আয়েশা ওয়ারেসা

বিবর্তনের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় স্ক্যামটা করছে বিড়াল!
হিউম্যান হিস্ট্রি ঘাঁটলে দেখবেন, দুনিয়ার তাবৎ প্রাণিকে মানুষ পোষ মানাইছে নিজের লাভের জন্য। কুকুরকে পোষ মানাইছে বাড়ি পাহারার জন্য, ঘোড়াকে দিয়ে জিনিসপত্র টানাইছে। কিন্তু আমাকে বিড়ালের ব্যাপারটা কেউ একটু লজিক্যালি বুঝাবেন প্লিজ? এ আবার কী কাজ করবে যে আমার কাজে লাগবে?
মাঝে মধ্যে মনে হয়, মানুষ এদের না, এরাই উল্টা মানুষরে পোষ মানাইছে! কাজ নাই, কাম নাই, এসেই বেডরুমের সবচেয়ে নরম বালিশটা দখল করে আরামে শুয়ে পড়বে, আর আমরা বিনা বেতনে সারাদিন এদের লিটার বক্স পরিষ্কার করব!
ব্যাপারটা এমন না যে কোনো ‘ক্যাট-হেটার’ বা বিড়াল-বিদ্বেষ থেকে এই কথাগুলা বলতেছি। কিন্তু ইদানীং চারপাশে তাকালে হুট করেই বিড়াল পালার যে একটা ক্রেজ চোখে পড়ে, সেটা আগে আমাদের সোসাইটিতে কখনো ছিল না।
আগে বিড়ালের স্ট্যাটাস কী ছিল? বড়জোর রান্নাঘরে দুধ চুরি করতে এলে মায়েরা ‘শিস শিস’ করে তাড়িয়ে দিত, আর খুব শখ হলে কেউ হয়ত দুপুরের উচ্ছিষ্ট কাঁটা-হাড় খেতে দিত। আর এখন? এখন জেন-জি থেকে শুরু করে মিলেনিয়াল– সবার ঘরে ঘরে বিদেশি জাতের বিড়াল। তাদের স্পেশাল ক্যাট-ফুড, লিটার বক্স, মুড সুইং, এমনকি তাদের এস্থেটিক রিলস বানানোর জন্য রিং লাইট পর্যন্ত কেনা হচ্ছে!
বিড়াল পালার এই অবসেশন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাইছে যে, মানুষ নিজের জীবনের চেয়েও এদের বেশি ভ্যালু দিচ্ছে। এই তো কিছুদিন আগের ঘটনা, নিজের পোষা বিড়ালকে বাঁচাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে বন্যা কস্তার মর্মান্তিক এক মৃত্যু হলো। ঘটনাটা ট্র্যাজিক, একই সাথে এটা আমাদের একটা সাইকোলজিক্যাল রিয়েলিটির দিকেও আঙুল তোলে। মানুষ আসলে কোনও প্রাণির সাথে কতটা ইমোশনালি অ্যাটাচড হয়ে গেলে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতেও দুইবার ভাবে না?
অফলাইন এর কথা নাহয় এক সাইডে রাখলাম ।
বিজ্ঞানীরা নাকি ইন্টারনেট আবিষ্কার করছিল নিউক্লিয়ার যুদ্ধের সময় মিলিটারি যোগাযোগের জন্য। কোল্ড ওয়ারের সময় পেন্টাগনের মাথা ঘামানো প্রজেক্ট ছিল এই ‘আরপানেট’, যেন দুনিয়া ধ্বংস হয়ে গেলেও অন্তত ডিফেন্সের যোগাযোগটা টিকে থাকে। আর এখন ২০২৬ সালে এসে সেই মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের টেকনোলজির মেইন কাজ হলো দুই রিল পর পর একটা বিড়ালের ভিডিও দেখানো!

