দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামীকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসন শেষে এই ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এই নির্বাচনকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রে উত্তরণের একটি সম্ভাব্য সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুটি প্রধান কারণে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এক. নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং দুই. তীব্র ‘তথ্যযুদ্ধ’। এরই মধ্যে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং পরিবর্তনশীল বিরোধী শিবির
এবারের নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো নতুন রাজনৈতিক জোটের উত্থান। এই জোট শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তারা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। অন্যদিকে, মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলে হয়তো তিনিই হবেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
নতুন সেই রাজনৈতিক জোট হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। এটি বাংলাদেশের বংশপরম্পরার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে বিরোধী শিবিরের একটি বড় পুনর্গঠন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপির সঙ্গে রক্ষণশীল জামায়াতে ইসলামীর এই জোট গঠন আদর্শিক মিলের চেয়ে কৌশলগত আপস হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে। ভারত ও আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচক এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যার পর এই দুই দল একত্রে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
হাদি হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের তদন্তকারীরা ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, যাদের অনেকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগসূত্র রয়েছে বলে জানা গেছে। হাদির সমর্থকরা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনলেও দিল্লি তা অস্বীকার করেছে। এনসিপি নেতাদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ড ‘আধিপত্যবাদী শক্তি’র পক্ষ থেকে আসা হুমকির বহিঃপ্রকাশ।
জামায়াতের বিতর্কিত অতীত এবং নারীদের নিয়ে তাদের অবস্থানের কারণে এনসিপির কিছু প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এই জোটের তীব্র বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেছেন। তবে এনসিপির অধিকাংশ নেতা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়াকে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁরা সংস্কারের এজেন্ডা থেকে বিচ্যুত হননি এবং এনসিপির আলাদা নির্বাচনী ইশতেহার গণতন্ত্র ও সমতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। যদিও জামায়াত একমাত্র দল যারা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে নারীর জোরালো বিরোধিতা করে, তবুও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোনো দলই ৫ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি।
ভারত বিরোধিতার অভিন্ন অবস্থান এই জোটকে আরও শক্তিশালী করেছে। দুই দলই ভারত থেকে হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা এবং হাদি হত্যার বিচার দাবি করছে। এর বিপরীতে, বিএনপির শীর্ষ নেতারা ‘ক্লিন ইমেজ’ বা স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ‘হতাশ’ আওয়ামী লীগ কর্মীদের দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই কৌশল কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। জনমত জরিপ বলছে, আওয়ামী লীগের প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোটার এখন বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন।
চ্যাথাম হাউসের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশটনির্বাচন-পূর্ব এক জরিপে দেখা গেছে, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, জামায়াত তার শৃঙ্খলা ও সততার ইমেজের কারণে তরুণ এবং শিক্ষিত ভোটারদের বেশি আকর্ষণ করছে। অন্যদিকে বিএনপি তার অতীত শাসনের অভিজ্ঞতার কারণে কর্মজীবী, কৃষক ও শ্রমিকদের সমর্থন পাচ্ছে। মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশই তরুণ (১৮-৩৭ বছর), যারা মূলত এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
তথ্যযুদ্ধ
এবারের নির্বাচন ব্যাপক ‘তথ্যযুদ্ধ’ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রচারণার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করছে। ভোটারদের প্রভাবিত করতে ‘বট’-চালিত কমেন্ট এবং ইমোজি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভুল তথ্য, অপতথ্য এবং এআই-চালিত ‘ডিপফেক’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের ধর্মীয় বক্তব্যের খণ্ডিত ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে ভোটারদের অনুভূতিকে উসকে দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে।
বিদেশি অপতথ্যের ঢেউও বাড়ছে। জানুয়ারিতে জাতিসংঘে সঙ্গে আলাপকালে ড. ইউনূস নির্বাচনের আগে বিদেশি অপতথ্যের ‘বন্যা’ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। ‘রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ’-এর দাবি অনুযায়ী, গত বছর ৭৩টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ সম্পর্কে ১৪০টি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবও সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে, ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ সম্পর্কে ‘উদ্বেগজনক মিথ্যা বয়ান’ ছড়াচ্ছে।
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড ‘এক্স’ (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে নারীবিদ্বেষী একটি পোস্ট ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তবে জামায়াতের দাবি, এটি একটি সমন্বিত সাইবার হামলার অংশ। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ইমেইল ব্যবহার করে পাঠানো ভারতীয় ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে শীর্ষ নেতাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির প্রতিক্রিয়ায় ইউনূস সরকার বৈদেশিক নীতি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য এনেছে। আঞ্চলিক গণমাধ্যমগুলো গুঞ্জন ছড়াচ্ছে যে, বাংলাদেশ হয়তো পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের সঙ্গে একটি উদীয়মান প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বে যোগ দিতে পারে। নতুন সরকার এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখবে কি না, তা দেখার বিষয়।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে এই নির্বাচনের প্রভাব অনেক দেশই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কূটনীতিকের ফাঁস হওয়া অডিও থেকে বোঝা যায় ওয়াশিংটন জামায়াতে ইসলামীর উত্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। অন্যদিকে, ভারত নির্বাচনের পর সম্পর্ক মেরামতের আশায় বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের এক রূপান্তরিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উন্মোচন করেছে। এটি বিশ্বের প্রথম ‘জেন-জি’ অনুপ্রাণিত নির্বাচন, যেখানে তরুণ ভোটারদের রায়ই হবে আগামীর বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা।
(চ্যাথাম হাউসের দাপ্তরিক নাম রয়্যাল ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স নামে পরিচিত। এটি লন্ডনভিত্তিক একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক। ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্ব নিয়ে গবেষণা ও নীতি নির্ধারণে কাজ করে)