনও হয় না।

এই ধরনের যাতায়াত ও সম্পর্ককে শুধু অবৈধ অভিবাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে সীমান্তের সামাজিক ইতিহাস আড়াল হয়ে যায়। রাষ্ট্রের কল্পিত সীমান্তধারণা আর সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সীমান্তের অর্থ প্রায়ই আলাদা হয়। ইতিহাসবিদ ও নৃতত্ত্ববিদ উইলিয়াম ভেন শেন্ডেল-এর ভাষায়— সীমান্ত একটি ‘জীবন্ত পরিসর’, যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবন, কাজকর্ম আর টিকে থাকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভূখণ্ডের অর্থ নির্মাণ করে। এই উপলব্ধি রাষ্ট্র-নির্ধারিত স্থির ভৌগোলিক সীমানার ধারণা থেকে অনেকটাই আলাদা।

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নিরাপত্তা নামের ধারণাটি তঈরি করতে কিছু জনগোষ্ঠীকে ‘অন্য’ বা ‘বহিরাগত’ হিসেবে দাঁড় করায়। ‘পুশ-ইন’-এর প্রসঙ্গে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই মানুষগুলো কি সত্যিই নিরাপত্তার জন্য হুমকি? নাকি রাষ্ট্র তাদের সেরকম করে হাজির করছে? দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অভিবাসনকে নিরাপত্তা-সংকট হিসেবে দেখার প্রবণতা মূলত রাষ্ট্র-নির্মিত একটি বাস্তবতা।

‘পুশ-ইন’ শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল নয়। এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সেই ক্ষমতার প্রকাশ, যার মাধ্যমে কিছু জনগোষ্ঠীকে অধিকার থেকে বঞ্চিত হিসেবে নির্মাণ করা হয়। মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার হলো ‘অধিকার পাওয়ার অধিকার’। যদি কোনো রাষ্ট্র কাউকে তার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে, তবে সেই মানুষ অধিকার কোথায় পাবে? আবার কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সদস্য না হওয়ার কারণে একজন মানুষ কীভাবে অধিকারহীন হয়ে পড়তে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু আইন দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এগুলো সামাজিক নৈতিকতা, মানবাধিকার ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সঙ্গেও জড়িত।

ভারতের ‘পুশ-ইন’ নীতি এবং বাংলাদেশের অবস্থানকে কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক কৌশল হিসেবে দেখার সমস্যা আছে। এভাবে দেখলে এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে। একে নাগরিকত্বের সংকট, সার্বভৌমত্বের প্রদর্শন, অবাঞ্ছিত জনগোষ্ঠী তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে দেখবার সুযোগ অ প্রয়োজন আছে। একে এমন এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক কর্মকৌশল হিসেবেও দেখা যায়, যার মাধ্যমে মানবজীবনের মূল্যকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় নির্ধারণ করা হয়।

সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ ‘পুশ-ইন’ বিতর্ককে এই বৃহত্তর তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করলে কী দেখা যাবে? দেখা যাবে যে এটি শুধু অভিবাসন-সংক্রান্ত একটি বিরোধ নয়। ‘পুশ-ইন’ একইসঙ্গে রাষ্ট্র, নাগরিকত্ব এবং মানবিক মর্যাদার সমকালীন সংকটও বটে। আমরা কি সেই সংকটের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত?

  • ড. ঈশিতা দস্তিদার: নৃতত্ত্ববিদ ও লেখক

সম্পর্কিত