আপনি যতই পলিটিক্স, ইকোনমি বা মোটিভেশনাল ভিডিও দেখেন না কেন, দিনশেষে স্ক্রল করতে করতে আপনি ঠিকই কখনো পেশিবহুল এক বিড়াল হাঙ্গর পিটিয়ে বাচ্চা উদ্ধার করে বেভারলি হিলসের অট্টালিকায় নিয়ে যাচ্ছে, তো কখনো বিলাই-বউয়ের পরকীয়ার প্রতিশোধ নিচ্ছে এমন সব ভিডিও ফিডে পাবেন।
ভিডিওর বিড়ালগুলো দেখতেও অবিকল মানুষের মতো। দামি গাড়ি চালায়, জিম করে সিক্স-প্যাক বানায়, আবার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে কি বাজে আন্দাজ করে বলেন তো?
‘মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ’
লেইখা সুরটা শোনাইতে পারতেছি না ঠিকই, কিন্তু এতক্ষণে আপনি ঠিকই বুঝে গেছেন জিনিসটা কী! বিলি আইলিশের সেই অস্কারজয়ী ‘হোয়াট ওয়াজ আই মেড ফর?’-এর এআই বিড়াল ভার্সন। আর সেই বিলাই যখন রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য জিমে গিয়া মাসল বানায়া কামব্যাক করে, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজবে রিহানার ‘ডায়মন্ড’ গানের ম্যাও ম্যাও ভার্সন।
ভাবতে হয়, ছোট্ট একটা চারপেয়ে প্রাণি, অথচ রিয়েল লাইফ থেকে শুরু করে ইন্টারনেট মেটাভার্স—সবখানেই এদের এমন জমিদারি দাপট এল কোত্থেকে?
বিজ্ঞানী কনরাড লরেঞ্জ প্রথম ‘কিন্ডচেনস্কিমা’ বা ‘বেবি স্কিমা’ নামের একটি তত্ত্ব দেন। মানুষের ব্রেইন এমনভাবে ডিজাইন করা যে, বড় মাথা, বড় বড় চোখ, ছোট নাক আর চ্যাপ্টা কপালের কোনো কিছু দেখলে আমাদের ভেতর অটোমেটিক একটা ‘প্যারেন্টাল কেয়ার’ কাজ করে। বিড়ালের ফিজিক্যাল স্ট্রাকচার একদম মানুষের বাচ্চার মতো। শুধু তা-ই নয়, বিড়াল খাবার বা আদরের জন্য যে ইঞ্জিনের মতো ‘ঘড়ঘড়’ (Purr) শব্দটা করে, তার ফ্রিকোয়েন্সি মানবশিশুর কান্নার ফ্রিকোয়েন্সির সাথে হুবহু মিলে যায়। ব্রেইন চাইলেও এটাকে ইগনোর করতে পারে না।

এর পাশাপাশি রয়েছে হরমোনের খেলা। কুকুর-বিড়াল উভয়ের সান্নিধ্যেই মানুষের শরীরে ‘অক্সিটোসিন’ হরমোন নির্গত হয়। তবে কুকুর যেখানে সারাক্ষণ মানুষের দিকে তাকিয়ে ভ্যালিডেশন খোঁজে, বিড়াল সেখানে নিজের মতো 'ডোন্ট কেয়ার' অ্যাটিটিউড নিয়ে থাকে। ওই যে বলে না, যে জিনিস সহজে পাওয়া যায় না, মানুষ সেটার পেছনেই বেশি দৌড়ায়। মনস্তাত্ত্বিকদেরও মতে, যেহেতু বিড়ালের মনোযোগ সহজে পাওয়া যায় না, তাই যখন তারা এসে গায়ে গা ঘষে, তাদের এই অ্যারোগেন্সই মানুষের ব্রেইনে অক্সিটোসিন রিলিজ করে।
বিড়াল পোষার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন, বিড়াল কখনো ঈশ্বরের আসনে বসছে, আবার কখনো শয়তানের তকমা পাইছে।
প্রাচীন মিসরে বিড়ালকে দেবতার প্রতিমূর্তি মনে করা হতো। দেবী বাস্টেট ছিলেন উর্বরতা ও সুরক্ষার প্রতীক, যার চেহারা ছিল অনেকটা বিড়ালের মতো। ভুল করে একটি বিড়াল হত্যা করলেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নিয়ম ছিল মিসরে। এমনকি, বিড়াল মারা গেলে মানুষ ভ্রু কেটে শোক পালন করত, বিড়ালের মমি করে সমাহিত করত।

তবে মধ্যযুগের ইউরোপে বিড়ালের কপালে জোটে চরম দুর্গতি। বিড়ালের স্বাধীনচেতা স্বভাব এবং রাতের বেলায় ঘোরাফেরার কারণে পোপ গ্রেগরি নাইন ১২৩৩ সালে ফতোয়া দিলেন যে, কালো বিড়াল হলো শয়তানের রূপ এবং ডাইনিদের সঙ্গী। এরপর ইউরোপজুড়ে শুরু হলো বিড়াল নিধন। বস্তায় ভরে বিড়াল পোড়ানো হলো।
তবে প্রকৃতিও হাড়ে হাড়ে এর প্রতিশোধ নিয়েছিল। বিড়াল কমে যাওয়ায় হঠাৎ ইঁদুরের উপদ্রব এত বেড়ে যায় যে, সেই ইঁদুর থেকে ছড়ানো ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা প্লেগ মহামারিতে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়।

আমাদের দেশে হঠাৎ বিড়ালপ্রীতির এই জোয়ারের পেছনে অনেকেই দাবি করেন, এর শেকড়টা আসলে ধর্মীয়। এবং যদি একটু খেয়াল করেন, আমাদের লোকাল পারসপেক্টিভে বিড়াল পালার পেছনে সবচেয়ে বড় গ্রাউন্ডেড রিজনটা হলো ধর্ম।
তবে বিড়াল নিয়া এই শৌখিনতার অনেক আগে থেকেই কিন্তু আমাদের দেশে বিড়াল পালার একটা প্র্যাকটিক্যাল চল ছিল। মূলত বিড়াল হলো আমাদের আদি ‘পেস্ট কন্ট্রোল’ সার্ভিস। কারণ গ্রামে-গঞ্জে বা মফস্বলে মানুষ বিড়াল পালতো ঠিকই কিন্তু মোটেও তা ‘শখের বশে’ না। মূলত কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় ফসল আর গোলার ধান ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচাইতে বিড়াল ছিল একমাত্র ভরসা। শুধু গ্রামে কেন, আজও শহরের অনেক দোকানে বা গুদামে দেখবেন বিড়ালদের রীতিমতো খাতির করে খাওয়ানো হচ্ছে। এই খাতিরের পেছনে ইমোশন যতটা না কাজ করে, তার চেয়ে বেশি কাজ করে দোকানের মালপত্র ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদ।
এদিকে, ইসলাম ধর্মে বিড়ালকে দেখা হয় অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র প্রাণি হিসেবে। এমনকি মসজিদেও এদের অবাধ যাতায়াতের অনুমতি আছে, যা অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে একেবারেই দেখা যায় না। মহানবী (সা.) এর বিড়ালপ্রীতির গল্প এবং তাঁর সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.), যার নামের অর্থই হলো ‘বিড়ালের পিতা’ – এই রেফারেন্সগুলো মুসলিম প্রধান সমাজে বিড়ালকে একটা বিশেষ ডিগনিটি দিয়ে দিছে।
তাই অনেক সময় যারা খুব একটা এনিমেল লাভার না, তারাও ধর্মের প্রতি সম্মান রেখে বিড়ালের প্রতি সফট কর্নার রাখে।
আবার শুধু আমাদের এখানে না, বিড়ালের এই পজিটিভ ইমেজ গ্লোবাল লেভেলেও খুবই পপুলার। জাপানে ‘মানেকি-নেকো’ বা হাত নাড়া বিড়ালের মূর্তি প্রায় সব শোরুম বা রেস্টুরেন্টের ক্যাশ কাউন্টারে দেখা যায়। জাপানিদের বিশ্বাস, এই হাত নাড়া বিড়ালটা হলো সৌভাগ্য আর বাণিজ্যের প্রতীক।

কুকুরের এক্সপ্রেশন খুব ইজিলি রিড করা যায়, কিন্তু বিড়াল সবসময় একটা ডেডপ্যান বা ব্ল্যাংক এক্সপ্রেশন নিয়ে থাকে। ফলে মানুষ খুব সহজেই নিজেদের অ্যাংজাইটি, দুঃখ বা হিউমার বিড়ালের ওপর বসিয়ে 'গ্রাম্পি ক্যাট' টাইপ মিম বানাতে পারে। ওয়েব ২.০ যুগে এসে বিড়াল যেন ইন্টারনেটের অঘোষিত মাসকট।
২০০৮ সালে ইন্টারনেট স্কলার ইথান জুকারম্যান দারুণ একটা থিওরি দেন, কিউট ক্যাট থিওরি। থিওরিটা হলো – ইন্টারনেট মূলত বানানোই হয়েছে বিড়ালের ছবি-ভিডিও বা এই ধরণের কন্টেন্ট শেয়ার করার জন্য। তাঁর যুক্তি ছিল, পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্টরা এই কিউট বিড়ালের প্ল্যাটফর্মগুলোতেই লুকিয়ে কাজ করে।
এখন ধরেন, সরকার চাচ্ছে এই অ্যাক্টিভিস্টদের মুখ বন্ধ করতে। সরকার যদি একটা নির্দিষ্ট পলিটিক্যাল ওয়েবসাইট বা ব্লগ ব্লক করে দিতে পারে, এতে সাধারণ মানুষ খুব একটা বিচলিত হবে না।
কিন্তু যখন তারা ইউটিউব বা ফেসবুক ব্লক করে, তখন সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলার ঝুঁকি থাকে। তাই অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সরকার এসব বড় প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করতে সাহস পায় না। ইথানের মতে, এভাবেই ‘কিউট ক্যাট’ বা সাধারণ কন্টেন্টগুলো রাজনৈতিক কন্টেন্টকেও শিল্ড দিয়ে থাকে ।

ষাটের দশকে, একবার সিআইএ ভাবছিল, বিড়াল যেহেতু এতই শান্ত আর চুপিচুপি হাঁটে, এদেরকে কি কোনোভাবে স্পাই বানানো যায়!
'প্রজেক্ট অ্যাকুস্টিক কিটি' নামে ১৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটা বিড়ালের কানের ভেতর মাইক্রোফোন আর লেজের ভেতর অ্যান্টেনা ফিট করলো তারা। প্ল্যান ছিল, রাশিয়ান অ্যাম্বাসির বাইরে বিড়ালটা ঘুরে ঘুরে সব রেকর্ড করবে।
কিন্তু বিড়াল মহোদয় কি কারো অর্ডার শোনার পাত্র? মিশনে নামার প্রথম দিনই রাস্তা পার হতে গিয়ে ট্যাক্সির নিচে পড়ে মারা যায় বিড়ালটা। পরে বাধ্য হয়ে প্রজেক্টটি ক্যানসেল করে সিআইএ।
ঢাকার গুলশান-বসুন্ধরার মতো এলাকায় এখন গেলে দেখবেন, বিড়ালের জন্য গড়ে উঠছে প্রিমিয়াম সব ‘পেট কেয়ার সেন্টার’। বিড়ালের জন্য স্পা, গ্রুমিং, এমনকি তাদের থাকার জন্য এসি রুমের ব্যবস্থাও আছে! মহল্লার সাধারণ ন্যাড়া বিড়ালকে কেউ পাত্তাও দেয় না, কিন্তু ৫-১০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা সাদা ধবধবে বিদেশি বিড়ালের জন্য আদিখ্যেতার শেষ নাই।
কারণ হয়তো, এই বিড়ালই এখনকার আরবান লাইফস্টাইলে একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হয়া দাঁড়াইছে। আপনার ঘরে একটা বিদেশি বিড়াল থাকা মানে হলো – আপনি আর্থিকভাবে সচ্ছল, আপনার রুচি আধুনিক এবং আপনি অনেক বেশি সেনসিটিভ একজন মানুষ। এই যে দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি বা আইফোন দিয়ে আমরা নিজেদের স্ট্যাটাস জাহির করি, বিদেশি বিড়াল পালন করাটাও এখন অনেকটা সেই লেভেলেই চইলা গেছে।
ইনস্টাগ্রামে নিজের পার্সিয়ান বিড়ালের সাথে কিউট একটা ছবি দেওয়া এখনকার অনলাইন কালচারের বড় অংশ। মনোবিজ্ঞানীরা এই ট্রেন্ডটাকে বলতেছেন কনস্পিকুয়াস কনজাম্পশন; দাঁত ভাঙ্গা বাংলায় প্রদর্শনমূলক ভোগ।
এখানে বিড়ালটা হয়ে যায় আপনার ছবির একটা প্রপস। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যাস্থেটিক একটা বই আর পাশে একটা দামি জাতের বিড়াল – ব্যস! আপনার লাইফস্টাইল যে কতটা এলিট, সেটা প্রুফ করার জন্য এর চেয়ে বড় ডিজিটাল হাতিয়ার আর নাই।
সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট হলো এর পেছনের সাইকোলজি। বিড়াল কিন্তু কুকুরের মতো হুকুমের গোলাম না। সে স্বাধীন, নিজের খেয়ালখুশি মতো চলে। আমাদের সাথে আমাদের ঘরে থাকে ঠিকই, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি পোষ মানে না। তো এই যে একটা বন্য বা জেদি প্রাণীর ভালোবাসা জয় করতে পারা, এটা মালিককে এক ধরণের মোরাল সুপিরিওরিটি ফিল দেয়। তারা নিজেদের অন্য সবার চেয়ে একটু বেশি দয়ালু আর উচ্চস্তরের মানুষ মনে করেন, কারণ তারা একটা স্বাধীন সত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ বা ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন।
অবশ্যই সবার ক্ষেত্রে যে এটা সত্য– তা না। অনেকেই আছেন যারা জান-পরান দিয়ে বিড়াল ভালোবাসেন।
কিন্তু আমাদের এই ডিজিটাল জমানায় বিড়াল পালন করাটা যেভাবে একটা পণ্য বা ফ্যাশন হয়ে উঠছে, সেটা নিয়ে একটু আধেকটু ভাবার সময়ও আসছে।
রাস্তার অসহায় বিড়ালটাকে পাশ কাটিয়ে যখন আমরা কাটাবন থেইকা ৫০০০ টাকার বিদেশি বিড়াল কিনে তার ছবি দিয়ে এনিমেল লাভার সাজি, তখন বুঝতে হবে ভালোবাসাটা বিড়ালের প্রতি না, বরং সোশ্যাল এক্সেপ্টেন্সের প্রতি।

বিবর্তনের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় স্ক্যামটা করছে বিড়াল!
হিউম্যান হিস্ট্রি ঘাঁটলে দেখবেন, দুনিয়ার তাবৎ প্রাণিকে মানুষ পোষ মানাইছে নিজের লাভের জন্য। কুকুরকে পোষ মানাইছে বাড়ি পাহারার জন্য, ঘোড়াকে দিয়ে জিনিসপত্র টানাইছে। কিন্তু আমাকে বিড়ালের ব্যাপারটা কেউ একটু লজিক্যালি বুঝাবেন প্লিজ? এ আবার কী কাজ করবে যে আমার কাজে লাগবে?
