সালেহ ফুয়াদ

মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র ৭২ ঘণ্টা (তিন দিন) আগে ‘যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ সই করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তীব্র সমালোচনার মধ্যেই চুক্তিটি সই হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তা নিয়ে উদ্বেগ ও সমালোচনা চলছে। জাতীয় সংসদে একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য চুক্তিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তবে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচক, প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন পর্যন্ত চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু উচ্চারণ করেনি।
এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিকে ‘অধীনতার চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। গত ১৭ এপ্রিল চুক্তিটি বাতিলের দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। সেখানে আনু মুহাম্মদ চুক্তি সই করায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিচারও দাবি করেছেন। চুক্তি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে মন্তব্য করে সংসদে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছেন।
সমাবেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই চুক্তি বহাল থাকলে দেশের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা একটা চোখ, কান ও মাথা বন্ধ করা একটা জাতিতে পরিণত হব, যারা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এ রকম একটা ভয়ংকর অবস্থায় যেতে না চাইলে সমাজের সব পর্যায় থেকে এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আসতে হবে।’
যদিও এই বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ‘উদ্বেগের কিছু নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। গত মঙ্গলবার (৫ মে) সচিবালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, চুক্তির কোনো ধারা যদি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তা সংশোধনের সুযোগ চুক্তির মধ্যেই রয়েছে।
চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে নয় এবং বাংলাদেশ চুক্তি বাতিলের পথে যাবে কিনা এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি বাণিজ্যমন্ত্রী।
অবস্থা বিবেচনায় মনে হচ্ছে, চুক্তির বিষয়ে সরকার ও বিরোধীদলগুলোর অবস্থান প্রায় একই রকম। জামায়াত ও এনসিপির দুই শীর্ষ নেতা স্ট্রিমকে বলেছেন, দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি তারা চান না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তির ‘প্রকাশ্য বিরোধিতাও’ তারা করছেন না।
জামায়াত দলীয়ভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাবে বলে জানিয়েছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। অন্যদিকে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেছেন, দলীয়ভাবে ইতিমধ্যে তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ নিয়ে আরও আলোচনা হবে।
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বাণিজ্যচুক্তিটিকে জাতীয় সংসদে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। নির্বাচনের তিন দিন আগে এই চুক্তি সই হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তখন দেশের সুশীল সমাজ ও ‘থিঙ্কট্যাংক’ মহল থেকে বলা হয়েছিল, একটি অনির্বাচিত সরকার এ ধরনের চুক্তি সই করতে পারে না। এই চুক্তিতে অনেকগুলো ক্লজ আছে, যেটা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। সুতরাং নির্বাচনের পরে যখন একটি নির্বাচিত সরকার আসবে, তখন যেন এই চুক্তি সই হয়। কিন্তু আনফরচুনেটলি আমরা দেখলাম, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুনল না এবং ৯ ফেব্রুয়ারি এই চুক্তি সই হয়।’
রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘এই চুক্তি ৬০ দিনের মধ্যে যদি সরকার চায়, তারা এটিকে বাতিল করতে পারে। চুক্তিটি সংসদে আনা হোক।’ কিন্তু প্রশ্নটি সংসদের চলমান বিষয়ের ওপরে না হওয়ায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এটিকে পয়েন্ট অব অর্ডার হিসেবে গ্রহণ করেননি।
গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। দর–কষাকষির পর ১ আগস্ট থেকে শুল্ক নেমে আসে ২০ শতাংশে। বাংলাদেশের পণ্যে পূর্বনির্ধারিত শুল্কের পরিমাণ ছিল ১৫ শতাংশ। ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ। এরপর ৯ মাসের দীর্ঘ আলোচনার ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক নিয়ে চুক্তি করে বাংলাদেশ, যাতে আগের চেয়ে শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে হয় ১৯ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আগে দর–কষাকষিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। ওই চুক্তির বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেন, বাণিজ্যচুক্তি করার আগে ‘বিএনপি ও জামায়াত সম্মতি দিয়েছিল’। তাঁর ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি করলেও কোনো চুক্তি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করেনি।
