যুক্তরাষ্ট্রের চু‌ক্তি নিয়ে সরকারের সঙ্গে ‘ঐক্য’ জামায়াত-এন‌সি‌পির

স্ট্রিম গ্রাফিক

জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমালোচনা ছিল শুরু থেকেই। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তা থামেনি। সম্প্রতি ওই চুক্তিতে শতাধিক শর্তের কথা সামনে আসার পর ফের তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। তবে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির আলাপে গত দুই বছর ধরে সরব জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন পর্যন্ত এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো উচ্চবাচ্য করেনি।

দল দুটির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেও কড়া প্রতিবাদ আসার আভাস মেলেনি। জামায়াত ও এনসিপির দুই শীর্ষ নেতা স্ট্রিমকে জানান, দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি তাঁরা চান না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তির ‘প্রকাশ্য বিরোধিতাও’ তারা করছেন না।

জামায়াত দলীয়ভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাবে বলে জানিয়েছেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। অন্যদিকে, এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, দলীয়ভাবে আলোচনা করেছেন, আরও হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিকে যারা কড়া কথা বলেছেন তাঁর মধ্যে একজন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। গত ১৭ এপ্রিল চুক্তিটি বাতিলের দাবিতে শাহবাগে এক সমাবেশে তিনি একে ‘অধীনতার চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেন। ওই চুক্তি সই করায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিচারও দাবি করেন তিনি।

এরপর ২৯ এপ্রিল বাণিজ্য চুক্তিটিকে জাতীয় সংসদে তোলার দাবি জানান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। নির্বাচনের তিন দিন আগে চুক্তিটি সই হওয়ার কথা উল্লেখ করে জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, তখন দেশের সুশীল সমাজ ও থিঙ্কট্যাংক মহল থেকে বলা হয়েছিল, একটি অনির্বাচিত সরকার এ ধরনের চুক্তি সই করতে পারে না। আবার চুক্তিতে অনেকগুলো ক্লজ আছে, যেটা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অন্তর্বর্তী সরকার সেই কথা না শুনে ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তিতে সই করে।

রুমিন ফারহানা আরও বলেন, সরকার চাইলে ৬০ দিনের মধ্যে এই চুক্তি বাতিল করতে পারে। তাই চুক্তিটি সংসদে আনা হোক।

সম্প্রতি চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য পালনীয় ১৩১ শর্তের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এমন শর্ত মাত্র ৬টি থাকার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর সমালোচনার মধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির দাবি করেন, এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। গত ৫ মে সচিবালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চুক্তির কোনো ধারা যদি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থি হয়, তা সংশোধনের সুযোগ চুক্তির মধ্যেই রয়েছে।

চুক্তিতে ‘সম্মতি থাকা’ নিয়ে যা বলছে দলগুলো

ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা দেয় গত বছরের এপ্রিলে। দর–কষাকষির পর ১ আগস্ট থেকে সেই শুল্ক ২০ শতাংশে নামে। বাংলাদেশের পণ্যে আগেই শুল্কের পরিমাণ ছিল ১৫ শতাংশ। ফলে সব মিলিয়ে শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।

এরপর ৯ মাস আলোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই করে। এতে শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশ করে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে অতিরিক্ত ওই শুল্ক শেষ পর্যন্ত চালু করতে পারেননি ট্রাম্প।

যেই শুল্ক আরোপই হয়নি তা কমাতে করা চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী শর্ত রয়েছে বলে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পর ক্ষমতায় বসা বিএনপি সরকারও এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। বিরোধীদল থেকেও আসেনি প্রতিবাদ।

ওই চুক্তির দর–কষাকষিতে বাংলাদেশের পক্ষে প্রধান ভূমিকায় থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বর্তমানে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সম্প্রতি বলেন, বাণিজ্যচুক্তি করার আগে ‘বিএনপি ও জামায়াত সম্মতি দিয়েছিল’।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই দাবি অবশ্য অস্বীকার করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি করলেও কোনোটি নিয়েই জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা করেনি।

আর এনসিপির কূটনীতি সেলের সম্পাদক আলাউদ্দিন মোহাম্মদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘এই চুক্তির সঙ্গে এনসিপি অ্যালাইন (একমত) ছিল না। কিন্তু আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, বিএনপি এবং জামায়াত উভয়েই অ্যালাইন ছিল এবং আমরা এই চুক্তির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নই।’

চুক্তিটি প্রকাশের পর পর্যালোচনায় এনসিপি দেশের অর্থনৈতিক এবং জিও পলিটিক্যাল ‘স্বার্থের পরিপন্থি’ অনেকগুলো ধারা পেয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে কিছু শর্ত দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভালো বলে দাবি করেন তিনি।

সরকারি ও বিরোধীদলের এমন অবস্থান নিয়ে গত ৫ মে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, দেশের স্বার্থ বিসর্জনে সরকার ও বিরোধীদল একমত হলে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

চুক্তির পুরোপুরি বিরোধী নয় এনসিপি

চুক্তির বিষয়ে এনসিপির অবস্থান জানতে দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিবের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল স্ট্রিম। পরে তিনি দলের কূটনীতি সেলের সম্পাদক আলাউদ্দিন মোহাম্মদের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন।

আলাউদ্দিন মোহাম্মদ স্ট্রিমকে জানান, এনসিপি চুক্তির শর্ত বিবেচনা করে দেখেছে এর কিছু দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জন্য ভালো। তিনি বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে, যার কারণে হোল হার্টেডলি (পুরোপুরি) যে বিরোধিতা করব সেই জায়গায় আমরা নেই। আমাদের স্বাধীনতার ওপর যে জায়গাগুলো হস্তক্ষেপ করে বলে মনে হয়, এগুলো ডেফিনেটলি রিভিউ করা উচিত। চুক্তির যে যে শর্ত আমাদের অর্থনীতির জন্য সহায়ক সেগুলোতে প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণ দেখি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবাই মিলে একজোট হয়ে যেভাবে বলছে, এই চুক্তি বাংলাদেশকে বিক্রি করে দিয়েছে, সেটা সত্য নয়। এটা সেরকম হয় নাই।’

বাংলাদেশের আগের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা এই বিষয়টাকে জাতীয় নিরাপত্তাজনিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি। কারণ আমরা অতীতেও দেখেছি, বাংলাদেশের যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়, বেশিরভাগ বৈদেশিক বাণিজ্য এবং চুক্তিগুলো অনেকটা একপেশে ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই চুক্তিটা একটা এক্সট্রিম মনে হলো।’

চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এই চুক্তির প্রসেসটাকে কখনোই যথাযথ মনে করি না। ইউএস-এর যে ট্রেড কনভয় এখন দেশে সফররত আছে, তাদের সঙ্গেও আমাদের মিটিং হয়েছে; ইউএস সেক্রেটারি জেমস স্টুয়ার্টের সঙ্গেও। দ্বিপাক্ষিক মিটিংয়ে আমাদের কনসার্ন (উদ্বেগ) জানিয়েছি এবং আমরা ক্রিটিক্যাল অবস্থান জারি রেখেছি।’

সংসদ অথবা সংসদের বাইরে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট না করার কারণ জানতে চাইলে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনা ছিল আমাদের একটা জাতীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্বের অংশ হিসেবে এই জায়গাটা ডাইভার্সিফাই করাও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল।’

এখনই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য নয়: জামায়াত

বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্ট্রিমকে বলেন, নির্বাচনের ৩ দিন আগে চুক্তিটা হয়েছে। চুক্তি হওয়ার সময় অন্তর্বর্তী সরকার কিছু জানায়নি। বর্তমান সরকারও এ ব্যাপারে প্রথম দিকে কিছু বলেনি। এখন এটার ধরন-প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা জেনেছি।

দলের শীর্ষ নেতারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে জামায়াতের অবস্থান কী তা নিয়ে এখনই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা যাচ্ছে না। দলের আমির দেশের বাইরে সফরে রয়েছেন, তিনি ফেরার পর আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানানো হবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত