leadT1ad

ঢাকা-৩: এলাকার ‘দাদা’ গয়েশ্বর, জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জামায়াত প্রার্থী

ঢাকা-৩ আসনের প্রার্থী গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং মো. শাহীনুর ইসলাম। স্ট্রিম গ্রাফিক

বুড়িগঙ্গার এক তীরে রাজধানীর জৌলুস থাকলেও অন্য তীরে রয়েছে অবহেলার এক ভিন্ন জগৎ। ভেঙে যাওয়া রাস্তা, ময়লার ভাগাড় আর দুর্গন্ধে নাক চেপে চলা সেখানে দৈনন্দিন বাস্তবতা। ঢাকা-৩ আসনের বাসিন্দাদের কাছে নাগরিক সুবিধা যেন এক দূরের স্বপ্ন। শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারও এখানে সহজলভ্য নয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কি পারবে তাঁদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে?

নির্বাচন এলে প্রতিশ্রুতির ডালি নিয়ে হাজির হন প্রার্থীরা। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। তাই ভোটাররা এবার পরিবর্তনের আশায় বুক বেঁধেছেন। কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, শুভাঢ্যা, আগানগর, তেঘরিয়া ও কোন্ডা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয়েছে ঢাকা-৩ আসন। সরেজমিনে এলাকাটি ঘুরে দেখা গেছে, সবখানে ময়লা পড়ে আছে। রাস্তাগুলোর বেহাল দশা; অনেক রাস্তা ভাঙা ও সরু। এসব সরু গলিতে বর্ষায় কাদা জমে আর শুকনো মৌসুমে ধুলা ওড়ে। নেই ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি হাসপাতাল। ফলে দিনের পর দিন মানবেতর জীবনযাপন করছেন বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরো এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। সেই সাথে আছে মাদকের ছড়াছড়ি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ নানা অপরাধী চক্রের তৎপরতা। জনসচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাবে এলাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে মুক্তি চান স্থানীয় বাসিন্দারা। ভোটাররা বলছেন, অতীতে অনেক নামী-দামি ব্যক্তি এই আসন থেকে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁদের আর এলাকায় পাওয়া যায়নি। সমস্যার কথা তাঁদের জানানো যায়নি এবং তাঁরা নিজেরাও উদ্যোগ নেননি।

শুভাঢ্যা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় নেতারা আসেন। ভোট চেয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। কিন্তু নির্বাচনের পর তাঁদের আর পাওয়া যায় না। তাই ঢাকার একেবারে কাছে থেকেও আমরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই এলাকায় গ্যাসের লাইন আছে। আমরা গ্যাস বিলও দিই, কিন্তু গ্যাস পাই না। ভালো কোনো হাসপাতাল নেই এবং ছেলেমেয়েদের পড়ার ভালো প্রতিষ্ঠান নেই। রাস্তাগুলো এতই সংকীর্ণ যে হাঁটা যায় না। আমরা এসব থেকে পরিত্রাণ চাই।’

মোহাম্মদ রকি নামে এক তরুণ বলেন, ‘শুভাঢ্যা এলাকায় একটা খাল আছে। এই খালে এত পরিমাণ ময়লা ফেলা হয়েছে যে খালটাই বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু এই খাল নয়, নদীর পাড় ও রাস্তাঘাটসহ পুরো এলাকা ময়লার ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। ময়লার কারণে হাঁটা যায় না এবং দুর্গন্ধে নাক চেপে রাখতে হয়।’

নির্বাচনী হালচাল
ঢাকা-৩ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭১ জন পুরুষ ও ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৪ জন নারী ভোটার। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৪ জন। এছাড়া পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন ২ হাজার ৫শ ৫৬ জন। এই আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১০ জন প্রার্থী। তবে আলোচিত ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দুইজনের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে একজন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং অন্যজন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১০-দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মো. শাহীনুর ইসলাম।

এই আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১০ জন প্রার্থী। তবে আলোচিত ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দুইজনের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে একজন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং অন্যজন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১০-দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মো. শাহীনুর ইসলাম।

নির্বাচন ঘিরে আসনটিতে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেলেও কেউ কেউ নীরবতা বেছে নিয়েছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, এলাকা জুড়ে প্রার্থীদের ব্যানার ও বিলবোর্ড সাঁটানো হয়েছে। প্রার্থীরা মিছিল-মিটিং করছেন এবং জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দোয়া নিচ্ছেন। তবে বিএনপির প্রচারণা ও ব্যানার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। বিএনপির পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্যানারও দেখা গেছে। অন্যান্য প্রার্থীদের প্রচারণা খুব একটা নজরে পড়েনি।

আগানগর ইউনিয়নের তেলঘাট এলাকায় নাসির হোসেনের সাথে কথা হয়। বুড়িগঙ্গার পাড়ে এক চা-দোকানে নির্বাচনী আলাপে মেতে আছেন তিনি। নাসির বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে আমরা আগ্রহী। গত ১৭ বছর ধরে আমরা কথা বলতে পারিনি এবং নিজেদের অধিকার পাইনি। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এই এলাকায় “দাদা” হিসেবে পরিচিত। তাঁর ব্যাপারে প্রচুর ইতিবাচক কথা শুনছি। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা বলা মুশকিল।’

এদিকে জামায়াত প্রার্থীসহ অনেক প্রার্থীকেই চেনেন না সাধারণ ভোটাররা। আল-আমিন নামে এক তরুণ ভোটার বলেন, ‘এবার প্রথম ভোট দেব। এর আগে ভোট দিইনি। যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাঁদের অনেককেই আমি চিনি না।’

যা বলছেন প্রার্থীরা
কেরানীগঞ্জ এলাকাটি এক সময় ‘বিএনপির ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এই এলাকা থেকে টানা চারবার এমপি হয়েছিলেন বিএনপি নেতা আমানুল্লাহ আমান। ২০০৮ সালে এলাকাটিকে দুটি আসনে ভাগ করে ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ করা হয়। এরপর বিএনপি মনোনীত কোনো প্রার্থী এই দুই আসন থেকে জয়ী হতে পারেননি। তবে আগামী নির্বাচনে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জয়ী হবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ শাখা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নিপুন রায় চৌধুরী।

নিপুন রায় চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে আমরা জনগণের কাছে যাচ্ছি। তাঁরা আমাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করছেন এবং আমাদের নিয়ে উচ্ছ্বসিত। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনগণ তাঁদের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়েছেন। আমরা এলাকা ঘুরে দেখছি। বিশেষ করে খাল সংস্কার, সুয়ারেজ লাইন স্থাপন ও গ্যাস সংকট নিরসনে আমরা কাজ করব। এছাড়া আধুনিক হাসপাতাল ও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’

অন্যদিকে বিজয় ছিনিয়ে নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহীনুর ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা জোরেশোরে প্রচার চালাচ্ছি এবং জনগণের সাথে মিশতে চেষ্টা করছি। আমি লক্ষ্য করেছি, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের গ্রহণ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যা চাঁদাবাজি ও মাদকের বিস্তার। এছাড়া রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি। বর্ষায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। জনগণের টাকা আত্মসাৎ করার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। আমরা নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।’

বিএনপি প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ মনে করছেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গয়েশ্বর সাহেব অভিজ্ঞ মানুষ এবং এই এলাকার সন্তান। তাঁকে আমরা সম্মান করি। তাঁকে আমি চ্যালেঞ্জ করব—এমনটি ভাবি না। বরং জনগণ পরিবর্তন চায়। আওয়ামী লীগের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়েছে। সেই হিসেবে মনে করি, আমরা পাস করব।’

প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন যাঁরা
ঢাকা-৩ আসন থেকে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি ও জামায়াত বাদে অন্য প্রার্থীরা হলেন—বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মজিবুর হাওলাদার, গণফোরামের মুহাম্মদ রওশন ইয়াজদানী, জাতীয় পার্টির (জাপা) মো. ফারুক, গণসংহতি আন্দোলনের মো. বাচ্চু ভুঁইয়া, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) মো. সাজ্জাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. সুলতান আহাম্মদ খাঁন, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মোহাম্মদ জাফর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মনির হোসেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত