সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রশ্নবিদ্ধ মামলার রাজনীতি

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ১৫: ৫৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

গত ৩ মে মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে রাজধানীতে আয়োজিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা। সেদিনই বিশ্বের ১৩১টি দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর চালানো এক জরিপের ফল প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্যালাপ’ দাবি করেছে, বিশ্বের ৬৪ শতাংশ গণমাধ্যমকর্মী নিজ দেশে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউরোপের গণমাধ্যমগুলো সবচেয়ে বেশি স্বাধীন। প্রথম পাঁচটি দেশ নরডিক অঞ্চলের, এগুলো হলো—ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ও আইসল্যান্ড। এই দেশগুলোর গড়ে আশি শতাংশের বেশি সাধারণ মানুষ মনে করে, তাদের দেশের গণমাধ্যম যথেষ্ট স্বাধীন। এসব দেশের গণমাধ্যমের ওপর সরকারের কোনো চাপ নেই। যদিও ৬৪ শতাংশ গণমাধ্যমকর্মী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন—এই ধারণার সঙ্গে একমত নন ৩০ শতাংশ গণমাধ্যমকর্মী।

একই দিন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার প্রকাশিত প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্স বলছে, বিশ্বের অন্তত ৮০ দেশে সাংবাদিকতা করা অত্যন্ত কঠিন। তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই বা সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় চাপ আছে—এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই ওপরের দিকে থাকে। যদিও সব সরকারই দাবি করে, দেশের গণমাধ্যম ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি স্বাধীন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও এমন দাবি করা হতো। অথচ ওই আমলেও বাংলাদেশে অনেক সাংবাদিক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। প্রশ্নবিদ্ধ মামলায় সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে মাসের পর মাস কারাগারে রাখা এবং তাদের জামিন না দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যখন উন্নয়ন, মানবাধিকার, সুশাসন ও সংস্কার শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে।

গ্যালাপ ও রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার যেদিন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করল, সেদিন বিবিসি বাংলার একটি খবরে বলা হয়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগে ২৬৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। আর মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৩৭টি মামলায় সাংবাদিকদের অভিযুক্ত করা হয়। এসব মামলায় ১৪ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন পর্যন্ত কারো জামিন হয়নি। এসব মামলায় অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়নি। স্বজনদের অভিযোগ, উচ্চ আদালতে জামিন আবেদনের শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ বারবার সময় আবেদন করে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে। বিবিসি লিখেছে, ‘এসব মামলার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অপরাগতা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস কাজল। পেন্ডিং মামলার বিষয়ে কথা বলতে চান না বলে জানান তিনি।’

প্রশ্ন হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়ের হওয়া মামলায় যে সাংবাদিকরা পৌনে ২ বছর ধরে কারাগারে আছেন, তাদের জামিন হলে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের কী অসুবিধা? তারা কি মনে করেন এসব সাংবাদিককে জামিন দিলে সরকার বা বিচার বিভাগ এক বা একাধিক গোষ্ঠীর তরফে মবের শিকার হবে বা সমালোচিত হবে? যদি তাই হয়, তাহলে কারও বিরাগভাজন হতে হবে বা কারও সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় কোনো নাগরিককে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত রাখার অধিকার কি রাষ্ট্রের আছে?

সাংবাদিকদের সঙ্গে অন্য পেশার লোকদের মৌলিক পার্থক্য হলো সাংবাদিকের কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত থাকলেও সেটি কোনোভাবেই তার পেশাদারত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। তার সংবাদ হতে হয় বস্তুনিষ্ঠ। তিনি যদি কোনো নিবন্ধ লেখেন, সেটিও হতে হয় ফ্যাক্টনির্ভর।

যেসব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে, সেগুলো কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা আছে। সেটি সরকারের কর্তাব্যক্তিরাও জানেন। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধেই সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ‍সুযোগে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সরকারের অনেক অন্যায় ও অপকর্মে সমর্থন ও সহযোগিতার অভিযোগও আছে অনেকের বিরুদ্ধে। তবে যাই হোক, কাউকে বিচারের ‍মুখোমুখি করতে হলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগেই করা উচিত। অথচ খুনের মতো অভিযোগের মামলায় তাদেরকে মাসের পর মাস আটকে রাখা হচ্ছে। পৌনে দুই বছরেও এসব মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হলো না বা দেওয়া গেল না। বিচার নিয়ে এরকম পরিস্থিতি খুবই আশঙ্কাজনক।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে ঘটনার সূত্রপাত, সেটি গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত একটি সরকারের আমলেও অব্যাহত থাকবে—সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যারা প্রশ্নবিদ্ধ মামলা করেছেন, তার পেছনে কারা ইন্ধন জুগিয়েছেন এবং তাদের কী ধরনের স্বার্থ আছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। কেননা এমনও অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। পেশাদারত্ব বজায় রেখে জুলাই অভ্যুত্থানের সংবাদ কাভার করেছেন। এখন এইসব মামলার বাদী এবং সাক্ষীদেরকেই এখন বরং জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার যে, তিনি কীসের ভিত্তিতে এই মামলা করলেন; কী কারণে মামলায় সাক্ষী হলেন এবং এসবের পেছনে কে বা কারা ইন্ধন দিয়েছেন?

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রতিটি মামলা পর্যালোচনা করা দরকার। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকলেও কারও বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। তবে বাস্তবতা হলো, যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সাংবাদিকদের একটি অংশ নির্লজ্জভাবে সেই সরকারের পক্ষে দাঁড়ায়। সরকারের সব কাজে সমর্থন দেয়। সরকার ভুল করলেও সেটাকে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করে। তারা এসব করে মূলত সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য।

টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগ আমলে দলবাজ সাংবাদিকদের তালিকাটা দীর্ঘ হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও কি সাংবাদিকদের একটি অংশ নানাভাবে সুবিধা ভোগ করেনি? অনেক কথা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আজ না হোক কাল, না হয় ১০ বছর পরেও এসব প্রকাশিত হবে। আবার বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও কি সাংবাদিকদের একটি অংশ সরকার ও বিএনপির প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করছে না? সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকেও কি তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ মামলায় জড়াতে হবে?

সাংবাদিকদের সঙ্গে অন্য পেশার লোকদের মৌলিক পার্থক্য হলো সাংবাদিকের কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত থাকলেও সেটি কোনোভাবেই তার পেশাদারত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। তার সংবাদ হতে হয় বস্তুনিষ্ঠ। তিনি যদি কোনো নিবন্ধ লেখেন, সেটিও হতে হয় ফ্যাক্টনির্ভর। কিন্তু তিনি যদি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে মিথ্যা খবর লেখেন, বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন বিশ্লেষণ দেন এবং যদি সরকারের অপকর্মের পক্ষে যুক্তি তৈরি করেন—সেটি নিঃসন্দেহে অন্যায়।

সুতরাং, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও সেগুলো সুনির্দিষ্ট হতে হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার পেছনে যে সাংবাদিকদেরই একাংশের ইন্ধন থাকে; ব্যক্তিগত রেষারেষি ও পেশাগত ইগো অনেক সময় যে সেখানে বড় ভূমিকা রাখে—এসবও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

সম্পর্কিত