জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধ

চব্বিশের বিপ্লব থেকে ছাব্বিশের ব্যালট: বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের কঠিন পরীক্ষা

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বিশ্বকে আশার আলো দেখালেও দেড় বছর পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ আজ গভীর সংকটে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন ও ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি টম ফেলিক্স জোয়েঙ্ক তাঁদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়লে গণতন্ত্রে ফেরা কতটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোট কি পারবে বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা দিতে?

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

দেড় বছর আগে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশ হয়তো বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের পিছু হটার যে ধারা চলছে, তাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত তরুণ প্রজন্ম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনকে উৎখাত করে। এর মাধ্যমে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনের শাসনের অবসান ঘটে। সেই মুহূর্তটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রকামী মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, জনগণ চাইলে স্বৈরাচারী শাসন উপড়ে ফেলে নতুন করে শুরুর পথ তৈরি করতে পারে।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষা। তবে গণতন্ত্রকে নতুন করে সাজানোর সেই উচ্চাশা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পরবর্তী সময়কালটি স্থিতিশীলতার বদলে সহিংসতা, আমলাতান্ত্রিক ও শিল্প ধর্মঘট, বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা একটি রূঢ় সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে, যার প্রভাব উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। সেটি হচ্ছে, যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর গণতন্ত্র নির্ভর করে, সেগুলো যদি একবার অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে, তবে গণতান্ত্রিক নবজাগরণ অত্যন্ত দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ এখন এই সংকটের একটি জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত।

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে। আদর্শিক ও নীতিগত পার্থক্য সামান্য থাকলেও, এই দুই নেত্রী এবং তাঁদের দল বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনে তিক্ত লড়াই চালিয়েছে। তা সত্ত্বেও, একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কারণে দেশে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চালু ছিল। কিন্তু ২০১১ সালে ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেন। এরপর থেকে নির্বাচনী অনিয়ম এবং অবৈধ নির্বাচনের এক দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়। স্বজনপ্রীতি ও লুটতরাজের অর্থনীতি আরও জেঁকে বসে এবং শেখ হাসিনার সরকার আদালত, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করতে শুরু করে।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর লাখ লাখ বাংলাদেশি আশা করেছিলেন, দেশে স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিতা ফিরে আসবে। ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন সেই আশাবাদকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু ড. ইউনূস একটি গভীরভাবে রাজনৈতিকীকরণ হওয়া এবং খণ্ডিত রাষ্ট্রকাঠামোয় শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন। ইউনূস সরকারের কোনো নির্দিষ্ট আইনি ম্যান্ডেট নেই এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত সমর্থন মিলছে না। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। শেখ হাসিনার পতনের পর প্রতিশোধের ভয়ে অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদত্যাগ করায় এসব প্রতিষ্ঠান আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মন্থর মজুরি প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের কাঁধে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামীকালের ভোটের গ্রহণযোগ্যতা ইতিমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নির্বাচনী সহিংসতা, ভোট কেনাবেচার অভিযোগ এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করার কারণে।

নির্বাচনে জয়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিএনপি, যার নেতৃত্বে আছেন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। উল্লেখ্য, খালেদা জিয়া গত ডিসেম্বরে মারা গেছেন। তবে ২০০৮ সালের পর দেশে কোনো সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন না হওয়ায় এবারের ভোটের ফলাফল অনুমান করা কঠিন। এক নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিরা এবার ভোট দিচ্ছেন। ভোটারদের ৪৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। জরিপ বলছে, তারা পুরনো দলীয় কোন্দলের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরপেক্ষ শাসনের মতো ব্যবহারিক বিষয়গুলো নিয়ে বেশি সোচ্চার।

ইসলামপন্থী শক্তিগুলো এই নির্বাচনে একটি ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ বা অপ্রত্যাশিত ফ্যাক্টর। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির প্রান্তিকে থাকা এই শক্তিগুলো বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম মূল ভিত্তি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৭ শতাংশ নতুন ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন। সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামো এবং প্রথাগত দুই দলের বিকল্প হিসেবে তারা জনসমর্থন পাচ্ছে। তবে ২০২৪ সালের পর থেকে আরও কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী নারীর শালীনতা রক্ষা আইন কার্যকর করা, ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং এমনকি খেলাফত প্রতিষ্ঠারও দাবি তুলছে।

বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে, যদিও এই সপ্তাহের নির্বাচনের জন্য তা কার্যকর হচ্ছে না। এছাড়া বৃহস্পতিবারের ব্যালটে একটি নতুন ‘জাতীয় সনদ’ বা জুলাই সনদের ওপর গণভোটও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে সাংবিধানিক রূপ দেবে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসান হয়। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসান হয়। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন হবে। বিএনপি এই সনদের কিছু মূল ধারার বিরোধিতা করছে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা এবং তদারকি সংস্থাগুলোকে অধিকতর স্বাধীনতা দেওয়ার বিষয়ে। আরও কিছু রাজনৈতিক দলও আপত্তি তুলেছে। গণভোটে এই সনদ অনুমোদিত হলেও তা কার্যকর করতে আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচনের ঝুঁকি অনেক বেশি। অতীতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কুফলগুলোকে কিছুটা সামাল দিয়ে আসছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যদিও স্থিতিশীলতার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তবে নতুন নেতাদের এক কঠিন বৈশ্বিক পরিবেশের মোকাবিলা করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনা সেখানে আশ্রয় নেওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার ও বিক্ষোভকারীরা ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে ভারত অভিযোগ করেছে, ইউনূস সরকার হিন্দুদের ওপর সহিংসতা রোধে ব্যর্থ হয়েছে। এই উত্তেজনা ইতিমধ্যে ভিসা স্থগিত এবং বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের এই অভ্যুত্থানের শিক্ষা কেবল এর সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০১০-এর দশকের আরব বসন্ত থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক শ্রীলঙ্কা, নেপাল বা দক্ষিণ আমেরিকার গণজাগরণ প্রমাণ করেছে, জনবিক্ষোভ রাজনৈতিক পথ উন্মুক্ত করতে পারলেও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে সেই অর্জনগুলো হারিয়ে যায় বা ভঙ্গুর থেকে যায়।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড আদালত, আইনি কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে দলীয় দ্বন্দ্বে টেনে নামিয়ে এবং নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে মার্কিন গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলোকে ক্রমাগত দুর্বল করার হুমকি দিচ্ছে।

স্বৈরশাসকদের উৎখাত করা সম্ভব। কিন্তু তারা যে ক্ষতি করে গেছেন, তা মেরামত করাই হয়তো গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ।

  • জাহিদ হোসেন: বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং টম ফেলিক্স জোয়েঙ্ক: রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ এবং ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি।
Ad 300x250

সম্পর্কিত