জেনজিদের জন্য/এআই বিশ্বব্যাপী যেসব নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করছে, আপনি কি প্রস্তুত
স্ট্রিম ডেস্ক

‘এআই অনেকের চাকরি নিয়ে নেবে’—এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। এখন আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে চোখ রাখলে এমন কিছু পদের নাম দেখা যায়, যেগুলো কয়েক বছর আগেও শোনা যেত না। যেমন এআই গভর্ন্যান্স ম্যানেজার, রোবট রিলেশনশিপ ম্যানেজার, রেসপনসিবল এআই লিড।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব চাকরির নাম এখনো অনেকের কাছে নতুন। তবে সময়ের সঙ্গে এসব পেশার চাহিদাও বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে হয়তো ‘সফটওয়্যার ডেভেলপার’ বা ‘মার্কেটিং অ্যানালিস্ট’-এর মতো এসব পদও চাকরির বাজারে পরিচিত হয়ে উঠবে। যেমন একসময় এসইও স্পেশালিস্ট বা সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার পদও আমাদের কাছে খুব পরিচিত ছিল না। অথচ গত ১০ বছরে এসব পদের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে।
তাই ‘এআই কি আমার চাকরি নিয়ে নেবে?’ এই প্রশ্নের চেয়ে আরও বাস্তবসম্মত প্রশ্ন হতে পারে, ‘এআই এমন কী কী নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করছে, যেগুলো আমরা আগে ভাবিনি?’
নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে কোথায়
এআইকে ঘিরে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় কাজগুলো তৈরি হচ্ছে যেখানে প্রযুক্তি, তথ্য, সাইবার নিরাপত্তা এবং মানুষের তৈরি নিয়মকানুনের সমন্বয় দরকার। তাই প্রযুক্তি বোঝে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে এবং এআই ব্যবহারের ঝুঁকি ও প্রভাবও বুঝতে পারে, এমন মানুষের চাহিদা বাড়ছে।
এর একটি উদাহরণ এআই গভর্ন্যান্স ম্যানেজার। কয়েক বছর আগেও এই পদের অস্তিত্ব ছিল না। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এআই অ্যাক্ট’-এর মতো নতুন আইন ও নীতিমালা চালু হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এআই ব্যবহার করবে, তাতেও পরিবর্তন আসছে। ফলে সেসব প্রতিষ্ঠানে ডেটা সায়েন্টিস্ট ও আইন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবেন, এমন মানুষের চাহিদা বাড়ছে।
বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের জন্য বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে তেমন কোনো আইন বা নীতিমালা নেই। তবে ভবিষ্যতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের আইন ও নীতিমালার প্রয়োজন হতে পারে।
সহজ করে বললে, এআই ব্যবহারে কী ধরনের ঝুঁকি আছে, সেগুলো চিহ্নিত করা এবং প্রতিষ্ঠান যে নীতিমালা ও মূল্যবোধ ঠিক করেছে, এআই ব্যবহারের সময় সেগুলো মানা হচ্ছে কি না—তা দেখাই এই পেশার অন্যতম কাজ।
আবার সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের কাজ। এআইয়ের কারণে সাইবার হামলা আরও দ্রুততম সময়ে করা যাছে। ফলে এটি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। এর ফলে বিজনেস ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার-এর মতো পদ বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এমনকি ডেটা লেবেলিং-ও এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। মনে রাখতে হবে, এআই নিজে নিজে সবকিছু শিখে নেয় না। মানুষ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে, সেগুলো যাচাই করে এআইকে শেখানোর উপযোগী করে তোলে। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা এআইকে শেখানোর জন্য বিভিন্ন তথ্য তৈরি ও যাচাই করেন। ভবিষ্যতে এসব তথ্য ব্যবহার করে এমন এআই তৈরি হতে পারে, যা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা সহজ করবে। কারণ এআই থেকে পাওয়া তথ্যের সামান্য ভুলও পরে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। এ কারণে ডেটা লেবেলিংয়ের কাজ শুধু তথ্য চিহ্নিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই কাজের সঙ্গে অনেক দায়িত্বও জড়িয়ে আছে।
এআইয়ের যুগেও শিক্ষাগত যোগ্যতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
এআই যতই আমাদের তথ্য-প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করুক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি বা শিক্ষাগত যোগ্যতার গুরুত্ব কমে যায়নি। শিক্ষা মানুষের বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরিতে সাহায্য করে। তবে পরিবর্তন এসেছে অন্য জায়গায়। এখন শুধু বড় বড় ডিগ্রি থাকলেই পুরো কর্মজীবন পার করে দেওয়া যাবে—এমন ধারণার ভিত্তি নেই।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মীদের বর্তমান মূল দক্ষতার গড়ে ৩৯ শতাংশ বদলে যেতে বা অপ্রচলিত হয়ে যেতে পারে।
বিষয়টিকে একটি বাড়ির সঙ্গে তুলনা করা যায়। আপনার ডিগ্রি হলো বাড়ির ভিত্তি। ভালো বাড়ির জন্য এই ভিত্তি অবশ্যই দরকার। কিন্তু শুধু ভিত্তি থাকলেই তো কেউ সেখানে থাকতে পারে না। বাড়িকে পরিপূর্ণ করতে সেখানে দেয়াল, জানালা আর ছাদও দরকার। কর্মজীবনে সেই পরিপূর্ণতা দেওয়ার কাজ করে নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা ও মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা।
শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ডিগ্রি আপনাকে কীভাবে চিন্তা করতে হয়, তা শেখায়। এআইয়ের যুগে ডিগ্রির প্রয়োজন হচ্ছে সেই শেখার প্রক্রিয়াটা চালিয়ে যাওয়া এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া। যেসব কর্মী এআইয়ের বিভিন্ন টুল ব্যবহার করতে শিখছেন, তাঁরা এমন কাজও করতে পারছেন, যা এক বছর আগেও সম্ভব ছিল না।
বাংলাদেশে বসেও কি এসব কাজের সুযোগ আছে
নতুন এসব পেশার আরেকটি দিক হলো, সব কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দেশে গিয়ে কাজ করতে হবে এমন নয়। প্রযুক্তিনির্ভর অনেক কাজই এখন দূর থেকে করা সম্ভব। ফলে বাংলাদেশে বসেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ জন্য শুধু এআইয়ের ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, প্রোগ্রামিং, এআই নীতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যোগাযোগ, বিশ্লেষণী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটাকে সহজ সুযোগ হিসেবে দেখারও কারণ নেই। আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি এবং শুধু সার্টিফিকেট বা কোনো এআই টুল ব্যবহারের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেখানে টিকে থাকা কঠিন। প্রয়োজন হবে নিয়মিত শেখা, নিজের দক্ষতার প্রমাণ তৈরি করা এবং পরিবর্তিত কাজের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা।
যেসব চাকরিতে মানুষই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
মজার বিষয় হলো, এআই যত শক্তিশালী হচ্ছে, মানুষের কিছু বিশেষ গুণের মূল্যও তত বাড়ছে। যেমন কমিউনিকেশন অফিসার কিংবা পাবলিক রিলেশনশিপ অফিসারের নাম তো আমরা শুনেছি। কিন্তু রোবট রিলেশনশিপ ম্যানেজারের নাম কি আগে শুনেছি?
বিদেশের বিভিন্ন কারখানায় এখন মানুষের পাশাপাশি কাজ করছে সহযোগী রোবট, যেগুলোকে ‘কো-বট’ বলা হয়।
এই কাজের দায়িত্বের মধ্যে আছে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, কাজের পদ্ধতি ঠিক করা এবং রোবটকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা তৈরি হলে তা সামলানোর মতো বিষয়। অর্থাৎ, এখানে প্রকৌশল, মনোবিজ্ঞান ও প্রশিক্ষণ—তিন ধরনের দক্ষতা একসঙ্গে দরকার। এই কাজটি শুধু অ্যালগরিদম দিয়ে ভালোভাবে করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এখনও এমন পেশাকে ‘অবাস্তব’ মনে হলেও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এই পেশার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘এআই এথিসিস্ট’ বা এআই নীতিবিদদের কাজ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যখন নিজেদের কাজে দ্রুত এআই ব্যবহার করছে, তখন শুধু ‘এআই দিয়ে কাজটি করা যাবে কি না’—এই প্রশ্ন করলেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এভাবে এআই ব্যবহার করা উচিত কি না এবং এর ফলে মানুষের ওপর বা সমাজের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে।
এআই এথিসিস্টরা মূলত এই ধরনের প্রশ্ন সামনে আনেন। তাঁরা দেখেন, এআই কোনো পক্ষপাত করছে কি না। এআইয়ের সিদ্ধান্ত মানুষের জন্য ন্যায্য কি না, সেটিও তাঁরা যাচাই করেন। পাশাপাশি, এআই ব্যবহারের কারণে সমাজ বা মানুষের জন্য কোনো সমস্যা তৈরি হতে পারে কি না, সেটাও তাঁরা বিবেচনা করেন।
এআই কি তাহলে মানুষের কাজ কেড়ে নেবে
২০৩৫ সালে চাকরির বাজারে ঠিক কোন কোন পদের সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় বলা যায়—যাঁরা নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী থাকবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের দক্ষতা বদলাতে পারবেন, তাঁরাই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন।
এআইয়ের কারণে তৈরি হওয়া নতুন অর্থনীতি আসলে মানুষের কাজের ধারণা বদলে দিচ্ছে। এআই আসার ফলে আমাদের কাজের ধরন যেমন পাল্টেছে। তেমনি এই বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। যেসব কাজ বারবার একইভাবে করতে হয়, সেগুলো ধীরে ধীরে যন্ত্র বা এআই করতে পারবে। আর মানুষ বেশি মন দেবে এমন কাজে, যেখানে চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, সৃজনশীলতা ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মতো দক্ষতা দরকার। কয়েক বছর আগেও এ ধরনের কাজকে আলাদা পেশা হিসেবে দেখা যেত না। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাতে এসব কাজের গুরুত্ব বাড়ছে।
- ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত লেখা অবলম্বনে
.png)











