leadT1ad

জামায়াতের ইশতেহার

ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্ন থেকে সরে ‘মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার রূপরেখা

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩: ২৪
৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হোটেল শেরাটনে ইশতেহার ঘোষণা করছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সংগৃহীত ছবি

‘ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। নির্বাচনী ইশতেহার অন্তত এটিই বলছে। দলটি এখন ‘মানবিক ও নিরাপদ’ বাংলাদেশ গড়তে চায়। জামায়াতের ২০২৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনী দুই ইশতেহার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেড় যুগের ব্যবধানে দলটির ইশতেহারে ‘ইসলাম’ শব্দের ব্যবহার এবং ধর্মীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।

২০০৮ সালের ইশতেহারে সরাসরি ‘ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা, ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রে ইসলামী অনুশাসন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছিল স্পষ্ট। ছিল মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ‘বিশেষ’ সম্পর্ক স্থাপন ও বাণিজ্যে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়। ২০২৬ সালের ইশতেহারে ধর্মীয় পরিভাষার চেয়ে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মানবাধিকার, সুশাসন এবং ‘জুলাই বিপ্লবের’ আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

১৯৭৯ সালে ঢাকায় ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ গঠিত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় সাফল্য পায় দলটি। সেবার ১৮টি আসন জেতে তারা। তাদের সমর্থনেই সরকার গঠন করে বিএনপি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রিত্ব পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দুটি আসন পায় জামায়াত। এরপর আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া বিতর্কিত তিনটি সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিতে পারেনি দলটি।

এবার ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রধান দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে জামায়াত। তাদের প্রার্থী রয়েছে ২২০টি আসনে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দী হিসেবে ধরা হচ্ছে জামায়াতকে। গতকাল বুধবার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে দলটি।
জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী দলটির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো ‘বাংলাদেশে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন’। ২০০৮ সালে দেওয়া দলটির ইশতেহারের উপসংহারে নিজেদের উদারনৈতিক ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে উল্লেখ করেছিল জামায়াত। এবার অবশ্য এ বিষয়টি এড়িয়ে গেছে দলটি।

২০০৮ সালে দলটির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারের ভূমিকায় বলা হয়েছিল, দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী এবং কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী সব অপতৎপরতা প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা হবে। ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ধাপ হিসাবে এদেশের বিদ্যমান আইন-কানুন বিধি-বিধান সংস্কারের মাধ্যমে তা সময়োপযোগী করা এবং ব্যাপক প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।

দলটির এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব ধর্মীয় প্রতিশ্রুতির উল্লেখ নেই। ভূমিকায় এই ইশতেহারকে একটি আধুনিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করেছে দলটি। বলা হয়েছে, তরুণ সমাজকে সঙ্গে নিয়ে একটি নিরাপদ, মানবিক, ইনসাফভিত্তিক, সমৃদ্ধ, উন্নত ও শক্তিশালী বাংলাদেশের পথে যাত্রা শুরু করার এখনই সময়।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের ১৩ নম্বর পাতায় দলটি বলেছিল, ইসলামী আকিদা বিশ্বাস, হুকুম-আহকাম ও নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষার মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ইসলামী মৌলিক শিক্ষার ব্যবস্থা ও সালাত কায়েম করার যথাসাধ্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বই, পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ধর্মবিরোধী প্রচারণা ও কটূক্তিকারীদের প্রতিরোধ ও শরিয়াহের বিধানের জন্যে ব্লাসফেমি-জাতীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। এই বিষয়গুলো ২০২৬ সালের ইশতেহারে অনুপস্থিত।
২০২৬ সালের ইশতেহারের শিরোনাম ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার’। এখানে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ শব্দের পরিবর্তে ‘নিরাপদ’, ‘মানবিক’ এবং ‘বৈষম্যহীন’ শব্দগুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ব্লাসফেমি আইনের মতো ‘বিতর্কিত’ শব্দ ব্যবহার না করে বরং ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়া’ এবং ‘সকল ধর্মের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
২০০৮ সালের ইশতেহারে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রক্ষা করার কথা বলেছিল জামায়াত। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কন্নয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ-ও বলা হয়েছে, মুসলিম বিশ্বের সাথে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পর্ক বাড়ানো হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন যে দলটি তাদের কট্টর ধর্মীয় অবস্থান থেকে সরে এসে একটি সর্বজনীন ও ইনসাফভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা দিতে চাইছে, আপাতদৃষ্টিতে এমনটি মনে হলেও তাদের আদর্শিক অবস্থান বদলায়নি। জামায়াত সম্ভবত বুঝতে পেরেছে, কেবল ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে জেন-জি বা আধুনিক ভোটারদের আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, প্রতিটি দলই নির্বাচনে কৌশল অবলম্বন করে এবং সেটি করা হয় স্থান, কাল, পাত্রভেদে। জামায়াত মূলত একটি আদর্শবাদী দল। কমিউনিস্ট পার্টিগুলো যেমন কমিউনিজমের সরাসরি প্রচার করে লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না, জামায়াতের ক্ষেত্রেও তেমন।
আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ কিংবা আনোয়ার ইব্রাহিম যে কায়দায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, জামায়াতও এখানে তেমনটি করার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। ফলে ইশতেহার বা ওপর ওপর বক্তব্য-বিবৃতিতে পরিবর্তন এলেও জামায়াতের আদর্শিক জায়গায় পরিবর্তন আসেনি। এখন যেহেতু তারা এনসিপির মতো তরুণদের দলের সঙ্গে জোট করেছে, তাই তাদের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করছে। এটি তরুণদের ভোট টানারও কৌশল।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও জামায়াতের দুই ইশতেহারের মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যায়। ২০০৮ সালে মাদ্রাসা শিক্ষার স্বকীয়তা রক্ষা, ফাজিল-কামিল ডিগ্রির মান এবং মক্তব শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। ২০২৬ সালে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে ‘নৈতিক ও উন্নত জাতি’ গঠনের কথা বলা হলেও, সেখানে কারিগরি শিক্ষা, আইসিটি, এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী জনশক্তি তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি দুই ইশতেহারে থাকলেও, ২০২৬ সালে কওমি মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আধুনিক সিলেবাসের সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে গুরুত্বের সাথে। ২০০৮ সালে যেখানে ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, ২০২৬ সালে সেখানে ‘গবেষণা ও ইনোভেশন’ এবং ‘স্মার্ট সিটিজেন’ তৈরির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে।
অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও শব্দচয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০০৮ সালের ইশতেহারে বলা হয়েছিল, সুদের শোষণ থেকে জনগণকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের সুদের হার পর্যায়ক্রমে কমানোসহ আমানত ও ঋণের সুদের হারের মধ্যে ব্যবধান হ্রাস করা হবে। এ ছাড়া, কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী সকল অপতৎপরতা প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা হবে। এবার বাংলাদেশে সফল ইসলামী ব্যাংক ও বীমা খাতের বিকাশে সহায়তা করার কথা বলা হয়েছে।
২০২৬ সালে নারীদের জন্য আলাদা কর্মপরিবেশ, ডে-কেয়ার সেন্টার, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং ‘নিরাপদ নারী ও শিশু’ অধ্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। নারীদের মন্ত্রিত্ব দেওয়ার কথাও জানিয়েছে দলটি। ২০০৮ সালে এ বিষয়টির উল্লেখ ছিল না। এই নির্বাচনে দলটির সবচাইতে বেশি আলোচিত প্রসঙ্গ ছিল নারী নেতৃত্ব ও নারীদের কর্মক্ষেত্রে ভূমিকার প্রসঙ্গটি। এই প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির নারীদের কর্মসময় ৫ ঘণ্টা করা হবে বলে আলোচিত হয়েছিলেন। ইশতেহারের তৃতীয় ভাগের ১৮ নম্বভর অংশে অবশ্য কেবল মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়েরদের সম্মতি সাপেক্ষে কর্মসময় ৫ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় আছেন জানিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। দলটির সহকারী সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে কল ও বার্তা পাঠিয়েও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গতকাল ইশতেহার ঘোষণার সময় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের পর একটি পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা সামনে এগোচ্ছি। অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেছনে ফেলে মেধা, উদ্ভাবন ও আদর্শনির্ভর নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা হবে। আমি বলেছি নির্বাচনে আমি জামায়াতের বিজয় চাই না, আমি চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।‘
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘আমাদের দলের ইশতেহার তৈরিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মত দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকরা সহযোগিতা করেছেন। এ ইশতেহার জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব, শৃঙ্খলাবান্ধব।‘

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত