সালেহ ফুয়াদ

জামায়াত-এনসিপির ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে ঘোষণা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর নতুন লক্ষ্যের দিকে ছুটছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জোট ছাড়ার কারণে প্রচারের আলো থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও দলটি জাতীয় নির্বাচনে অন্তত দুই অঙ্কের (ডাবল ডিজিট) আসন নিশ্চিত করতে চায়। তাদের লক্ষ্য উচ্চকক্ষে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা। এর বাইরে দূরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে শরিয়াহ প্রশ্নে আপসহীন হিসেবে নিজেদের পরিচিত করে তুলতে চায় দলটি।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থীদের ভোট এক বাক্সে আনতে জামায়াতের সঙ্গে কয়েকটি কওমিধারার রাজনৈতিক দলকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হয় ইসলামী আন্দোলন। পরে আরও কয়েকটি দল তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সব দলকে নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য তৈরির এই চেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ইসলামী আন্দোলন। তবে আসন সমঝোতার ঘোষণার আগেই জামায়াতের সঙ্গে তাদের জটিলতা তৈরি হয়।
গত ১৬ জানুয়ারি ঘোষণা দিয়ে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যায় চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা, বিএনপিকে নিয়ে জামায়াতের জাতীয় সরকার গঠনের চেষ্টা এবং শরিয়াহ আইন না চাওয়ার মতো অভিযোগ তোলে দলটি। এ ছাড়া আস্থা-বিশ্বাসের অভাব আর আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতার অভিযোগও করা হয়। বেরিয়ে যাওয়ার পর ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান ওই দিন সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইসলামী আন্দোলন ২৬৮ আসনে এককভাবে নির্বাচন করবে। বাকি আসনে নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রয়েছে—এমন প্রার্থীদের তাঁরা সমর্থন দেবেন।
ঢাকায় একটিসহ টার্গেট সারা দেশে দুই অঙ্কের আসন
গত ৫ জানুয়ারি বরিশালে দলীয় জরিপের তথ্য তুলে ধরেন ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, ‘৩০০ আসনের মধ্যে ১৪৩ আসনে আমরা “এ” গ্রেডে আছি।’ ওই সময় দলটির এই নীতিনির্ধারক জানান, এই আসনগুলোর সবকটিতে জয় না হলেও ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। সিংহভাগ আসনে ভালো ফলাফলের বিষয়ে তিনি আশাবাদী ছিলেন।
তবে নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে দলটি ২৬ আসনে জয় ছিনিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো একটি আসনেও জয় না পাওয়া দলটির নেতারা দ্রুতই বুঝতে পারেন, ১৫টির বেশি আসনে তাঁদের জয়ের সম্ভাবনা নেই। নতুন করে ১৫ আসনে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে এখন তাঁরা দুই অঙ্কের ঘরে আসন পেতে লড়ছেন।
গত ১ ফেব্রুয়ারি দলটির একটি অভ্যন্তরীণ জরিপ করা হয়। সেখানে ৮ থেকে ৯টি আসনে জয়ের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে বলে দলের একজন শীর্ষ নেতার দাবি। এর মধ্যে রাজধানীতে সর্বোচ্চ একটি আসনে জয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকা-১১ আসনে সম্ভাবনা থাকলেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রার্থী হওয়ায় সেই আসনের আশা ছেড়ে দিয়েছে দলটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলনের এক শীর্ষ নেতা স্ট্রিমকে বলেন, ‘অন্তত ডাবল ডিজিটের আসন বের করে আনা আমাদের লক্ষ্য। এর বাইরে আমাদের বড় চেষ্টা হচ্ছে প্রার্থী দেওয়া সব আসনে একটি ভালো সংখ্যার ভোট পাওয়া। অন্য আসনগুলোতে জয় না পেলেও উচ্চকক্ষে যেন আমাদের একটি শক্ত অবস্থান থাকে, সেই চেষ্টা আমরা করছি।’
রাজধানীর ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও কদমতলীর কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ইসলামী আন্দোলন। এই আসনে দলটির মনোনীত প্রার্থী হাজী মো. ইবরাহীম। তিনি ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৭ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত হওয়ার পর পরপর দুবার নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর জয়ের ব্যাপারে ইসলামী আন্দোলন আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে আসনটিতে চরমোনাই পীর সমাবেশও করেছেন।
এর বাইরে কুড়িগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীর কয়েকটি আসনের পাশাপাশি বরিশালের দুটি আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ইসলামী আন্দোলন। সূত্র জানিয়েছে, বরিশাল-৪ এবং বরিশাল-৬ আসনে তারা জয় পেতে পারে। তবে বরিশাল-৫ আসনে জয় পাওয়া সম্ভব নয় বলে সূত্রটি জানায়। এই আসনটিতে বিএনপি অত্যন্ত শক্তিশালী। এ কারণে জামায়াত শায়খে চরমোনাই হিসেবে পরিচিত ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বলে ওই সূত্র জানায়। এ ছাড়া নীলফামারীর একটি আসন নিয়ে আগে আশাবাদী থাকলেও জরিপের পর সেই আশা ছেড়ে দিয়েছে দলটি।
শরিয়াহ ও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা না হওয়ায় বিরোধ
ইসলামী আন্দোলন অতীতে জোটের রাজনীতি এড়িয়ে একক নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়েছে। এ কারণে এবারও একক নির্বাচন করতে অসুবিধা নেই বলে মনে করেন দলটির নেতারা। তবে মাঝপথে সমঝোতা করতে গিয়ে পিছিয়ে আসায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
শরিয়াহ নিয়ে জামায়াতের অবস্থান পরিষ্কার না করা সমঝোতা না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। এর সঙ্গে আসন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারা এবং বিশ্বাসের অভাবকে দায়ী মনে করেন ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। এসব প্রসঙ্গ টেনেই তাঁরা জোট থেকে বেরিয়ে গেছেন। নির্বাচনের আগে নেতারা বলছেন, আদর্শগত বিরোধকে আবারও সামনে এনে ভবিষ্যৎ রাজনীতি চালিয়ে যাবেন তাঁরা।
ইতিমধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে শরিয়াহকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন। ইশতেহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় গেলে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার পরিপালন’ করা হবে। অন্যদিকে একই দিন গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ইশতেহার প্রকাশ করেছে জামায়াতও। তবে তাদের দীর্ঘ ইশতেহারে শরিয়াহ বা ইসলামি ব্যবস্থা কায়েমের ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়নি।
ইসলামী আন্দোলনের ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে দলটির আমির চরমোনাই পীর সরাসরি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে ইসলামী আন্দোলনকে শরিয়াহপন্থী ও জঙ্গি দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জামায়াত বলেছে, তারা ইসলামী আন্দোলনকে এই অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে।
এর কয়েক দিন আগে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহের মার্কিন দূতাবাসে ইসলামী আন্দোলনকে নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর ওই বক্তব্যের উল্লেখ করে চরমোনাই পীর বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, আমেরিকার সাথে তারা (জামায়াতে ইসলামী) বৈঠক করে আমাদের উগ্রবাদী হিসেবে উপস্থাপন করেছে।’
জানা গেছে, শরিয়াহ প্রশ্নের বাইরে আরও কিছু বিষয়ে একমত হতে না পারায় জামায়াতের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। এর মধ্যে কাঙ্ক্ষিত আসন না পাওয়া ছাড়াও অন্যতম কারণ ছিল উপজেলা নির্বাচন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারা। ইসলামী আন্দোলনের দাবি ছিল, সংসদ নির্বাচনে যে আসনগুলো তাদের দেওয়া হবে না, উপজেলা নির্বাচনে সেগুলো ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু জামায়াত এ ক্ষেত্রেও ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় জোট ভেঙে যায়।
জামায়াতের সঙ্গে চাঙা পুরোনো বিরোধ
জোট ছাড়ার পর থেকে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা প্রকাশ্যে জামায়াতবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। জামায়াত নেতারাও ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন। দেশের কয়েকটি জায়গায় দুই দলের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
খুলনা ও ভোলায় ইসলামী আন্দোলনের নারী কর্মীদের ওপর জামায়াতের কর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। বিবৃতি দিয়ে এসব ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন চরমোনাই পীরও। সভা-সমাবেশে পরস্পরের বিরুদ্ধে সমালোচনা এবং কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা দুটি দলের মুখোমুখি অবস্থানকে নির্দেশ করছে।
আবারও জামায়াতবিরোধী রাজনীতি
দলটির একজন নেতা বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই জামায়াতবিরোধী দল। এইবার সমঝোতার উদ্যোগের কারণে ব্যতিক্রম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। প্রকাশ্যে জামায়াতবিরোধী বক্তব্য না দেওয়ায় কর্মীরা ধরে নিয়েছিলেন ইসলামী আন্দোলন হয়তো আর কখনো জামায়াতের বিরোধিতা করবে না। এখন বিরোধ তৈরি হওয়ায় আবার পুরোনো সমালোচনা ফিরে এসেছে। এ কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে সামান্য দ্বিধা থাকলেও তা কেটে যাবে।’
১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে ‘উলামা ফ্রন্ট’ গঠিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামী যোগ দিতে চাইলেও আদর্শিক শর্তের কারণে তা সম্ভব হয়নি। হাফেজ্জী হুজুর জামায়াতকে তার প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীর কিছু মতবাদ সংশোধন করে পত্রিকায় বিবৃতি দিতে বলেন। জামায়াত তা প্রত্যাখ্যান করে। হাফেজ্জী হুজুরের মৃত্যুর পর তাঁর ভক্ত-শাগরেদদের হাত ধরে দেশে কওমি ধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দল তৈরি হয়। এর অন্যতম হলো চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
এর পর থেকে বেশিরভাগ সময় ইসলামী আন্দোলন জোট এড়িয়ে রাজনীতি করেছে। তবে এরশাদের পতনের পর ইসলামী ঐক্যজোটে তারা ছিল, যেখানে জামায়াতে ইসলামী ছিল না। ১৯৯১ সালে তারা ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচন করে। ১৯৯৬ সালে এককভাবে ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির সাথে ‘ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ গঠন করে অষ্টম নির্বাচনে অংশ নেয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে এককভাবে ১৬৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৯টি ভোট পায় দলটি। ২০১৪ সালের নির্বাচন তারা বর্জন করে। একাদশ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে তারা মোট ভোটের ১.৫ শতাংশ পায়। গত দুই দশকে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় নির্বাচনে সাফল্য পেয়ে দলটি আলোচনায় আসে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে সমঝোতার উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর তারা আবারও ‘একলা চলো’ নীতিতে ফিরে গেছে।
যোগাযোগ করা হলে ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন স্ট্রিমকে বলেন, ‘শরিয়াহ প্রশ্নে কোনো ছাড় দেব না আমরা। অতীতে ইসলামের জন্য আমরা জোট করেছি। এবারও উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু জামায়াত শরিয়াহ প্রশ্নে ছাড় দিলেও আমরা দেব না।’ তিনি জানান, নির্বাচনে এককভাবেই তাঁরা লড়াই করবেন। জরিপের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জামায়াত-এনসিপির ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে ঘোষণা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর নতুন লক্ষ্যের দিকে ছুটছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জোট ছাড়ার কারণে প্রচারের আলো থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও দলটি জাতীয় নির্বাচনে অন্তত দুই অঙ্কের (ডাবল ডিজিট) আসন নিশ্চিত করতে চায়। তাদের লক্ষ্য উচ্চকক্ষে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা। এর বাইরে দূরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে শরিয়াহ প্রশ্নে আপসহীন হিসেবে নিজেদের পরিচিত করে তুলতে চায় দলটি।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থীদের ভোট এক বাক্সে আনতে জামায়াতের সঙ্গে কয়েকটি কওমিধারার রাজনৈতিক দলকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হয় ইসলামী আন্দোলন। পরে আরও কয়েকটি দল তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সব দলকে নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য তৈরির এই চেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ইসলামী আন্দোলন। তবে আসন সমঝোতার ঘোষণার আগেই জামায়াতের সঙ্গে তাদের জটিলতা তৈরি হয়।
গত ১৬ জানুয়ারি ঘোষণা দিয়ে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যায় চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা, বিএনপিকে নিয়ে জামায়াতের জাতীয় সরকার গঠনের চেষ্টা এবং শরিয়াহ আইন না চাওয়ার মতো অভিযোগ তোলে দলটি। এ ছাড়া আস্থা-বিশ্বাসের অভাব আর আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতার অভিযোগও করা হয়। বেরিয়ে যাওয়ার পর ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান ওই দিন সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইসলামী আন্দোলন ২৬৮ আসনে এককভাবে নির্বাচন করবে। বাকি আসনে নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রয়েছে—এমন প্রার্থীদের তাঁরা সমর্থন দেবেন।
ঢাকায় একটিসহ টার্গেট সারা দেশে দুই অঙ্কের আসন
গত ৫ জানুয়ারি বরিশালে দলীয় জরিপের তথ্য তুলে ধরেন ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, ‘৩০০ আসনের মধ্যে ১৪৩ আসনে আমরা “এ” গ্রেডে আছি।’ ওই সময় দলটির এই নীতিনির্ধারক জানান, এই আসনগুলোর সবকটিতে জয় না হলেও ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। সিংহভাগ আসনে ভালো ফলাফলের বিষয়ে তিনি আশাবাদী ছিলেন।
তবে নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে দলটি ২৬ আসনে জয় ছিনিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো একটি আসনেও জয় না পাওয়া দলটির নেতারা দ্রুতই বুঝতে পারেন, ১৫টির বেশি আসনে তাঁদের জয়ের সম্ভাবনা নেই। নতুন করে ১৫ আসনে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে এখন তাঁরা দুই অঙ্কের ঘরে আসন পেতে লড়ছেন।
গত ১ ফেব্রুয়ারি দলটির একটি অভ্যন্তরীণ জরিপ করা হয়। সেখানে ৮ থেকে ৯টি আসনে জয়ের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে বলে দলের একজন শীর্ষ নেতার দাবি। এর মধ্যে রাজধানীতে সর্বোচ্চ একটি আসনে জয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকা-১১ আসনে সম্ভাবনা থাকলেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রার্থী হওয়ায় সেই আসনের আশা ছেড়ে দিয়েছে দলটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলনের এক শীর্ষ নেতা স্ট্রিমকে বলেন, ‘অন্তত ডাবল ডিজিটের আসন বের করে আনা আমাদের লক্ষ্য। এর বাইরে আমাদের বড় চেষ্টা হচ্ছে প্রার্থী দেওয়া সব আসনে একটি ভালো সংখ্যার ভোট পাওয়া। অন্য আসনগুলোতে জয় না পেলেও উচ্চকক্ষে যেন আমাদের একটি শক্ত অবস্থান থাকে, সেই চেষ্টা আমরা করছি।’
রাজধানীর ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও কদমতলীর কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ইসলামী আন্দোলন। এই আসনে দলটির মনোনীত প্রার্থী হাজী মো. ইবরাহীম। তিনি ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৭ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত হওয়ার পর পরপর দুবার নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর জয়ের ব্যাপারে ইসলামী আন্দোলন আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে আসনটিতে চরমোনাই পীর সমাবেশও করেছেন।
এর বাইরে কুড়িগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীর কয়েকটি আসনের পাশাপাশি বরিশালের দুটি আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ইসলামী আন্দোলন। সূত্র জানিয়েছে, বরিশাল-৪ এবং বরিশাল-৬ আসনে তারা জয় পেতে পারে। তবে বরিশাল-৫ আসনে জয় পাওয়া সম্ভব নয় বলে সূত্রটি জানায়। এই আসনটিতে বিএনপি অত্যন্ত শক্তিশালী। এ কারণে জামায়াত শায়খে চরমোনাই হিসেবে পরিচিত ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বলে ওই সূত্র জানায়। এ ছাড়া নীলফামারীর একটি আসন নিয়ে আগে আশাবাদী থাকলেও জরিপের পর সেই আশা ছেড়ে দিয়েছে দলটি।
শরিয়াহ ও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা না হওয়ায় বিরোধ
ইসলামী আন্দোলন অতীতে জোটের রাজনীতি এড়িয়ে একক নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়েছে। এ কারণে এবারও একক নির্বাচন করতে অসুবিধা নেই বলে মনে করেন দলটির নেতারা। তবে মাঝপথে সমঝোতা করতে গিয়ে পিছিয়ে আসায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
শরিয়াহ নিয়ে জামায়াতের অবস্থান পরিষ্কার না করা সমঝোতা না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। এর সঙ্গে আসন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারা এবং বিশ্বাসের অভাবকে দায়ী মনে করেন ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। এসব প্রসঙ্গ টেনেই তাঁরা জোট থেকে বেরিয়ে গেছেন। নির্বাচনের আগে নেতারা বলছেন, আদর্শগত বিরোধকে আবারও সামনে এনে ভবিষ্যৎ রাজনীতি চালিয়ে যাবেন তাঁরা।
ইতিমধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে শরিয়াহকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন। ইশতেহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় গেলে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার পরিপালন’ করা হবে। অন্যদিকে একই দিন গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ইশতেহার প্রকাশ করেছে জামায়াতও। তবে তাদের দীর্ঘ ইশতেহারে শরিয়াহ বা ইসলামি ব্যবস্থা কায়েমের ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়নি।
ইসলামী আন্দোলনের ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে দলটির আমির চরমোনাই পীর সরাসরি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে ইসলামী আন্দোলনকে শরিয়াহপন্থী ও জঙ্গি দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জামায়াত বলেছে, তারা ইসলামী আন্দোলনকে এই অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে।
এর কয়েক দিন আগে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহের মার্কিন দূতাবাসে ইসলামী আন্দোলনকে নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর ওই বক্তব্যের উল্লেখ করে চরমোনাই পীর বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, আমেরিকার সাথে তারা (জামায়াতে ইসলামী) বৈঠক করে আমাদের উগ্রবাদী হিসেবে উপস্থাপন করেছে।’
জানা গেছে, শরিয়াহ প্রশ্নের বাইরে আরও কিছু বিষয়ে একমত হতে না পারায় জামায়াতের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। এর মধ্যে কাঙ্ক্ষিত আসন না পাওয়া ছাড়াও অন্যতম কারণ ছিল উপজেলা নির্বাচন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারা। ইসলামী আন্দোলনের দাবি ছিল, সংসদ নির্বাচনে যে আসনগুলো তাদের দেওয়া হবে না, উপজেলা নির্বাচনে সেগুলো ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু জামায়াত এ ক্ষেত্রেও ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় জোট ভেঙে যায়।
জামায়াতের সঙ্গে চাঙা পুরোনো বিরোধ
জোট ছাড়ার পর থেকে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা প্রকাশ্যে জামায়াতবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। জামায়াত নেতারাও ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন। দেশের কয়েকটি জায়গায় দুই দলের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
খুলনা ও ভোলায় ইসলামী আন্দোলনের নারী কর্মীদের ওপর জামায়াতের কর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। বিবৃতি দিয়ে এসব ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন চরমোনাই পীরও। সভা-সমাবেশে পরস্পরের বিরুদ্ধে সমালোচনা এবং কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা দুটি দলের মুখোমুখি অবস্থানকে নির্দেশ করছে।
আবারও জামায়াতবিরোধী রাজনীতি
দলটির একজন নেতা বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই জামায়াতবিরোধী দল। এইবার সমঝোতার উদ্যোগের কারণে ব্যতিক্রম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। প্রকাশ্যে জামায়াতবিরোধী বক্তব্য না দেওয়ায় কর্মীরা ধরে নিয়েছিলেন ইসলামী আন্দোলন হয়তো আর কখনো জামায়াতের বিরোধিতা করবে না। এখন বিরোধ তৈরি হওয়ায় আবার পুরোনো সমালোচনা ফিরে এসেছে। এ কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে সামান্য দ্বিধা থাকলেও তা কেটে যাবে।’
১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে ‘উলামা ফ্রন্ট’ গঠিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামী যোগ দিতে চাইলেও আদর্শিক শর্তের কারণে তা সম্ভব হয়নি। হাফেজ্জী হুজুর জামায়াতকে তার প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীর কিছু মতবাদ সংশোধন করে পত্রিকায় বিবৃতি দিতে বলেন। জামায়াত তা প্রত্যাখ্যান করে। হাফেজ্জী হুজুরের মৃত্যুর পর তাঁর ভক্ত-শাগরেদদের হাত ধরে দেশে কওমি ধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দল তৈরি হয়। এর অন্যতম হলো চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
এর পর থেকে বেশিরভাগ সময় ইসলামী আন্দোলন জোট এড়িয়ে রাজনীতি করেছে। তবে এরশাদের পতনের পর ইসলামী ঐক্যজোটে তারা ছিল, যেখানে জামায়াতে ইসলামী ছিল না। ১৯৯১ সালে তারা ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচন করে। ১৯৯৬ সালে এককভাবে ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির সাথে ‘ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ গঠন করে অষ্টম নির্বাচনে অংশ নেয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে এককভাবে ১৬৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৯টি ভোট পায় দলটি। ২০১৪ সালের নির্বাচন তারা বর্জন করে। একাদশ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে তারা মোট ভোটের ১.৫ শতাংশ পায়। গত দুই দশকে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় নির্বাচনে সাফল্য পেয়ে দলটি আলোচনায় আসে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে সমঝোতার উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর তারা আবারও ‘একলা চলো’ নীতিতে ফিরে গেছে।
যোগাযোগ করা হলে ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন স্ট্রিমকে বলেন, ‘শরিয়াহ প্রশ্নে কোনো ছাড় দেব না আমরা। অতীতে ইসলামের জন্য আমরা জোট করেছি। এবারও উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু জামায়াত শরিয়াহ প্রশ্নে ছাড় দিলেও আমরা দেব না।’ তিনি জানান, নির্বাচনে এককভাবেই তাঁরা লড়াই করবেন। জরিপের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

‘ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। নির্বাচনী ইশতেহার অন্তত এটিই বলছে। দলটি এখন ‘মানবিক ও নিরাপদ’ বাংলাদেশ গড়তে চায়।
১৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশকে নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বপ্ন, তারেক রহমানের ৩১ দফা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থাণের মূলমন্ত্রকে ধারণ করে ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
১৪ ঘণ্টা আগে
আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনকে প্রাণিবান্ধব মডেল এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নিরাপদ আবাসনস্থল হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
১৫ ঘণ্টা আগে
রাজনীতি কি আর গ্ল্যামারের ওপর ভরসা করছে না—এই প্রশ্ন দিয়েই আলোচনার সূচনা। একসময় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনের তারকাদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ সরাসরি সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, কেউ দলীয় প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
১৫ ঘণ্টা আগে