জাহিদ জগৎ

নারী-প্রশ্ন ডিল করার আগে নিজের অপারগতা স্বীকার করছি। কেননা, ‘নারী প্রশ্ন’ বলার মধ্য দিয়েই নারীকে কম মানুষ করা হয়ে যায়। যদিও কম মানুষের বিপরীতে বেশি মানুষ বলে কিছু নেই। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপ বিবেচনা থেকে আমাদের চিন্তার উত্তরণ ঘটলে এই আলোচনা হয়তো সহজ হতো। এমনকি ভাষা নিজেও, নারীকে কম মানুষ করে রাখার পক্ষেই সহজতর, ফলে নানা রকম সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই কিছু আলোচনার চেষ্টা করব।
প্রথমত, বেশি মানুষ আর কম মানুষের পার্থক্যের জায়গা আমাদের চেতনাগত ধারণাই একমাত্র আদর্শ। এইটা কেবল নারী ও পুরুষের বিবেচনা নয়। বরং বাস্তবতার নিরিখে নজর করলে দেখা যাবে, এই বৈষম্য, বৈষম্যের বেসিস একেক ধরনের। এসবের মধ্যে অর্থনৈতিক চরিত্রের বৈষম্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে আছে কথিত আধুনিক চিন্তার ওপর দখলদারিত্বের ক্ষমতা এবং শারীরিক শক্তির তফাৎ–এসব বৈষম্যের বৈধ্যতা দানে প্রাকৃতিক অবস্থা হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।
মনুষ্যসমাজ এবং চিন্তার পরিণতির দিকে খেয়াল করলে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কমজাত বা Low cast বলে যেসব সমাজ এখন পর্যন্ত পিছিয়ে আছে বা আমরা যারা আধুনিকতার মান বিচারে পিছিয়ে পড়া মনে করি, তাদের বাস্তবতাও ঠিক একই। এমনকি আমরা যারা নিজেদের আধুনিক দাবি করি, তাদের মধ্যেও এই ধরনের উচ্চতর কিংবা কমজাত ধারণা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
যেমন আমরা ‘মূল ধারা’ থেকে গণিত, ইংরেজি, বাংলা পড়েছি; অন্যরা মাদ্রাসায় আরবি বা ফারসি পড়েছে। কিন্তু তারা যেহেতু করপোরেট দুনিয়ায় সহজে যোগাযোগ করতে সক্ষম নয়। ফলে শিক্ষায় মাদ্রাসার ছাত্ররা আমাদের তুলনায় কমজাত বলে আমরা মনে করি। আবার বাংলা মাধ্যম থেকে শিখেছি কিন্তু ভালো ইংরেজি জানি না। কিংবা আমরা শিক্ষিত এবং ভালো ইংরেজি জানি, কিন্তু আমরা করপোরেট দুনিয়ায় যথেষ্ট ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারিনি বা সামান্য কর্মচারী হিসেবে করপোরেট দুনিয়ার সেবক, এই ক্ষেত্রেও ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার কাছে কমজাত হিসেবে গণ্য।
একইভাবে আমরা আমাদের তুলনায় কম বেতনের কিংবা আমাদের তুলনায় কম শিক্ষিত কিংবা আমাদের তুলনায় কম আধুনিকের ওপর আমাদের চিন্তা, চেতনা, আদর্শ এবং সামাজিক ও শারীরিক ক্ষমতার মান প্রয়োগ করি। যেটা আমাদের কাছে খুবই যৌক্তিক মনে হয়। এইযে নানাভাবে আমরা একে অন্যকে কমজাত করে রাখি। এটা শুধু আমাদের একে অন্যের ওপর দখলস্বত্ব তৈরির মধ্য দিয়ে নিজেকে অপেক্ষাকৃত উন্নত হিসেবে হাজির রাখার প্রয়োজনে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দুর্বলতাগুলোর যৌক্তিক সুরক্ষা তৈরি। এটা খুব জটিল বিষয়। আমাদের যে সব অবস্থানে নিজেরা দূর্বল এবং যা উতড়ে আমরা নিজেদের জন্য স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী অবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে অপারগ; ঠিক সেখানে আমরা আমাদের দুর্বলতাগুলোকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বলের ঘাড়ে চাপিয়ে তার যৌক্তিক সুরক্ষা তৈরি করে থাকি- যাতে করে আমাদের শক্তিমত্তা টিকিয়ে রাখতে পারি। এই ঘটনা সাধারণত অপরাধীদের বয়ানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আপনি খেয়াল করে দেখবেন—একজন খুনি যখন খুন করে, তখন সে নিজের পক্ষে খুনের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী যুক্তি তৈরি করে থাকে। কিংবা একজন গৃহকর্তা যখন একজন গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে, তখনও ঠিক নিজের পক্ষে যথাযথ যুক্তি তৈরি করে থাকে। নারীর প্রতি নিগ্রহের পক্ষেও ঠিক আমাদের এইরকম যুক্তি তৈরি হয় দীর্ঘদিনের ক্ষমতা চর্চার মধ্য দিয়ে। এমনকি আমাদের সমাজে এই মত ভয়াবহভাবে প্রচলিত। আমাদের ধর্মীয় জ্ঞান তাত্ত্বিকগণও এমন যুক্তি ও সম্মতি উৎপাদন করছে যে একজন নারী, অশ্লীল পোশাক এবং তার নারীত্বের প্রকাশভঙ্গির কারণে সে ধর্ষিত হয়েছে। অথবা আমার আপনার, ঈমান, আমল নির্ভর করছে একজন নারীর বলা, চলা, ভাবনার উপর।
মানে আমরা ধ্যানী, সাধক, আশেক এবং আমাদের সাধনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে নারীর প্রকাশ। মানে নারী অন্তরালে গেলে আমাদের ধ্যান-ধর্ম রক্ষা পায়। নারী প্রকাশিত হচ্ছে বলে আমাদের ধ্যান, ধারণা, এলেম, আমল, বিশ্বাস ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
এটা কেন বলতে হচ্ছে? কারণ আদতে আমরা বিশ্বাসী নই, আমরা ধার্মিকও নই, আমরা চিন্তকও নই, আমরা আশেকও নই। আমরা যেহেতু এইসবের কিছুই নই, ফলে আমাদের এই ‘কিছুই না’র দুর্বলতাকে নিজেদের জন্য সান্ত্বনারূপ দাঁড় করিয়েছি, যেহেতু নারী প্রকাশিত এবং আমাদের ধ্যানে এলেমে একমাত্র বাধা। ফলে তাকে অন্তরালে পাঠিয়ে দাও। অথবা যদি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—তবে একবাক্যে বলে দেওয়া যাবে, নারী প্রকাশিত ছিল, ফলে আমি নষ্ট হয়েছি। নারী মুক্ত ছিলো, ফলে আমি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছি। নারী ক্ষমতাবান ছিলো বলে আমি অবিশ্বাসী হয়েছি। মানে, আমাদের বিশ্বাস,ধ্যান, এলেম যে আমাদের বানানো প্রতারণা ছিলো– আমরা খুনি ছিলাম, আমরা ধর্ষক ছিলাম, আমরা বিশ্বাসীর চরিত্রে অভিনয় করছিলাম, আমরা ছিলাম অত্যাচারী, আমরা নিপীড়ক হয়ে উঠেছিলাম– এগুলো আমরা কখনো ভাবতেই চাইনি বা ভাবতেই দেওয়া হয় নি, চিন্তার কি ভয়াবহ অসুখ এটা ভাবতে পারেন?
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে যখন নারী প্রশ্নে ‘নারীবাদ’ শব্দটা এসে হাজির হয়, ঠিক তখনই একটা দ্বন্দ্ব খুব জোরালো হয়ে ওঠে, সেটা হলো মুসলিম দেশে পশ্চিমা চিন্তা ও সংস্কৃতির আগ্রাসন। মুসলিম দেশ ও পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বন্দ্বে ফেলে আমাদের নারীদের মুক্তি ও সম্ভাবনার কবর রচনা করা হয় প্রতিমুহূর্তে।
অথচ প্রশ্নটা ছিলো নারীর জৈবিক ও মানবিক মর্যাদা। এইখানে পশ্চিমা চিন্তা সংস্কৃতির প্রভাব থাকতে পারে– কিন্তু যদি মুসলিম সংস্কৃতির কথা বলেন সেটাও তো শুধুমাত্র মুসলিম দেশের একক হিস্যা নয়। সেসব দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও নারীর মুক্তির প্রশ্ন। ফলে “নারীবাদ” যে একেবারে পশ্চিমা তত্ত্বের বিষয় নয়, এটা বুঝতে না চাইলে শুধু ‘নারীবাদ’ শব্দের মধ্যে নারীর সংগ্রামকে আটকে ফেললে বড় মুশকিলে পড়তে হয়।
এমনকি খোদ পশ্চিমা দুনিয়াকেও নারী প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে নানাভাবে ভাবতে হয়েছে। সেখানেও নারী কমজাত। সেখানেও নারীকে নাগরিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে বারবার। এটা শুধু নারী পুরুষ সম্পর্কের ভিত্তির ওপর নয়, বরং নারীর পূর্ণাঙ্গ মানুষ মর্যাদার প্রশ্নে সমাজ বা রাষ্ট্রের অবস্থান কেমন হতে পারে তার দিকগুলো নিয়ে। অথবা মুসলিম দেশগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, আজকের দুনিয়ায় এসে প্রতিটি সভ্য সমাজকে নারীর পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এসব বৈষম্যের সঙ্গে নারী’র সম্পর্ক কী?
নারীর সম্পর্ক হলো, মানব সভ্যতার শুরুর দিক থেকেই নারীকে নানা রকম অজুহাতে কমজাত করে দেখা হয়েছে। এমনকি কোন কোন সমাজ সভ্যতার ক্ষমতা, শক্তি, দখল, এবং ‘উচ্চতর’র ধারণার বিকাশই হয়েছে নারীকে কমজাত করার মধ্য দিয়ে। শিকারে অংশগ্রহণ, দীর্ঘপথের যাত্রা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে ঋতুস্রাব, গর্ভধারণ, বাচ্চা পালনকে নারীর শারীরিক দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে ক্ষমতাবিস্তার এবং তা রক্ষার দায়িত্বে নারীকে কমজাত কিংবা কোথাও কোথাও বাধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক নারীকে পাঠ করলে বোঝা যায় এসব শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় রেখেই সভ্যতার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নারী আসলে কোনোকালেই কমজাত ছিল না।
প্রাগতৈহাসিক অবস্থা থেকে প্রাক মধ্যযুগ পর্যন্ত পুরুষের সঙ্গে সমানতালে এবং বহুবিদ অংশে নারীই অপার শক্তিধর হিসেবে সভ্যতার নতুন দিগদর্শনের সরাসরি আবিষ্কারের সাথে যুক্ত ছিলো। দীর্ঘ প্রস্তরযুগের যেটুকু ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে, প্রতিটি অবস্থায় নারী ছিলো একক কৃতিত্বের অধিকারী। প্রাক-মধ্যযুগে, বিশেষ করে মানুষ যখন স্থায়ী বসবাস কিংবা স্থায়ী সম্পদের ধারণার সাথে যুক্ত হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে মালিকানা স্বত্বের অধিকার এবং সম্পদ সংরক্ষণকালেও নারীই প্রধান। কিন্তু সেটা সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে পুরুষ তা বলপূর্বক অধিগ্রহণ করেছে।
এই ‘বল’ সত্যিকার অর্থে নারীর শারীরিক সক্ষমতার তুলনামূলক অবস্থার চেয়েও অনেক বেশি ছিল পুরুষের চতুরতা। পুরুষ কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নারীকে পৃথিবীর ‘বিশেষ বিবেচনা’ হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করতে চেয়েছে। আজকের আধুনিকতা পর্যন্ত তা চলমান। যেভাবে একজন মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের বিশেষ বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নারী তা স্বীকার করবে কেন?
এখানেই যত দ্বন্দ্ব ও আজকের নারী পুরুষ-চিন্তার যুদ্ধ। যখন নারী তার ঐতিহাসিকতার পুনর্দখলের কথা বলছে, ঠিক তখনই পুরুষ তার উপর চাপিয়ে দিয়েছে নিজেদের সংরক্ষিত চেতনা বা ভাবসর্বস্ব ভবিষ্যৎ। যেমন সমাজ তথা পুরুষের মানসম্মান, কিংবা তার বিশ্বাস, চেতনার সংরক্ষনারগার হিসেবে তারে যে মর্যাদার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তেমনি তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে দুনিদারির ক্ষমতা। এই মর্যাদার ফাঁদ থেকে নিজেকে মুক্ত করার কথা উঠলেই সমাজ তথা পুরুষের মাথায় সাম্রাজ্য হারানোর ভয়, দুনিয়াবি শক্তি হারানোর ভয় এবং ঐতিহাসিক পুরুষোচিত কূটকৌশল ধরা পড়ার ভয় এসে হাজির হয় কথিত সভ্যতার ঘাড়ে। এইখানেই ধর্মভিত্তিক চেতনাগুলো সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে সমাজ তথা পুরুষের পক্ষে।
ধর্ম বনাম নারী হয়ে ওঠার গল্পটা খেয়াল করুন। যেখানে নারী নিজেও ধার্মিকতার বাইরে নয়। এমনকি যে সব প্রাচীন ধর্ম এখনো টিকে আছে, তাদের অতীতে খেয়াল করলে দেখা যাবে পুরুষ ও নারী সম্পূর্ণরূপ এবং ধর্ম সেখানে খুব বিভেদ তৈরি করতে সক্ষম নয়। কেননা ধর্মচিন্তা মানুষের মধ্যেই গড়ে ওঠা চিন্তা-প্রক্রিয়ার সাঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেগুলো আধুনিক সভ্যতার যুগে এসে তাদের সেই ঐতিহাসিক চেতনা লুপ্ত হয়ে সেই ধর্মগুলোও পুরুষের দখলে চলে এসেছে এবং তারাও আলাদা করে নারীর বিধান বিশেষ করে তুলেছে।
এমনকি আপনি সর্বাধুনিক ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও যদি বলেন প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে আরবের নারী সমাজ যখন পুরুষকেন্দ্রিক ভয়াবহ আক্রমণের শিকার, তখন হযরত মোহাম্মদ (সা.) সর্বস্তরের নির্যাতিতের পক্ষে এক নতুন বিনির্মাণের দিকে নজর দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের চিন্তা যেখান থেকে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, ইতিহাসের নতুন নতুন বর্ণবাদ নিরূপণ এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাজ, চিন্তা ও চেতনা বিনির্মাণের কথা ছিলো ইতিহাসের ঠিক সেই বিন্দুতেই আটকে দেওয়া হলো আর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো আরও পেছনের দিকে।
ইতিহাসের পেছন দিকে যাবার সুবিধা হলো আমাদের পুরুষদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায়। আমরা আরও বেশি পুরুষ হয়ে উঠতে পারি এবং আমাদের দখলদারত্ব সহজেই কায়েম হয়।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে আপনি সমাজের বেশির ভাগ পুরুষের ‘ধর্ম ও নারী’ বিষয়ক মতামত জরিপ করলে দেখতে পারবেন আদতে তিনি ধর্ম বলতে বোঝেনই শুধু নারীর সমস্ত স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। তিনি মনে করেন, তার ধর্মবিশ্বাস, তার পূর্ণলাভ কিংবা ধর্মের যেটুকু পুরষ্কার সবটুকুই নির্ভর করছে নারীর উপর। এমনকি তিনি তার যতোরকম অন্যায়, অপরাধ, পাপাচার—সেসবের ক্ষেত্রেও তিনি প্রায় সম্পূর্ণরূপে নারীকে দায়ী করেন। এটা যেহেতু পুরুষদের মধ্যে খুব বেশি প্রচলিত ও জনপ্রিয় মত, আমাদের ধর্মীয় ওস্তাদেরাও নিজেও সেই পুরুষ হিসেবে পুরুষ সমাজের আকাঙ্ক্ষা মোতাবেক ধর্মীয় বয়ানগুলো তৈরি করেন। ফলে সর্বত্র নারী এমন এক বস্তু হিসেবে উপস্থিত আছে আমাদের পুরুষ সমাজে—আমরা স্বর্গীয় দূত এবং আমাদের স্বর্গচ্যুত হয়েছে এই নারীর অপকর্মে; আমাদের স্বর্গে ফেরত যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো নারীদের উপর্যুপরি শাসন, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। এমন মিথের উপর দাঁড়িয়ে পুরুষ সমাজের পক্ষে নারীকে সম্পূর্ণ মানুষরূপ ভাবতে পারাটা অসম্ভব।
এমন অবস্থায় নারী যখন পুরুষের এই ধারণা ইতিহাসের প্রতিটি মুহূর্তে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, ঠিক তখনই অসহায় হয়ে পরেছে পুরুষসমাজ। তারা না পেরেছে নিজের এই অসহায়ত্ব’কে স্বীকার করতে, না পেরেছে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে।
অধিকার প্রশ্নে নারীর বিদ্রোহের দিকগুলোর দিকে নজর দেন। সে তার সম্পূর্ণ মানুষরূপ প্রতিষ্ঠার জন্য কী কী কর্মযজ্ঞে নিজেকে মেলে ধরেছে? বা এই যুগে নারীবাদ, আসলে কী কী ধরনের সংকট ও প্রস্তাবনার দিকে নজর দিচ্ছে। তারা যে বিষয়গুলো নিয়ে পুরুষের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, তার মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জীবের জীবনের পূর্ণতা লাভ। আশরাফুল মাকলুকাত (মানুষ) তো দূরের কথা, জীব হিসেবেও সে অসম্পূর্ণ, অর্ধেক, না প্রাণ হিসেবে, নারীকে পূর্ণাঙ্গ জীবের হিস্যার জন্যেই আজ পর্যন্ত লড়াই করতে হচ্ছে। আর সেই হিস্যা এসে পড়েছে আমাদের দখলদারি চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাসের বিরুদ্ধে- ফলে নারীর যেকোন প্রস্তাবনাই আমাদের জন্য হুমকিস্বরূপ।
আমরা ভয় পাচ্ছি, নারী পুরুষের সমান মানুষ হয়ে উঠলে আমাদের কর্তৃত্ববাদী চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস ভেঙে পড়ার, সমাজের ওপর নিজেদের দখল হারাবার। কিন্তু আমরা খেয়াল করিনি, আমাদের এই গোড়া, অহংকারী মিথকে যুগের পর যুগ ভেঙ্গে ফেলেছে নারীরা। আজকের দুনিয়ার দিকে দেখেন, আপনি তাকে আর কোথায় আটকাবেন? শারীরিক শক্তিতে? সেটা আর সম্ভব নয়। নারী আপনার পুরুষগিরি শরীর ছাপিয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে সক্ষম তার অজস্র প্রমাণ রেখেছে। চিন্তায়? মেধায়? বুদ্ধিতে? শিক্ষাক্ষেত্রে তাকালেও দেখা যায় পুরুষের মিথ্যা অহংকারগুলো কি অসহায় হয়ে পড়েছে তাদের প্রজ্ঞার কাছে। এমনকি তার সততার কাছেও পুরুষের ঠুনকো অহংকার চুরমার হয়ে পরেছে ইতিহাসের কোনায় কোনায়।
যখন চারদিক থেকে নারী তার পূর্ণাঙ্গরূপ নিয়ে বর্তমান, ঠিক তখনই আমরা তাদের সামনে বাধা হিসেবে হাজির করতে চেয়েছি। খোদার কাছে সে কম মানুষ নয়, কিংবা তার জন্য আলাদা কিংবা কম রহমত দেন নাই। হকের প্রশ্নে তিনি এমন বৈষম্য রাখেন নাই, যেখানে নারী পুরুষের একবিন্দু কম। অথচ আমরা তার ধর্মকে তার মতো বুঝতেই দিতে চাইনি আর… কেননা, রাবেয়া আল বসরি (র.)-এর মতো নারী ঠিকই নিজের ধর্ম নিজে বুঝে নেন।
এখানে আমার প্রস্তাব হলো, পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপে নারীর বিকাশের ক্ষেত্রে নারীর যে সাধনা, তাকে তার সাধনার ন্যায্যতা প্রদান। তার শিক্ষাদীক্ষা, মেধা, মনন, ধর্ম, বিশ্বাস, চিন্তা, চেতনা এবং সাধনার পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাকে স্বীকার করে নেওয়া। কোন অজুহাতেই তার সাধনার পথে তাকে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার আর কারও থাকার কোনরূপ বৈধতা নাই দুনিয়ায়। সে যতো বড় আলেমই হোক না কেন কিংবা যতো বড় ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোন না কেন।
আপনি তার সঙ্গেই যুক্ত হবেন যে আপনার মতের সঙ্গে একমত পোষণ করে। অপরাপর জীব জীবনের ওপর ব্যক্তি পর্যায়ে কারও নিয়ন্ত্রণ থাকা অপরাধ হিসেবে গণ্য থাকতে হবে। এমনকি একজন পুরুষ রাষ্ট্রের কাছে যা যা সুবিধা পেয়ে থাকেন কিংবা যা যা একজন পুরুষের ক্ষেত্রে অপরাধ ও শাস্তি, তা অবশ্যই নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, নাগরিক মর্যাদাবোধ তৈরি হতে হবে সমাজে। নাগরিক হিসেবে মর্যাদা প্রদানই এসব সমস্যার অনেকাংশে সমাধান করতে পারে বলে আমার ধারণা। নারী ছাড়াও এমনকি যেকোন ক্ষেত্রেই নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে প্রকাশ্যে বা গোপনে কেউ কাউকে কমজাত কিংবা না মানুষ হিসেবে চার্জ করতে পারবে না। আর এই বিষয়ে রাষ্ট্রকে হয়ে উঠতে শক্তিশালী। ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী, পুরুষ, ধনী, গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যতক্ষণ না তার নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে ন্যায্যতা লাভ করছে–ততদিন পর্যন্ত এই এই ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

নারী-প্রশ্ন ডিল করার আগে নিজের অপারগতা স্বীকার করছি। কেননা, ‘নারী প্রশ্ন’ বলার মধ্য দিয়েই নারীকে কম মানুষ করা হয়ে যায়। যদিও কম মানুষের বিপরীতে বেশি মানুষ বলে কিছু নেই। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপ বিবেচনা থেকে আমাদের চিন্তার উত্তরণ ঘটলে এই আলোচনা হয়তো সহজ হতো। এমনকি ভাষা নিজেও, নারীকে কম মানুষ করে রাখার পক্ষেই সহজতর, ফলে নানা রকম সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই কিছু আলোচনার চেষ্টা করব।
প্রথমত, বেশি মানুষ আর কম মানুষের পার্থক্যের জায়গা আমাদের চেতনাগত ধারণাই একমাত্র আদর্শ। এইটা কেবল নারী ও পুরুষের বিবেচনা নয়। বরং বাস্তবতার নিরিখে নজর করলে দেখা যাবে, এই বৈষম্য, বৈষম্যের বেসিস একেক ধরনের। এসবের মধ্যে অর্থনৈতিক চরিত্রের বৈষম্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে আছে কথিত আধুনিক চিন্তার ওপর দখলদারিত্বের ক্ষমতা এবং শারীরিক শক্তির তফাৎ–এসব বৈষম্যের বৈধ্যতা দানে প্রাকৃতিক অবস্থা হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।
মনুষ্যসমাজ এবং চিন্তার পরিণতির দিকে খেয়াল করলে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কমজাত বা Low cast বলে যেসব সমাজ এখন পর্যন্ত পিছিয়ে আছে বা আমরা যারা আধুনিকতার মান বিচারে পিছিয়ে পড়া মনে করি, তাদের বাস্তবতাও ঠিক একই। এমনকি আমরা যারা নিজেদের আধুনিক দাবি করি, তাদের মধ্যেও এই ধরনের উচ্চতর কিংবা কমজাত ধারণা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
যেমন আমরা ‘মূল ধারা’ থেকে গণিত, ইংরেজি, বাংলা পড়েছি; অন্যরা মাদ্রাসায় আরবি বা ফারসি পড়েছে। কিন্তু তারা যেহেতু করপোরেট দুনিয়ায় সহজে যোগাযোগ করতে সক্ষম নয়। ফলে শিক্ষায় মাদ্রাসার ছাত্ররা আমাদের তুলনায় কমজাত বলে আমরা মনে করি। আবার বাংলা মাধ্যম থেকে শিখেছি কিন্তু ভালো ইংরেজি জানি না। কিংবা আমরা শিক্ষিত এবং ভালো ইংরেজি জানি, কিন্তু আমরা করপোরেট দুনিয়ায় যথেষ্ট ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারিনি বা সামান্য কর্মচারী হিসেবে করপোরেট দুনিয়ার সেবক, এই ক্ষেত্রেও ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার কাছে কমজাত হিসেবে গণ্য।
একইভাবে আমরা আমাদের তুলনায় কম বেতনের কিংবা আমাদের তুলনায় কম শিক্ষিত কিংবা আমাদের তুলনায় কম আধুনিকের ওপর আমাদের চিন্তা, চেতনা, আদর্শ এবং সামাজিক ও শারীরিক ক্ষমতার মান প্রয়োগ করি। যেটা আমাদের কাছে খুবই যৌক্তিক মনে হয়। এইযে নানাভাবে আমরা একে অন্যকে কমজাত করে রাখি। এটা শুধু আমাদের একে অন্যের ওপর দখলস্বত্ব তৈরির মধ্য দিয়ে নিজেকে অপেক্ষাকৃত উন্নত হিসেবে হাজির রাখার প্রয়োজনে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দুর্বলতাগুলোর যৌক্তিক সুরক্ষা তৈরি। এটা খুব জটিল বিষয়। আমাদের যে সব অবস্থানে নিজেরা দূর্বল এবং যা উতড়ে আমরা নিজেদের জন্য স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী অবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে অপারগ; ঠিক সেখানে আমরা আমাদের দুর্বলতাগুলোকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বলের ঘাড়ে চাপিয়ে তার যৌক্তিক সুরক্ষা তৈরি করে থাকি- যাতে করে আমাদের শক্তিমত্তা টিকিয়ে রাখতে পারি। এই ঘটনা সাধারণত অপরাধীদের বয়ানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আপনি খেয়াল করে দেখবেন—একজন খুনি যখন খুন করে, তখন সে নিজের পক্ষে খুনের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী যুক্তি তৈরি করে থাকে। কিংবা একজন গৃহকর্তা যখন একজন গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে, তখনও ঠিক নিজের পক্ষে যথাযথ যুক্তি তৈরি করে থাকে। নারীর প্রতি নিগ্রহের পক্ষেও ঠিক আমাদের এইরকম যুক্তি তৈরি হয় দীর্ঘদিনের ক্ষমতা চর্চার মধ্য দিয়ে। এমনকি আমাদের সমাজে এই মত ভয়াবহভাবে প্রচলিত। আমাদের ধর্মীয় জ্ঞান তাত্ত্বিকগণও এমন যুক্তি ও সম্মতি উৎপাদন করছে যে একজন নারী, অশ্লীল পোশাক এবং তার নারীত্বের প্রকাশভঙ্গির কারণে সে ধর্ষিত হয়েছে। অথবা আমার আপনার, ঈমান, আমল নির্ভর করছে একজন নারীর বলা, চলা, ভাবনার উপর।
মানে আমরা ধ্যানী, সাধক, আশেক এবং আমাদের সাধনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে নারীর প্রকাশ। মানে নারী অন্তরালে গেলে আমাদের ধ্যান-ধর্ম রক্ষা পায়। নারী প্রকাশিত হচ্ছে বলে আমাদের ধ্যান, ধারণা, এলেম, আমল, বিশ্বাস ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
এটা কেন বলতে হচ্ছে? কারণ আদতে আমরা বিশ্বাসী নই, আমরা ধার্মিকও নই, আমরা চিন্তকও নই, আমরা আশেকও নই। আমরা যেহেতু এইসবের কিছুই নই, ফলে আমাদের এই ‘কিছুই না’র দুর্বলতাকে নিজেদের জন্য সান্ত্বনারূপ দাঁড় করিয়েছি, যেহেতু নারী প্রকাশিত এবং আমাদের ধ্যানে এলেমে একমাত্র বাধা। ফলে তাকে অন্তরালে পাঠিয়ে দাও। অথবা যদি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—তবে একবাক্যে বলে দেওয়া যাবে, নারী প্রকাশিত ছিল, ফলে আমি নষ্ট হয়েছি। নারী মুক্ত ছিলো, ফলে আমি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছি। নারী ক্ষমতাবান ছিলো বলে আমি অবিশ্বাসী হয়েছি। মানে, আমাদের বিশ্বাস,ধ্যান, এলেম যে আমাদের বানানো প্রতারণা ছিলো– আমরা খুনি ছিলাম, আমরা ধর্ষক ছিলাম, আমরা বিশ্বাসীর চরিত্রে অভিনয় করছিলাম, আমরা ছিলাম অত্যাচারী, আমরা নিপীড়ক হয়ে উঠেছিলাম– এগুলো আমরা কখনো ভাবতেই চাইনি বা ভাবতেই দেওয়া হয় নি, চিন্তার কি ভয়াবহ অসুখ এটা ভাবতে পারেন?
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে যখন নারী প্রশ্নে ‘নারীবাদ’ শব্দটা এসে হাজির হয়, ঠিক তখনই একটা দ্বন্দ্ব খুব জোরালো হয়ে ওঠে, সেটা হলো মুসলিম দেশে পশ্চিমা চিন্তা ও সংস্কৃতির আগ্রাসন। মুসলিম দেশ ও পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বন্দ্বে ফেলে আমাদের নারীদের মুক্তি ও সম্ভাবনার কবর রচনা করা হয় প্রতিমুহূর্তে।
অথচ প্রশ্নটা ছিলো নারীর জৈবিক ও মানবিক মর্যাদা। এইখানে পশ্চিমা চিন্তা সংস্কৃতির প্রভাব থাকতে পারে– কিন্তু যদি মুসলিম সংস্কৃতির কথা বলেন সেটাও তো শুধুমাত্র মুসলিম দেশের একক হিস্যা নয়। সেসব দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও নারীর মুক্তির প্রশ্ন। ফলে “নারীবাদ” যে একেবারে পশ্চিমা তত্ত্বের বিষয় নয়, এটা বুঝতে না চাইলে শুধু ‘নারীবাদ’ শব্দের মধ্যে নারীর সংগ্রামকে আটকে ফেললে বড় মুশকিলে পড়তে হয়।
এমনকি খোদ পশ্চিমা দুনিয়াকেও নারী প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে নানাভাবে ভাবতে হয়েছে। সেখানেও নারী কমজাত। সেখানেও নারীকে নাগরিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে বারবার। এটা শুধু নারী পুরুষ সম্পর্কের ভিত্তির ওপর নয়, বরং নারীর পূর্ণাঙ্গ মানুষ মর্যাদার প্রশ্নে সমাজ বা রাষ্ট্রের অবস্থান কেমন হতে পারে তার দিকগুলো নিয়ে। অথবা মুসলিম দেশগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, আজকের দুনিয়ায় এসে প্রতিটি সভ্য সমাজকে নারীর পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এসব বৈষম্যের সঙ্গে নারী’র সম্পর্ক কী?
নারীর সম্পর্ক হলো, মানব সভ্যতার শুরুর দিক থেকেই নারীকে নানা রকম অজুহাতে কমজাত করে দেখা হয়েছে। এমনকি কোন কোন সমাজ সভ্যতার ক্ষমতা, শক্তি, দখল, এবং ‘উচ্চতর’র ধারণার বিকাশই হয়েছে নারীকে কমজাত করার মধ্য দিয়ে। শিকারে অংশগ্রহণ, দীর্ঘপথের যাত্রা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে ঋতুস্রাব, গর্ভধারণ, বাচ্চা পালনকে নারীর শারীরিক দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে ক্ষমতাবিস্তার এবং তা রক্ষার দায়িত্বে নারীকে কমজাত কিংবা কোথাও কোথাও বাধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক নারীকে পাঠ করলে বোঝা যায় এসব শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় রেখেই সভ্যতার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নারী আসলে কোনোকালেই কমজাত ছিল না।
প্রাগতৈহাসিক অবস্থা থেকে প্রাক মধ্যযুগ পর্যন্ত পুরুষের সঙ্গে সমানতালে এবং বহুবিদ অংশে নারীই অপার শক্তিধর হিসেবে সভ্যতার নতুন দিগদর্শনের সরাসরি আবিষ্কারের সাথে যুক্ত ছিলো। দীর্ঘ প্রস্তরযুগের যেটুকু ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে, প্রতিটি অবস্থায় নারী ছিলো একক কৃতিত্বের অধিকারী। প্রাক-মধ্যযুগে, বিশেষ করে মানুষ যখন স্থায়ী বসবাস কিংবা স্থায়ী সম্পদের ধারণার সাথে যুক্ত হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে মালিকানা স্বত্বের অধিকার এবং সম্পদ সংরক্ষণকালেও নারীই প্রধান। কিন্তু সেটা সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে পুরুষ তা বলপূর্বক অধিগ্রহণ করেছে।
এই ‘বল’ সত্যিকার অর্থে নারীর শারীরিক সক্ষমতার তুলনামূলক অবস্থার চেয়েও অনেক বেশি ছিল পুরুষের চতুরতা। পুরুষ কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নারীকে পৃথিবীর ‘বিশেষ বিবেচনা’ হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করতে চেয়েছে। আজকের আধুনিকতা পর্যন্ত তা চলমান। যেভাবে একজন মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের বিশেষ বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নারী তা স্বীকার করবে কেন?
এখানেই যত দ্বন্দ্ব ও আজকের নারী পুরুষ-চিন্তার যুদ্ধ। যখন নারী তার ঐতিহাসিকতার পুনর্দখলের কথা বলছে, ঠিক তখনই পুরুষ তার উপর চাপিয়ে দিয়েছে নিজেদের সংরক্ষিত চেতনা বা ভাবসর্বস্ব ভবিষ্যৎ। যেমন সমাজ তথা পুরুষের মানসম্মান, কিংবা তার বিশ্বাস, চেতনার সংরক্ষনারগার হিসেবে তারে যে মর্যাদার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তেমনি তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে দুনিদারির ক্ষমতা। এই মর্যাদার ফাঁদ থেকে নিজেকে মুক্ত করার কথা উঠলেই সমাজ তথা পুরুষের মাথায় সাম্রাজ্য হারানোর ভয়, দুনিয়াবি শক্তি হারানোর ভয় এবং ঐতিহাসিক পুরুষোচিত কূটকৌশল ধরা পড়ার ভয় এসে হাজির হয় কথিত সভ্যতার ঘাড়ে। এইখানেই ধর্মভিত্তিক চেতনাগুলো সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে সমাজ তথা পুরুষের পক্ষে।
ধর্ম বনাম নারী হয়ে ওঠার গল্পটা খেয়াল করুন। যেখানে নারী নিজেও ধার্মিকতার বাইরে নয়। এমনকি যে সব প্রাচীন ধর্ম এখনো টিকে আছে, তাদের অতীতে খেয়াল করলে দেখা যাবে পুরুষ ও নারী সম্পূর্ণরূপ এবং ধর্ম সেখানে খুব বিভেদ তৈরি করতে সক্ষম নয়। কেননা ধর্মচিন্তা মানুষের মধ্যেই গড়ে ওঠা চিন্তা-প্রক্রিয়ার সাঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেগুলো আধুনিক সভ্যতার যুগে এসে তাদের সেই ঐতিহাসিক চেতনা লুপ্ত হয়ে সেই ধর্মগুলোও পুরুষের দখলে চলে এসেছে এবং তারাও আলাদা করে নারীর বিধান বিশেষ করে তুলেছে।
এমনকি আপনি সর্বাধুনিক ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও যদি বলেন প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে আরবের নারী সমাজ যখন পুরুষকেন্দ্রিক ভয়াবহ আক্রমণের শিকার, তখন হযরত মোহাম্মদ (সা.) সর্বস্তরের নির্যাতিতের পক্ষে এক নতুন বিনির্মাণের দিকে নজর দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের চিন্তা যেখান থেকে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, ইতিহাসের নতুন নতুন বর্ণবাদ নিরূপণ এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাজ, চিন্তা ও চেতনা বিনির্মাণের কথা ছিলো ইতিহাসের ঠিক সেই বিন্দুতেই আটকে দেওয়া হলো আর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো আরও পেছনের দিকে।
ইতিহাসের পেছন দিকে যাবার সুবিধা হলো আমাদের পুরুষদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায়। আমরা আরও বেশি পুরুষ হয়ে উঠতে পারি এবং আমাদের দখলদারত্ব সহজেই কায়েম হয়।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে আপনি সমাজের বেশির ভাগ পুরুষের ‘ধর্ম ও নারী’ বিষয়ক মতামত জরিপ করলে দেখতে পারবেন আদতে তিনি ধর্ম বলতে বোঝেনই শুধু নারীর সমস্ত স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। তিনি মনে করেন, তার ধর্মবিশ্বাস, তার পূর্ণলাভ কিংবা ধর্মের যেটুকু পুরষ্কার সবটুকুই নির্ভর করছে নারীর উপর। এমনকি তিনি তার যতোরকম অন্যায়, অপরাধ, পাপাচার—সেসবের ক্ষেত্রেও তিনি প্রায় সম্পূর্ণরূপে নারীকে দায়ী করেন। এটা যেহেতু পুরুষদের মধ্যে খুব বেশি প্রচলিত ও জনপ্রিয় মত, আমাদের ধর্মীয় ওস্তাদেরাও নিজেও সেই পুরুষ হিসেবে পুরুষ সমাজের আকাঙ্ক্ষা মোতাবেক ধর্মীয় বয়ানগুলো তৈরি করেন। ফলে সর্বত্র নারী এমন এক বস্তু হিসেবে উপস্থিত আছে আমাদের পুরুষ সমাজে—আমরা স্বর্গীয় দূত এবং আমাদের স্বর্গচ্যুত হয়েছে এই নারীর অপকর্মে; আমাদের স্বর্গে ফেরত যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো নারীদের উপর্যুপরি শাসন, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। এমন মিথের উপর দাঁড়িয়ে পুরুষ সমাজের পক্ষে নারীকে সম্পূর্ণ মানুষরূপ ভাবতে পারাটা অসম্ভব।
এমন অবস্থায় নারী যখন পুরুষের এই ধারণা ইতিহাসের প্রতিটি মুহূর্তে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, ঠিক তখনই অসহায় হয়ে পরেছে পুরুষসমাজ। তারা না পেরেছে নিজের এই অসহায়ত্ব’কে স্বীকার করতে, না পেরেছে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে।
অধিকার প্রশ্নে নারীর বিদ্রোহের দিকগুলোর দিকে নজর দেন। সে তার সম্পূর্ণ মানুষরূপ প্রতিষ্ঠার জন্য কী কী কর্মযজ্ঞে নিজেকে মেলে ধরেছে? বা এই যুগে নারীবাদ, আসলে কী কী ধরনের সংকট ও প্রস্তাবনার দিকে নজর দিচ্ছে। তারা যে বিষয়গুলো নিয়ে পুরুষের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, তার মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জীবের জীবনের পূর্ণতা লাভ। আশরাফুল মাকলুকাত (মানুষ) তো দূরের কথা, জীব হিসেবেও সে অসম্পূর্ণ, অর্ধেক, না প্রাণ হিসেবে, নারীকে পূর্ণাঙ্গ জীবের হিস্যার জন্যেই আজ পর্যন্ত লড়াই করতে হচ্ছে। আর সেই হিস্যা এসে পড়েছে আমাদের দখলদারি চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাসের বিরুদ্ধে- ফলে নারীর যেকোন প্রস্তাবনাই আমাদের জন্য হুমকিস্বরূপ।
আমরা ভয় পাচ্ছি, নারী পুরুষের সমান মানুষ হয়ে উঠলে আমাদের কর্তৃত্ববাদী চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস ভেঙে পড়ার, সমাজের ওপর নিজেদের দখল হারাবার। কিন্তু আমরা খেয়াল করিনি, আমাদের এই গোড়া, অহংকারী মিথকে যুগের পর যুগ ভেঙ্গে ফেলেছে নারীরা। আজকের দুনিয়ার দিকে দেখেন, আপনি তাকে আর কোথায় আটকাবেন? শারীরিক শক্তিতে? সেটা আর সম্ভব নয়। নারী আপনার পুরুষগিরি শরীর ছাপিয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে সক্ষম তার অজস্র প্রমাণ রেখেছে। চিন্তায়? মেধায়? বুদ্ধিতে? শিক্ষাক্ষেত্রে তাকালেও দেখা যায় পুরুষের মিথ্যা অহংকারগুলো কি অসহায় হয়ে পড়েছে তাদের প্রজ্ঞার কাছে। এমনকি তার সততার কাছেও পুরুষের ঠুনকো অহংকার চুরমার হয়ে পরেছে ইতিহাসের কোনায় কোনায়।
যখন চারদিক থেকে নারী তার পূর্ণাঙ্গরূপ নিয়ে বর্তমান, ঠিক তখনই আমরা তাদের সামনে বাধা হিসেবে হাজির করতে চেয়েছি। খোদার কাছে সে কম মানুষ নয়, কিংবা তার জন্য আলাদা কিংবা কম রহমত দেন নাই। হকের প্রশ্নে তিনি এমন বৈষম্য রাখেন নাই, যেখানে নারী পুরুষের একবিন্দু কম। অথচ আমরা তার ধর্মকে তার মতো বুঝতেই দিতে চাইনি আর… কেননা, রাবেয়া আল বসরি (র.)-এর মতো নারী ঠিকই নিজের ধর্ম নিজে বুঝে নেন।
এখানে আমার প্রস্তাব হলো, পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপে নারীর বিকাশের ক্ষেত্রে নারীর যে সাধনা, তাকে তার সাধনার ন্যায্যতা প্রদান। তার শিক্ষাদীক্ষা, মেধা, মনন, ধর্ম, বিশ্বাস, চিন্তা, চেতনা এবং সাধনার পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাকে স্বীকার করে নেওয়া। কোন অজুহাতেই তার সাধনার পথে তাকে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার আর কারও থাকার কোনরূপ বৈধতা নাই দুনিয়ায়। সে যতো বড় আলেমই হোক না কেন কিংবা যতো বড় ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোন না কেন।
আপনি তার সঙ্গেই যুক্ত হবেন যে আপনার মতের সঙ্গে একমত পোষণ করে। অপরাপর জীব জীবনের ওপর ব্যক্তি পর্যায়ে কারও নিয়ন্ত্রণ থাকা অপরাধ হিসেবে গণ্য থাকতে হবে। এমনকি একজন পুরুষ রাষ্ট্রের কাছে যা যা সুবিধা পেয়ে থাকেন কিংবা যা যা একজন পুরুষের ক্ষেত্রে অপরাধ ও শাস্তি, তা অবশ্যই নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, নাগরিক মর্যাদাবোধ তৈরি হতে হবে সমাজে। নাগরিক হিসেবে মর্যাদা প্রদানই এসব সমস্যার অনেকাংশে সমাধান করতে পারে বলে আমার ধারণা। নারী ছাড়াও এমনকি যেকোন ক্ষেত্রেই নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে প্রকাশ্যে বা গোপনে কেউ কাউকে কমজাত কিংবা না মানুষ হিসেবে চার্জ করতে পারবে না। আর এই বিষয়ে রাষ্ট্রকে হয়ে উঠতে শক্তিশালী। ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী, পুরুষ, ধনী, গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যতক্ষণ না তার নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে ন্যায্যতা লাভ করছে–ততদিন পর্যন্ত এই এই ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। রাতের আঁধার তখনো পুরোপুরি কাটেনি। আমেরিকা আর ইসরাইলের যুদ্ধবিমান একসঙ্গে ঢুকে পড়ে ইরানের আকাশে। অপারেশন 'এপিক ফিউরি'। মিসাইল আর বোমার আঘাত হতে থাকে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে। বোমা পড়ে স্কুলে। নিহত হয় শত শত শিশু। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিও নিহত হন। পরদিন সকালে বিশ্বের মানুষ চোখ
২ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও শক্তিশালী সামরিক শক্তি। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কবে ঠিক হবে, তার জন্য বিশ্বের বাকি দেশগুলো অনন্তকাল অপেক্ষা করতে পারে না। এখন সময় বিকল্প চিন্তার। আগামীর জন্য এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ছাড়াও চলতে পারে।
৩ ঘণ্টা আগে
গত বছরের ২৮ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অভিযোগ— তাঁরা অনুষ্ঠানে দেশকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অস
১ দিন আগে
রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে আমরা এত বছর পার করলাম, তার ভিত্তি হওয়া উচিত ছিল সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা এবং তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারণ করা। কিন্তু আমরা সেসব না করে কেবল কথার ফুলঝুরি ছুটিয়েছি, যার পরিণতি ভবিষ্যতে আমরা আরও বেশি দেখতে পাব।
১ দিন আগে