প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর ‘লাঠিয়াল’ হয়ে ওঠা রোধ করতে হবে

বালুর ঘাটে ইজারাদারের কর্মীকে ইউএনওর থাপ্পড়। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ময়মনসিংহের ত্রিশালের একটি বালুমহাল। সেখানকার অস্থায়ী টিনের কার্যালয়ে বসে কাজ করছিলেন ইজারাদারের এক কর্মচারী। হঠাৎ সেখানে দলবল নিয়ে প্রবেশ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য। সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আকস্মিক প্রবেশে কিছুটা ভড়কে যান ওই কর্মচারী। তাৎক্ষণিকভাবে আসন ছেড়ে দাঁড়াতেও পারেননি। আর এই ‘না দাঁড়ানো’ থেকেই শুরু হয় ক্ষমতার আস্ফালন; যা দেশের প্রচলিত আইন, সংবিধান ও মানবাধিকারের গালে চপেটাঘাতের শামিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজটির দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। দৃশ্যত কোনো অপরাধ প্রমাণের আগেই কেবল সম্মান না করার ‘অপরাধে’ প্রজাতন্ত্রের একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা যে আচরণ করেছেন, তা কোনো সভ্য সমাজের দৃশ্য হতে পারে না।

ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরে ঢুকেই ইউএনওর এক সহযোগী ধমকের সুরে ওই কর্মচারীকে বলেন, ‘এই ভাই দাঁড়াও রে ভাই। কোন এলাকার মানুষ তুমি?’ হতভম্ব কর্মচারী পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কারা আপনারা?’ এতেই যেন অহংবোধে লাগে ওই সহযোগীর। দম্ভভরে বলেন, ‘আমারে চিনো না?’ কর্মচারীর সরল স্বীকারোক্তি, ‘আমি তো আইছি নতুন।’ তখন সহযোগী আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ‘স্যার আসছে... দাঁড়ায়া সালাম-নমস্কার দিতে হবে না?’

এ পর্যায়ে ইউএনও এগিয়ে এসে আঙুল উঁচিয়ে ধমক দিয়ে বলেন, ‘আমি ত্রিশালের ইউএনও। মোবাইল কোর্টে আসছি। কথাবার্তা হিসাব করে, বুঝে-শুনে বলবেন।’

কর্মচারীটি বিড়বিড় করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলে ইউএনও আবারও হুংকার দেন। এরপর বালু উত্তোলনের লাইসেন্স দেখতে চান। কর্মচারী যখন পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল দিয়ে ইউএনওর কথার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন বিচারকের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা। তিনি টেবিলের ওপাশে গিয়ে কর্মচারীকে চড়থাপ্পড় মারতে থাকেন। এতেও ক্ষোভ মেটেনি তাঁর। এক পর্যায়ে পাশে থাকা র‍্যাব সদস্যের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে ওই কর্মচারীকে সজোরে পিটিয়ে কক্ষের এক কোণে নিয়ে যান।

ভুক্তভোগী যুবক ‘সরি স্যার, সরি স্যার’ বলে বাঁচার আকুতি জানালেও ইউএনওর লাঠিপেটা থামেনি।

এই পুরো ঘটনার আইনি, প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে আমাদের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয়।

প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা অনিয়ম দমনের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত একটি আইনি প্রক্রিয়া। কোনো ম্যাজিস্ট্রেট যখন কোথাও অভিযান চালাবেন, তাঁর প্রথম কাজ নিজের ও দলের পরিচয় দেওয়া এবং অভিযানের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করা। কিন্তু এখানে দেখা গেল উল্টো চিত্র। ইউএনও ও তাঁর দলবল পরিচয় না দিয়েই হম্বিতম্বি শুরু করলেন। একজন নাগরিকের কার্যালয়ে এভাবে ঢুকে পড়া এবং ত্রাস সৃষ্টি কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা প্রশাসনিক শিষ্টাচার হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, একজন দিনমজুর বা বালুমহালের কর্মচারী ইউএনওকে চেহারা দেখে চিনবেন না, এটাই স্বাভাবিক। একটি উপজেলার সব মানুষ ইউএনওকে ব্যক্তিগতভাবে চিনবেন, এমন দাবি অযৌক্তিক। কিন্তু এই ‘না চেনা’ বা ‘সালাম না দেওয়া’কে কেন্দ্র করে একজন কর্মকর্তার এমন খেপে যাওয়া তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয়। এতে তাঁর যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন হয় করের টাকায়। তাঁরা জমিদার নন যে, কথিত প্রটোকল না পেলেই চাবুক হাতে তুলে নেবেন।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ইউএনও কোনোভাবেই কোনো নাগরিকের গায়ে হাত তুলতে পারেন না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনানুযায়ী আশ্রয় লাভ এবং কেবল আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজটির দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। দৃশ্যত কোনো অপরাধ প্রমাণের আগেই কেবল সম্মান না করার ‘অপরাধে’ প্রজাতন্ত্রের একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা যে আচরণ করেছেন, তা কোনো সভ্য সমাজের দৃশ্য হতে পারে না।

আর সংবিধানের ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলছে, ‘কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না।’ ইউএনও লাঠি হাতে নিয়ে মারপিট করে সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।

মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, একজন ম্যাজিস্ট্রেট কেবল নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বিচার করে অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড দিতে পারেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি বা কোনো নাগরিককে প্রহারের কোনো বিধান এই আইন বা বাংলাদেশের অন্য কোনো আইনে নেই।

যদি ওই কর্মচারী সরকারি কাজে বাধা দিয়ে বা অপরাধ করে থাকেন, তবে ম্যাজিস্ট্রেট আইন অনুযায়ী তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারতেন। পুলিশ বা আনসারের মাধ্যমে হেফাজতে নিয়ে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় বিচারে সোপর্দ করতে পারতেন। তা না করে র‍্যাব সদস্যের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে নিজেই ‘লাঠিয়াল’ হয়ে ওঠা বেআইনি, অপেশাদার ও স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ।

বিষয়টি নিয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমি ভিডিওটি দেখেছি। ইউএনও যে আচরণ করেছেন, এটি পেশাদারত্বের মধ্যে পড়ে না। কোন পরিস্থিতিতে তিনি কী করেছেন, তাঁকেই জবাব দিতে হবে। ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে সে অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হবে।’

জেলা প্রশাসকের এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠে, ঠিক কোন ‘পরিস্থিতিতে’ একজন সরকারি কর্মচারী প্রকাশ্যে এত মানুষের উপস্থিতিতে একজন নাগরিকের গায়ে হাত তোলার অধিকার রাখেন? প্রশাসন কেন স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে না? কেন ভুক্তভোগীর অভিযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব প্রশ্ন তুলেছেন।

অতীতে দেখা গেছে, এ ধরনের ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের সাধারণত ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। লঘু শাস্তির এই রেওয়াজ আদতে তাঁদের মধ্যে কোনো আত্মোপলব্ধি তৈরি করে না। এতে ক্ষমতার দম্ভও নিম্নমুখি হয় না।

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে এখনো ঔপনিবেশিক ‘প্রভু-ভৃত্য’ মানসিকতা রয়ে গেছে। যেখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই আইন ভাঙেন, সেখানে সাধারণ মানুষ কার কাছে বিচার চাইবে? এই ঘটনার যদি উপযুক্ত বিচার না হয়, তবে ‘জনগণের সেবক’ নামধারী এমন আরও লাঠিয়ালের জন্ম হবে; একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য যা মোটেও কল্যাণকর নয়। এমন লাঠিয়াল হয়ে ওঠা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত