জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই চরম অর্থ সংকটে পড়বে

লেখা:
লেখা:
এম এ রাজ্জাক

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩: ৩৬
ছবি: সংগৃহীত

১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। এটি কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বা ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। নতুন সরকার যখন দায়িত্ব নেবে, তখন তাদের সামনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এমন কিছু রূঢ় বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হবে, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সংকটপূর্ণ।

বিগত সরকারের সময়ে অর্থনীতিতে যেসব কাঠামোগত ত্রুটি-বিচ্যুতি দানা বেঁধেছিল—বিশেষ করে সরকারি খাত, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা বা নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে—তা সমাধানের দায়ভার অবধারিতভাবেই নতুন সরকারের কাঁধে বর্তাবে। এর সঙ্গে রয়েছে অসহনীয় মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস তুলেছে। পুরনো সমস্যাগুলোর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ইস্যু এবং এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে আগামী সরকারের জন্য একটি পুঞ্জীভূত চ্যালেঞ্জের পাহাড় অপেক্ষা করছে।

এমতাবস্থায়, নতুন সরকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ও চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করবে, তা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তিও হয়তো এই মুহূর্তে সরকারের অংশ হতে দ্বিধা করবেন। কারণ, সামনে যখন সমস্যার পাহাড় দেখা যায়, তখন দায়িত্ব নেওয়াটা কেবল ক্ষমতার উপভোগ থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় এক অগ্নিপরীক্ষা। কাজেই যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের অত্যন্ত সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা নিয়েই আসতে হবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় মাত্রার সংস্কার করতে না পারলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

নতুন সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো সময়ের স্বল্পতা। সরকার গঠনের পরপরই তাদের এলডিসি থেকে উত্তরণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা কি নির্ধারিত সময়েই গ্রাজুয়েশন করতে চায়, নাকি সময় বাড়াতে চায়? যদি সময় বাড়াতে চায়, তবে তার কৌশল ও প্রস্তুতি কী হবে? এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা, শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং রপ্তানি আয়ের ভবিষ্যৎ। কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা কালক্ষেপণ দেশের রপ্তানি খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই এটি হবে সরকারের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান ‘নীতি চ্যালেঞ্জ’।

দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট। বর্তমানে দেশ একটি স্থিতিশীলকরণ বা 'স্ট্যাবিলাইজেশন প্রোগ্রাম'-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা হলেও সফলতার হার খুবই সামান্য। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করছে, যা অর্থনীতির স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও সুখকর নয়।

এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিষয়টি। বর্তমানে রিজার্ভ ২৬-২৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি আমদানিনির্ভর এবং বড় অর্থনীতির দেশের জন্য এই পরিমাণ রিজার্ভ কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক নয়। এই রিজার্ভ নিয়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝাঁকুনির ঝুঁকি থেকে যায়। সুতরাং, রিজার্ভ বাড়ানো এবং ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা নতুন সরকারের জন্য হবে আশু করণীয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় যে বাধার সম্মুখীন হবে, তা হলো চরম আর্থিক সংকট। সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। রাজস্ব আদায়ের ধীরগতির বিপরীতে সরকারি ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তার মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার বিগত সময়ে ব্যাংক থেকে এবং বিদেশ থেকে প্রচুর ঋণ নিয়েছে। বর্তমানে দেশীয় ও বিদেশি ঋণের সুদের হার অত্যধিক বেড়ে গেছে। একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান হলো, সরকার বছরে মোট যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে, তার প্রায় ৩১ থেকে ৩২ শতাংশই চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধ করতে। আসলের কথা বাদই দিলাম, কেবল সুদ দিতেই রাজস্বের এক-তৃতীয়াংশ নাই হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর নতুন পে-স্কেল বা সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের চাপও রয়েছে। সব মিলিয়ে, উন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে খুব সামান্য অর্থই অবশিষ্ট থাকছে।

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নে বিদেশি অনুদান বা গ্রান্টস বড় ভূমিকা রাখত। কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন আর নেই। বর্তমানে মোট বাজেটের ০.৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে অনুদানের পরিমাণ। উন্নত দেশগুলো এখন আর আগের মতো সহজ শর্তে সাহায্য দিচ্ছে না। আমরা এখন যা পাই, তা মূলত ঋণ, যা সুদসহ ফেরত দিতে হয়।

নতুন সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো সময়ের স্বল্পতা। সরকার গঠনের পরপরই তাদের এলডিসি থেকে উত্তরণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা কি নির্ধারিত সময়েই গ্রাজুয়েশন করতে চায়, নাকি সময় বাড়াতে চায়? যদি সময় বাড়াতে চায়, তবে তার কৌশল ও প্রস্তুতি কী হবে?

কাজেই অর্থের সংকলন করতে হলে নতুন সরকারকে পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত ১৫-২০ বছর ধরে আলোচনার পরেও আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, বরং তা ৮ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য এই অনুপাত ন্যূনতম ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। সুতরাং, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা নতুন সরকারের জন্য কোনো বিকল্প নয়, বরং বাধ্যবাধকতা।

রাজস্ব বাড়াতে হলে সরকারকে কঠোর এবং কৌশলী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি: প্রথমত, ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি করতে হবে। ভ্যাট আদায়ে ব্যাপক লিকেজ বা চুরি হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে এই ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে হবে এবং ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে। দ্বিতীয় কাজ হবে আয়করের জাল বিস্তার করা। দেশে বর্তমানে অনেক নতুন নতুন ‘গ্রোথ সেন্টার’ বা অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, বিশেষ করে মফস্বল শহরগুলোতে। সেখানে অনেক বিত্তবান মানুষ রয়েছেন যারা করের আওতার বাইরে। তাদের করের আওতায় আনতে হবে। আয়কর আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি হলো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হবে। এর ফলে আমদানি শুল্ক থেকে আয় কমে যাবে। তাই আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ আয়কর ও ভ্যাটের ওপর জোর দিতে হবে, যা বিশ্বের সব আধুনিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

সরকারের অর্থের অপচয় রোধ করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে। বছরের পর বছর ধরে লোকসানে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানকে জনগণের করের টাকায় ভর্তুকি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এই ‘রক্তক্ষরণ’ বন্ধ করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে হয় লাভজনক ও দক্ষ করতে হবে, নতুবা কঠোর সংস্কারের মাধ্যমে লোকসানের বোঝা কমাতে হবে। এখান থেকে সাশ্রয়কৃত অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় করা সম্ভব।

পরিশেষে, নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য কোনো ফুলের বিছানা অপেক্ষা করছে না। বরং তাদের জন্য অপেক্ষা করছে অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার এক কঠিন সংগ্রাম। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানো, অপচয় রোধ করা, ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই তাদের সামনে এগোতে হবে।

ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য। এই সংকটময় মুহূর্তে প্রয়োজন অদম্য সাহস, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ। যদি নতুন সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলো সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারে, তবেই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে ফিরে আসবে। অন্যথায়, অর্থনীতি ও দেশ এক
গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হতে পারে।

  • এম এ রাজ্জাক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, র‌্যাপিড
Ad 300x250

সম্পর্কিত