আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কেন বাড়তে শুরু করেছে, সেটা সবারই জানা। বিশ্বের খুব কম দেশই জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সিংহভাগ দেশকেই কমবেশি আমদানি করতে হয় নানা রকম জ্বালানি পণ্য। বাংলাদেশও জ্বালানির ক্ষেত্রে ব্যপকভাবে আমদানিনির্ভর। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশেও এর দাম বেড়ে যাওয়ার কথা। তবে এটা এখন আর চট করে ঘটছে না। কারণ আন্তর্জাতিক বাজার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে মাস শুরুর আগে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হচ্ছে অনেকদিন ধরে। সে কারণে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলেও আর তা সংগ্রহে বেশি ব্যয় করতে হলেও এর দাম সমন্বয় করলে সেটা করা হবে চলতি মাসের শেষে। সেটা কার্যকর হবে পরের মাস থেকে।
সরকার কি জ্বালানি পণ্যগুলোর দাম বাড়াবে?
সরকার কি জ্বালানি পণ্যগুলোর দাম বাড়াবে? নাকি ভর্তুকি দিয়ে দাম অপরিবর্তিত রাখবে? জ্বালানি দাম বাড়ালে পরিবহনসহ সম্পর্কিত সব খাতে খরচ বেড়ে যায়। এর অবধারিত ফল হিসেবে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়। মাঝে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমিয়ে আনা গেলেও তা এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই বেশি। বিপুলভাবে ব্যবহৃত ডিজেলসহ জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে এর নানামুখি চাপে মূল্যস্ফীতি এখন আরও বেড়ে যাবে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নতুন সরকার সেটা নাও চাইতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিকল্প হলো ভর্তুকি বাড়িয়ে জ্বালানির দাম বাড়তে না দেওয়া। এ অবস্থায় সরকারের রাজস্ব ব্যয় বাড়বে। রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি ভালো, তা বলার কিন্তু সুযোগ নেই। মাঝে, গত দেড় বছরের শাসনামলে এ ক্ষেত্রে বরং আরও অবনতি ঘটেছে। উল্টো বেড়েছে সরকারের পরিচালন ব্যয়। সুদাসলে ঋণ পরিশোধের কারণেও ব্যয় বেড়েছে। নতুন সরকার এসে আবার নতুন কিছু জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে বাড়াচ্ছে খরচ। এগুলো প্রশংসিত হলেও খরচের অর্থ কোত্থেকে আসবে, সে প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানির দাম বাড়াতে না চাইলে সরকারের খরচ আরও বাড়বে। এমন সংকটে সরকার অবশ্য মধ্যপন্থার আশ্রয় নিতে পারে। জ্বালানির দাম অল্প বাড়িয়ে এর বাড়তি খরচের একাংশ উঠিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে সরকার। নির্বাচিত কিছু খাতে বেশি ভর্তুকিতে জ্বালানি জোগানোর ব্যবস্থাও করতে পারে। যেমন, কৃষি খাত। বোরোর ভরা মৌসুমে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি সেচেও অনেক ডিজেল লাগবে চাষীদের। এটা আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদন মৌসুম বলে কথা!
এসব করে জ্বালানি খাত ব্যবস্থাপনায় সরকার না হয় এগিয়ে এলো। সরকার এটা ভেবেও স্বস্তিতে থাকতে পারে যে, ইরান যুদ্ধ বাস্তব কিছু কারণেই বেশি প্রলম্বিত হবে না এবং এর সুবাদে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারও শান্ত হয়ে আসবে। এর বাজার কিন্তু অনেকদিন ধরেই শান্ত ছিল। আরেক যুদ্ধ তথা ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এর দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল মাঝে। বাংলাদেশসহ দেশে দেশে মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব পড়েছে। সারসহ খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজারও অস্থির ছিল এর প্রভাবে। সে পরিস্থিতি থেকে পুরো পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হয়নি আজও। ওদিকে ইউক্রেন যুদ্ধও কিন্তু চলমান। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরান যুদ্ধের প্রভাবই এ মুহূর্তে বেশি।
ইরানের অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার শংকাতেই জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল। হরমুজ বন্ধের খবরে এ ক্ষেত্রে পড়েছে নতুন প্রভাব। ডিজেলের মতো পণ্যের দাম তো বাড়ছেই; তার চাইতে বেশি হারে বাড়ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস তথা এলএনজির দাম। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বদলে ‘স্পট মার্কেট’ থেকে এলএনজি কিনতে হওয়ায় দ্বিগুণ দামও পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার নিরুপায়। গ্যাস সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক রাখতে চাইলেও এলএনজি আমদানির চলমান ধারা বজায় রাখতে হবে। গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল খাতগুলোর ন্যূনতম স্বার্থ রক্ষায় এটার বিকল্প নেই। এর মধ্যে তৈরি পোশাক আর বস্ত্র শিল্পও রয়েছে, যেটা সজীব রাখছে আমাদের রপ্তানি খাত। হালে ক’মাস ধরে অবশ্য রপ্তানি পরিস্থিতি খারাপ। গ্যাসের অভাবে, এমনকি নতুন করে এর দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে দিয়ে রপ্তানি খাতকে কাহিল করা যাবে না।
বেসরকারি খাত কী করবে?
কথা হলো, জ্বালানি খাত মোটের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তারা এর ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারবেন। কিন্তু বেসরকারি খাতে আন্তর্জাতিক বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার চাপ মোকাবিলা করা যাবে কীভাবে? যেমন, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কীভাবে? আমরা তো কেবল জ্বালানি আমদানি করি না। অনেক খাদ্যশস্যও আমদানি করি। যেমন, খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ পণ্য গম বিপুলভাবে আমদানি করতে হয়। আমাদের রপ্তানি খাতও তার কাঁচামালের জন্য বিপুলভাবে আমদানিনির্ভর। যেমন, তুলার প্রায় পুরোটাই করতে হয় আমদানি। যেসব খাতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি, সে ক্ষেত্রেও রয়েছে আমদানিনির্ভরতা। যেমন, গবাদিপশু ও মুরগির খাবারে আমাদের আমদানিনির্ভরতা রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ব্যয় বৃদ্ধি রোধ করা না গেলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়ে পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি ঘটবে নিশ্চিতভাবে। সরকার অবশ্য পারে কর-শুল্ক কমিয়ে এ পরিস্থিতি ‘সহনীয়’ পর্যায়ে রাখার প্রয়াস নিতে। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই কি কর-শুল্ক ছাড় দেওয়া সম্ভব, বিশেষত চলমান দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতিতে?
সরকার কি জ্বালানি পণ্যগুলোর দাম বাড়াবে? নাকি ভর্তুকি দিয়ে দাম অপরিবর্তিত রাখবে? জ্বালানি দাম বাড়ালে পরিবহনসহ সম্পর্কিত সব খাতে খরচ বেড়ে যায়। এর অবধারিত ফল হিসেবে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়।
সরকার জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়াবে; আবার গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি খাতগুলোয় রাজস্ব ছাড় দেবে– এটা কি সম্ভব? নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে কিছু জনকল্যাণমূলক কাজেও কিন্তু তাকে ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে। এসব ব্যয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে ভোগব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়াতে পারে বলেও শংকা রয়েছে। সত্যি বলতে, ইরান যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ না হলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে শুরু করবে। সঙ্গে রপ্তানি আয়ও কমতে থাকলে বিদেশি মুদ্রার মজুদ তথা রিজার্ভে পড়বে এর প্রভাব। রপ্তানি আয় কমতে পারে আমাদের পণ্যের গন্তব্যগুলোয় ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণেও। ইরান যুদ্ধের প্রভাব তো তাদের ওপরও পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়বে সেইসব দেশেও। মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণমূলক করেও তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইতে পারে। আমাদের দেশেও একই প্রকৃতির মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হতে পারে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত। তাতে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। আর সরকার সব ক্ষেত্রে রাজস্ব ছাড় দিতে পারবে না বলে আমদানি সূত্রে আসা মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা সহ্য করতেই হবে ভোক্তাদের। মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। বিশেষত খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণে এরই মধ্যে অবনতির দিকে যাওয়া দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরও অবনতি সম্ভবত রোধ করা যাবে না।
ভোজ্যতেল…
জ্বালানি তেলের দাম না বাড়লেও আমরা লক্ষ করছি, এরই মধ্যে বেড়ে গেছে ভোজ্যতেলের দাম। রোজার মধ্যেও পণ্যবাজারে মোটের ওপর যে স্বস্তি ছিল, তাতে ফাটল ধরেছে সয়াবিনসহ ভোজ্যতেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়ায়। সামনে ঈদ। এ অবস্থায় সাদা চিনির দামও বাড়বে কিনা, কে জানে। আটা-ময়দা আর সেমাইয়ের দাম? ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে আমদানিকৃত পণ্যের দামে অস্থিরতার খবর মিলছিল। এর ক’দিন পরই বিশেষ করে প্যাকেটজাত সয়াবিন তেল খুচরা বাজার থেকে ‘নেই’ হয়ে যাওয়ার ঘটনার মুখোমুখি হতে হলো। আতংকিত হয়ে বেশি করে কিনে ফেলার কারণেই এমনটা ঘটেছে বলে মনে হয় না। সরবরাহের দিক থেকেও কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে আমরা অপরিচিত নই। নতুন সরকারকে এ পরিস্থিতিও সামলাতে হবে। এক, বেশি দাম দিয়ে হলেও, প্রয়োজনে নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখতে হবে তাকে। স্থানীয়ভাবে এর দামও অসহনীয় হতে দেওয়া যাবে না। আর বেসরকারি খাতে, বিশেষত আমদানিকৃত পণ্যের দাম যেন আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব পণ্যে আমদানিকারক ও সরবরাহকারী কম, তাদের জোটবদ্ধ হয়ে দাম বাড়ানোর প্রবণতা থাকলে সেটা রোধ করতে হবে সরকারকেই। ‘অলিগার্কি’ তথা গোষ্ঠীতান্ত্রিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড রোধের কথা ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কিন্তু অনেক বলা হয়েছে। এখন সেটা করে দেখানোর দায়িত্ব বর্তেছে নির্বাচিত সরকারের ওপর।
যুদ্ধ যদি না থামে!
সবচেয়ে ভালো হয় সর্বনাশা এ যুদ্ধটা দ্রুত শেষ হয়ে এলে। তাতে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার শান্ত হয়ে আসতে সময় লাগবে না। জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম এখনও ১০০ ডলার ছাড়ায়নি। তবে যুদ্ধ চলতে থাকলে এটা ১৫০ ডলার হয়ে যেতে পারে বলেও প্রাক্কলন রয়েছে। আমাদের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর তখন কী অবস্থা হবে! রিজার্ভেও টান পড়বে তখন। মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া যাবে না এক জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণেই। দেশেও এমনকি কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি রোধ করা যাবে না উপকরণ ব্যয় বাড়ার কারণে। কম দামে শাকসবজি পাওয়াটাও কঠিন হবে তখন। সবজির দাম সহনীয় থাকার কারণেও কিন্তু মাঝে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমেছিল। গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য ডিমের দাম এখনও কম। সেটা কি কমিয়ে রাখা সম্ভব হবে আমদানিকৃত উপকরণে তৈরি ফিডের দাম বেড়ে গেলে? সঙ্গে যদি যোগ হয় বিদ্যুৎ সংকট? এরই মধ্যে সরকার কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযত হওয়ার কথা বলতে শুরু করেছে। সরকার জানে, বিপুলভাবে ভর্তুকি জুগিয়ে চলার সামর্থ্য তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ সব ক্ষেত্রে ‘চাহিদামাফিক’ রাজস্ব ছাড় দিয়ে সে চলতে পারবে না। বাস্তবতার খাতিরে এ প্রশ্নে উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শও পুরো উপেক্ষা করতে পারবে না সরকার। রিজার্ভ সন্তোষজনক রাখতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা প্রাপ্তির ধারাটি বরং অটুট রাখতে হবে তাকে।
- হাসান মামুন : সাংবাদিক, কলাম লেখক