আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঝিনাইদহে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। অলিগলি থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। তবে এবার ভোটারদের চাওয়া শুধু রাস্তাঘাট বা কালভার্ট নয়; ঝিনাইদহবাসীর দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিন দাবি—রেললাইন সংযোগ, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ এবং একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। বছরের পর বছর ধরে চলা আন্দোলনের পর নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থীরাও এই তিন মেগা প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন।
সাধারণ ভোটারদের মতে, প্রতিশ্রুতি অনেকবার পাওয়া গেছে, এবার তারা চান সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন। শহরের কলেজ শিক্ষক হুমায়ুন রেজা বলেন, ‘আমরা আর আশ্বাসের বাণী শুনতে চাই না। যিনি সংসদে এই প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান করতে পারবেন, ভোট তাকেই দেব।’ আরাপপুর এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল হোসেনের বলেন, ‘ভোট এলেই প্রার্থীরা রেললাইন-মেডেকেলের স্বপ্ন দেখান কিন্তু পরে সব ভুলে যান। আমরা এবার ফাঁপা প্রতিশ্রুতিতে ভুলবেন না।’
তরুণ ভোটারদের বিশেষ ঝোঁক উচ্চশিক্ষার দিকে। ঝিনাইদহ সরকারি কেশবচন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী জাহিদুজ্জামান জাহিদ বলেন, ‘একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরি। অতীতে যারা এমপি হয়েছেন তারা কেউই সংসদে আমাদের প্রাণের দাবি তুলে ধরেননি।’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী মাসুম শাহরিয়ার জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের কারণে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ শহরে থাকা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য শাটল ট্রেন সার্ভিস চালু করা এখন সময়ের দাবি।
ঝিনাইদহ উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দাবি খুবই পুরনো। আমরা এমন একজন সংসদ সদস্য চাই যিনি সংসদে আমাদের দাবি নিয়ে কথা বলবেন। যার হাতে সম্পদ তছরুপ হবে না এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না।’ অন্যদিকে, জেলা সুজন-এর ব্যক্তিত্ব সুজন বিপ্লব মনে করেন, বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা এবার এই বড় তিন দাবি মাথায় রেখেই সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন।
ঝিনাইদহ-২ আসনে এবার ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে প্রথম সংসদ অধিবেশনেই রেললাইন সংযোগ ও মেডিকেল কলেজের প্রস্তাব উত্থাপন করব। ঝিনাইদহকে আর অবহেলিত থাকতে দেব না। আমাদের সরকার ক্ষমতায় গেলে ঝিনাইদহকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আলী আজম মোহাম্মদ আবু বকর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও রেললাইন স্থাপন ছাড়া এই জেলার অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। আমরা চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে ঝিনাইদহ হয়ে মাগুরা পর্যন্ত রেললাইনের টেকনিক্যাল ম্যাপ পুনরুজ্জীবিত করব। মাত্র এক বছরের মধ্যে মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। লক্ষ্য—ঝিনাইদহকে এডুকেশন ও হেলথ হাব হিসেবে গড়ে তোলা।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী এইচএম মোমতাজুর রহমান বলেন, ‘উন্নয়ন মানে মানুষের ভোগান্তি কমানো। আমরা ক্ষমতায় গেলে ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে মেডিকেল কলেজ ও রেল সংযোগ দেব। সঠিক পরিকল্পনায় ঝিনাইদহকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের অঙ্গীকার।’
সিপিবির প্রার্থী আবু তোয়াব অপু বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে ঝিনাইদহে ইলা মিত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাঘা যতীন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করব। রেললাইনের ক্ষেত্রে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য কার্গো ট্রেন সুবিধার কথা ভাবা হবে। এছাড়া কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, নদী সংস্কার এবং পান ও কলার রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করব।’
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ঝিনাইদহবাসীর দীর্ঘদিনের এই তিন প্রাণের দাবি ততই জোরালো হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থীর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় ভোটাররা আস্থা রাখেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।