leadT1ad

ইশতেহার: বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে চায় বিএনপি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতি সামনে রেখে ঘোষণা হয়েছে বিএনপির ইশতেহার। সংগৃহীত ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দলীয় ইশতেহারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের অন্যতম প্রধান পন্থা হিসেবে তুলে ধরে বিএনপি বলছে তারা সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আলোকে পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে চায় বিএনপি।

শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান ঘোষিত এই ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতি শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং অর্থনীতি, নিরাপত্তা, শ্রমবাজার, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও সফট পাওয়ারের সঙ্গে সমন্বিত একটি রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে স্থান পেয়েছে।

বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় দর্শন হিসেবে রয়েছে‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দলটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে বন্ধু থাকতে পারে, কিন্তু কোনো প্রভু থাকবে না। বিএনপি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মান হবে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি।

ইশতেহারে বিএনপি তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে মূলত তিনটি স্তম্ভে ভাগ করেছে—প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতি।

সীমান্ত নিরাপত্তা ও পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি

প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। তারা ইশতেহারে বলছে সম্মিলিত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতা সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে।

আন্তসীমান্ত নদী ও জলসম্পদ নিয়ে বিএনপি বলছে, পদ্মা, তিস্তা এবং বাংলাদেশের সকল আন্তসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধসহ সব অন্যায্য কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সীমান্তে চোরাচালান, মানব পাচার এবং মাদক পাচার কঠোরভাবে দমন করা হবে।

রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান করা বিএনপির অগ্রাধিকার হবে উল্লেখ করে ইশতেহারে বলা হয়েছে, দীর্ঘ আট বছর ধরে জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ব্যর্থ হওয়ায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি।

বিএনপি দুইবার (১৯৭৮ এবং ১৯৯২) রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সফল হয়েছে দাবী করে বলছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের পূর্ণ অধিকারসহ মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তারা। প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান গভীর সম্পর্ককে আরও সুসংহত ও কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছে। দলটির মতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

আসিয়ানের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন এবং দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল থাকা সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে চায় বিএনপি

আশিয়ানের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন এবং দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল থাকা সার্ককে পুনরুজ্জীবিত ও কার্যকর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। সার্ক ও আসিয়ান অঞ্চলের বাইরে আমেরিকা, ইউরোপ, প্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশসমূহ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক জোটের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণকেও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)-ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিএনপি বলছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বৃত্ত পুঁজি এবং বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংহতি অর্জন করা হবে। এই অংশীদারত্বের লক্ষ্য হবে পারস্পরিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামরিক শিল্প ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বৃদ্ধি।

ইশতেহারে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে অঞ্চলটির অন্যান্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়ন ও ‘পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট’ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিএনপি সফট পাওয়ার কূটনীতি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচির আওতায় শিক্ষক, গবেষক, লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বেসরকারি নীতি-নির্ধারক ও যুব রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটি কাঠামোবদ্ধ পুল গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সাংস্কৃতিক কূটনীতি সম্প্রসারণে বাংলাদেশের সংস্কৃতিমনা তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক পরিসরে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব সক্রিয় কর্মসূচির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দলটি।

অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করে বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে বিএনপি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দলটি বলছে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা, বৈশ্বিক ও উদীয়মান আঞ্চলিক জোটগুলোর সঙ্গে নতুন বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রেফারেনশিয়াল বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ইশতেহারে বিএনপি বলছে, গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক শক্তি ও প্রধান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারে নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হবে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা সংরক্ষণকে কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের শীর্ষে রাখা হয়েছে।

কৃষি ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা, মেরিটাইম সিকিউরিটি, ফ্রিডম অব নেভিগেশন এবং উপকূলীয় নিরাপত্তায় কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত