সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ২০: ১১
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

পরিসংখ্যান নিয়ে এই বিতর্কের কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, তথ্যের অস্পষ্টতা। ইতিপূর্বে মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন যখন বিবিএস থেকে প্রকাশ হতো, তখন সেটি বিস্তারিত থাকত। সেখানে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত প্রতিটি উপখাত ধরে বিশ্লেষণ দেওয়া হতো। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বর্তমানে আমরা মাত্র এক পৃষ্ঠার ‘কি-ইন্ডিকেটর’ পাচ্ছি। এর ফলে ঠিক কোন উপাদানগুলোর কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমল এবং কোনগুলোর জন্য খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেশি, তা বোঝার উপায় নেই। শহর ও গ্রামভিত্তিক মূল্যস্ফীতির পরিষ্কার চিত্রও এই সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত, জুলাই মাসের মূল্যস্ফীতির যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জুলাইয়ে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য কারণে বাজারে পণ্য সরবরাহে বড় ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল না। সরকারি সংস্থা টিসিবির বাজারভিত্তিক তথ্যেও চালের দাম কমার কোনো প্রমাণ নেই; বরং মোটা ও চিকন চালের দাম স্থিতিশীল বা বাড়তির দিকেই ছিল। অথচ বিবিএস বলছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে! এর কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যাও তারা দেয়নি।

সরকার যদি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে থাকে, তবে পরিসংখ্যানের কসরত না করে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজারে পণ্য সরবরাহ স্থিতিশীল করা, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সেচ ও বীজের মতো কৃষি উপকরণ সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

অতীতে বিশেষ করে বিগত আ.লীগ সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, পরিসংখ্যান নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা হতো। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেখানো হতো, আবার উল্টোটাও ঘটত। উদ্দেশ্য ছিল মূল্যস্ফীতিকে স্থিতিশীল দেখানো। এবারের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানেও—যেখানে খাদ্য কমেছে, কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত বেড়েছে—সেই পুরনো প্রবণতারই ইঙ্গিত মেলে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর (ভারত ও নেপাল বাদে) সঙ্গে তুলনা করলেও বাংলাদেশের এই মূল্যস্ফীতি কমার চিত্রটি অস্বাভাবিক ঠেকে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নেমে আসা মোটেও স্বস্তির খবর নয়। ৮ শতাংশও অতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বিগত দুই বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এই দীর্ঘস্থায়ী অসহনীয় পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে, জীবনমান ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষ ক্রমাগত মানবেতর জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নামিয়েও কৃতিত্ব নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সরকার যদি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে থাকে, তবে পরিসংখ্যানের কসরত না করে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজারে পণ্য সরবরাহ স্থিতিশীল করা, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সেচ ও বীজের মতো কৃষি উপকরণ সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে নিম্ন আয়ের মানুষকে বাঁচাতে টিসিবির ট্রাক সেল, ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি।

বিগত সরকারের আমলে বিবিএসকে ব্যবহার করে মনগড়া তথ্য প্রচারের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়। বিবিএসের তথ্য-উপাত্ত যাচাই ও সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উচিত বিবিএসকে এক পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত-সারের বদলে আগের মতো পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশে বাধ্য করা।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে শতভাগ নির্ভেজাল তথ্য পাওয়া হয়তো কঠিন। তথ্যের উৎস ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বলে বাস্তবতাবিবর্জিত পরিসংখ্যান প্রকাশ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

মূল্যস্ফীতি গণনার পদ্ধতিতে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধন করাও এই কমিটির কাজ। তবে শুধু সুপারিশ করলেই হবে না; বিবিএস তা যথাযথভাবে প্রতিপালন করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভুল তথ্যের দায়ভার এই বিশেষজ্ঞ কমিটির ওপরও বর্তাবে।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে শতভাগ নির্ভেজাল তথ্য পাওয়া হয়তো কঠিন। তথ্যের উৎস ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বলে বাস্তবতাবিবর্জিত পরিসংখ্যান প্রকাশ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বিবিএসের মূল কাজ তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং সময়মতো প্রকাশ করা। এজন্য বিবিএসকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো পরিসংখ্যান ব্যুরোকে সরকারের বদলে সরাসরি সংসদের কাছে জবাবদিহি করার কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। আমলাদের পাশাপাশি পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে হবে এবং এর সক্ষমতা বাড়াতে পর্যাপ্ত বাজেট দিতে হবে।

সর্বোপরি, অবাস্তব তথ্যের ওপর প্রণীত রাষ্ট্রীয় নীতি কখনোই অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে না। স্বচ্ছ ও নির্ভুল তথ্য ছাড়া সঠিক নীতি-সিদ্ধান্ত গ্রহণ অসম্ভব। উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি বিনিয়োগকারী কিংবা সরকারের নিজস্ব বাজেট প্রণয়ন—সব ক্ষেত্রেই নির্ভুল তথ্যের কোনো বিকল্প নেই।

তথ্য যদি সঠিক না হয়, তবে তা অপতথ্য বা অর্ধসত্য হয়ে দাঁড়ায়–যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরাতে সবার আগে পরিসংখ্যানের আয়নাটিকে স্বচ্ছ করতে হবে।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত