আল-জাজিরা এক্সপ্লেইনার
আল জাজিরা

সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া পাইপলাইনে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল ছুটে চলার একটানা শব্দ যেন খার্গ দ্বীপের শ্বাসপ্রশ্বাস।
এখানেই একদিন দাঁড়িয়েছিলেন বিখ্যাত ইরানি লেখক জালাল আল-ই-আহমদ। জনবিচ্ছিন্ন এই তীরের দিকে তাকিয়ে তিনি দ্বীপটির নাম দিয়েছিলেন ‘পারস্য উপসাগরের এতিম মুক্তা’ বা অরফ্যান পার্ল।
বর্তমানে বুশেহর প্রদেশের ২২ বর্গকিলোমিটারের এই প্রবাল দ্বীপ ইরানিদের কাছে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ বা ফরবিডেন আইল্যান্ড নামে পরিচিত। গোপনীয়তায় মোড়া এই দ্বীপ পাহারা দেয় ইরানের এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। এই দ্বীপে কেবল বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়া নির্দিষ্ট কিছু মানুষেরই প্রবেশের অনুমতি রয়েছে।
তবে, বিশাল ইস্পাতের বেড়া আর সামরিক ওয়াচটাওয়ারের ওপারে লুকিয়ে আছে অকৃত্রিম ল্যান্ডস্কেপ। যেখানে ইরানের আধুনিক জ্বালানি সাম্রাজ্যের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের সঙ্গেই নীরবে সহাবস্থান করছে হাজার বছরের বৈচিত্র্যময় মানব ইতিহাস।
গত শনিবারের (১৪ মার্চ) প্রথম প্রহরে এই খার্গ দ্বীপই হয়ে ওঠে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার কেন্দ্রবিন্দু বা এপিসেন্টার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ইরানের এই দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেছে।
ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘সৌজন্যের খাতিরে আমি দ্বীপের তেল অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে আমি তাৎক্ষণিকভাবে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।’
তেল সাম্রাজ্যের স্নায়ুকেন্দ্র
বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ১৫ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২৮ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ অবিসংবাদিতভাবেই ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশটির মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৯৫ কোটি (৯৫০ মিলিয়ন) ব্যারেল।
দৈর্ঘ্যে মাত্র ৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থে ৪-৫ কিলোমিটার হলেও এর চারপাশের গভীর জলরাশি একে এক দারুণ ভৌগোলিক সুবিধা দিয়েছে। এই গভীরতার কারণেই বিশাল সব সুপারট্যাঙ্কার নিরাপদে এখানে নোঙর করতে পারে। এখান থেকে অপরিশোধিত তেল মূলত এশিয়ার বাজারে যায়, যার সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হলো চীন।
ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মতে, দ্বীপের এই স্থাপনাগুলো জ্বালানি খাতের ‘স্নায়ুকেন্দ্র’ বা নার্ভ সেন্টার হিসেবে কাজ করে। এই টার্মিনাল মূলত তিনটি বড় অফশোর ফিল্ড আবুজার, ফোরোজান এবং দোরুদ থেকে অপরিশোধিত তেল গ্রহণ করে। এরপর সাবসি বা সমুদ্রতলদেশের পাইপলাইনের এক জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা অনশোর বা ডাঙার প্রসেসিং প্ল্যান্টে যায়। সেখান থেকে বিশ্ববাজারে পাঠানোর আগে এটি মজুত করা হয়।
বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে উৎপাদন ব্যাহত হলেও, ইরান এই দ্বীপের অবকাঠামো সম্প্রসারিত করেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে তেহরান টার্মিনালের ২৫ ও ২৬ নম্বর ট্যাংক সংস্কার করে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বা মজুত সক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়িয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে, ক্রমাগত আপগ্রেড বা উন্নত হওয়া এই টার্মিনালগুলোর লোডিং ক্যাপাসিটি বা তেল ভরার সক্ষমতা দিনে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। তবে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জাতীয় রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দিনে প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল।
সাম্রাজ্যবাদ আর নির্বাসনের ইতিহাস
হাইড্রোকার্বন বা জ্বালানি তেল আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই খার্গ দ্বীপের কৌশলগত সামুদ্রিক গুরুত্ব একে লোভনীয় বস্তুতে পরিণত করেছিল। অনেকেই ভুল করে ‘খার্গ’ নামকে আলেকজান্ডারের প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন শহর ‘কারাক্স স্পাসিনো’-এর সঙ্গে মেলাতে চান। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড নিশ্চিত করে যে এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় উপভাষা এবং ইউরোপীয় মানচিত্রে দ্বীপটির নাম খার্গ, খার্ক, খারাজ এবং খারেজ হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। এর প্রাকৃতিক মিঠাপানির ঝরনা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি কৃষিপণ্য ও খনিজ রপ্তানির সামুদ্রিক ক্রসরোড বা সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছিল।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দ্বীপের সঙ্গে পর্তুগিজরা খার্গও দখল করে। এরপর আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এখানে ডাচ বা ওলন্দাজদের ক্ষমতার ডালপালা মেলে। ১৭৫২ সালে ডাচ ব্যারন নিপহাউসেন একটি ট্রেডিং পোস্ট বা বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের জন্য বন্দর রিগের শাসক মীর নাসের আল-জাবির সঙ্গে চুক্তি করেন। পরের বছর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একটি সুসজ্জিত দুর্গ নির্মাণ করে।
তবে এই ঔপনিবেশিক আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। উত্তেজনার পারদ চড়তে চড়তে একসময় বন্দর রিগের তৎকালীন গভর্নর মীর মুহান্না সফলভাবে দুর্গটিতে আক্রমণ চালান এবং ১৭৬৬ সালের জানুয়ারিতে ডাচ বাহিনীকে চিরতরে বিতাড়িত করেন।
বিংশ শতাব্দীতে দ্বীপটির ইতিহাস এক অন্ধকার মোড় নেয়। ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের ক্ষমতায় থাকা রেজা শাহ পাহলভি এই দ্বীপটিকে রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য দুর্গম নির্বাসনকেন্দ্রে বা পিনাল কলোনিতে পরিণত করেছিলেন। ফলে এর বৃহত্তর সম্ভাবনা পুরোপুরি অব্যবহৃত থেকে যায়।
এরপর ১৯৫৮ সালের পর আধুনিক পেট্রোলিয়াম যুগের সূচনা হলে খার্গ তার অন্ধকার অতীত মুছে ফেলে এবং বিশাল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৬০ সালের আগস্টে এর নতুন ডিপ-ওয়াটার টার্মিনাল থেকে প্রথম বড় তেলের চালান পাঠানো হয়। ষাটের দশকে যখন একের পর এক অফশোর তেলের খনি আবিষ্কৃত হতে থাকে, তখন খার্গ ইরানের আরেক বন্দর আবাদানকেও ছাড়িয়ে যায় এবং এর গভীর জলের নোঙরে ভিড়তে থাকে বিশাল বিশাল সব সুপারট্যাঙ্কার।
বৈচিত্র্যময় অতীতের প্রতিধ্বনি
দ্বীপটির আধুনিক শিল্প কাঠামোর আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। এখানে মানববসতির প্রমাণ খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষের দিকের—যা এলামাইট, হাখমানেশি (অ্যাকিমেনিড) এবং সাসানীয় যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এখানকার সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মীর মোহাম্মদ মাজার। হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে (১৩ শতকের শেষ ভাগে) পাথর এবং কাদা দিয়ে তৈরি দুটি শঙ্কু আকৃতির গম্বুজ রয়েছে এই মাজারে।
পাশেই রয়েছে মীর আরাম মাজার, যেখানে একটি ১২ মিটার (৩৯ ফুট) লম্বা পাথর আছে। পাথরটিতে ইসলামি শিলালিপি খোদাই করা এবং দুটি মশাল রয়েছে যা হাখমানেশি যুগের বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয়রা এই স্থানটিকে পবিত্র কোরআন এবং বাইবেলে উল্লিখিত নবী নূহের বংশধর মীর আরামের সঙ্গে যুক্ত করেন।
এই দ্বীপ মূলত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের এক জীবন্ত প্রমাণ। এখানকার একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গোরস্তানে বিভিন্ন ধর্মের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন দেখা যায়। সেখানে জরাথুস্ট্রবাদী (জোরোস্ট্রিয়ান) সমাধিক্ষেত্র, খ্রিষ্টানদের কবর এবং সাসানীয় যুগের সমাধি পাশাপাশি অবস্থান করছে।
দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ১৭৪৭ সালের ডাচ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, ডাচ বাগান, খার্গ ফলের বাগান, একটি পুরোনো রেললাইন, ইসলামি গোরস্তান এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হাখমানেশি শিলালিপি। ৮৫ বাই ১১৬ সেন্টিমিটারের এই প্রবাল পাথরের খোদাইটি ইতিহাসবিদদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত, কারণ এটি ‘পারস্য উপসাগর’ বা ‘পার্সিয়ান গালফ’-এর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ডগুলোর একটি।
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে খার্গ দ্বীপকে গভীর ক্ষতও বহন করতে হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এই দ্বীপ নিরলস এবং বিধ্বংসী বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল। পরে ইরানি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত যত্ন সহকারে দ্বীপটি পুনর্নির্মাণ করে।
বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বারবার এই অঞ্চলের জলপথকে হুমকির মুখে ফেললেও দ্বীপটি কঠোর সামরিক পাহারায় রয়েছে। পর্যটকদের দূরে সরিয়ে রাখার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবেই এর আদিম পরিবেশগত চরিত্র বা ইকোলজিক্যাল ক্যারেক্টার অনেকটা সুরক্ষিত রয়ে গেছে।
খার্গ দ্বীপ আমাদের এক হাড়হিম করা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—সাম্রাজ্য আসবে, জ্বালানি যুদ্ধও হয়তো একদিন শেষ হবে, কিন্তু পারস্য উপসাগরের এই ‘অরফ্যান পার্ল’ ইতিহাসের উত্তাল স্রোতে চিরকাল এভাবেই বাঁধা থাকবে।

সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া পাইপলাইনে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল ছুটে চলার একটানা শব্দ যেন খার্গ দ্বীপের শ্বাসপ্রশ্বাস।
এখানেই একদিন দাঁড়িয়েছিলেন বিখ্যাত ইরানি লেখক জালাল আল-ই-আহমদ। জনবিচ্ছিন্ন এই তীরের দিকে তাকিয়ে তিনি দ্বীপটির নাম দিয়েছিলেন ‘পারস্য উপসাগরের এতিম মুক্তা’ বা অরফ্যান পার্ল।
বর্তমানে বুশেহর প্রদেশের ২২ বর্গকিলোমিটারের এই প্রবাল দ্বীপ ইরানিদের কাছে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ বা ফরবিডেন আইল্যান্ড নামে পরিচিত। গোপনীয়তায় মোড়া এই দ্বীপ পাহারা দেয় ইরানের এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। এই দ্বীপে কেবল বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়া নির্দিষ্ট কিছু মানুষেরই প্রবেশের অনুমতি রয়েছে।
তবে, বিশাল ইস্পাতের বেড়া আর সামরিক ওয়াচটাওয়ারের ওপারে লুকিয়ে আছে অকৃত্রিম ল্যান্ডস্কেপ। যেখানে ইরানের আধুনিক জ্বালানি সাম্রাজ্যের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের সঙ্গেই নীরবে সহাবস্থান করছে হাজার বছরের বৈচিত্র্যময় মানব ইতিহাস।
গত শনিবারের (১৪ মার্চ) প্রথম প্রহরে এই খার্গ দ্বীপই হয়ে ওঠে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার কেন্দ্রবিন্দু বা এপিসেন্টার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ইরানের এই দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেছে।
ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘সৌজন্যের খাতিরে আমি দ্বীপের তেল অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে আমি তাৎক্ষণিকভাবে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।’
তেল সাম্রাজ্যের স্নায়ুকেন্দ্র
বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ১৫ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২৮ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ অবিসংবাদিতভাবেই ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশটির মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৯৫ কোটি (৯৫০ মিলিয়ন) ব্যারেল।
দৈর্ঘ্যে মাত্র ৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থে ৪-৫ কিলোমিটার হলেও এর চারপাশের গভীর জলরাশি একে এক দারুণ ভৌগোলিক সুবিধা দিয়েছে। এই গভীরতার কারণেই বিশাল সব সুপারট্যাঙ্কার নিরাপদে এখানে নোঙর করতে পারে। এখান থেকে অপরিশোধিত তেল মূলত এশিয়ার বাজারে যায়, যার সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হলো চীন।
ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মতে, দ্বীপের এই স্থাপনাগুলো জ্বালানি খাতের ‘স্নায়ুকেন্দ্র’ বা নার্ভ সেন্টার হিসেবে কাজ করে। এই টার্মিনাল মূলত তিনটি বড় অফশোর ফিল্ড আবুজার, ফোরোজান এবং দোরুদ থেকে অপরিশোধিত তেল গ্রহণ করে। এরপর সাবসি বা সমুদ্রতলদেশের পাইপলাইনের এক জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা অনশোর বা ডাঙার প্রসেসিং প্ল্যান্টে যায়। সেখান থেকে বিশ্ববাজারে পাঠানোর আগে এটি মজুত করা হয়।
বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে উৎপাদন ব্যাহত হলেও, ইরান এই দ্বীপের অবকাঠামো সম্প্রসারিত করেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে তেহরান টার্মিনালের ২৫ ও ২৬ নম্বর ট্যাংক সংস্কার করে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বা মজুত সক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়িয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে, ক্রমাগত আপগ্রেড বা উন্নত হওয়া এই টার্মিনালগুলোর লোডিং ক্যাপাসিটি বা তেল ভরার সক্ষমতা দিনে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। তবে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জাতীয় রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দিনে প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল।
সাম্রাজ্যবাদ আর নির্বাসনের ইতিহাস
হাইড্রোকার্বন বা জ্বালানি তেল আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই খার্গ দ্বীপের কৌশলগত সামুদ্রিক গুরুত্ব একে লোভনীয় বস্তুতে পরিণত করেছিল। অনেকেই ভুল করে ‘খার্গ’ নামকে আলেকজান্ডারের প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন শহর ‘কারাক্স স্পাসিনো’-এর সঙ্গে মেলাতে চান। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড নিশ্চিত করে যে এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় উপভাষা এবং ইউরোপীয় মানচিত্রে দ্বীপটির নাম খার্গ, খার্ক, খারাজ এবং খারেজ হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। এর প্রাকৃতিক মিঠাপানির ঝরনা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি কৃষিপণ্য ও খনিজ রপ্তানির সামুদ্রিক ক্রসরোড বা সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছিল।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দ্বীপের সঙ্গে পর্তুগিজরা খার্গও দখল করে। এরপর আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এখানে ডাচ বা ওলন্দাজদের ক্ষমতার ডালপালা মেলে। ১৭৫২ সালে ডাচ ব্যারন নিপহাউসেন একটি ট্রেডিং পোস্ট বা বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের জন্য বন্দর রিগের শাসক মীর নাসের আল-জাবির সঙ্গে চুক্তি করেন। পরের বছর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একটি সুসজ্জিত দুর্গ নির্মাণ করে।
তবে এই ঔপনিবেশিক আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। উত্তেজনার পারদ চড়তে চড়তে একসময় বন্দর রিগের তৎকালীন গভর্নর মীর মুহান্না সফলভাবে দুর্গটিতে আক্রমণ চালান এবং ১৭৬৬ সালের জানুয়ারিতে ডাচ বাহিনীকে চিরতরে বিতাড়িত করেন।
বিংশ শতাব্দীতে দ্বীপটির ইতিহাস এক অন্ধকার মোড় নেয়। ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের ক্ষমতায় থাকা রেজা শাহ পাহলভি এই দ্বীপটিকে রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য দুর্গম নির্বাসনকেন্দ্রে বা পিনাল কলোনিতে পরিণত করেছিলেন। ফলে এর বৃহত্তর সম্ভাবনা পুরোপুরি অব্যবহৃত থেকে যায়।
এরপর ১৯৫৮ সালের পর আধুনিক পেট্রোলিয়াম যুগের সূচনা হলে খার্গ তার অন্ধকার অতীত মুছে ফেলে এবং বিশাল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৬০ সালের আগস্টে এর নতুন ডিপ-ওয়াটার টার্মিনাল থেকে প্রথম বড় তেলের চালান পাঠানো হয়। ষাটের দশকে যখন একের পর এক অফশোর তেলের খনি আবিষ্কৃত হতে থাকে, তখন খার্গ ইরানের আরেক বন্দর আবাদানকেও ছাড়িয়ে যায় এবং এর গভীর জলের নোঙরে ভিড়তে থাকে বিশাল বিশাল সব সুপারট্যাঙ্কার।
বৈচিত্র্যময় অতীতের প্রতিধ্বনি
দ্বীপটির আধুনিক শিল্প কাঠামোর আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। এখানে মানববসতির প্রমাণ খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষের দিকের—যা এলামাইট, হাখমানেশি (অ্যাকিমেনিড) এবং সাসানীয় যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এখানকার সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মীর মোহাম্মদ মাজার। হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে (১৩ শতকের শেষ ভাগে) পাথর এবং কাদা দিয়ে তৈরি দুটি শঙ্কু আকৃতির গম্বুজ রয়েছে এই মাজারে।
পাশেই রয়েছে মীর আরাম মাজার, যেখানে একটি ১২ মিটার (৩৯ ফুট) লম্বা পাথর আছে। পাথরটিতে ইসলামি শিলালিপি খোদাই করা এবং দুটি মশাল রয়েছে যা হাখমানেশি যুগের বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয়রা এই স্থানটিকে পবিত্র কোরআন এবং বাইবেলে উল্লিখিত নবী নূহের বংশধর মীর আরামের সঙ্গে যুক্ত করেন।
এই দ্বীপ মূলত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের এক জীবন্ত প্রমাণ। এখানকার একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গোরস্তানে বিভিন্ন ধর্মের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন দেখা যায়। সেখানে জরাথুস্ট্রবাদী (জোরোস্ট্রিয়ান) সমাধিক্ষেত্র, খ্রিষ্টানদের কবর এবং সাসানীয় যুগের সমাধি পাশাপাশি অবস্থান করছে।
দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ১৭৪৭ সালের ডাচ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, ডাচ বাগান, খার্গ ফলের বাগান, একটি পুরোনো রেললাইন, ইসলামি গোরস্তান এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হাখমানেশি শিলালিপি। ৮৫ বাই ১১৬ সেন্টিমিটারের এই প্রবাল পাথরের খোদাইটি ইতিহাসবিদদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত, কারণ এটি ‘পারস্য উপসাগর’ বা ‘পার্সিয়ান গালফ’-এর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ডগুলোর একটি।
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে খার্গ দ্বীপকে গভীর ক্ষতও বহন করতে হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এই দ্বীপ নিরলস এবং বিধ্বংসী বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল। পরে ইরানি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত যত্ন সহকারে দ্বীপটি পুনর্নির্মাণ করে।
বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বারবার এই অঞ্চলের জলপথকে হুমকির মুখে ফেললেও দ্বীপটি কঠোর সামরিক পাহারায় রয়েছে। পর্যটকদের দূরে সরিয়ে রাখার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবেই এর আদিম পরিবেশগত চরিত্র বা ইকোলজিক্যাল ক্যারেক্টার অনেকটা সুরক্ষিত রয়ে গেছে।
খার্গ দ্বীপ আমাদের এক হাড়হিম করা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—সাম্রাজ্য আসবে, জ্বালানি যুদ্ধও হয়তো একদিন শেষ হবে, কিন্তু পারস্য উপসাগরের এই ‘অরফ্যান পার্ল’ ইতিহাসের উত্তাল স্রোতে চিরকাল এভাবেই বাঁধা থাকবে।

ইরানের যুদ্ধক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তার কুয়াশা ঘন। এই যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই এখনো অস্পষ্ট। সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর জবাব যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এখনো দেয়নি। বিশেষ করে প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধ শেষ হবে কীভাবে? এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক ঝুঁকির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিণতি কী
৮ ঘণ্টা আগে
ইরানের তেল বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আজ শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে খার্গ দ্বীপে অন্তত ১৫টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এই হামলায় দ্বীপের তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে দাবি করেছে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ
৮ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাঠামোও পরিবর্তনের মুখোমুখি।
১০ ঘণ্টা আগে
ইরানের 'মোজাইক ডিফেন্স ডকট্রিন' হলো একটি বিকেন্দ্রীকৃত সামরিক কৌশল, যেখানে মোজাইকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোর মতো প্রতিটি প্রদেশকে একেকটি স্বাধীন প্রতিরক্ষা ইউনিটে রূপান্তর করা হয়েছে।
১ দিন আগে