পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় ইরানের আখ্যান

লেখা:
লেখা:
আমিন সাইকাল

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ১৪: ১২
স্ট্রিম কোলাজ

প্রখ্যাত ফার্সি ভাষার কবি আবুল-কাসিম ফেরদৌসি একবার বলেছিলেন: “ইরান আমার দেশ, এবং পুরো বিশ্ব আমার পায়ের নিচে। এ দেশের মানুষেরা পুণ্য, শিল্প এবং সাহসিকতার অধিকারী। গর্জনরত সিংহকেও তারা ভয় পায় ন।”

হ্যা, ইরান। এটি এমন একটি দেশ যা বহুবার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিদেশি পরাশক্তির হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাজার বছরের আগ্রাসন সত্ত্বেও ইরান কখনোই কারও স্থায়ী উপনিবেশে পরিণত হয়নি। ইতিহাসের প্রতিটি কঠিন বাঁকে ইরানিরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে, রক্ষা করেছে নিজেদের আত্মপরিচয় ও স্বকীয়তা।

আধুনিক যুগেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে প্রায়ই ইরানকে নানা হুমকির মুখে পড়তে হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ইরানকে তিনি ‘পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলবেন’ এবং ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেবেন। এসব মন্তব্য হয়তো সাময়িক রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াতে পারে, কিন্তু যারা ইরানের সুদীর্ঘ ও টেকসই সভ্যতার ইতিহাস জানেন, তাদের কাছে এটি নিছকই অজ্ঞতা। কারণ, পারস্য বা আজকের ইরান এমন এক জাতি, যাদের ধ্বংস করার হুমকি দেওয়া সহজ, কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব।

ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের সাংস্কৃতিক দৃঢ়তা। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট সামরিক শক্তিতে পারস্য জয় করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি নিজেই পারস্যের সংস্কৃতিতে মুগ্ধ হয়ে তা আপন করে নিয়েছিলেন। ফলে গ্রিকদের চেয়ে পারস্যের সংস্কৃতিই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।

প্রাচীন গৌরবের ইতিকথা: গ্রিস ও রোমের প্রতিদ্বন্দ্বী

পশ্চিমা বিশ্বে প্রাচীনকাল থেকেই পারস্যকে একটি ‘ভিন্ন সত্তা’ বা খলনায়ক হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা ছিল। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে পারস্যের রাজারাই ব্যাবিলনে নির্বাসিত ইহুদিদের জেরুজালেমে ফিরে গিয়ে তাদের মন্দির পুনর্নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বিশ্বের প্রথম সত্যিকারের বহুসংস্কৃতির সাম্রাজ্য হিসেবে পারস্যের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়।

গ্রিকদের সাথে পারস্যের যুদ্ধের ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি। ম্যারাথন বা সালামিসের যুদ্ধে পারস্য বাহিনীর বিরুদ্ধে গ্রিকদের বিজয়কে পশ্চিমা বিশ্ব বিশাল অর্জন হিসেবে দেখে। কিন্তু পারস্যের কাছে এটি ছিল সামান্য হোঁচট মাত্র। বস্তুত, প্রাচীন যুগে গ্রিকদের রাজনীতিতে পারস্যই কলকাঠি নাড়ত। যেমন, পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধে স্পার্টাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল পারস্য।

পরবর্তীকালে রোমান সাম্রাজ্যকেও কাঁপিয়ে দিয়েছিল তারা। ২৬০ খ্রিস্টাব্দে সাসানীয় সম্রাট প্রথম শাপুর রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানকে যুদ্ধে বন্দী করেছিলেন, যা ছিল তৎকালীন বিশ্বের এক নজিরবিহীন ঘটনা। পশ্চিমা বিজয়ের আড়ালে এই সত্যটি প্রায়ই ঢাকা পড়ে যায় যে, প্রাচীন যুগে পারস্য বারবার পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোকে পরাস্ত ও নতজানু করেছিল।

ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ফিরে আসা

ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের সাংস্কৃতিক দৃঢ়তা। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট সামরিক শক্তিতে পারস্য জয় করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি নিজেই পারস্যের সংস্কৃতিতে মুগ্ধ হয়ে তা আপন করে নিয়েছিলেন। ফলে গ্রিকদের চেয়ে পারস্যের সংস্কৃতিই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।

খোমেনি ইরানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেন, যা ছিল পুরোপুরি আমেরিকা ও ইসরায়েল বিরোধী। তিনি ইরানিদের হাজার বছরের আত্মমর্যাদাবোধকে জাগিয়ে তোলেন। শিয়া রাজনৈতিক ইসলামের সাথে ইরানিদের জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটান তিনি, যা আজ অবধি যেকোনো বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে।

পরবর্তী সময়ে ইসলামের আগমনেও পারস্যের নিজস্ব সভ্যতা হারিয়ে যায়নি। বরং ইসলামি নেতারা ফার্সি ভাষা ও সংস্কৃতিকে সযত্নে লালন করেছেন। ‘নওরোজ’-এর মতো ৩,০০০ বছরের পুরোনো উৎসব আজও ইরানে মহাসমারোহে পালিত হয়। এমনকি ১২১৯ থেকে ১২৫৮ সালের মধ্যে মঙ্গোলদের ভয়াবহ আক্রমণ ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলেও, পারস্য সভ্যতার মূল শিকড় তারা উপড়ে ফেলতে পারেনি। সাফাভি রাজবংশের শাসনামলে এই সভ্যতা আবারও আপন মহিমায় বিকশিত হয়।

আধুনিক যুগের উপনিবেশবাদ ও ইরানি প্রতিরোধ

ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হয় বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর কূটনীতির লড়াই। ইঙ্গ-রুশ দ্বন্দ্বে ইরান কোণঠাসা হলেও কখনো বশ্যতা স্বীকার করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তেলসমৃদ্ধ ইরানকে ব্রিটিশ ও সোভিয়েতরা দখল করলেও, যুদ্ধের পর তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে ইরানি জাতীয়তাবাদ এক নতুন রূপ পায়। দেশের তেলের ওপর ব্রিটিশদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদে ১৯৫১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদেক ইরানের তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করেন। তিনি চেয়েছিলেন বিদেশিদের প্রভাব মুক্ত একটি গণতান্ত্রিক ইরান। কিন্তু ব্রিটিশ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা (এমআই-৬ ও সিআইএ) ১৯৫৩ সালে এক গোপন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদেককে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং পশ্চিমা-ঘেঁষা শাসক শাহকে ক্ষমতায় বসায়।

ইসলামি বিপ্লব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম

আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট শাহ সরকারের আমলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও, সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। এর চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় ১৯৭৮-৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবে। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নানা অবরোধ ও হুমকির মুখেও ইরান প্রমাণ করেছে যে, তারা দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য সব সময় প্রস্তুত। তবে আজকের বিশ্বে পেশিশক্তির আস্ফালন দিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সামরিক সংঘাতের বদলে পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে কূটনৈতিক আলোচনাই হলো এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ।

খোমেনি ইরানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেন, যা ছিল পুরোপুরি আমেরিকা ও ইসরায়েল বিরোধী। তিনি ইরানিদের হাজার বছরের আত্মমর্যাদাবোধকে জাগিয়ে তোলেন। শিয়া রাজনৈতিক ইসলামের সাথে ইরানিদের জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটান তিনি, যা আজ অবধি যেকোনো বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে।

'গর্জনরত সিংহকেও আমাদের ভয় নেই'

প্রখ্যাত ফার্সি কবি আবুল-কাসিম ফেরদৌসি হাজার বছর আগে লিখেছিলেন, "ইরান আমার দেশ, এবং পুরো বিশ্ব আমার পায়ের নিচে। এ দেশের মানুষেরা পুণ্য, শিল্প এবং সাহসিকতার অধিকারী। গর্জনরত সিংহকেও তাদের কোনো ভয় নেই।"

কবির এই কথাগুলো যেন আজও আধুনিক ইরানের প্রতিচ্ছবি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নানা অবরোধ ও হুমকির মুখেও ইরান প্রমাণ করেছে যে, তারা দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য সব সময় প্রস্তুত। তবে আজকের বিশ্বে পেশিশক্তির আস্ফালন দিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সামরিক সংঘাতের বদলে পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে কূটনৈতিক আলোচনাই হলো এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। অন্যথায় একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বকে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে ফেলে দিতে পারে। আর দিনশেষে, ইরানের শাসনব্যবস্থা বা ভবিষ্যৎ কেমন হবে—তা নির্ধারণ করার একমাত্র অধিকার কেবল ইরানের জনগণেরই।

(লেখাটি দ্য কনভারসেশন থেকে অনুবাদ করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত