রুয়েল মার্ক গেরেখট ও রে তাকেয়

বিপ্লবী সরকারগুলো প্রায়শই তাদের নিজেদের বিজয়ের শিক্ষা ভুলে যায়। শুরুর দিকের সেই অগ্নিঝরা বিপ্লবীদের বয়স বাড়ে। তখন নতুন প্রজন্ম পুরো ব্যবস্থাতে কিছুটা অদলবদল আনতে চায়। তারা মতাদর্শের কঠোর বাঁধনগুলো আলগা করতে চায়। এমনকি নতুন করে জাতীয় ঐক্য গড়তেও তারা পিছপা হয় না। প্রবীণ ও নবীনদের এই মতপার্থক্যের কারণে ইরানি শাসনব্যবস্থা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাদের অস্তিত্ব নিয়েই টানাটানি শুরু হতে পারে।
দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ শাসকগোষ্ঠীকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ বিসর্জন না দিয়ে তারা কি রাজপথ শান্ত করতে পারবে? নাকি তারা কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করবে? কিন্তু তাতে বিক্ষোভের আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলে ওঠার আশঙ্কা থাকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো সহিংসতা হলে সামরিক জবাব দেওয়া হবে। তবে এই হুমকিতে সম্ভবত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির সমর্থকরা থামবে না।
সত্তর দশকে পাহলভি রাজতন্ত্রের পতনের ঘটনা থেকে এই বিপ্লবী প্রজন্ম অনেক মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছিল। শাহ তখন সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তিনি অর্থনৈতিক সুযোগও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন এতে মানুষ রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকবে। কিন্তু এর বদলে তিনি পেয়েছিলেন তুমুল গণবিক্ষোভ। শাহ যত বেশি ছাড় দিয়েছেন তাঁর বিরোধী জোট ততই শক্তিশালী হয়েছিল। শাহের বাবা ধর্মীয় নেতাদের কঠোর হাতে দমন করতেন। সেই বাবার ছায়ায় ও পশ্চিমা শিক্ষায় বেড়ে ওঠা শাহ শিয়াবাদকে ঠিক বুঝতে পারেননি। শিয়া বিশ্বাসের ভেতরে যে বিদ্রোহী চেতনা মিশে আছে তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
খামেনি খুব ভালো করেই জানেন যে ছোটখাটো বিষয়ে ছাড় দিলে শেষমেশ দাবির পরিধি কেবল বাড়তেই থাকে। পশ্চিমা সাহিত্যের তিনি এক গভীর সমঝদার। তিনি জানেন পশ্চিমা দুনিয়ার ধারণাগুলো দেখতে যতটা লোভনীয়, ভেতর থেকে তা সমাজকে ততটাই ক্ষয়ে দিতে পারে। এমনকি তিনি হয়তো মনে মনে এটাও মানেন যে ইসলামি বিপ্লবের ফলে দেশের মানুষ আসলে ভেতরে-ভেতরে ধর্মনিরপেক্ষতার দিকেই বেশি ঝুঁকেছে।
তবে ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার জন্য সময়টা এখন আর অনুকূলে নেই। গত জুন মাসে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ যুদ্ধ তাঁর বিচারবুদ্ধিকেই বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত ৩৫ বছর ধরে তিনি তিলে তিলে তাঁর প্রকল্প সাজিয়েছিলেন। তিনি ইরানকে পারমাণবিক বোমার খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন। তিনি পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ভয়ংকর সব প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধাদের জাল বিস্তার করেছিলেন। আমেরিকান ও ইসরায়েলিদের অপদস্থ করাকেই বিপ্লবীদের সাফল্য বলে মনে করতেন। আজ তাঁর সেই দীর্ঘদিনের সব পরিকল্পনা ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে ইরানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সঙ্গেই একধরনের বোঝাপড়ায় লিপ্ত হয়েছে।
অবশ্য খামেনির কঠোর মনোভাবই হয়তো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষগুলো মূলত তাঁরই অনুগত। কিন্তু তাঁদের এই দ্বিধা বা সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে রাজপথের বিক্ষোভ বিশাল আকার ধারণ করতে পারে। এমনকি তা পুরো শাসনব্যবস্থার জন্য অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুদ্ধে পরাজয়, ভেঙে পড়া অর্থনীতি আর পানির তীব্র সংকট মিলিয়ে ইরান সরকার এখন বেশ কোণঠাসা। বড় কোনো বিপদ এড়ানোর কৌশল হিসেবে তারা জনগণকে কিছুটা সামাজিক স্বাধীনতা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। নারীদের খোলা চুলের সৌন্দর্য বা আকর্ষণ নিয়ে ইসলামি আইনজ্ঞদের মাথাব্যথার শেষ ছিল না। অথচ পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো শাস্তি ছাড়াই হিজাব না পরা বা হিজাব ছুড়ে ফেলার বিষয়টি এখন সেখানে এক জাতীয় প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এখন নৈতিক কোড প্রয়োগের ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি পরিষ্কারভাবেই বলছেন যে মানুষের ওপর অহেতুক বিধিনিষেধ আরোপ করা বা চাপ সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, জনমনে ক্ষোভের জন্ম দেয় এমন যেকোনো কিছু শেষ পর্যন্ত জায়নবাদী সরকারকেই সহায়তা করে। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, তখন এমন কথা বললে হয়তো পেজেশকিয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হতো।
সংসদের স্পিকার ও ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সাবেক জেনারেল মোহাম্মদ গালিবাফও এখন সুর বদলেছেন। ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন কিংবা ২০০৯ সালের গণতন্ত্রপন্থী সবুজ আন্দোলন যিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করেছিলেন, সেই গালিবাফই এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি এখন জোর দিয়ে বলছেন, বিক্ষোভকারীদের প্রতি উদারতা দেখাতে হবে। তাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে ও সম্পূর্ণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা অবশ্য হুমকি-ধমকি দিয়েই যাচ্ছে। এরই মধ্যে ৪৫ জন বিক্ষোভকারীর প্রাণ ঝরে গেছে। তবে রাজপথে নামানো বাহিনী এখনো সংযম দেখিয়ে যাচ্ছে। এমন আচরণ তাদের স্বভাববিরুদ্ধই বলা চলে।
ইরানি জনগণ অবশ্য সরকারের এই তোষামুদে আচরণে শান্ত হয়নি। এবারের প্রতিবাদের শুরুটা হয়েছিল ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। রিয়ালের দরপতনে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলন এখন আর মুদ্রাস্ফীতির হিসাব-নিকাশে আটকে নেই। তা মোড় নিয়েছে খোদ শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায়। চারদিকে এখন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান উঠছে। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ এবং ‘স্বাধীনতা, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা’।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার পুরনো নিজস্ব কায়দা ছিল। বিক্ষোভ বড় আকার ধারণ করলে তারা বিক্ষোভকারীদের অভাব-অভিযোগের কথা স্বীকার করে নিত। কিন্তু ইসলামি শাসনব্যবস্থার গায়ে কোনো আঁচড় লাগতে দিত না। সমালোচনার তির যদি অস্তিত্বের দিকে ধেয়ে আসত তবে শাসকরা অন্য পথ ধরত। তারা বিক্ষোভকারীদের ‘বিদ্রোহী’ বা ‘বিদেশি শক্তির চর’ বলে দাগিয়ে দিত। সরকার তখন পাল্টা আঘাত করতেও দ্বিধা করত না। প্রয়োজনে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের রাস্তাও তারা বেছে নিত। গত ৩ জানুয়ারি খামেনির কণ্ঠেও সেই পুরোনো সুরই শোনা গেল। তিনি বললেন কর্মকর্তাদের উচিত বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলা। তবে দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে আলাপের কোনো অর্থ হয় না। তাদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। তাদের যোগ্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
সরকার আশা করছে কিছুটা নরম হলেই হয়তো রাজপথের মানুষ ঘরে ফিরবে। তারা ভাবছে প্রতিবাদকারীরা নিজেদের দাবি জানাতে পেরেই সন্তুষ্ট হবে। কিন্তু যদি তা না হয় তবে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। তখন গালিবাফ বা পেজেশকিয়ানের নমনীয় নীতি আর টিকবে না। সেই জায়গা দখল করবে সর্বোচ্চ নেতার পছন্দের কঠোরতা। ট্রাম্পের উসকানিমূলক চ্যালেঞ্জ সেই কঠোরতাকে আরও ইন্ধন জোগাতে পারে।
গত এক শতাব্দী ধরে ইরানি জনগণ অর্থবহ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারগুলো বরাবরই সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রেই শাসকরাই শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে বা বিজয়ী হয়েছে। তবে ইরানিরা কখনোই এমন কোনো জাতীয় সমঝোতায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। অর্থনৈতিক সুবিধা বা সামাজিক মুক্তির বিনিময়ে রাজনৈতিক অধিকার বিসর্জন দেওয়ার সেই পুরনো ফর্মুলা তারা কখনোই মেনে নেয়নি।
ইরানের অভ্যন্তরীণ এই নাটক তার নিজস্ব গতিতেই মঞ্চস্থ হবে। এই সংগ্রামে বিদেশিরা মূলত দর্শকের ভূমিকাই পালন করে। অবশ্য তারা যদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মতো আচরণ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা না রাখে তবে তাদের করার বিশেষ কিছু থাকে না। ট্রাম্প হয়তো শীঘ্রই সেই সত্য অনুধাবন করতে পারবেন।
যুদ্ধ আর নিষেধাজ্ঞার আঘাতে জর্জরিত দুর্বল শাসনব্যবস্থা কতদিন মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইরানে নেতৃত্বে রয়েছে এক অনিশ্চিত গোষ্ঠী। যদি বিক্ষোভের মাত্রা বাড়ে ও তা চরমপন্থার দিকে মোড় নেয় তবে খামেনিকে আসলে দোষারোপ করা যাবে না। তিনি তাঁর অনুসারীদের বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি ধর্মরাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার লড়াই বিপ্লব জয়ের মতোই কঠিন। এর জন্য ইস্পাতকঠিন সংকল্প আর রক্তপাতের প্রয়োজন হয়।
লেখক: গেরেখট ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিস-এর একজন আবাসিক স্কলার। তাকেয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর একজন জ্যেষ্ঠ ফেলো হিসেবে কর্মরত।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ

বিপ্লবী সরকারগুলো প্রায়শই তাদের নিজেদের বিজয়ের শিক্ষা ভুলে যায়। শুরুর দিকের সেই অগ্নিঝরা বিপ্লবীদের বয়স বাড়ে। তখন নতুন প্রজন্ম পুরো ব্যবস্থাতে কিছুটা অদলবদল আনতে চায়। তারা মতাদর্শের কঠোর বাঁধনগুলো আলগা করতে চায়। এমনকি নতুন করে জাতীয় ঐক্য গড়তেও তারা পিছপা হয় না। প্রবীণ ও নবীনদের এই মতপার্থক্যের কারণে ইরানি শাসনব্যবস্থা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাদের অস্তিত্ব নিয়েই টানাটানি শুরু হতে পারে।
দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ শাসকগোষ্ঠীকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ বিসর্জন না দিয়ে তারা কি রাজপথ শান্ত করতে পারবে? নাকি তারা কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করবে? কিন্তু তাতে বিক্ষোভের আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলে ওঠার আশঙ্কা থাকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো সহিংসতা হলে সামরিক জবাব দেওয়া হবে। তবে এই হুমকিতে সম্ভবত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির সমর্থকরা থামবে না।
সত্তর দশকে পাহলভি রাজতন্ত্রের পতনের ঘটনা থেকে এই বিপ্লবী প্রজন্ম অনেক মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছিল। শাহ তখন সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তিনি অর্থনৈতিক সুযোগও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন এতে মানুষ রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকবে। কিন্তু এর বদলে তিনি পেয়েছিলেন তুমুল গণবিক্ষোভ। শাহ যত বেশি ছাড় দিয়েছেন তাঁর বিরোধী জোট ততই শক্তিশালী হয়েছিল। শাহের বাবা ধর্মীয় নেতাদের কঠোর হাতে দমন করতেন। সেই বাবার ছায়ায় ও পশ্চিমা শিক্ষায় বেড়ে ওঠা শাহ শিয়াবাদকে ঠিক বুঝতে পারেননি। শিয়া বিশ্বাসের ভেতরে যে বিদ্রোহী চেতনা মিশে আছে তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
খামেনি খুব ভালো করেই জানেন যে ছোটখাটো বিষয়ে ছাড় দিলে শেষমেশ দাবির পরিধি কেবল বাড়তেই থাকে। পশ্চিমা সাহিত্যের তিনি এক গভীর সমঝদার। তিনি জানেন পশ্চিমা দুনিয়ার ধারণাগুলো দেখতে যতটা লোভনীয়, ভেতর থেকে তা সমাজকে ততটাই ক্ষয়ে দিতে পারে। এমনকি তিনি হয়তো মনে মনে এটাও মানেন যে ইসলামি বিপ্লবের ফলে দেশের মানুষ আসলে ভেতরে-ভেতরে ধর্মনিরপেক্ষতার দিকেই বেশি ঝুঁকেছে।
তবে ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার জন্য সময়টা এখন আর অনুকূলে নেই। গত জুন মাসে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ যুদ্ধ তাঁর বিচারবুদ্ধিকেই বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত ৩৫ বছর ধরে তিনি তিলে তিলে তাঁর প্রকল্প সাজিয়েছিলেন। তিনি ইরানকে পারমাণবিক বোমার খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন। তিনি পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ভয়ংকর সব প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধাদের জাল বিস্তার করেছিলেন। আমেরিকান ও ইসরায়েলিদের অপদস্থ করাকেই বিপ্লবীদের সাফল্য বলে মনে করতেন। আজ তাঁর সেই দীর্ঘদিনের সব পরিকল্পনা ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে ইরানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সঙ্গেই একধরনের বোঝাপড়ায় লিপ্ত হয়েছে।
অবশ্য খামেনির কঠোর মনোভাবই হয়তো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষগুলো মূলত তাঁরই অনুগত। কিন্তু তাঁদের এই দ্বিধা বা সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে রাজপথের বিক্ষোভ বিশাল আকার ধারণ করতে পারে। এমনকি তা পুরো শাসনব্যবস্থার জন্য অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুদ্ধে পরাজয়, ভেঙে পড়া অর্থনীতি আর পানির তীব্র সংকট মিলিয়ে ইরান সরকার এখন বেশ কোণঠাসা। বড় কোনো বিপদ এড়ানোর কৌশল হিসেবে তারা জনগণকে কিছুটা সামাজিক স্বাধীনতা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। নারীদের খোলা চুলের সৌন্দর্য বা আকর্ষণ নিয়ে ইসলামি আইনজ্ঞদের মাথাব্যথার শেষ ছিল না। অথচ পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো শাস্তি ছাড়াই হিজাব না পরা বা হিজাব ছুড়ে ফেলার বিষয়টি এখন সেখানে এক জাতীয় প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এখন নৈতিক কোড প্রয়োগের ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি পরিষ্কারভাবেই বলছেন যে মানুষের ওপর অহেতুক বিধিনিষেধ আরোপ করা বা চাপ সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, জনমনে ক্ষোভের জন্ম দেয় এমন যেকোনো কিছু শেষ পর্যন্ত জায়নবাদী সরকারকেই সহায়তা করে। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, তখন এমন কথা বললে হয়তো পেজেশকিয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হতো।
সংসদের স্পিকার ও ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সাবেক জেনারেল মোহাম্মদ গালিবাফও এখন সুর বদলেছেন। ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন কিংবা ২০০৯ সালের গণতন্ত্রপন্থী সবুজ আন্দোলন যিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করেছিলেন, সেই গালিবাফই এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি এখন জোর দিয়ে বলছেন, বিক্ষোভকারীদের প্রতি উদারতা দেখাতে হবে। তাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে ও সম্পূর্ণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা অবশ্য হুমকি-ধমকি দিয়েই যাচ্ছে। এরই মধ্যে ৪৫ জন বিক্ষোভকারীর প্রাণ ঝরে গেছে। তবে রাজপথে নামানো বাহিনী এখনো সংযম দেখিয়ে যাচ্ছে। এমন আচরণ তাদের স্বভাববিরুদ্ধই বলা চলে।
ইরানি জনগণ অবশ্য সরকারের এই তোষামুদে আচরণে শান্ত হয়নি। এবারের প্রতিবাদের শুরুটা হয়েছিল ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। রিয়ালের দরপতনে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলন এখন আর মুদ্রাস্ফীতির হিসাব-নিকাশে আটকে নেই। তা মোড় নিয়েছে খোদ শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায়। চারদিকে এখন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান উঠছে। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ এবং ‘স্বাধীনতা, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা’।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার পুরনো নিজস্ব কায়দা ছিল। বিক্ষোভ বড় আকার ধারণ করলে তারা বিক্ষোভকারীদের অভাব-অভিযোগের কথা স্বীকার করে নিত। কিন্তু ইসলামি শাসনব্যবস্থার গায়ে কোনো আঁচড় লাগতে দিত না। সমালোচনার তির যদি অস্তিত্বের দিকে ধেয়ে আসত তবে শাসকরা অন্য পথ ধরত। তারা বিক্ষোভকারীদের ‘বিদ্রোহী’ বা ‘বিদেশি শক্তির চর’ বলে দাগিয়ে দিত। সরকার তখন পাল্টা আঘাত করতেও দ্বিধা করত না। প্রয়োজনে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের রাস্তাও তারা বেছে নিত। গত ৩ জানুয়ারি খামেনির কণ্ঠেও সেই পুরোনো সুরই শোনা গেল। তিনি বললেন কর্মকর্তাদের উচিত বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলা। তবে দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে আলাপের কোনো অর্থ হয় না। তাদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। তাদের যোগ্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
সরকার আশা করছে কিছুটা নরম হলেই হয়তো রাজপথের মানুষ ঘরে ফিরবে। তারা ভাবছে প্রতিবাদকারীরা নিজেদের দাবি জানাতে পেরেই সন্তুষ্ট হবে। কিন্তু যদি তা না হয় তবে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। তখন গালিবাফ বা পেজেশকিয়ানের নমনীয় নীতি আর টিকবে না। সেই জায়গা দখল করবে সর্বোচ্চ নেতার পছন্দের কঠোরতা। ট্রাম্পের উসকানিমূলক চ্যালেঞ্জ সেই কঠোরতাকে আরও ইন্ধন জোগাতে পারে।
গত এক শতাব্দী ধরে ইরানি জনগণ অর্থবহ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারগুলো বরাবরই সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রেই শাসকরাই শেষ পর্যন্ত টিকে গেছে বা বিজয়ী হয়েছে। তবে ইরানিরা কখনোই এমন কোনো জাতীয় সমঝোতায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। অর্থনৈতিক সুবিধা বা সামাজিক মুক্তির বিনিময়ে রাজনৈতিক অধিকার বিসর্জন দেওয়ার সেই পুরনো ফর্মুলা তারা কখনোই মেনে নেয়নি।
ইরানের অভ্যন্তরীণ এই নাটক তার নিজস্ব গতিতেই মঞ্চস্থ হবে। এই সংগ্রামে বিদেশিরা মূলত দর্শকের ভূমিকাই পালন করে। অবশ্য তারা যদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মতো আচরণ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা না রাখে তবে তাদের করার বিশেষ কিছু থাকে না। ট্রাম্প হয়তো শীঘ্রই সেই সত্য অনুধাবন করতে পারবেন।
যুদ্ধ আর নিষেধাজ্ঞার আঘাতে জর্জরিত দুর্বল শাসনব্যবস্থা কতদিন মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইরানে নেতৃত্বে রয়েছে এক অনিশ্চিত গোষ্ঠী। যদি বিক্ষোভের মাত্রা বাড়ে ও তা চরমপন্থার দিকে মোড় নেয় তবে খামেনিকে আসলে দোষারোপ করা যাবে না। তিনি তাঁর অনুসারীদের বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি ধর্মরাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার লড়াই বিপ্লব জয়ের মতোই কঠিন। এর জন্য ইস্পাতকঠিন সংকল্প আর রক্তপাতের প্রয়োজন হয়।
লেখক: গেরেখট ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিস-এর একজন আবাসিক স্কলার। তাকেয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর একজন জ্যেষ্ঠ ফেলো হিসেবে কর্মরত।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ

সিরিয়া কি তবে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার পথে? উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে সুওয়াইদা—সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ও ইসরায়েলি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে এক চরম চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একতার সুতো এখন চরম অনিশ্চয়তায় দুলছে।
১১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দ্রুত অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
স্বাধীন বাংলাদেশে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান–পতন আমরা দেখেছি। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণে পরিমিতিবোধ বজায় রাখার ধারাবাহিকতা যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার নাম আলাদাভাবে আলোচনায় আসে।
১ দিন আগে
প্রযুক্তির পরিবর্তন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপটে মূলধারার গণমাধ্যম আজ অস্তিত্ব সংকটে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেলের অভাবে সাংবাদিকতায় নৈতিক অবক্ষয় ও তথ্য-নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে।
১ দিন আগে