হরমুজ থেকে বাব-আল-মান্দেব: ‘অবরোধের বিপরীতে অবরোধ’ কোন বাস্তবতা ডেকে আনছে

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ২১
এআই জেনারেটেড ছবি

বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি কৌশলগত জলপথ—হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব—এখন বারুদঠাসা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের ৪০ দিন পর দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষে ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি ছাড়াই হরমুজ প্রণালিতে একক নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি এবং ১৫টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করার এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এই দুঃসাহসের পাল্টা জবাবে ইরান তার ছায়াশক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বাব-আল-মান্দেব প্রণালি অচল করে দেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে।

তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বন্দর হুমকির মুখে পড়লে পারস্য উপসাগর বা ওমান সাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না। এই দ্বিমুখী সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অপূরণীয় ধসের কিনারে দাঁড় করিয়েছে, যা ইতিহাসে ‘অবরোধের বিপরীতে অবরোধ’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। ন্যাটোর চিরাচরিত সমর্থন ছাড়াই মাদক চোরাচালানকারীদের মতো ইরানি জাহাজ ধ্বংসের যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল বিধিনিষেধকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এই অবরোধকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে, যা লোহিত সাগর থেকে আরব সাগর পর্যন্ত যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। মূলত এটি কেবল জ্বালানি প্রবাহকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ধমনিকেও পঙ্গু করে দেবে। যখন বৈশ্বিক শক্তিগুলো বিভক্ত এবং আঞ্চলিক মেরুকরণ তুঙ্গে, তখন এই ব্লকেড রাজনীতি বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। পশ্চিমা মিত্রদের অনুপস্থিতিতে আমেরিকার এই সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কি কেবল আত্মঘাতী হবে, নাকি ইরানকে একঘরে করার শেষ অস্ত্র হবে, তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

হরমুজ প্রণালি: আমেরিকার একক ‘নেভাল ব্লকেড’ ও এর চ্যালেঞ্জ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০-২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ। ন্যাটোর প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়া এখানে আমেরিকার একক নৌ-অবরোধ কার্যকর করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মিত্রহীন অবস্থায় কয়েকশ কিলোমিটার বিস্তৃত এই জলপথকে নিশ্ছিদ্র রাখা কৌশলগতভাবে দুরূহ। এমন পরিস্থিতিতে চীন বা ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সংঘাত অবধারিত হয়ে উঠবে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জোটের সমর্থন না থাকায় এই অবরোধ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘একপাক্ষিক আগ্রাসন’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

ন্যাটোর অনুপস্থিতি ও ইউরোপীয় দেশগুলোর দোদুল্যমানতা

ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক সমর্থন ছাড়া আমেরিকার একক অবরোধ প্রচেষ্টা মূলত কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করবে। যুক্তরাজ্য ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা লোহিত সাগর বা পারস্য উপসাগরে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল কোনো যুদ্ধে একা জড়াতে হিমশিম খাবে। অন্যদিকে, ফ্রান্স ও জার্মানি বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে আগ্রহী। তারা মনে করে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত ইউরোপের জ্বালানি বাজারকে ধ্বংস করে দেবে এবং নতুন করে শরণার্থী সংকটের জন্ম দেবে।

স্পেন ও ইতালির মতো দক্ষিণ ইউরোপীয় দেশগুলোও ন্যাটোর ছাতা ছাড়া এই সংঘাতের অংশ হতে অনিচ্ছুক। কারণ তাদের অর্থনীতি সরাসরি ভূমধ্যসাগরীয় স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে ন্যাটোর অনুপস্থিতিতে আমেরিকা কেবল সামরিকভাবেই দুর্বল হবে না, বরং আন্তর্জাতিক বৈধতার সংকটেও পড়বে। এই অনীহা মূলত ইরানের ওপর সরাসরি চাপের বদলে আলোচনার মাধ্যমে পথ খোঁজার ইউরোপীয় নীতিকেই স্পষ্ট করে।

মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা

মার্কিন পঞ্চম নৌবহর পারস্য উপসাগরে আমেরিকার সামরিক সক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ এবং হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো নৌ-অবরোধ কার্যকর করার মূল কারিগর। তবে কয়েকশ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই স্পর্শকাতর জলপথে মিত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া নিশ্ছিদ্র নজরদারি চালানো এবং অবরোধ বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। এককভাবে এই অপারেশন চালাতে গিয়ে পঞ্চম নৌবহরকে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন এবং নজরদারি বিমান মোতায়েন করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে যেমন অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তেমনি সামরিক সরঞ্জামগুলোর জন্য কৌশলগতভাবে ক্লান্তিকর।

ন্যাটোর মতো সহযোগীদের মাইন-সুইপিং ভেসেল বা লজিস্টিক সাপোর্ট ছাড়া ইরানের ছোট ও দ্রুতগামী বোট এবং সাবমেরিনগুলোকে মোকাবিলা করা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া একক অবরোধে ব্যস্ত থাকার সুযোগে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে থাকা মার্কিন নৌ-স্বার্থগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আকাশচুম্বী অপারেশনাল খরচ এবং জনবলের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক চাপ শেষ পর্যন্ত এই ব্লকেডের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

বাব-আল-মান্দেব: ইরানের পাল্টা চাল ও প্রক্সি শক্তি

আমেরিকা যদি হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করে, তবে তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠবে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব-আল-মান্দেব প্রণালি। এই পথে বিশ্ব বাণিজ্যের এক বিশাল অংশ এবং সুয়েজ অভিমুখী অধিকাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়, যার নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষভাবে ইরানের হাতে। তেহরান সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়েও তার আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে এই রুটে ব্লকেড তৈরির সক্ষমতা রাখে। ফলে হরমুজে মার্কিন চাপের বিপরীতে বাব-আল-মান্দেবকে অচল করে দেওয়া হবে ইরানের এক অব্যর্থ পাল্টা চাল।

হুতি কার্ড: ইরানের অব্যর্থ রণকৌশল

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা কেবল ইরানের আদর্শিক মিত্র নয়, বরং লোহিত সাগরে তেহরানের হয়ে প্রক্সি যুদ্ধের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। ইরান ইতিমধ্যে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে, হরমুজ অবরুদ্ধ হলে তারা তাদের মিত্রদের মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যান্য ধমনিও সচল থাকতে দেবে না। আর ইয়েমেন এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরাসরি ইরানের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে।

দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষে ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি ছাড়াই হরমুজ প্রণালিতে একক নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি এবং ১৫টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করার এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গত কয়েক বছরে হুতিরা অত্যাধুনিক ড্রোন, কামিকাজে বোট এবং জাহাজ বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করে প্রমাণ করেছে, তারা বাব-আল-মান্দেব প্রণালিতে যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল সম্পূর্ণ স্থবির করে দিতে সক্ষম। এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও ‘ভিশন ২০৩০’-এর মেগা প্রজেক্টগুলো সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। কারণ তাদের লোহিত সাগরীয় বন্দরগুলো অচল হয়ে যাবে।

অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলো ভয়াবহ খাদ্য ও পণ্য সংকটে পড়বে, কারণ সুয়েজ খালগামী অধিকাংশ কনটেইনার জাহাজ এই রুট ব্যবহার করতে না পেরে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যেতে বাধ্য হবে। ফলে হুতি কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান মূলত পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৌশলগত সুবিধা ও অ্যাসিমেট্রিক ব্লকেড

বাব-আল-মান্দেব প্রণালি সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হওয়ায় এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়, যার নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য এক অনন্য কৌশলগত সুবিধা। ইরান সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে হুতিদের মাধ্যমে এই রুটে একটি ‘ছায়াযুদ্ধ’ বা অ্যাসিমেট্রিক ব্লকেড তৈরি করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক আইনত সরাসরি যুদ্ধের উস্কানি হিসেবে গণ্য হবে না।

এই কৌশলের মাধ্যমে তেহরান আমেরিকাকে সরাসরি মোকাবিলা করার ঝুঁকি এড়িয়েও বিশ্ব বাণিজ্যকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এভাবেই কনটেইনার শিপিং থেকে শুরু করে জ্বালানি সরবরাহ পর্যন্ত সবকিছু স্থবির করে দিয়ে ইরান মূলত পশ্চিমাদের ওপর এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে। এই সমরকৌশল বড় কোনো যুদ্ধ ছাড়াই আমেরিকার একক নৌ-আধিপত্যকে অকার্যকর করে দেওয়ার এক মোক্ষম হাতিয়ার।

জোড়া অবরোধের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহাপ্রলয়

হরমুজ এবং বাব-আল-মান্দেব—উভয় প্রণালি একসঙ্গে অবরুদ্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কবলে পড়বে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত দৈনিক প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হওয়া মানেই হলো বিশ্বজুড়ে শিল্পোৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থার হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়া। এর প্রভাবে জ্বালানির দাম কেবল আকাশচুম্বীই হবে না, বরং অনেক উন্নত দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

অন্যদিকে বাব-আল-মান্দেব অবরুদ্ধ হওয়ার অর্থ হলো সুয়েজ খালের কার্যকারিতা হারানো, যা প্রতিদিন বিলিয়ন ডলারের কনটেইনার শিপিং, খাদ্যদ্রব্য এবং শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহকে অনিয়মিত করে দেবে। লোহিত সাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং দরিদ্র দেশগুলোতে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেবে।

এছাড়া আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে জাহাজ চলাচলের কারণে পরিবহন খরচ ও সময় বহুগুণ বেড়ে যাবে। নিয়ন্ত্রক পক্ষ হিসেবে ওমান, জিবুতি বা ইরিত্রিয়া থাকলেও ইরান ও হুতিদের সরাসরি হস্তক্ষেপে এই অঞ্চলগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হবে। এই দ্বিমুখী অবরোধ কেবল তেলের বাজার নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রতিটি ধমনীকে চিরস্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

চীন ও ভারতের উদ্বেগ এবং মার্কিন অবরোধের অসারতা

হরমুজ প্রণালিতে আমেরিকার একক নৌ-অবরোধ মূলত এশীয় অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন ও ভারতের জন্য অস্তিত্ব সংকটের নাম। কারণ তাদের শিল্প ও জ্বালানি নিরাপত্তা এই রুটের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। সম্প্রতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত চীনা মালিকানাধীন ট্যাংকার ‘রিচ স্টারি’ যেভাবে সরাসরি এই ব্লকেড উপেক্ষা করে ২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল মিথানল নিয়ে প্রণালি অতিক্রম করেছে, তা ওয়াশিংটনের অবরোধ কার্যকরের সক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

আমেরিকা যদি হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করে, তবে তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠবে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব-আল-মান্দেব প্রণালি। এই পথে বিশ্ব বাণিজ্যের এক বিশাল অংশ এবং সুয়েজ অভিমুখী অধিকাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়, যার নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষভাবে ইরানের হাতে।

ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, ‘সাংহাই জুয়ানরুন শিপিং’ পরিচালিত এই জাহাজটির সাহস দেখিয়ে দেয় যে, বেইজিং তার জ্বালানি স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন রক্তচক্ষু তোয়াক্কা করছে না। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আমেরিকার একপাক্ষিক পদক্ষেপ এশীয় দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করছে এবং তারা ডলারের পরিবর্তে বিকল্প বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা ইউয়ানে লেনদেন আরও জোরদার করার দিকে ঝুঁকছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান এবং একই সময়ে ইরানের বন্দরে নোঙর করা ‘এলপিস’ ট্যাংকারের চলাচল ইঙ্গিত দেয় যে, একক সামরিক শক্তি দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের এই ধমনী আটকে রাখা অসম্ভব। বিশেষ করে মালাউইয়ের মতো দেশের ছদ্মনাম বা পতাকাবাহী জাহাজ ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল আমেরিকার নিয়ন্ত্রণকে অকার্যকর করে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে মিত্রহীন এই অবরোধ কেবল জ্বালানি ব্যবসায়ীদের মধ্যেই অনিশ্চয়তা তৈরি করেনি, বরং এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আমেরিকার একাকিত্বকেই প্রকট করে তুলছে। শেষ পর্যন্ত চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ আমদানিকারকদের সক্রিয় বিরোধিতা এবং ইরানের সঙ্গে তাদের বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম ওয়ান-টু-ওয়ান বাণিজ্যের পথ খুলে দিলে মার্কিন ‘ইকোনমিক ওয়ারফেয়ার’ বা অর্থনৈতিক যুদ্ধ তার ধার হারাবে।

