জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বদিউল আলম মজুমদারের সাক্ষাৎকার

অযোগ্যরা সুযোগ পেলে নির্বাচনের সমীকরণ বদলে যায়

ড. বদিউল আলম মজুমদার; সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। নির্বাচনে মাঠের পরিবেশ, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, নির্বাচন কমিশনের সাফল্য-ব্যর্থতা, গণতন্ত্রে উত্তরণসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন বদিউল আলম মজুমদার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদুল ইসলাম

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২: ৫৩
ড. বদিউল আলম মজুমদার। স্ট্রিম ছবি

স্ট্রিম: এবারের নির্বাচনে মাঠের পরিবেশ কেমন দেখছেন?

বদিউল আলম মজুমদার: এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি যা দেখছি, তা মোটামুটি শান্তই বলা চলে। কিছু উত্তাপ-উত্তেজনা থাকলেও তা সহিংসতায় রূপ নেয়নি। মানুষ গ্রামে ফিরে যাচ্ছে, ঢাকা শহর অনেকটা ফাঁকা। মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করছি; বহু বছর পর তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। তাই আমি আশাবাদী– একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।

স্ট্রিম: অতীতে যত নির্বাচন হয়েছে, বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের গত ১৫ বছর এবং তার আগের সময়গুলো বিবেচনায় নিলে এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ কতটা ভিন্ন?

বদিউল আলম মজুমদার: অনেক ভিন্ন, এখানে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। শেখ হাসিনা অবশ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। ২০০৮ সালের সেই নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন সবই জালিয়াতির নির্বাচন বলা চলে। কোনোটি ছিল জালিয়াতিপূর্ণ, আবার কোনোটি একতরফা। এগুলো মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। এসবের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কার্যত নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, প্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম দলীয়করণ এবং ব্যাপক নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হয়েছে।

সেখানে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতো। এখন নির্বাচন হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। এই সরকারের কারও প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার কথা নয়। তাই আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করছি। অতীতের প্রশাসনের দলীয়করণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দলীয়করণ এবং চরম পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশনের তুলনায় এবারের পরিবেশ আলাদা। হয়তো পরিবেশটি পুরোপুরি আদর্শ বা আইডিয়াল নয়। তবে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

স্ট্রিম: বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বদিউল আলম মজুমদার: বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। নিরপেক্ষতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন আছে, সে বিষয়ে পরে আসছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক দিক হলো, নির্বাচনটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হচ্ছে এবং তাদের নিয়োগ করা নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবেই দায়িত্ব পালন করবে। মানুষ ভোটাধিকার ছাড়াও কথা বলার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। তবে কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’-এর পক্ষ থেকে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক হতে পারত, তার অনেকগুলোই তারা গ্রহণ করেনি। এছাড়া তারা ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের মনোনয়ন বৈধ বলে ঘোষণা করেছে, যা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আমরা হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, অনেকে সর্বশেষ আয়কর বিবরণী জমা দেননি। অথচ আইন অনুযায়ী তা বাধ্যতামূলক। এর ফলে তাদের মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ এবং বাতিল হওয়ার কথা।

এছাড়া পর্যবেক্ষক নিয়োগ নিয়ে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে কমিশন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি। অযোগ্য বা অবৈধ প্রার্থীরা (ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিক বা ট্যাক্স রিটার্ন জমা না দেওয়া) নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে সমীকরণ বদলে যায়। যারা হয়তো জিতত না, তারা জিতে যেতে পারে। নির্বাচন শুধু ভোট দিলেই হয় না, তা হতে হয় ‘ফেয়ার অ্যান্ড জাস্ট’। অযোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে থাকলে তা ন্যায়সংগত হয় কি না, সেটাই এখন গুরুতর প্রশ্ন। সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এই বিষয়গুলোর সুরাহা করা। অন্যথায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

স্ট্রিম: প্রার্থী তালিকায় অন্তত ৪২ জন ঋণখেলাপি রয়েছেন, দ্বৈত নাগরিকদের বিষয়ও সুরাহা করা হয়নি। নির্বাচন কমিশন কেন এমন করল?

বদিউল আলম মজুমদার: সম্ভবত এটি একটি দুর্বল নির্বাচন কমিশন এবং তাদের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তারা কাউকে অসন্তুষ্ট করতে চাননি। কিন্তু এর ফলে যে নির্বাচনের মৌলিক বিষয়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তা তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন কিনা, সন্দেহ আছে।

আরেকটি বিষয় হলো, তারা গণভোটের বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করেছে যে, সরকারি কর্মকর্তারা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে তারা আরপিও-এর ৮৬ অনুচ্ছেদ, আচরণবিধি এবং গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারার রেফারেন্স দিয়েছে। অথচ আরপিও বা এসব বিধি মূলত সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য, গণভোটের ক্ষেত্রে নয়। তারা নিজেদের আইন সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। আইনের বিধানগুলো যে এখানে প্রযোজ্য নয়, তা বুঝতে না পারা মস্ত বড় ভুল। নির্বাচন কমিশন এখানে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি, যা গণভোটকে প্রভাবিত করতে পারে। এই দায় নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। তাদের সক্ষমতার অভাব এবং অন্যান্য অভিযোগের কারণে নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হলো কিনা, সেই প্রশ্নগুলো অবশ্যই উঠবে।

ঋণখেলাপিদের বৈধ ঘোষণা নিয়ে আমরাও অসন্তুষ্ট। এটি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যদি এরা না থাকত, তবে নির্বাচনের ফলাফল হয়তো অন্যরকম হতো। উচ্চ আদালতের অনেক রায় আছে, যেখানে বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে ‘ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড জাস্ট’ (অবাধ, সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত) নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের এখনো সুযোগ আছে ব্যবস্থা নেওয়ার। কমিশনের কেউ একজন তো বলেই ফেলেছেন—‘বৈধ করে দিলাম, টাকাটা কিন্তু ফেরত দিয়েন।’ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই আশা করা যায় না, এটা ন্যক্কারজনক।

এখন তারা যেটা করতে পারে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের ফলাফল গেজেট না করে, বিষয়টি তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তারপর ফলাফল প্রকাশ করা। এ ব্যাপারে আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। জাস্টিস দেবনাথের একটি রায় আছে (নূর হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার মামলা-সংক্রান্ত), যেখানে বলা হয়েছে—নির্বাচনকালীন সময়ে যদি কারচুপি বা অনিয়মের প্রশ্ন ওঠে, তবে নির্বাচন কমিশন ফলাফল বাতিল করতে পারে এবং নতুন নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের ‘ইনহেরেন্ট পাওয়ার’(অন্তর্নিহিত ক্ষমতা) আছে। আদালতের রায় অনুযায়ী, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তারা আইনের বিধি-বিধানের সঙ্গে সংযোজনও করতে পারে। যেখানে আইনের অস্পষ্টতা থাকে, তা দূর করার ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়েছে। একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন যে নির্বাচনের পরেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কিন্তু মনে রাখা দরকার, গেজেট প্রকাশ হয়ে গেলে বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে (ইলেকশন পিটিশন) চলে যায়। তাই গেজেট প্রকাশের আগেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াই সমীচীন হবে।

স্ট্রিম: কমিশনের সদিচ্ছার অভাব নাকি সক্ষমতার ঘাটতি দেখছেন? কারণ তাদের তো সব ধরনের ক্ষমতা, অর্থ ও জনবল দেওয়া হয়েছে–

বদিউল আলম মজুমদার: এখানে সদিচ্ছার অভাব বা অন্য কোনো সমস্যা থাকতে পারে—এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। তবে কারণ যা-ই হোক, বিষয়টি সামগ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

স্ট্রিম: সকালে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করে বিকেলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করল। আগেও কমিশন সার্কুলার দিয়ে তা প্রত্যাহার করেছে। জনগণের কাছে এসব কি বার্তা দিচ্ছে?

বদিউল আলম মজুমদার: এগুলো কমিশনের দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবুও আমরা আশা করি, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকার, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রার্থীদের। কারণ ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই কিংবা ব্যালট স্টাফিংয়ের মতো অনিয়ম দল বা প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা করে। তারা যদি এসব বন্ধ করে, তবেই একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব।

স্ট্রিম: এই নির্বাচন কি অন্তর্ভুক্তিমূলক? অনেকেই বলছেন, আওয়ামী লীগ বা থাকায় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না–

বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, এক অর্থে এটা সত্য। কিন্তু কেন এমন হয়েছে, তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। কারণ, আওয়ামী লীগের সব গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মী পালিয়ে গেছেন এবং তাদের কোনো বিকল্প কমিটিও নেই। শুধু তাই নয়, যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, বহু অপরাধ ও খুনখারাবি হয়েছে—তার কোনো দায় তারা স্বীকার করেনি। বরং তারা প্রতিশোধ নেওয়ার পায়তারা করছে। তারা যে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না, এই পরিস্থিতির দায় তারা এড়াতে পারে না। হ্যাঁ, তারা অংশগ্রহণ করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু যারা খুনখারাবি, অন্যায় ও লুটপাট করেছে, তাদের বাদ দিয়ে যদি হতো... তবে তারা তো সেই উদ্যোগ নেয়নি। একই সঙ্গে তাদের যেসব কর্মী-সমর্থক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বা ভোটাধিকার প্রয়োগে তো কোনো বাধা নেই।

স্ট্রিম: এবারের নির্বাচনে কি আপনার চোখে কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন?

বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, কিছু কিছু ভালো ও ‘ক্লিন’ক্যান্ডিডেট তো আছেন। তবে অনেক ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিক, যারা নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্য নন, তারাও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এটা হতাশার। বিষয়টি এমন যে, আপনি আমগাছ রোপণ করে তো কাঁঠাল পেতে পারেন না। যদি বিতর্কিত ব্যক্তিদেরই মনোনয়ন দেওয়া হয় এবং তারাই নির্বাচিত হয়ে আসেন, তাহলে আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণ বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব হবে না।

স্ট্রিম: আপনি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন। সবকিছু মিলিয়ে আপনাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হলো?

বদিউল আলম মজুমদার: আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংস্কার প্রস্তাব করেছিলাম। যেমন—আমরা বলেছি ঋণখেলাপিদের নির্বাচনের ছয় মাস আগে ঋণ নিয়মিত করতে হবে এবং অভ্যাসগত ঋণখেলাপিরা যেন কোনোভাবেই অংশ নিতে না পারে। আমরা রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রায়নের কথা বলেছি। টাকার খেলা বন্ধ করা এবং নির্বাচনী ব্যয় প্রতিনিয়ত মনিটর করার প্রস্তাব দিয়েছি। নির্বাচনের পর ব্যয়ের যে হিসাব দেওয়া হয়, তা খতিয়ে দেখার কথাও বলেছি।

আরেকটি বিষয় আমরা লক্ষ্য করেছি, আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে সর্বশেষ ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি অনেকে রিটার্নের বদলে প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যা ট্যাক্স রিটার্ন নয়। অর্থাৎ তাদের মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ। এটি কোনো ছোটখাটো করণিক ভুল নয়, বরং গুরুতর বিষয়। কেউ কেউ পুরনো ছকে হলফনামা দিয়েছেন। বিশেষত যারা ট্যাক্স রিটার্ন দেননি, তাদের মনোনয়নপত্র কোনোভাবেই বৈধ হওয়া উচিত হয়নি।

স্ট্রিম: নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা কেমন দেখছেন?

বদিউল আলম মজুমদার: মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কিছু কিছু জায়গায় পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। তবে ঢালাওভাবে গুরুতর কোনো অভিযোগ এখনো পাওয়া যায়নি। যদিও কিছু অভিযোগ আছে, তবে তথ্যের ভিত্তিতে বা প্রমাণসহ আমরা তেমন কিছু পাইনি। যেহেতু এখন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে আছে, তাই আমি আশা করি তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে।

স্ট্রিম: বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনপ্রতিনিধিদের বিত্তবৈভব অর্জনের প্রবণতাকে আপনারা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

বদিউল আলম মজুমদার: আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চরম অবক্ষয় ঘটেছে। রাজনীতি এখন আর জনকল্যাণের জন্য নয়, এটি এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়াটাই এখন বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার মোক্ষম উপায়। অর্থাৎ, রাজনীতির সঙ্গে যেন একটি জাদুর কাঠি জড়িয়ে আছে।

গত সপ্তাহে আমরা প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছি। সুজনের প্রচেষ্টায় আদালতের নির্দেশে হলফনামার বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং ২০০৮ সাল থেকে এটি বাধ্যতামূলক। আমরা ২০০৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের গড় আয়ের তুলনা করেছি। আমরা দেখেছি, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের তুলনায় বিএনপির প্রার্থীদের গড় আয় দ্বিগুণ ছিল, যা প্রায় ৩২ লাখ টাকার মতো। তখন এমপিরা আজকের মতো এতো বিত্তবৈভবের মালিক ছিলেন না; বলা যায় তারা ‘গরিব এমপি’ ছিলেন। ২০০৮-এর পর থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের গড় আয় আকাশচুম্বী হয়েছে। অথচ বিএনপির প্রার্থীদের আয় বেড়েছে সামান্যই। এর মানে হলো, ক্ষমতার সঙ্গে সেই জাদুর কাঠি যুক্ত। ২০০৮-এর আগে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল বলে তাদের আয় বেশি ছিল, আর এরপর দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তারা বিরাট সম্পদশালী হয়েছে।

এটি শুধু জাতীয় নির্বাচনে নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দেখা গেছে। ২০০৮ সালে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালে তারা সবাই পরাজিত হন। এই পাঁচ বছরে নির্বাচিত মেয়রদের অনেকের আয় কয়েক হাজার গুণ বেড়েছিল। রাজনীতি এখন পুরোপুরি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আমাদের সংসদে অধিকাংশ সদস্যই হন ব্যবসায়ী। কারণ রাজনীতিতে তারা বিনিয়োগকে সবচেয়ে লাভজনক মনে করেন।

স্ট্রিম: এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? গণভোট বা সংস্কারের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের আলোচনা চলছে, তা কি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে?

বদিউল আলম মজুমদার: আমাদের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অঙ্গনে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির পদচারণা এবং টাকার খেলাই এখন চালিকাশক্তি। আমাদের গণতন্ত্র এখন টাকা দিয়ে কেনা যায়, যা আসলে কোনো গণতন্ত্রই নয়। এই অস্বচ্ছ ও দুর্বৃত্তায়িত ব্যবস্থা যদি আমরা কাটিয়ে উঠতে না পারি, তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ কণ্টকাকীর্ণ হবে। এটি অনেকাংশে নির্ভর করছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয় কিনা তার ওপর। ‘হ্যাঁ’জয়যুক্ত হলে মৌলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথ উন্মুক্ত হবে। আর যদি ‘না’ জয়যুক্ত হয়, তবে কিছুই বদলাবে না। স্বৈরাচারী হাসিনা পালিয়েছেন, কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থাটা রয়ে গেছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হলে এই কাঠামো বদলানোর সুযোগ তৈরি হবে। অন্যথায়, পুরোনো পদ্ধতিতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদেরও স্বৈরাচার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

স্ট্রিম: গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন?

বদিউল আলম মজুমদার: ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে হলেও গণঅভ্যুত্থানটি হয়েছিল একটি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে। শুরুতে কিছু দলের সংকোচ থাকলেও পরে সবাই যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই ঐক্য এখন আর আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। একতার পরিবর্তে আমরা এখন অসহিষ্ণুতা দেখছি। সুজনের পক্ষ থেকে আমরা ‘প্রার্থী-ভোটার মুখোমুখি’ অনুষ্ঠান করি। এবার কিছু প্রার্থী বলছেন, তারা নির্দিষ্ট কোনো দল বা প্রার্থীর সঙ্গে একই মঞ্চে উঠবেন না। অথচ আমরা এত রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হয়, তবে রক্তের ঋণ শোধ করার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, যারা রক্তপাতের কারণ ছিল, তাদের তোষামোদ করা হচ্ছে, যা আমাদের ৯০-এর দশকের পুরোনো সংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন সব দল এরশাদের সঙ্গে হাত না মেলানোর প্রতিজ্ঞা করলেও বাস্তবে তা রক্ষা হয়নি। এবারও পরিস্থিতি সেদিকে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। যারা অপরাধ করেনি তাদের হয়রানি করা উচিত নয়, কিন্তু যারা অন্যায় করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্ট্রিম: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা আসলে কী পরিবর্তন?

বদিউল আলম মজুমদার: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের পক্ষে। কথা ছিল আমরা স্বৈরাচারের দোসর হব না, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব এবং সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নেব। কিন্তু বাস্তবে এসবের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতি সেই ব্যবসা আর টাকার খেলাতেই আটকে রয়েছে, যা কোনোভাবে উৎসাহব্যঞ্জক নয়।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত