সাক্ষাৎকারে ড. সাজ্জাদ জহির
ড. সাজ্জাদ জহির অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া, এতে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলন, দুর্নীতি এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণের মতো সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারে তিনি আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
মুজাহিদুল ইসলাম

স্ট্রিম: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন গভর্নরের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আপনার অভিমত কী?
সাজ্জাদ জহির: সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখে মনে হয়েছে, খুব অল্প সময়ের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রজ্ঞাপন জারি করে একজনকে প্রত্যাহার করা হলো এবং আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। ঘটনার আকস্মিকতা দেখে মনে হয়, এই প্রক্রিয়াটি নিশ্চয়ই শেষ মুহূর্তের কোনো সিদ্ধান্তের ফসল। এই প্রক্রিয়াটি একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সিদ্ধান্তটি পূর্বপরিকল্পিত হলে বিদায়ী গভর্নরের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকত এবং তাঁকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে বিদায় জানানো যেত। সরকার এবং ব্যাংক—উভয় পক্ষকেই কোনো না কোনোভাবে এর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে কাউকে বিদায় দিতে হলে তা যথাযথ উপায়ে দেওয়া যায়। বিদায়ী গভর্নর দেশের এক কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সুতরাং আমার মনে হয়, যথার্থ সম্মান দেখিয়েই তার বিদায়টি হওয়া দরকার ছিল।
স্ট্রিম: মেয়াদপূর্তির আগে গভর্নর পরিবর্তনের বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সাজ্জাদ জহির: এর আগে সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার সম্ভবত ৫ই আগস্ট আ.লীগের পতনের পর পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না; বিষয়টি আরও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করলে ভালো হতো। তবে এটি কেন হয়েছে, কী কারণে হয়েছে—তা না বুঝে বা না জেনে মন্তব্য করাটা আসলে কঠিন।
স্ট্রিম: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা সাধারণত অর্থনীতিবিদ বা বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা হয়ে থাকেন। এবার একজন ব্যবসায়ীকে এই পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তটি কতটা যৌক্তিক হলো?
সাজ্জাদ জহির: আমি অনেক জায়গাতেই এই বিষয়ে মানুষকে মন্তব্য করতে দেখেছি। যখন কোনো পরিবর্তন ঘটে, তখন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। যিনি এই পদে আসছেন, তাঁর সম্পর্কে আমি বিশদভাবে জানি না। তবে জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া যেহেতু নানাবিধ, তাই আজকাল কে কোথা থেকে কী পড়েছেন, কেবল তা দিয়েই একজন ব্যক্তির জ্ঞানের পরিধি পুরোপুরি বিচার করা যায় না। তিনি তাঁর জানা বিষয়গুলো অন্যদের জানাতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে মানুষের মনে সন্দেহ থাকতে পারে; কারণ তিনি যদি পরিচিত হতেন, তবে সবাই তাকে চিনত বা জানত। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে অনেক সমীকরণ কাজ করে, যার ফলে একজন ব্যক্তির ভেতরে ঠিক কী পর্যায়ের যোগ্যতা রয়েছে, তা খুব সহজে বা সবসময় প্রকাশ পায় না।
স্ট্রিম: একজন ব্যবসায়ীর গভর্নর হওয়ায় ‘স্বার্থের সংঘাত’-এর কোনো ঝুঁকি দেখেন কী?
সাজ্জাদ জহির: ‘স্বার্থের সংঘাত’বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের বিষয়টি নিয়ে আমি কয়েক জায়গায় আলাপ করেছি এবং অনেক জায়গাতেই কথা উঠেছে। যেমন, তিনি একটি নির্দিষ্ট ঋণ নিয়েছেন এবং কাগজে-কলমে দেখেছি যে সেই ঋণের পরিপ্রেক্ষিতে পুনঃতফসিলীকরণ (রিশিডিউল) বা কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যদিও এগুলো আমার সম্পৃক্ততার অনেক আগের ঘটনা এবং বিষয়টি হয়তো সেভাবে এগোয়নি। আমাদের সমাজে আসলে সব ধরনের সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে এত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে যে, পূর্ববর্তী গভর্নরদের ক্ষেত্রেও হয়তো খুঁজলে কোথাও না কোথাও স্বার্থের সংঘাত পাওয়া যাবে। তবে বর্তমান গভর্নরের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি তোলা হয়েছে, আমার কাছে মনে হয়েছে অন্তত নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের একটি বিষয় থেকেই যায়।
আমি একটি উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরা যাক, কোনো পরীক্ষক কমিটিতে আমাকে রাখা হলো এবং আমি যদি একজন প্রার্থীকে চিনি, তবে সেখানে স্বার্থের সংঘাত হতে পারে—এটি সবাই জানে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই সংঘাতের জায়গা থেকে কীভাবে ইতিবাচক দিক বা তথ্যগুলোকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো যায় এবং কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব (বায়াস) যেন না আসে, তার জন্য একটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা বা প্রোটেকশন মেকানিজম তৈরি করা।
স্ট্রিম: অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ব্যবসায়ী কমিউনিটি থেকে আসায় তিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে ব্যবসায়ীদের সুবিধা বেশি দেখবেন। আপনি কী মনে করেন?
সাজ্জাদ জহির: আমি যদি অন্যভাবে বলি—অর্থাৎ আমি তাকে সমর্থন করে কিছু বলছি না, বরং বলছি যে এটি একটি অদ্ভুত বিষয়। আর তা হলো, আমাদের আগের গভর্নরেরও কোনো না কোনো ফর্মে ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। তাই এখন যদি বলি যে বর্তমান গভর্নর একজন ব্যবসায়ী, তবে সেটি খুব একটা মানানসই যুক্তি হয় না। তাঁর আইএমএফ বা অন্যান্য জায়গায় কাজের অভিজ্ঞতায় তাঁর জ্ঞানের যে পরিধি প্রতিফলিত হয়েছে, সম্ভবত তার ভিত্তিতেই নিয়োগকর্তারা তাকে এই পদে বেছে নিয়েছেন। আবার কেউ যদি মনে করেন যে, আইএমএফের প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে যিনি নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করেন—যেমনটি মন্ত্রীর বক্তব্যে আমেরিকান সিস্টেমের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে—তবে সংসদীয় ব্যবস্থায় মানুষ এটি সহজভাবেই নেয়। কিন্তু যখন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কেউ আসেন, তখন সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্বার্থের সংঘাত চলে আসে। আমি যদি মেনে নিই যে এখানে রাজনৈতিক পক্ষপাত রয়েছে, তখন আর তেমন কিছু বলার থাকে না।
তবে ব্যবসার চেয়েও বড় বিষয়টি হলো তাঁর সেই নির্দিষ্ট ঋণটি। মানুষ মনে করে, এটিই সবচেয়ে বড় স্বার্থের সংঘাতের জায়গা তৈরি করেছে এবং আমারও তা-ই মনে হয়। কারণ, বিগত দশক বা তারও বেশি সময় ধরে আমরা দেখেছি যে, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ের জন্য আইনকে নিজেদের মতো করে পরিবর্তন (টুইস্ট) করার ইতিহাস রয়েছে। এখন আমাদের ভাবতে হবে, এই পরিস্থিতিগুলোকে কীভাবে ইতিবাচক দিকে নেওয়া যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এমন কী ধরনের মেকানিজম বা ব্যবস্থা থাকা দরকার, যার মাধ্যমে এই ধরনের স্বার্থের সংঘাতকে প্রশমিত বা ওভাররুল করা যায়। এর জন্য অবশ্যই সম্মিলিত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ (কালেক্টিভ ইনফর্মড ডিসিশন), উন্মুক্ততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো প্রয়োজন, যা মূলত অভ্যন্তরীণ সুশাসনের (ইন্টারনাল গভর্ন্যান্স) সঙ্গে জড়িত।
স্ট্রিম: একটি বিশেষ ব্যাংককে হঠাৎ করে এক হাজার কোটি টাকা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
সাজ্জাদ জহির: আমার মনে হয় না বর্তমান গভর্নর এমনটা করেছেন। এটি কি কেউ নিশ্চিতভাবে জানেন? আমি এ কথা বলছি কারণ, যেকোনো বিষয় প্রক্রিয়াকরণের জন্যই একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। যদি সত্যিই এমন কিছু ঘটে থাকে, তবে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার মাধ্যমেই আসল ঘটনাটি বের করে আনা উচিত।
স্ট্রিম: বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অথচ এর কর্মকর্তারা প্রায়ই গভর্নর বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন বিভিন্ন ইস্যুতে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
সাজ্জাদ জহির: এটি আমাদের একটি সাধারণ সংস্কৃতির (জেনারেল কালচার) সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত রাজনৈতিক দল এবং নেতৃত্বের ভেতরের চর্চাগুলোর যে অধঃপতন ঘটেছে, একে তারই প্রতিফলন বলা যায়। হঠাৎ করে বা কেবল এক জায়গায় এরকম ঘটেনি; দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সর্বত্রই ঘটছে। আমরা হঠাৎ করে একটি চাকরি বা বিশেষ অধিকার পেলে ধরে নিই যে এটি আমাদের প্রাপ্য অধিকার। রাষ্ট্রের সঙ্গে একজন কর্মীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের অধিকারবোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসাটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা বলছি না।
আমি ভেবেছিলাম, রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে আমরা যে এত বছর পার করলাম, তার ভিত্তি হওয়া উচিত ছিল সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা এবং তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারণ করা। কিন্তু আমরা সেসব না করে কেবল কথার ফুলঝুরি ছুটিয়েছি, যার পরিণতি ভবিষ্যতে আমরা আরও বেশি দেখতে পাব। তবে আমি মনে করি, এখনো সময় আছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে এটি আমাদের দেশের একটি মৌলিক সমস্যা এবং তারপর তা সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আমি হয়তো একটি সমাধান দিতে পারি, কিন্তু তা কার্যকর হবে না, যদি না রাজনৈতিক দলগুলো শুধু লোক দেখানো খুঁটিনাটি সনদ তৈরি না করে বরং অত্যন্ত মৌলিক বিষয়গুলোতে নজর দেয়। এগুলো অতীতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আগামীতে এগুলোর সমাধান হওয়া উচিত।
স্ট্রিম: আমরা দেখেছি, সম্প্রতি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন দেওয়ার মতো সম্পূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মীরা আন্দোলন করেছেন বা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছেন। কর্মীদের নিজেদের এখতিয়ারের বাইরের এমন নীতিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রবণতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
সাজ্জাদ জহির: ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মীদের আন্দোলনের কথা বলছিলেন। যতটুকু মনে হড়ছে আন্দোলনটি ছিল এই বিষয়ে কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে। তারা সেখানে একটি ইস্যু তুলেছিল। এর মানে হলো, তারা এমন বিষয়ে কথা বলছে যা তাদের এখতিয়ারের বাইরে। সাবেক গভর্নর এ কথা বলেছিলেন এবং আমি বর্তমান গভর্নরের বক্তব্যও শুনেছি—তিনিও এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন যে এগুলো তাদের আলোচনার বিষয় নয় এবং এখানে মৌলিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি জড়িত।
কিন্তু যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমনটা কেন হয়? যখন বাইরের কোনো সংস্থা বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রক সংস্থার (রেগুলেটরি বডি) সিদ্ধান্তকে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করতে চায়, তখনই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এটি এমন নয় যে ভেতরের কেউ নিজ থেকেই নিজের স্বার্থে কিছু করতে যায়। তাই অবশ্যই ভেতরের ব্যবস্থাকে ঠিক করতে হবে। বিশেষ করে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি নিজেদের এসব প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে না পারে, তবে তা একটি বিপজ্জনক সংকেত। আমি মনে করি, এটি কেবল নতুন গভর্নরের নয়, বরং পর্ষদ এবং বিশেষ করে ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ যে কীভাবে এই পরিস্থিতি ঠিক করা যায়।
স্ট্রিম: নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনৈতিক সুবিধা নেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই চর্চা বন্ধ করা প্রয়োজন কী?
সাজ্জাদ জহির: আমাদের এখানে উপহার (গিফট) দেওয়া তো একটি ছোট বিষয়। যেমন—একটি ডায়রি বা ক্যালেন্ডার দেওয়া। আমার কাছে মনে হয় যে, নানা আকারেই সুযোগ-সুবিধার এই হস্তান্তর বা ট্রান্সফার ঘটে। কিন্তু এর পেছনের মূল কারণটি বুঝতে হবে। যখন কারও আয়ের একটি নির্দিষ্ট উৎস থাকে এবং সেই আয় নিশ্চিত বা ধরে রাখার জন্য যখন তার মনে হয় যে আপনার সহায়তা প্রয়োজন, তখন সে ওই আয়ের একটি অংশ থেকে আপনাকে উৎকোচ বা সুবিধা দেবে। এখন এই আয়ের উৎস কী?
এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উৎস হলো কোনো বিজনেস গ্রুপ—যা মূলত কেনাকাটা বা প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে, অথবা আর্থিক খাতের ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর যে আয় হয়, তার একটি বড় অংশ ধরে রাখার জন্য এবং তাদের কেনাকাটার ক্ষেত্রে যেখানে অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, সেখানেও অনেক ভাগবাটোয়ারা হতে পারে। আমি এটি তাত্ত্বিকভাবে বলছি।
এই জায়গাগুলোতে উঁচু পর্যায়ে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং সিদ্ধান্তগুলো হতে হবে পর্যাপ্ত তথ্যভিত্তিক। উদাহরণস্বরূপ, আগে একটি নিয়ম ছিল যে একটি আইন তৈরির আগে কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। যেমন—আমি কেন পরিবর্তন চাচ্ছি? এর যৌক্তিকতা কী? পরিবর্তন আনলে কী ভালো বা খারাপ হবে? অর্থাৎ, নথি (নোটিং) প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি ওই জায়গাকে ঠিক করতে পারি, তাহলে ছোটখাটো দুর্নীতির পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। সুতরাং গভর্ন্যান্স বা সুশাসন মানে এই নয় যে, কোথায় কী সুবিধা লেনদেন হচ্ছে তা ধরে ধরে একটি পুলিশিং বা খবরদারিমূলক ব্যবস্থার ভেতরে যাওয়া। কারণ, পুলিশিং ব্যবস্থা উল্টো আরেক ধরনের খারাপ প্রথাকে জায়গা করে দিতে পারে।
স্ট্রিম: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হলেও, দলীয়করণ আগের চেয়ে বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরিণতি কী হতে পারে?
সাজ্জাদ জহির: আমি আবারও বলছি, রাজনীতিকীকরণের দুটি দিক থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে যা চলছে, তাকে রাজনীতিকিকরণ না বলে ‘দলীয়করণ’ বলাই ভালো। যদি রাজনৈতিকভাবে উন্নত করা যেত, তবে সেটি ভালো হতো। এই দলীয়করণের প্রবণতা অনেক বছর ধরেই চলছে। আমি অনেক সময়ই বলি যে, একই পরিবারের এক ভাই এই দল করে, তো আরেক ভাই ওই দল করে—বিভিন্ন দলের ভেতরে এভাবে নিজেদের লোক রাখার ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষেত্রেও যদি কেউ খোঁজ নিতে শুরু করে, তবে দেখা যাবে যে—একটি সরকার ব্যবস্থায় যিনি চেয়ারম্যান হয়ে এলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সরে গেলেন এবং নতুন আরেকজন এলেন। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই চেয়ারম্যানকে দুই দলের মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে হয়তো তাদের মধ্যে একটি আঁতাত রয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি এই বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারে এবং সেই অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে সমস্যা দেখা দেবে। তখন একজন এসে বলবে, “আগেরজন লুট করে নিয়ে গেছে, তাই আমাকে টাকা দাও।” আবার সে চলে গেলে নতুনজন এসে বলবে, “আগেরজন লুট করেছে, এবার আমাকে টাকা দাও।” এটি তো সরকারি রাজস্ব এবং জনগণের টাকা, এভাবে তা নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।

ড. সাজ্জাদ জহির অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া, এতে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলন, দুর্নীতি এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণের মতো সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারে তিনি আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
স্ট্রিম: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন গভর্নরের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আপনার অভিমত কী?
সাজ্জাদ জহির: সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখে মনে হয়েছে, খুব অল্প সময়ের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রজ্ঞাপন জারি করে একজনকে প্রত্যাহার করা হলো এবং আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। ঘটনার আকস্মিকতা দেখে মনে হয়, এই প্রক্রিয়াটি নিশ্চয়ই শেষ মুহূর্তের কোনো সিদ্ধান্তের ফসল। এই প্রক্রিয়াটি একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সিদ্ধান্তটি পূর্বপরিকল্পিত হলে বিদায়ী গভর্নরের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকত এবং তাঁকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে বিদায় জানানো যেত। সরকার এবং ব্যাংক—উভয় পক্ষকেই কোনো না কোনোভাবে এর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে কাউকে বিদায় দিতে হলে তা যথাযথ উপায়ে দেওয়া যায়। বিদায়ী গভর্নর দেশের এক কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সুতরাং আমার মনে হয়, যথার্থ সম্মান দেখিয়েই তার বিদায়টি হওয়া দরকার ছিল।
স্ট্রিম: মেয়াদপূর্তির আগে গভর্নর পরিবর্তনের বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সাজ্জাদ জহির: এর আগে সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার সম্ভবত ৫ই আগস্ট আ.লীগের পতনের পর পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না; বিষয়টি আরও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করলে ভালো হতো। তবে এটি কেন হয়েছে, কী কারণে হয়েছে—তা না বুঝে বা না জেনে মন্তব্য করাটা আসলে কঠিন।
স্ট্রিম: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা সাধারণত অর্থনীতিবিদ বা বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা হয়ে থাকেন। এবার একজন ব্যবসায়ীকে এই পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তটি কতটা যৌক্তিক হলো?
সাজ্জাদ জহির: আমি অনেক জায়গাতেই এই বিষয়ে মানুষকে মন্তব্য করতে দেখেছি। যখন কোনো পরিবর্তন ঘটে, তখন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। যিনি এই পদে আসছেন, তাঁর সম্পর্কে আমি বিশদভাবে জানি না। তবে জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া যেহেতু নানাবিধ, তাই আজকাল কে কোথা থেকে কী পড়েছেন, কেবল তা দিয়েই একজন ব্যক্তির জ্ঞানের পরিধি পুরোপুরি বিচার করা যায় না। তিনি তাঁর জানা বিষয়গুলো অন্যদের জানাতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে মানুষের মনে সন্দেহ থাকতে পারে; কারণ তিনি যদি পরিচিত হতেন, তবে সবাই তাকে চিনত বা জানত। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে অনেক সমীকরণ কাজ করে, যার ফলে একজন ব্যক্তির ভেতরে ঠিক কী পর্যায়ের যোগ্যতা রয়েছে, তা খুব সহজে বা সবসময় প্রকাশ পায় না।
স্ট্রিম: একজন ব্যবসায়ীর গভর্নর হওয়ায় ‘স্বার্থের সংঘাত’-এর কোনো ঝুঁকি দেখেন কী?
সাজ্জাদ জহির: ‘স্বার্থের সংঘাত’বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের বিষয়টি নিয়ে আমি কয়েক জায়গায় আলাপ করেছি এবং অনেক জায়গাতেই কথা উঠেছে। যেমন, তিনি একটি নির্দিষ্ট ঋণ নিয়েছেন এবং কাগজে-কলমে দেখেছি যে সেই ঋণের পরিপ্রেক্ষিতে পুনঃতফসিলীকরণ (রিশিডিউল) বা কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যদিও এগুলো আমার সম্পৃক্ততার অনেক আগের ঘটনা এবং বিষয়টি হয়তো সেভাবে এগোয়নি। আমাদের সমাজে আসলে সব ধরনের সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে এত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে যে, পূর্ববর্তী গভর্নরদের ক্ষেত্রেও হয়তো খুঁজলে কোথাও না কোথাও স্বার্থের সংঘাত পাওয়া যাবে। তবে বর্তমান গভর্নরের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি তোলা হয়েছে, আমার কাছে মনে হয়েছে অন্তত নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের একটি বিষয় থেকেই যায়।
আমি একটি উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরা যাক, কোনো পরীক্ষক কমিটিতে আমাকে রাখা হলো এবং আমি যদি একজন প্রার্থীকে চিনি, তবে সেখানে স্বার্থের সংঘাত হতে পারে—এটি সবাই জানে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই সংঘাতের জায়গা থেকে কীভাবে ইতিবাচক দিক বা তথ্যগুলোকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো যায় এবং কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব (বায়াস) যেন না আসে, তার জন্য একটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা বা প্রোটেকশন মেকানিজম তৈরি করা।
স্ট্রিম: অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ব্যবসায়ী কমিউনিটি থেকে আসায় তিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে ব্যবসায়ীদের সুবিধা বেশি দেখবেন। আপনি কী মনে করেন?
সাজ্জাদ জহির: আমি যদি অন্যভাবে বলি—অর্থাৎ আমি তাকে সমর্থন করে কিছু বলছি না, বরং বলছি যে এটি একটি অদ্ভুত বিষয়। আর তা হলো, আমাদের আগের গভর্নরেরও কোনো না কোনো ফর্মে ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। তাই এখন যদি বলি যে বর্তমান গভর্নর একজন ব্যবসায়ী, তবে সেটি খুব একটা মানানসই যুক্তি হয় না। তাঁর আইএমএফ বা অন্যান্য জায়গায় কাজের অভিজ্ঞতায় তাঁর জ্ঞানের যে পরিধি প্রতিফলিত হয়েছে, সম্ভবত তার ভিত্তিতেই নিয়োগকর্তারা তাকে এই পদে বেছে নিয়েছেন। আবার কেউ যদি মনে করেন যে, আইএমএফের প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে যিনি নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করেন—যেমনটি মন্ত্রীর বক্তব্যে আমেরিকান সিস্টেমের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে—তবে সংসদীয় ব্যবস্থায় মানুষ এটি সহজভাবেই নেয়। কিন্তু যখন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কেউ আসেন, তখন সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্বার্থের সংঘাত চলে আসে। আমি যদি মেনে নিই যে এখানে রাজনৈতিক পক্ষপাত রয়েছে, তখন আর তেমন কিছু বলার থাকে না।
তবে ব্যবসার চেয়েও বড় বিষয়টি হলো তাঁর সেই নির্দিষ্ট ঋণটি। মানুষ মনে করে, এটিই সবচেয়ে বড় স্বার্থের সংঘাতের জায়গা তৈরি করেছে এবং আমারও তা-ই মনে হয়। কারণ, বিগত দশক বা তারও বেশি সময় ধরে আমরা দেখেছি যে, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ের জন্য আইনকে নিজেদের মতো করে পরিবর্তন (টুইস্ট) করার ইতিহাস রয়েছে। এখন আমাদের ভাবতে হবে, এই পরিস্থিতিগুলোকে কীভাবে ইতিবাচক দিকে নেওয়া যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এমন কী ধরনের মেকানিজম বা ব্যবস্থা থাকা দরকার, যার মাধ্যমে এই ধরনের স্বার্থের সংঘাতকে প্রশমিত বা ওভাররুল করা যায়। এর জন্য অবশ্যই সম্মিলিত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ (কালেক্টিভ ইনফর্মড ডিসিশন), উন্মুক্ততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো প্রয়োজন, যা মূলত অভ্যন্তরীণ সুশাসনের (ইন্টারনাল গভর্ন্যান্স) সঙ্গে জড়িত।
স্ট্রিম: একটি বিশেষ ব্যাংককে হঠাৎ করে এক হাজার কোটি টাকা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
সাজ্জাদ জহির: আমার মনে হয় না বর্তমান গভর্নর এমনটা করেছেন। এটি কি কেউ নিশ্চিতভাবে জানেন? আমি এ কথা বলছি কারণ, যেকোনো বিষয় প্রক্রিয়াকরণের জন্যই একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। যদি সত্যিই এমন কিছু ঘটে থাকে, তবে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার মাধ্যমেই আসল ঘটনাটি বের করে আনা উচিত।
স্ট্রিম: বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অথচ এর কর্মকর্তারা প্রায়ই গভর্নর বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন বিভিন্ন ইস্যুতে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
সাজ্জাদ জহির: এটি আমাদের একটি সাধারণ সংস্কৃতির (জেনারেল কালচার) সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত রাজনৈতিক দল এবং নেতৃত্বের ভেতরের চর্চাগুলোর যে অধঃপতন ঘটেছে, একে তারই প্রতিফলন বলা যায়। হঠাৎ করে বা কেবল এক জায়গায় এরকম ঘটেনি; দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সর্বত্রই ঘটছে। আমরা হঠাৎ করে একটি চাকরি বা বিশেষ অধিকার পেলে ধরে নিই যে এটি আমাদের প্রাপ্য অধিকার। রাষ্ট্রের সঙ্গে একজন কর্মীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের অধিকারবোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসাটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা বলছি না।
আমি ভেবেছিলাম, রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে আমরা যে এত বছর পার করলাম, তার ভিত্তি হওয়া উচিত ছিল সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা এবং তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারণ করা। কিন্তু আমরা সেসব না করে কেবল কথার ফুলঝুরি ছুটিয়েছি, যার পরিণতি ভবিষ্যতে আমরা আরও বেশি দেখতে পাব। তবে আমি মনে করি, এখনো সময় আছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে এটি আমাদের দেশের একটি মৌলিক সমস্যা এবং তারপর তা সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আমি হয়তো একটি সমাধান দিতে পারি, কিন্তু তা কার্যকর হবে না, যদি না রাজনৈতিক দলগুলো শুধু লোক দেখানো খুঁটিনাটি সনদ তৈরি না করে বরং অত্যন্ত মৌলিক বিষয়গুলোতে নজর দেয়। এগুলো অতীতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আগামীতে এগুলোর সমাধান হওয়া উচিত।
স্ট্রিম: আমরা দেখেছি, সম্প্রতি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন দেওয়ার মতো সম্পূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মীরা আন্দোলন করেছেন বা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছেন। কর্মীদের নিজেদের এখতিয়ারের বাইরের এমন নীতিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রবণতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
সাজ্জাদ জহির: ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মীদের আন্দোলনের কথা বলছিলেন। যতটুকু মনে হড়ছে আন্দোলনটি ছিল এই বিষয়ে কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে। তারা সেখানে একটি ইস্যু তুলেছিল। এর মানে হলো, তারা এমন বিষয়ে কথা বলছে যা তাদের এখতিয়ারের বাইরে। সাবেক গভর্নর এ কথা বলেছিলেন এবং আমি বর্তমান গভর্নরের বক্তব্যও শুনেছি—তিনিও এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন যে এগুলো তাদের আলোচনার বিষয় নয় এবং এখানে মৌলিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি জড়িত।
কিন্তু যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমনটা কেন হয়? যখন বাইরের কোনো সংস্থা বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রক সংস্থার (রেগুলেটরি বডি) সিদ্ধান্তকে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করতে চায়, তখনই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এটি এমন নয় যে ভেতরের কেউ নিজ থেকেই নিজের স্বার্থে কিছু করতে যায়। তাই অবশ্যই ভেতরের ব্যবস্থাকে ঠিক করতে হবে। বিশেষ করে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি নিজেদের এসব প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে না পারে, তবে তা একটি বিপজ্জনক সংকেত। আমি মনে করি, এটি কেবল নতুন গভর্নরের নয়, বরং পর্ষদ এবং বিশেষ করে ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ যে কীভাবে এই পরিস্থিতি ঠিক করা যায়।
স্ট্রিম: নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনৈতিক সুবিধা নেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই চর্চা বন্ধ করা প্রয়োজন কী?
সাজ্জাদ জহির: আমাদের এখানে উপহার (গিফট) দেওয়া তো একটি ছোট বিষয়। যেমন—একটি ডায়রি বা ক্যালেন্ডার দেওয়া। আমার কাছে মনে হয় যে, নানা আকারেই সুযোগ-সুবিধার এই হস্তান্তর বা ট্রান্সফার ঘটে। কিন্তু এর পেছনের মূল কারণটি বুঝতে হবে। যখন কারও আয়ের একটি নির্দিষ্ট উৎস থাকে এবং সেই আয় নিশ্চিত বা ধরে রাখার জন্য যখন তার মনে হয় যে আপনার সহায়তা প্রয়োজন, তখন সে ওই আয়ের একটি অংশ থেকে আপনাকে উৎকোচ বা সুবিধা দেবে। এখন এই আয়ের উৎস কী?
এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উৎস হলো কোনো বিজনেস গ্রুপ—যা মূলত কেনাকাটা বা প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে, অথবা আর্থিক খাতের ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর যে আয় হয়, তার একটি বড় অংশ ধরে রাখার জন্য এবং তাদের কেনাকাটার ক্ষেত্রে যেখানে অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, সেখানেও অনেক ভাগবাটোয়ারা হতে পারে। আমি এটি তাত্ত্বিকভাবে বলছি।
এই জায়গাগুলোতে উঁচু পর্যায়ে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং সিদ্ধান্তগুলো হতে হবে পর্যাপ্ত তথ্যভিত্তিক। উদাহরণস্বরূপ, আগে একটি নিয়ম ছিল যে একটি আইন তৈরির আগে কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। যেমন—আমি কেন পরিবর্তন চাচ্ছি? এর যৌক্তিকতা কী? পরিবর্তন আনলে কী ভালো বা খারাপ হবে? অর্থাৎ, নথি (নোটিং) প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি ওই জায়গাকে ঠিক করতে পারি, তাহলে ছোটখাটো দুর্নীতির পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। সুতরাং গভর্ন্যান্স বা সুশাসন মানে এই নয় যে, কোথায় কী সুবিধা লেনদেন হচ্ছে তা ধরে ধরে একটি পুলিশিং বা খবরদারিমূলক ব্যবস্থার ভেতরে যাওয়া। কারণ, পুলিশিং ব্যবস্থা উল্টো আরেক ধরনের খারাপ প্রথাকে জায়গা করে দিতে পারে।
স্ট্রিম: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হলেও, দলীয়করণ আগের চেয়ে বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরিণতি কী হতে পারে?
সাজ্জাদ জহির: আমি আবারও বলছি, রাজনীতিকীকরণের দুটি দিক থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে যা চলছে, তাকে রাজনীতিকিকরণ না বলে ‘দলীয়করণ’ বলাই ভালো। যদি রাজনৈতিকভাবে উন্নত করা যেত, তবে সেটি ভালো হতো। এই দলীয়করণের প্রবণতা অনেক বছর ধরেই চলছে। আমি অনেক সময়ই বলি যে, একই পরিবারের এক ভাই এই দল করে, তো আরেক ভাই ওই দল করে—বিভিন্ন দলের ভেতরে এভাবে নিজেদের লোক রাখার ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষেত্রেও যদি কেউ খোঁজ নিতে শুরু করে, তবে দেখা যাবে যে—একটি সরকার ব্যবস্থায় যিনি চেয়ারম্যান হয়ে এলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সরে গেলেন এবং নতুন আরেকজন এলেন। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই চেয়ারম্যানকে দুই দলের মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে হয়তো তাদের মধ্যে একটি আঁতাত রয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি এই বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারে এবং সেই অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে সমস্যা দেখা দেবে। তখন একজন এসে বলবে, “আগেরজন লুট করে নিয়ে গেছে, তাই আমাকে টাকা দাও।” আবার সে চলে গেলে নতুনজন এসে বলবে, “আগেরজন লুট করেছে, এবার আমাকে টাকা দাও।” এটি তো সরকারি রাজস্ব এবং জনগণের টাকা, এভাবে তা নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।

গত বছরের ২৮ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অভিযোগ— তাঁরা অনুষ্ঠানে দেশকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অস
৭ মিনিট আগে
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেই আসামের রাজনীতিতে বাংলাদেশ একটি ‘হুমকি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। অভিবাসন, জনমিতি পরিবর্তনের আতঙ্ক এবং সীমান্ত নিরাপত্তার ধোয়া তুলে সেখানে চরম ভারত-বাংলাদেশ মেরুকরণ শুরু হয়।
১ দিন আগে
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কেন বাড়তে শুরু করেছে, সেটা সবারই জানা। বিশ্বের খুব কম দেশই জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সিংহভাগ দেশকেই কমবেশি আমদানি করতে হয় নানা রকম জ্বালানি পণ্য। বাংলাদেশও জ্বালানির ক্ষেত্রে ব্যপকভাবে আমদানিনির্ভর।
১ দিন আগে
নারী-প্রশ্ন ডিল করার আগে নিজের অপারগতা স্বীকার করছি। কেননা, ‘নারী প্রশ্ন’ বলার মধ্য দিয়েই নারীকে কম মানুষ করা হয়ে যায়। যদিও কম মানুষের বিপরীতে বেশি মানুষ বলে কিছু নেই। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপ বিবেচনা থেকে আমাদের চিন্তার উত্তরণ ঘটলে এই আলোচনা হয়তো সহজ হতো। এমনকি ভাষা নিজেও, নারীকে কম মানুষ করে রাখা
২ দিন আগে