জামায়াতের আমির অস্বীকার করলেও চুক্তির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল বলে দাবি করেছেন এনসিপির কূটনীতি সেলের সম্পাদক আলাউদ্দিন মোহাম্মদ। বুধবার (৬ মে) সন্ধ্যায় স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘এই যে চুক্তি হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ৭২ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে, এই চুক্তির সঙ্গে এনসিপি অ্যালাইন (একমত) ছিল না। কিন্তু আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, বিএনপি এবং জামায়াত উভয়েই অ্যালাইন ছিল এবং আমরা এই চুক্তির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নই।’
চুক্তিটি প্রকাশ হলে পর্যালোচনা করে এনসিপি এর অনেকগুলো ধারাকে দেশের অর্থনৈতিক এবং জিওপলিটিক্যাল ‘স্বার্থের পরিপন্থী’ পেয়েছে বলেও জানান দলটির এই নেতা।
পারস্পরিক এই বাণিজ্যচুক্তিকে একতরফা বাধ্যবাধকতার এবং বিএনপি-জামায়াতের সমর্থনপুষ্ট আখ্যা দিয়ে এটিকে জাতির জন্য অশনি সংকেত বলে মন্তব্য করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (৫ মে) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমানের গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, এই চুক্তির বহুবিষয় আছে যা দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু দেশের স্বার্থ বিসর্জনে সরকার ও বিরোধীদল একমত হলে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
চুক্তির বিষয়ে দলের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব সময় চেয়ে নেন। পরে নিজে থেকে তিনি এ বিষয়ে এনসিপির কূটনীতি সেলের সম্পাদক আলাউদ্দিন মোহাম্মদের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন।
আলাউদ্দিন মোহাম্মদ জানান, এনসিপি চুক্তির শর্ত বিবেচনা করে দেখেছে এর কিছু শর্ত দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভালো। চুক্তির কিছু বিষয় প্রতিকূলেও আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে, যার কারণে হোল হার্টেডলি (পুরোপুরি) যে বিরোধিতা করবো এই জায়গায় আমরা নাই। আমাদের স্বাধীনতার ওপর যে জায়গাগুলো হস্তক্ষেপ করে বলে মনে হয়, এগুলো ডেফিনেটলি রিভিউ করা উচিত। চুক্তির যে যে শর্ত আমাদের অর্থনীতির জন্য সহায়ক সেগুলোতে প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণ দেখি না।’
তিনি বলেন, ‘সবাই মিলে একজোট হয়ে যেভাবে বলছে এই চুক্তি বাংলাদেশকে বিক্রি করে দিয়েছে সেটা সত্য নয়। ইটস নট ট্রু। এটা সেরকম হয় নাই। আপনাকে সামহাউ একটা জায়গায় ধাক্কা খেতে হবে, সে ধাক্কাটা হয়তোবা চলে আসছে এখন।’
আলাউদ্দিন মোহাম্মদ স্মরণ করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ শুল্কের বিষয়টি সামনে আসার পরে ব্যবসায়ীরা এই চুক্তি করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং বিচার-বিশ্লেষণ করেই চুক্তিটা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই বিষয়টাকে জাতীয় নিরাপত্তাজনিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি, কারণ আমরা অতীতেও দেখেছি যে, বাংলাদেশের যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ বৈদেশিক বাণিজ্য এবং চুক্তিগুলো অনেকটা একপেশে ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই চুক্তিটা একটা এক্সট্রিম মনে হলো।’
তিনি এ-ও বলেন, ‘তবে এই চুক্তির প্রসেসকে আমরা ক্রিটিক্যালি দেখি। আমরা এই চুক্তির প্রসেসটাকে কখনোই যথাযথ মনে করি না। ইউএস-এর যে ট্রেড কনভয় এখন দেশে সফররত আছে, তাদের সঙ্গেও আমাদের মিটিং হয়েছে, ইউএস সেক্রেটারি জেমস স্টুয়ার্টের সঙ্গেও। দ্বিপাক্ষিক মিটিংয়েও আমরা আমাদের কনসার্ন (উদ্বেগ) জানিয়েছি এবং আমরা আমাদের ক্রিটিক্যাল অবস্থান জারি রেখেছি।’
সংসদ অথবা সংসদের বাইরে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনা ছিল আমাদের একটা জাতীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্বের অংশ হিসেবে এই জায়গাটা ডাইভার্সিফাই করাও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্ট্রিমকে বলেন, নির্বাচনের তিন দিন আগে চুক্তিটা হয়েছে। চুক্তি হওয়ার সময় অন্তর্বর্তী সরকার কিছু জানায়নি। পরে এটা হয়েছে বলে জানা গেছে। আর বর্তমান সরকারও এ ব্যাপারে প্রথম দিকে কিছু বলে নাই। এখন এটার ধরন-প্রকৃতির সম্পর্কে আমরা জেনেছি।
এ ব্যাপারে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা। তিনি জানান, এ ব্যাপারে জামায়াতের অবস্থান কী তা নিয়ে এখনই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা যাচ্ছে না। দলের আমির দেশের বাইরে সফরে রয়েছেন, তাঁর ফেরার পরে আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানানো হবে।
তবে চুক্তি হওয়ার আগে জামায়াত অবগত ছিল না বলে আবারও দাবি করেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ ব্যাপারে ‘বিএনপি জানতো’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র ৭২ ঘণ্টা (তিন দিন) আগে ‘যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ সই করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তীব্র সমালোচনার মধ্যেই চুক্তিটি সই হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তা নিয়ে উদ্বেগ ও সমালোচনা চলছে। জাতীয় সংসদে একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য চুক্তিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তবে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচক, প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন পর্যন্ত চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু উচ্চারণ করেনি।
এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিকে ‘অধীনতার চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। গত ১৭ এপ্রিল চুক্তিটি বাতিলের দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। সেখানে আনু মুহাম্মদ চুক্তি সই করায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিচারও দাবি করেছেন। চুক্তি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে মন্তব্য করে সংসদে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছেন।
সমাবেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই চুক্তি বহাল থাকলে দেশের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা একটা চোখ, কান ও মাথা বন্ধ করা একটা জাতিতে পরিণত হব, যারা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এ রকম একটা ভয়ংকর অবস্থায় যেতে না চাইলে সমাজের সব পর্যায় থেকে এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আসতে হবে।’
যদিও এই বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ‘উদ্বেগের কিছু নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। গত মঙ্গলবার (৫ মে) সচিবালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, চুক্তির কোনো ধারা যদি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তা সংশোধনের সুযোগ চুক্তির মধ্যেই রয়েছে।
চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে নয় এবং বাংলাদেশ চুক্তি বাতিলের পথে যাবে কিনা এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি বাণিজ্যমন্ত্রী।
অবস্থা বিবেচনায় মনে হচ্ছে, চুক্তির বিষয়ে সরকার ও বিরোধীদলগুলোর অবস্থান প্রায় একই রকম। জামায়াত ও এনসিপির দুই শীর্ষ নেতা স্ট্রিমকে বলেছেন, দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি তারা চান না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তির ‘প্রকাশ্য বিরোধিতাও’ তারা করছেন না।
জামায়াত দলীয়ভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাবে বলে জানিয়েছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। অন্যদিকে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেছেন, দলীয়ভাবে ইতিমধ্যে তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ নিয়ে আরও আলোচনা হবে।
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বাণিজ্যচুক্তিটিকে জাতীয় সংসদে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। নির্বাচনের তিন দিন আগে এই চুক্তি সই হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তখন দেশের সুশীল সমাজ ও ‘থিঙ্কট্যাংক’ মহল থেকে বলা হয়েছিল, একটি অনির্বাচিত সরকার এ ধরনের চুক্তি সই করতে পারে না। এই চুক্তিতে অনেকগুলো ক্লজ আছে, যেটা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। সুতরাং নির্বাচনের পরে যখন একটি নির্বাচিত সরকার আসবে, তখন যেন এই চুক্তি সই হয়। কিন্তু আনফরচুনেটলি আমরা দেখলাম, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুনল না এবং ৯ ফেব্রুয়ারি এই চুক্তি সই হয়।’
রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘এই চুক্তি ৬০ দিনের মধ্যে যদি সরকার চায়, তারা এটিকে বাতিল করতে পারে। চুক্তিটি সংসদে আনা হোক।’ কিন্তু প্রশ্নটি সংসদের চলমান বিষয়ের ওপরে না হওয়ায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এটিকে পয়েন্ট অব অর্ডার হিসেবে গ্রহণ করেননি।
গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। দর–কষাকষির পর ১ আগস্ট থেকে শুল্ক নেমে আসে ২০ শতাংশে। বাংলাদেশের পণ্যে পূর্বনির্ধারিত শুল্কের পরিমাণ ছিল ১৫ শতাংশ। ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ। এরপর ৯ মাসের দীর্ঘ আলোচনার ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক নিয়ে চুক্তি করে বাংলাদেশ, যাতে আগের চেয়ে শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে হয় ১৯ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আগে দর–কষাকষিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। ওই চুক্তির বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেন, বাণিজ্যচুক্তি করার আগে ‘বিএনপি ও জামায়াত সম্মতি দিয়েছিল’। তাঁর ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি করলেও কোনো চুক্তি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করেনি।
জামায়াতের আমির অস্বীকার করলেও চুক্তির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল বলে দাবি করেছেন এনসিপির কূটনীতি সেলের সম্পাদক আলাউদ্দিন মোহাম্মদ। বুধবার (৬ মে) সন্ধ্যায় স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘এই যে চুক্তি হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ৭২ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে, এই চুক্তির সঙ্গে এনসিপি অ্যালাইন (একমত) ছিল না। কিন্তু আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, বিএনপি এবং জামায়াত উভয়েই অ্যালাইন ছিল এবং আমরা এই চুক্তির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নই।’
চুক্তিটি প্রকাশ হলে পর্যালোচনা করে এনসিপি এর অনেকগুলো ধারাকে দেশের অর্থনৈতিক এবং জিওপলিটিক্যাল ‘স্বার্থের পরিপন্থী’ পেয়েছে বলেও জানান দলটির এই নেতা।
পারস্পরিক এই বাণিজ্যচুক্তিকে একতরফা বাধ্যবাধকতার এবং বিএনপি-জামায়াতের সমর্থনপুষ্ট আখ্যা দিয়ে এটিকে জাতির জন্য অশনি সংকেত বলে মন্তব্য করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (৫ মে) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমানের গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, এই চুক্তির বহুবিষয় আছে যা দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু দেশের স্বার্থ বিসর্জনে সরকার ও বিরোধীদল একমত হলে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
চুক্তির বিষয়ে দলের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব সময় চেয়ে নেন। পরে নিজে থেকে তিনি এ বিষয়ে এনসিপির কূটনীতি সেলের সম্পাদক আলাউদ্দিন মোহাম্মদের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন।
আলাউদ্দিন মোহাম্মদ জানান, এনসিপি চুক্তির শর্ত বিবেচনা করে দেখেছে এর কিছু শর্ত দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভালো। চুক্তির কিছু বিষয় প্রতিকূলেও আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে, যার কারণে হোল হার্টেডলি (পুরোপুরি) যে বিরোধিতা করবো এই জায়গায় আমরা নাই। আমাদের স্বাধীনতার ওপর যে জায়গাগুলো হস্তক্ষেপ করে বলে মনে হয়, এগুলো ডেফিনেটলি রিভিউ করা উচিত। চুক্তির যে যে শর্ত আমাদের অর্থনীতির জন্য সহায়ক সেগুলোতে প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণ দেখি না।’
তিনি বলেন, ‘সবাই মিলে একজোট হয়ে যেভাবে বলছে এই চুক্তি বাংলাদেশকে বিক্রি করে দিয়েছে সেটা সত্য নয়। ইটস নট ট্রু। এটা সেরকম হয় নাই। আপনাকে সামহাউ একটা জায়গায় ধাক্কা খেতে হবে, সে ধাক্কাটা হয়তোবা চলে আসছে এখন।’
আলাউদ্দিন মোহাম্মদ স্মরণ করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ শুল্কের বিষয়টি সামনে আসার পরে ব্যবসায়ীরা এই চুক্তি করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং বিচার-বিশ্লেষণ করেই চুক্তিটা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই বিষয়টাকে জাতীয় নিরাপত্তাজনিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি, কারণ আমরা অতীতেও দেখেছি যে, বাংলাদেশের যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ বৈদেশিক বাণিজ্য এবং চুক্তিগুলো অনেকটা একপেশে ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই চুক্তিটা একটা এক্সট্রিম মনে হলো।’
তিনি এ-ও বলেন, ‘তবে এই চুক্তির প্রসেসকে আমরা ক্রিটিক্যালি দেখি। আমরা এই চুক্তির প্রসেসটাকে কখনোই যথাযথ মনে করি না। ইউএস-এর যে ট্রেড কনভয় এখন দেশে সফররত আছে, তাদের সঙ্গেও আমাদের মিটিং হয়েছে, ইউএস সেক্রেটারি জেমস স্টুয়ার্টের সঙ্গেও। দ্বিপাক্ষিক মিটিংয়েও আমরা আমাদের কনসার্ন (উদ্বেগ) জানিয়েছি এবং আমরা আমাদের ক্রিটিক্যাল অবস্থান জারি রেখেছি।’
সংসদ অথবা সংসদের বাইরে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনা ছিল আমাদের একটা জাতীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্বের অংশ হিসেবে এই জায়গাটা ডাইভার্সিফাই করাও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্ট্রিমকে বলেন, নির্বাচনের তিন দিন আগে চুক্তিটা হয়েছে। চুক্তি হওয়ার সময় অন্তর্বর্তী সরকার কিছু জানায়নি। পরে এটা হয়েছে বলে জানা গেছে। আর বর্তমান সরকারও এ ব্যাপারে প্রথম দিকে কিছু বলে নাই। এখন এটার ধরন-প্রকৃতির সম্পর্কে আমরা জেনেছি।
এ ব্যাপারে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা। তিনি জানান, এ ব্যাপারে জামায়াতের অবস্থান কী তা নিয়ে এখনই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা যাচ্ছে না। দলের আমির দেশের বাইরে সফরে রয়েছেন, তাঁর ফেরার পরে আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানানো হবে।
তবে চুক্তি হওয়ার আগে জামায়াত অবগত ছিল না বলে আবারও দাবি করেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ ব্যাপারে ‘বিএনপি জানতো’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। তিনি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত এবং সেখানে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন।
১৮ ঘণ্টা আগে
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠককে ঘিরে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। নেতাকর্মীরা বলছেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডসহ নানা কারণে ভুগতে থাকা সংগঠনগুলো সচলে বৈঠক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
১৯ ঘণ্টা আগে
অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে নতুন করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে না ফেলার দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
২ দিন আগে
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, বর্তমানে সেই সীমা অতিক্রম করেছে বলে মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে।
২ দিন আগে