জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সন্ত্রাসবিরোধী আইন: নিয়তেই গণ্ডগোল?

স্ট্রিম গ্রাফিক

গত বছরের ২৮ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অভিযোগ— তাঁরা অনুষ্ঠানে দেশকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অস্থিতিশীল করে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র প্ররোচিত করেছেন।

গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর রাতে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায় সিনিয়র সাংবাদিক এবং টেলিভিশনের টকশোতে আলোচিত বক্তা আনিস আলমগীরকে। ওইদিন মধ্যরাতে ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামে একটি সংগঠনের সদস্য আরিয়ান আহমেদের দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এখনও তিনি কারাগারে আছেন। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে থাকার মধ্যেই গত ১৫ জানুয়ারি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। সম্প্রতি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিন হলেও দুদকের মামলায় জামিন না হওয়ায় তিনি মুক্তি পাচ্ছেন না।

গত ৭ মার্চ রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ বাজানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার ‘স্লোগান ৭১’-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ তিনজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর থেকে তারাও কারাগারে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বাম সংগঠনগুলোর ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী ছিলেন ইমি। তিনি ছাড়া মামলার অপর দুই আসামি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সাবেক কর্মসংস্থান সম্পাদক মো. আসিফ আহমেদ সৈকত ও সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, ৭ মার্চ বিকালে রাজধানীর চানখাঁরপুল মোড়ে শেখ মুজিবের ভাষণ বাজানোর সময় দুজনকে আটক করা হয়। তাদের একজন ছিলেন আসিফ আহমেদ এবং অন্যজন মাইক অপারেটর। এই দুজনকে আটকের প্রতিবাদে ইমিসহ কয়েকজন রিকশায় মাইক বসিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর কর্মসূচি দেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর রাত ১০টার দিকে কয়েকজন এসে তাদের মাইক ও ব্যাটারি ভেঙে ফেলে। এতে আয়োজকদের সঙ্গে তাদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। হাতাহাতির পর ইমিসহ অন্যরা জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে ডাকসু ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা যান। পরে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ এবং সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের রিকশাটি টেনে শাহবাগ থানার ভেতরে নিয়ে যান। এ সময় ইমির সঙ্গে থাকা আবদুল্লাহ আল মামুনকে ছাত্রলীগের তকমা দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে থানার ফটকে নিয়ে মারধর করা হয়। ইমিকেও মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা ইমি ও মামুনকে ধরে টেনে-হিঁচড়ে শাহবাগ থানার ভেতরে নিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

এদিন বিকালে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষ্যে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে যাওয়ার পথে চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৮ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির অডিটরিয়ামে ‘মঞ্চ ৭১’ এর ব্যানারে যে অনুষ্ঠান থেকে লতিফ সিদ্দিকী এবং অধ্যাপক কার্জনসহ ১৬ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, ওই অনুষ্ঠানের আলোচ্য বিষয় ছিল সংবিধান। ওই সময় এনসিপিসহ বিভিন্ন ফোরাম থেকে বাহাত্তরের সংবিধানের কবর রচনা বা এই সংবিধান ছুড়ে ফেলার দাবি উঠেছিল। এর প্রতিবাদে ওই অনুষ্ঠানে বক্তারা বাহাত্তরের সংবিধান রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। যারা দেশের বিদ্যমান ছুড়ে ফেলা দেয়া বা সংবিধানের কবর রচনার হুমকি দিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো যারা সংবিধান রক্ষার দাবিতে বক্তব্য দিলেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলো! তাও আবার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা। তাহলে, সংবিধান রক্ষার দাবি জানানো সন্ত্রাসী কাজ?

সাংবাদিক আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু তাঁকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটি মোটমুটি সবাই আন্দাজ করতে পারেন। তিনি টেলিভিশনের টক শো আর নিজের ফেসবুক ওয়ালে অন্তর্বর্তী সরকার ও সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কড়া সমালোচনা করতেন। এনসিপি ও জামায়াতেরও সমালোচনা করতেন। তাঁর সমালোচনার ভাষা কখনো শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে, এরকম অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, টেলিভিশনে বা ফেসবুকে সরকার বা সরকার প্রধান কিংবা সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট কোনো দলের সমালোচনার অধিকার কি একজন সাংবাদিক বা সাধারণ নাগরিকের থাকবে না? সরকারের সমালোচনা মানেই সেটি সন্ত্রাসী কাজ? সমালোচনার ভাষা যত তীর্যক বা আক্রমণাত্মকই হোক না কেন, সেটি প্রতিরোধ করার জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করে একজন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষককে মাসের পর মাস কারাগারে রাখতে হবে?

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে জনমনে এই প্রতীতি জন্মেছিল যে, এখন থেকে রাষ্ট্র অন্তত নাগরিকের অধিকার হরণকারী আইনগুলোর প্রয়োগ করবে না। যারা অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ভুয়া ও প্রশ্নবিদ্ধ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, তাদের জামিনের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু আপাতত তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের যে ভাষণকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের একটি টার্নিং পয়েন্ট ধরা হয়; যে ভাষণটি ওই সময়ে মুক্তিকামী বাঙালি জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করায় বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্বাস করা হয়—সেই ভাষণ প্রচারের দায়ে কাউকে আটক করা এবং আটকের পরে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা রাষ্ট্র সংবিধানবহির্ভূত কাজ করল কি না, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ তথা শেষ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার অন্ত নেই। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থান দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপপ্রেয়োগেরও অভিযোগও বিস্তর। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে, ৭ই মার্চ বত্রিশ নম্বর বাড়িতে কেউ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবে না? সেটি কোন যুক্তিতে সন্ত্রাসী কাজ হয়? কোন যুক্তিতে এই অপরাধে কোনো নাগরিককে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে ঢোকানো যায়?

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে প্রণীত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতে যেকোনো অপরাধকে এই আইনের আওতায় ফেলে বিচার করা সম্ভব। আইনে অপরাধের আওতা এত বেশি যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে নিজেদের সুবিধামতো এর ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে মামলা নিতে পারে এবং সেই আলোকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারে। অর্থাৎ আইনটি প্রণয়ন করাই হয়েছে রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য। নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য নয়। সম্ভবত বাংলাদেশের অধিকাংশ আইন প্রণয়নের পেছনেই ক্ষমতাকে সুরক্ষিত তথা আনচ্যালেঞ্জড রাখার বিষয়টি প্রধান বিবেচ্য থাকে। যার বড় উদাহরণ বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (পরবর্তী সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন)। এই আইনটি করাই হয়েছে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সমালোচনার সুযোগ বন্ধ করার জন্য। যদিও আইনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে ভিন্ন কথা বলা আছে।

সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি প্রণয়নের পর থেকেই অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং জামিন অযোগ্য ধারার কারণে সমালোচিত হয়ে আসছে। এটি সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ বা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে এটিকে ‘কালো আইন’ বলে অভিহিত করা হয়। এই আইনে দায়ের করা মামলাগুলো সাধারণত জামিন অযোগ্য। এই শর্তটি বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে এবং অভিযুক্তদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারবিরোধী সমালোচনাকেও ‘সন্ত্রাসবাদী প্রচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এই আইনের অধীনে শাস্তি দেওয়া যায়।

প্রশ্ন হলো, সমালোচনা বা ভিন্নমত দমনে রাষ্ট্র কেন বরাবরই সন্ত্রাসীবিরোধী আইনের মতো একটি বিপজ্জনক ও মানবাধিকারপরিপন্থি আইনের আশ্রয় নেয়? এর সহজ উত্তর হলো, সরকার যাদের কণ্ঠরোধ করতে চায় বা যেসব কাজ করতে দিতে চায় না, সেসবের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা কঠিন। যেমন ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারকে আইনত অপরাধ বলার সুযোগ নেই। টেলিভিশনের টকশোতে সরকার বা সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি বা দলের সমালোচনাকেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলার সুযোগ নেই এবং সমালোচনার অভিযোগে শক্ত কোনো মামলাও দেয়া যাবে না। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কিংবা সংবিধান রক্ষার দাবিতে আলোচনা সভায় বক্তৃতা দেয়াকেও কোনো অপরাধের পর্যায়ে ফেলা যাবে না এবং কোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যেহেতু এসব কর্মকাণ্ড হতে দিতে চায় না, ফলে তাকে এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করতে হয় যা বেশ কঠিন। আর এই চিন্তা থেকেই বিরোধী মত দমনে কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী আইন তৈরি করা হয়। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে অপরাধ নয় কিংবা লঘু অপরাধেও যাতে বিরোধী মতের লোকদের দীর্ঘদিন জেলে পুরে রাখা যায় এবং যাতে তারা সহজে জামিন না পান, সেই বিবেচনা থেকেই সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। রাষ্ট্রকে যেখানে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা এবং ভিন্নমত পোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়ার কথা, সেখানে উল্টো ভিন্নমত দমনে রাষ্ট্র এমন একটি আইনি ব্যবস্থার আশ্রয় নেয়, যা স্পষ্টত মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের পরিপন্থি।

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে জনমনে এই প্রতীতি জন্মেছিল যে, এখন থেকে রাষ্ট্র অন্তত নাগরিকের অধিকার হরণকারী আইনগুলোর প্রয়োগ করবে না। যারা অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ভুয়া ও প্রশ্নবিদ্ধ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, তাদের জামিনের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু আপাতত তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং এই সরকারের আমলেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যে প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে, সেটি দুঃখজনক। বরং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেই আইনে মামলা করা যেতে পারে। কিন্তু কথায় কথায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানো আইনের শাসনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বলা হয়, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে আইনের নিজস্ব গতি বলে কিছু নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেক ক্ষেত্রে আইনের গতি নির্ধারিত হয় রাজনৈতিকভাবে। এর সঙ্গে অনেক সময় যুক্ত হয় ক্ষমতা, অর্থ ও অন্যান্য চাপ। প্রতিটি আইন কোন গতিতে চলবে এবং কাকে কতটুকু গতিতে গিয়ে সে পাকড়াও করবে, তা নির্ভর করে রাষ্ট্র বা সরকারের ওপর। কোন আইন কখন সক্রিয় থাকবে অথবা কতটুকু ক্রিয়াশীল থাকবে, সে কাকে ধরবে এবং কোন তরিকায় ধরবে, সেটি নির্ভর করে সরকারের রাজনৈতিক অভিলাষের ওপর। দ্বিতীয়ত, আইনের গতি নির্ভর করে যারা ওই আইনের প্রয়োগ করেন, অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। তৃতীয়ত, ব্যক্তির ওপর। অর্থাৎ একই আইন একই অপরাধে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে। আচরণ করে মানে আইনকে যেভাবে বলা হয়, সে সেভাবে ক্রিয়াশীল হয়। কারণ তার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই।

বাংলাদেশের আইনগুলো নিজস্ব গতিতে চলে কিনা বা নিজস্ব গতি বলতে কী বোঝায়, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—সব আইন কি জনগণের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রণয়ন করা হয় বা আইনসমূহের অভিপ্রায় কী? স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দুই বছরের জন্য দ্রুত বিচার আইন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সব সরকারই আইনটির মেয়াদ বাড়িয়েছে। ২০০২ সালে যখন আইনটি করা হয় তখন তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল এবং তারা এই আইনকে ‘আওয়ামী লীগ দমন আইন’ বলে অভিহিত করেছিল। অথচ তারাই পরবর্তীকালে এই আইনে সাজার মেয়াদ বাড়িয়েছে। অর্থাৎ বিএনপি যেমন এই আইনটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করেছিল, আওয়ামী লীগও তা-ই করছে। অন্তর্বর্তী সরকারও এই আইনের প্রয়োগ করেছে। বর্তমান বিএনপি সরকারও হয়তো করবে। অর্থাৎ, প্রতিটি আইনের প্রয়োগ নির্ভর করে আইনিটি প্রণয়নে সরকারের ইনটেনশন বা নিয়ত কী ছিল, তারওপর। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যে ব্যবহার তথা অপব্যবহার বছরের পর বছর ধরে চলছে, তাতে আইনটি নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

সম্পর্কিত