জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নির্বাচন শেষ: এখন দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পালা

লেখা:
লেখা:
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৩৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

বহুল প্রতীক্ষিত ও আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দীর্ঘদিন পর ভোটকেন্দ্রে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দের দল ও প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার দৃশ্য—গণতন্ত্রের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা।

এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করতে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ পুলিশ-সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সকলের কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য। গণতন্ত্র কেবল ব্যালটের লড়াই নয়; এটি আস্থার প্রশ্ন। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার পথে এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বিজয় ও বিরোধিতার নতুন সমীকরণ

এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তাদের জোটসঙ্গীরা নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। তাদের এই সাফল্যের জন্য জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা। একই সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলে নির্বাচনকে প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলার জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটও প্রশংসার দাবিদার। গণতন্ত্রে শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীল ও কার্যকর বিরোধীদলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গণতন্ত্রের এই পর্বকে একটি “নির্বাচনী ইকোসিস্টেম” হিসেবে দেখলে দেখা যায়—জনগণই এখানে মূল নিয়ামক। তারা অতিথি নন, বরং প্রকৃত মালিক। তাদের ভোট হলো এক অমূল্য উপহার, যা তারা আস্থা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে বিজয়ী দলের হাতে তুলে দিয়েছেন। এখন সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার পালা।

‘মেহমানদারি’র রাজনৈতিক দর্শন

জনগণ যদি মালিক হন, তবে নির্বাচিত সরকার তাদের সেবক—এই বোধ থেকেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে হবে। বিজয়ী দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব হবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা। অন্যদিকে বিরোধীদল হিসেবে ১১-দলীয় জোটের ভূমিকা হবে গঠনমূলক সমালোচনা, নীতিগত পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি নিশ্চিত করা।

এটাই “চেক অ্যান্ড ব্যালান্স”—ক্ষমতার ভারসাম্য। সরকার যেন স্বেচ্ছাচারী না হয়, আবার বিরোধীদল যেন কেবল বাধা দেওয়ার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, বিরোধিতাও রাষ্ট্রগঠনের অংশ।

১৯৯১-এর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্য এটি এক নতুন সুযোগ। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে যে সংযত, মেধাভিত্তিক ও দায়িত্বশীল মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ব্যক্তিস্বার্থ, অতিরিক্ত ক্ষমতালিপ্সা কিংবা দলীয়করণ—এসব থেকে দূরে থেকে একটি দক্ষ, সৎ ও কম স্বার্থান্বেষী মন্ত্রিসভা গঠন সময়ের দাবি।

রাষ্ট্র পরিচালনায় এখন প্রয়োজন—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান, বিচার ও প্রশাসনে নিরপেক্ষতা, তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো । জনগণ কেবল সরকার পরিবর্তন চায় না; তারা শাসনব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন চায়।

বিরোধীদলের কৌশলগত দায়িত্ব

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা। সংখ্যায় কম হলেও কার্যকর বিরোধীদল হওয়া সম্ভব—যদি তারা তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নীতিগত বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারে।

তাদের আগেভাগেই বিশ্লেষণ করতে হবে—সরকার কোথায় ভুল করতে পারে, কোন নীতিতে ঝুঁকি রয়েছে, কোন খাতে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। বিরোধিতা যেন প্রতিহিংসার না হয়ে নীতিনিষ্ঠ হয়। ভুল পথে গেলে সরকারকে সতর্ক করা হবে, কিন্তু উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে সমর্থনও দেওয়া হবে—এমন রাজনৈতিক পরিপক্বতা এখন জরুরি।

নতুন রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমের সম্ভাবনা

বিএনপি ক্ষমতায় এবং জামায়াত ও এনসিপিসহ ১১-দলীয় জোট বিরোধী দলে—এমন সমীকরণ অতীতে খুব কমই দেখা গেছে। এই বাস্তবতা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে।

যদি সরকার দায়িত্বশীল হয় এবং বিরোধীদল গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে, তবে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ইকোসিস্টেম তৈরি হতে পারে—যেখানে ক্ষমতা ও জবাবদিহি পাশাপাশি চলবে।

জনগণের চূড়ান্ত প্রত্যাশা

সবচেয়ে বড় কথা—জনগণ আবারও ভোট দিয়েছে। তারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আস্থা প্রকাশ করেছে। এখন সেই আস্থাকে মর্যাদা দেওয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।

গণতন্ত্র কেবল পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতা লাভের সুযোগ নয়; এটি জনগণের সঙ্গে এক নৈতিক চুক্তি। সেই চুক্তি রক্ষা করতে হলে দরকার সংযম, প্রজ্ঞা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।

আমরা আশাবাদী—এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও উন্নয়নমুখী শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে। নির্বাচন শেষ হয়েছে; এখন শুরু হোক দায়িত্ব পালনের প্রতিযোগিতা।

দেশ এগিয়ে নেওয়ার পালা—এবার সত্যিকার অর্থেই।

  • ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত