শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

এপ্রিল মে মাস এলেই আমরা তাপপ্রবাহকে দেখি একটি মৌসুমি ঝামেলা হিসেবে। হিট অ্যালার্ট আসে, স্কুল বন্ধ হয়, রাস্তার পিচ গলে যায়, তারপর বর্ষা নামলেই আমরা সবাই বিষয়টা ভুলে যাই। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের একটি নতুন প্রতিবেদন বলছে, এই ভুলে যাওয়ার অভ্যাসটাই এখন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু স্বাস্থ্য বা কৃষির বিষয় নয়, এটা এখন সরাসরি চাকরি, উৎপাদন আর দেশের প্রবৃদ্ধির হিসাবেও ঢুকে পড়েছে।
সংখ্যাগুলো দেখলেই বিষয়টি কতটা গুরুতর তা বোঝা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি দশ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমান কর্মঘণ্টা শুধু গরমের কারণে নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের অর্থনীতি প্রায় সাত শতাংশ ছোট হয়ে যেতে পারে। অথচ ঠিক এই সময়েই দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারে যুক্ত হবে আরও প্রায় আটাশ কোটি নতুন কর্মক্ষম মানুষ। একদিকে বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হাতছানি, অন্যদিকে গরমের কারণে সেই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর ক্ষমতাই কমে যাওয়ার শঙ্কা। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, জনসংখ্যার এই সুফল কাজে লাগানোর আগেই কি আমরা সেই সুযোগ হারিয়ে ফেলছি?
স্বাস্থ্যের দিক থেকেও ছবিটা ভয়ংকর। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপজনিত মৃত্যু দ্বিগুণ হয়েছে, আর শ্রীলঙ্কায় বেড়েছে প্রায় চার গুণ। অর্থাৎ এই সংকট শুধু জিডিপির হিসাবে আটকে নেই, সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের হিসাবটা আলাদা করে দেখা দরকার। ২০২৪ সালে তীব্র গরমের কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় এক দশমিক তিন থেকে এক দশমিক আট বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা জিডিপির শূন্য দশমিক তিন থেকে চার শতাংশের সমান। সবচেয়ে বেশি ভুগছে ঢাকা। রাজধানীতে প্রতি বছর মোট কাজের সময়ের প্রায় তিন শতাংশ নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় চার লাখ পঁয়ষট্টি হাজার পূর্ণকালীন চাকরি হারানোর সমান। এই প্রবণতা চললে ২০৮০ সালের মধ্যে এই ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে সাত দশমিক চার শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এই সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে ঢাকার নিজস্ব গঠন। অপরিকল্পিত কংক্রিটের ভবন, সবুজের অভাব আর গাড়ির চাপে ঢাকা এখন এমন একটি শহরে পরিণত হয়েছে যেখানে চারদিক থেকে আটকে থাকা গরম সহজে বের হতে পারে না (এই অবস্থাকে বলা হয় আরবান হিট আইল্যান্ড, অর্থাৎ শহরের ভেতরটা চারপাশের গ্রাম এলাকার চেয়ে বেশি গরম থাকা)। ফলে ঢাকার তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার চেয়ে চার থেকে পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে। অর্থাৎ প্রকৃতির দেওয়া গরমের সঙ্গে আমাদের নিজেদের নগর পরিকল্পনার ভুলও বাড়তি গরম যোগ করছে। রাজশাহী, পাবনা, খুলনার মতো জেলাগুলোতেও এখন প্রতি মৌসুমে হালকা থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মাঠের কাজ আর ফলন দুটোতেই প্রভাব ফেলছে।
এই সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা তৈরি পোশাক শিল্প। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক শ্রম ও আর্থিক সংস্থাগুলোর একটি যৌথ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাত গরম আর বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই চার দেশ মিলে প্রায় পঁয়ষট্টি বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে। কারখানার ভেতরে গরম বেড়ে গেলে উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণের চাপ শ্রমিকদের ওপর বাড়তি মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন আরও বলছে, এই চাপ নারী শ্রমিকদের ওপর হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
তবে এই খাতেই রয়েছে আশার একটা দিক, যা আমাদের সামনে তুলে ধরা দরকার। ২০১৬ সালে সরকার পোশাক কারখানায় বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি বসাতে এবং কাজের পরিবেশ ভালো করতে একটি তহবিল চালু করেছিল, যার নাম গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (সহজ কথায়, কারখানাকে পরিবেশবান্ধব করে তোলার জন্য সরকারি সহায়তার তহবিল)। শুরুটা হয়েছিল অল্প কয়েকটি কারখানা দিয়ে, পরে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা আর সহজ শর্তের ঋণ এই বদলকে আরও জোরদার করে। ফল হিসেবে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব স্বীকৃতি পাওয়া পোশাক কারখানার সংখ্যা (যাকে বলা হয় লিড সনদ) দুইশ সত্তর ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এই তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটা প্রমাণ করে যে সঠিক অর্থায়ন আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে গরম ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা করা কেবল সম্ভবই নয় বরং তা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় বদলে ফেলা যায়। প্রশ্ন হলো, পোশাক খাতে যে মডেল কাজ করেছে, নির্মাণ, পরিবহন কিংবা কৃষির মতো অন্য খাতে সেই একই সাহস আর অর্থায়ন কেন এখনো দেখা যাচ্ছে না?
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুরা। রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক কিংবা রাস্তার হকার, যাদের দিন শুরু হয় খোলা আকাশের নিচে, তাদের কাছে ছায়া বা বিশ্রামের সময় বিলাসিতা নয়, জীবিকার প্রশ্ন। পোশাক খাতে যেমন তহবিল আর স্বীকৃতির একটা কাঠামো তৈরি হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক খাতে তেমন কিছুই নেই। এই বিশাল শ্রমশক্তি আমাদের অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি হয়েও এখনো কোনো সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সমাধানের দিকটাও তাই স্পষ্ট করে বলা দরকার। বাংলাদেশের একটি খসড়া পরিকল্পনায় (যাকে বলা হয় ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান, অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জাতীয় রূপরেখা) চৌদ্দটা জলবায়ু বিপর্যয় ও এগারোটা ঝুঁকিপূর্ণ খাত চিহ্নিত করে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের ব্যয়ের রূপরেখা তৈরি হয়েছে, কিন্তু তাপপ্রবাহকে সেই পরিকল্পনায় একটি আলাদা, পরিমাপযোগ্য অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা এখনো বাকি। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন সম্প্রতি জাপানি পদ্ধতিতে (যার নাম মিয়াওয়াকি পদ্ধতি) খুব ঘন করে গাছ লাগানো শুরু করেছে, যা অল্প জায়গায় দ্রুত সবুজ তৈরি করে স্থানীয়ভাবে গরম কমাতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তাপ সতর্কবার্তাকে স্বাস্থ্য, শ্রম ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা দাঁড় করানো গেলে, যেখানে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ছাড়ালে খোলা আকাশের নিচে কাজ বন্ধ রাখা ও বাধ্যতামূলক বিশ্রাম আর ঠান্ডা রাখার জায়গার মতো স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে, তাহলে তাপজনিত মৃত্যু ও কাজের ক্ষতি দুটোই কমানো সম্ভব। পোশাক খাতের তহবিলের ধাঁচে নির্মাণ ও পরিবহন খাতের জন্যও লক্ষ্যভিত্তিক তহবিল গড়ে তোলা যেতে পারে। আর অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য ছোট বীমা বা তাপ ভাতার মতো সামাজিক সুরক্ষা চালু করা গেলে, চরম গরমের দিনে কাজ বন্ধ রাখলেও একজন রিকশাচালক বা দিনমজুরের পরিবারকে না খেয়ে থাকতে হবে না।
তাপপ্রবাহকে যতদিন আমরা কেবল মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখব, ততদিন তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও থাকবে মৌসুমি ও অস্থায়ী। অথচ পরিসংখ্যান বলছে এটা এখন একটি কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যা, যা প্রতি বছর ধীরে ধীরে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি আয়, জনস্বাস্থ্য আর শ্রমবাজারের ভিত নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
পোশাক খাত দেখিয়ে দিয়েছে সমাধান অসম্ভব নয়, শুধু ইচ্ছা আর অর্থায়নের বিষয়। শহর পরিকল্পনা, শ্রম নীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর শিল্পনীতিতে গরম সহ্য করার ক্ষমতাকে কেন্দ্রীয় বিবেচ্য বিষয় হিসেবে না রাখলে আগামী দশকগুলোতে এই ক্ষতির পরিমাণ কেবল বাড়তেই থাকবে।
দক্ষিণ এশিয়া দ্রুত নগরায়ণের পথে এগোচ্ছে, আর বাংলাদেশ এই যাত্রায় সবচেয়ে সক্রিয় দেশগুলোর একটি। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে আমাদের শহরগুলো কর্মসংস্থান আর প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে থাকবে, নাকি ক্রমবর্ধমান গরমের চাপে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বে। এই প্রশ্নের উত্তর প্রকৃতির হাতে নয়, আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্তের হাতেই রয়ে গেছে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

এপ্রিল মে মাস এলেই আমরা তাপপ্রবাহকে দেখি একটি মৌসুমি ঝামেলা হিসেবে। হিট অ্যালার্ট আসে, স্কুল বন্ধ হয়, রাস্তার পিচ গলে যায়, তারপর বর্ষা নামলেই আমরা সবাই বিষয়টা ভুলে যাই। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের একটি নতুন প্রতিবেদন বলছে, এই ভুলে যাওয়ার অভ্যাসটাই এখন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু স্বাস্থ্য বা কৃষির বিষয় নয়, এটা এখন সরাসরি চাকরি, উৎপাদন আর দেশের প্রবৃদ্ধির হিসাবেও ঢুকে পড়েছে।
সংখ্যাগুলো দেখলেই বিষয়টি কতটা গুরুতর তা বোঝা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি দশ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমান কর্মঘণ্টা শুধু গরমের কারণে নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের অর্থনীতি প্রায় সাত শতাংশ ছোট হয়ে যেতে পারে। অথচ ঠিক এই সময়েই দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারে যুক্ত হবে আরও প্রায় আটাশ কোটি নতুন কর্মক্ষম মানুষ। একদিকে বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হাতছানি, অন্যদিকে গরমের কারণে সেই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর ক্ষমতাই কমে যাওয়ার শঙ্কা। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, জনসংখ্যার এই সুফল কাজে লাগানোর আগেই কি আমরা সেই সুযোগ হারিয়ে ফেলছি?
স্বাস্থ্যের দিক থেকেও ছবিটা ভয়ংকর। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপজনিত মৃত্যু দ্বিগুণ হয়েছে, আর শ্রীলঙ্কায় বেড়েছে প্রায় চার গুণ। অর্থাৎ এই সংকট শুধু জিডিপির হিসাবে আটকে নেই, সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের হিসাবটা আলাদা করে দেখা দরকার। ২০২৪ সালে তীব্র গরমের কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় এক দশমিক তিন থেকে এক দশমিক আট বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা জিডিপির শূন্য দশমিক তিন থেকে চার শতাংশের সমান। সবচেয়ে বেশি ভুগছে ঢাকা। রাজধানীতে প্রতি বছর মোট কাজের সময়ের প্রায় তিন শতাংশ নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় চার লাখ পঁয়ষট্টি হাজার পূর্ণকালীন চাকরি হারানোর সমান। এই প্রবণতা চললে ২০৮০ সালের মধ্যে এই ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে সাত দশমিক চার শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এই সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে ঢাকার নিজস্ব গঠন। অপরিকল্পিত কংক্রিটের ভবন, সবুজের অভাব আর গাড়ির চাপে ঢাকা এখন এমন একটি শহরে পরিণত হয়েছে যেখানে চারদিক থেকে আটকে থাকা গরম সহজে বের হতে পারে না (এই অবস্থাকে বলা হয় আরবান হিট আইল্যান্ড, অর্থাৎ শহরের ভেতরটা চারপাশের গ্রাম এলাকার চেয়ে বেশি গরম থাকা)। ফলে ঢাকার তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার চেয়ে চার থেকে পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে। অর্থাৎ প্রকৃতির দেওয়া গরমের সঙ্গে আমাদের নিজেদের নগর পরিকল্পনার ভুলও বাড়তি গরম যোগ করছে। রাজশাহী, পাবনা, খুলনার মতো জেলাগুলোতেও এখন প্রতি মৌসুমে হালকা থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মাঠের কাজ আর ফলন দুটোতেই প্রভাব ফেলছে।
এই সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা তৈরি পোশাক শিল্প। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক শ্রম ও আর্থিক সংস্থাগুলোর একটি যৌথ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাত গরম আর বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই চার দেশ মিলে প্রায় পঁয়ষট্টি বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে। কারখানার ভেতরে গরম বেড়ে গেলে উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণের চাপ শ্রমিকদের ওপর বাড়তি মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন আরও বলছে, এই চাপ নারী শ্রমিকদের ওপর হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
তবে এই খাতেই রয়েছে আশার একটা দিক, যা আমাদের সামনে তুলে ধরা দরকার। ২০১৬ সালে সরকার পোশাক কারখানায় বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি বসাতে এবং কাজের পরিবেশ ভালো করতে একটি তহবিল চালু করেছিল, যার নাম গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (সহজ কথায়, কারখানাকে পরিবেশবান্ধব করে তোলার জন্য সরকারি সহায়তার তহবিল)। শুরুটা হয়েছিল অল্প কয়েকটি কারখানা দিয়ে, পরে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা আর সহজ শর্তের ঋণ এই বদলকে আরও জোরদার করে। ফল হিসেবে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব স্বীকৃতি পাওয়া পোশাক কারখানার সংখ্যা (যাকে বলা হয় লিড সনদ) দুইশ সত্তর ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এই তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটা প্রমাণ করে যে সঠিক অর্থায়ন আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে গরম ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা করা কেবল সম্ভবই নয় বরং তা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় বদলে ফেলা যায়। প্রশ্ন হলো, পোশাক খাতে যে মডেল কাজ করেছে, নির্মাণ, পরিবহন কিংবা কৃষির মতো অন্য খাতে সেই একই সাহস আর অর্থায়ন কেন এখনো দেখা যাচ্ছে না?
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুরা। রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক কিংবা রাস্তার হকার, যাদের দিন শুরু হয় খোলা আকাশের নিচে, তাদের কাছে ছায়া বা বিশ্রামের সময় বিলাসিতা নয়, জীবিকার প্রশ্ন। পোশাক খাতে যেমন তহবিল আর স্বীকৃতির একটা কাঠামো তৈরি হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক খাতে তেমন কিছুই নেই। এই বিশাল শ্রমশক্তি আমাদের অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি হয়েও এখনো কোনো সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সমাধানের দিকটাও তাই স্পষ্ট করে বলা দরকার। বাংলাদেশের একটি খসড়া পরিকল্পনায় (যাকে বলা হয় ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান, অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জাতীয় রূপরেখা) চৌদ্দটা জলবায়ু বিপর্যয় ও এগারোটা ঝুঁকিপূর্ণ খাত চিহ্নিত করে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের ব্যয়ের রূপরেখা তৈরি হয়েছে, কিন্তু তাপপ্রবাহকে সেই পরিকল্পনায় একটি আলাদা, পরিমাপযোগ্য অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা এখনো বাকি। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন সম্প্রতি জাপানি পদ্ধতিতে (যার নাম মিয়াওয়াকি পদ্ধতি) খুব ঘন করে গাছ লাগানো শুরু করেছে, যা অল্প জায়গায় দ্রুত সবুজ তৈরি করে স্থানীয়ভাবে গরম কমাতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তাপ সতর্কবার্তাকে স্বাস্থ্য, শ্রম ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা দাঁড় করানো গেলে, যেখানে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ছাড়ালে খোলা আকাশের নিচে কাজ বন্ধ রাখা ও বাধ্যতামূলক বিশ্রাম আর ঠান্ডা রাখার জায়গার মতো স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে, তাহলে তাপজনিত মৃত্যু ও কাজের ক্ষতি দুটোই কমানো সম্ভব। পোশাক খাতের তহবিলের ধাঁচে নির্মাণ ও পরিবহন খাতের জন্যও লক্ষ্যভিত্তিক তহবিল গড়ে তোলা যেতে পারে। আর অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য ছোট বীমা বা তাপ ভাতার মতো সামাজিক সুরক্ষা চালু করা গেলে, চরম গরমের দিনে কাজ বন্ধ রাখলেও একজন রিকশাচালক বা দিনমজুরের পরিবারকে না খেয়ে থাকতে হবে না।
তাপপ্রবাহকে যতদিন আমরা কেবল মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখব, ততদিন তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও থাকবে মৌসুমি ও অস্থায়ী। অথচ পরিসংখ্যান বলছে এটা এখন একটি কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যা, যা প্রতি বছর ধীরে ধীরে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি আয়, জনস্বাস্থ্য আর শ্রমবাজারের ভিত নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
পোশাক খাত দেখিয়ে দিয়েছে সমাধান অসম্ভব নয়, শুধু ইচ্ছা আর অর্থায়নের বিষয়। শহর পরিকল্পনা, শ্রম নীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর শিল্পনীতিতে গরম সহ্য করার ক্ষমতাকে কেন্দ্রীয় বিবেচ্য বিষয় হিসেবে না রাখলে আগামী দশকগুলোতে এই ক্ষতির পরিমাণ কেবল বাড়তেই থাকবে।
দক্ষিণ এশিয়া দ্রুত নগরায়ণের পথে এগোচ্ছে, আর বাংলাদেশ এই যাত্রায় সবচেয়ে সক্রিয় দেশগুলোর একটি। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে আমাদের শহরগুলো কর্মসংস্থান আর প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে থাকবে, নাকি ক্রমবর্ধমান গরমের চাপে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বে। এই প্রশ্নের উত্তর প্রকৃতির হাতে নয়, আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্তের হাতেই রয়ে গেছে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
.png)
ক্ষমতাসীন বিএনপি থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনায় কেউ অবাক হবেন না। তাঁর নামই বেশি আলোচিত হচ্ছিল। এর আগেই অবশ্য জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে প্রার্থী মনোনীত হয়েছেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
১৬ ঘণ্টা আগে
ময়মনসিংহের ত্রিশালের একটি বালুমহাল। সেখানকার অস্থায়ী টিনের কার্যালয়ে বসে কাজ করছিলেন ইজারাদারের এক কর্মচারী। হঠাৎ সেখানে দলবল নিয়ে প্রবেশ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য। সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আকস্মিক প্রবেশে কিছুটা ভড়কে যান ওই কর্মচারী।
১৭ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ।
১৯ ঘণ্টা আগেগ্যাস সংকট কাটতে শুরু করেও কাটছে না আর তাতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত। এ বিষয়ে সেমিনারে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও যারা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের শিকার, তারা তাৎক্ষণিকভাবে এর মোকাবিলা নিয়েই চিন্তিত। এ ক্ষেত্রে বিকল্পের শরণাপন্ন হতে গিয়ে রান্নাঘর থেকে শিল্পকারখানা পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
১২ আগস্ট ২০২৬