ইসরায়েল ফ্যাক্টর ও ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রকল্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা

হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব প্রণালির সংকটে ইসরায়েল ফ্যাক্টরটি কেবল একটি সামরিক সমীকরণ নয়, বরং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ও আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। আমেরিকা এককভাবে নৌ-অবরোধে অগ্রসর হলে ইসরায়েল একে ইরান রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখবে, যাতে তারা মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা হলো ইরানকে দুর্বল করে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিরাপত্তার জন্য ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা এবং হরমুজের বিকল্প হিসেবে আরব উপদ্বীপ থেকে ইসরায়েল হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত তেল-গ্যাস পাইপলাইনের একটি নতুন ‘ষড়ভুজ জোট’ গড়ে তোলা। তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই বিপজ্জনক খেলায় সরাসরি অংশ নিতে নারাজ, কারণ তাদের মূল্যবান অবকাঠামো ইরানের মিসাইল ও ড্রোন রেঞ্জের ভেতরে অবস্থিত।

এই বাস্তবতায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় রিয়াদ ও তেহরান এখন গোপন বা প্রকাশ্য আপস-রফার দিকে ঝুঁকছে, যা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ইরান-বিরোধী ঐক্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। নেতানিয়াহু যখন ইসরায়েলকে ‘বৈশ্বিক পরাশক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সিরিয়া বা লেবাননে ভূখণ্ড দখলের নেশায় মত্ত, তখন সৌদি আরব নিজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় যুদ্ধের চেয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্যকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। মূলত, ইসরায়েলের এই আধিপত্যবাদী প্রকল্প ও স্থায়ী যুদ্ধের মানসিকতা আরব দেশগুলোর মধ্যে ভীতি তৈরি করেছে, যা তাদের আমেরিকার একপাক্ষিক ব্লকড থেকে দূরে সরিয়ে ইরানের সঙ্গে এক ধরণের কৌশলগত সহাবস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

‘অবরোধের বিপরীতে অবরোধ’ তত্ত্বটি মূলত একটি আধুনিক ‘মিউচুয়াল অ্যাসিওরড ডেসট্রাকশন’ বা পারস্পরিক অর্থনৈতিক ধ্বংসের সমীকরণ। আমেরিকা যদি একক শক্তিতে হরমুজ আটকে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করতে চায়, তবে ইরান তার মিত্রদের মাধ্যমে বাব-আল-মান্দেব ব্যবহার করে পুরো পশ্চিমা বিশ্বের সাপ্লাই চেইন ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, যার বড় প্রমাণ হলো ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইউরোপের ২৬টি দেশ কর্তৃক তেল আবিবকে কার্যত একঘরে করে দেওয়া। ন্যাটোর এই বিশাল অংশের সমর্থনহীন অবস্থায় ট্রাম্পের একপাক্ষিক নৌ-অবরোধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকেই ঠেলে দেবে না, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার নৈতিক ও কৌশলগত কর্তৃত্বকে ধূলিসাৎ করবে।

ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যে রণসজ্জা শুরু হয়েছে, তা কেবল তেলের দাম বাড়াবে না, বরং বিশ্বকে এক মহাপ্রলয়ের কিনারে দাঁড় করাবে। লোহিত সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত এই জলপথের লড়াইয়ে কোনো পক্ষই এককভাবে বিজয়ী হতে পারবে না। ২০২৬ সালের এই সংকটময় মুহূর্তে শক্তির আস্ফালনের চেয়ে কূটনীতি এবং বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই কেবল বিশ্ব অর্থনীতিকে এই আসন্ন ধস থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

লেখক: সামরিক বিশ্লেষক

সম্পর্কিত