মাঝে মধ্যে মনে হয়, মানুষ এদের না, এরাই উল্টা মানুষরে পোষ মানাইছে! কাজ নাই, কাম নাই, এসেই বেডরুমের সবচেয়ে নরম বালিশটা দখল করে আরামে শুয়ে পড়বে, আর আমরা বিনা বেতনে সারাদিন এদের লিটার বক্স পরিষ্কার করব!
ব্যাপারটা এমন না যে কোনো ‘ক্যাট-হেটার’ বা বিড়াল-বিদ্বেষ থেকে এই কথাগুলা বলতেছি। কিন্তু ইদানীং চারপাশে তাকালে হুট করেই বিড়াল পালার যে একটা ক্রেজ চোখে পড়ে, সেটা আগে আমাদের সোসাইটিতে কখনো ছিল না।
আগে বিড়ালের স্ট্যাটাস কী ছিল? বড়জোর রান্নাঘরে দুধ চুরি করতে এলে মায়েরা ‘শিস শিস’ করে তাড়িয়ে দিত, আর খুব শখ হলে কেউ হয়ত দুপুরের উচ্ছিষ্ট কাঁটা-হাড় খেতে দিত। আর এখন? এখন জেন-জি থেকে শুরু করে মিলেনিয়াল– সবার ঘরে ঘরে বিদেশি জাতের বিড়াল। তাদের স্পেশাল ক্যাট-ফুড, লিটার বক্স, মুড সুইং, এমনকি তাদের এস্থেটিক রিলস বানানোর জন্য রিং লাইট পর্যন্ত কেনা হচ্ছে!
বিড়াল পালার এই অবসেশন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাইছে যে, মানুষ নিজের জীবনের চেয়েও এদের বেশি ভ্যালু দিচ্ছে। এই তো কিছুদিন আগের ঘটনা, নিজের পোষা বিড়ালকে বাঁচাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে বন্যা কস্তার মর্মান্তিক এক মৃত্যু হলো। ঘটনাটা ট্র্যাজিক, একই সাথে এটা আমাদের একটা সাইকোলজিক্যাল রিয়েলিটির দিকেও আঙুল তোলে। মানুষ আসলে কোনও প্রাণির সাথে কতটা ইমোশনালি অ্যাটাচড হয়ে গেলে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতেও দুইবার ভাবে না?
অফলাইন এর কথা নাহয় এক সাইডে রাখলাম ।
বিজ্ঞানীরা নাকি ইন্টারনেট আবিষ্কার করছিল নিউক্লিয়ার যুদ্ধের সময় মিলিটারি যোগাযোগের জন্য। কোল্ড ওয়ারের সময় পেন্টাগনের মাথা ঘামানো প্রজেক্ট ছিল এই ‘আরপানেট’, যেন দুনিয়া ধ্বংস হয়ে গেলেও অন্তত ডিফেন্সের যোগাযোগটা টিকে থাকে। আর এখন ২০২৬ সালে এসে সেই মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের টেকনোলজির মেইন কাজ হলো দুই রিল পর পর একটা বিড়ালের ভিডিও দেখানো!

আপনি যতই পলিটিক্স, ইকোনমি বা মোটিভেশনাল ভিডিও দেখেন না কেন, দিনশেষে স্ক্রল করতে করতে আপনি ঠিকই কখনো পেশিবহুল এক বিড়াল হাঙ্গর পিটিয়ে বাচ্চা উদ্ধার করে বেভারলি হিলসের অট্টালিকায় নিয়ে যাচ্ছে, তো কখনো বিলাই-বউয়ের পরকীয়ার প্রতিশোধ নিচ্ছে এমন সব ভিডিও ফিডে পাবেন।
ভিডিওর বিড়ালগুলো দেখতেও অবিকল মানুষের মতো। দামি গাড়ি চালায়, জিম করে সিক্স-প্যাক বানায়, আবার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে কি বাজে আন্দাজ করে বলেন তো?
‘মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ মিউ’
লেইখা সুরটা শোনাইতে পারতেছি না ঠিকই, কিন্তু এতক্ষণে আপনি ঠিকই বুঝে গেছেন জিনিসটা কী! বিলি আইলিশের সেই অস্কারজয়ী ‘হোয়াট ওয়াজ আই মেড ফর?’-এর এআই বিড়াল ভার্সন। আর সেই বিলাই যখন রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য জিমে গিয়া মাসল বানায়া কামব্যাক করে, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজবে রিহানার ‘ডায়মন্ড’ গানের ম্যাও ম্যাও ভার্সন।
ভাবতে হয়, ছোট্ট একটা চারপেয়ে প্রাণি, অথচ রিয়েল লাইফ থেকে শুরু করে ইন্টারনেট মেটাভার্স—সবখানেই এদের এমন জমিদারি দাপট এল কোত্থেকে?
বিজ্ঞানী কনরাড লরেঞ্জ প্রথম ‘কিন্ডচেনস্কিমা’ বা ‘বেবি স্কিমা’ নামের একটি তত্ত্ব দেন। মানুষের ব্রেইন এমনভাবে ডিজাইন করা যে, বড় মাথা, বড় বড় চোখ, ছোট নাক আর চ্যাপ্টা কপালের কোনো কিছু দেখলে আমাদের ভেতর অটোমেটিক একটা ‘প্যারেন্টাল কেয়ার’ কাজ করে। বিড়ালের ফিজিক্যাল স্ট্রাকচার একদম মানুষের বাচ্চার মতো। শুধু তা-ই নয়, বিড়াল খাবার বা আদরের জন্য যে ইঞ্জিনের মতো ‘ঘড়ঘড়’ (Purr) শব্দটা করে, তার ফ্রিকোয়েন্সি মানবশিশুর কান্নার ফ্রিকোয়েন্সির সাথে হুবহু মিলে যায়। ব্রেইন চাইলেও এটাকে ইগনোর করতে পারে না।

এর পাশাপাশি রয়েছে হরমোনের খেলা। কুকুর-বিড়াল উভয়ের সান্নিধ্যেই মানুষের শরীরে ‘অক্সিটোসিন’ হরমোন নির্গত হয়। তবে কুকুর যেখানে সারাক্ষণ মানুষের দিকে তাকিয়ে ভ্যালিডেশন খোঁজে, বিড়াল সেখানে নিজের মতো 'ডোন্ট কেয়ার' অ্যাটিটিউড নিয়ে থাকে। ওই যে বলে না, যে জিনিস সহজে পাওয়া যায় না, মানুষ সেটার পেছনেই বেশি দৌড়ায়। মনস্তাত্ত্বিকদেরও মতে, যেহেতু বিড়ালের মনোযোগ সহজে পাওয়া যায় না, তাই যখন তারা এসে গায়ে গা ঘষে, তাদের এই অ্যারোগেন্সই মানুষের ব্রেইনে অক্সিটোসিন রিলিজ করে।
বিড়াল পোষার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন, বিড়াল কখনো ঈশ্বরের আসনে বসছে, আবার কখনো শয়তানের তকমা পাইছে।
প্রাচীন মিসরে বিড়ালকে দেবতার প্রতিমূর্তি মনে করা হতো। দেবী বাস্টেট ছিলেন উর্বরতা ও সুরক্ষার প্রতীক, যার চেহারা ছিল অনেকটা বিড়ালের মতো। ভুল করে একটি বিড়াল হত্যা করলেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নিয়ম ছিল মিসরে। এমনকি, বিড়াল মারা গেলে মানুষ ভ্রু কেটে শোক পালন করত, বিড়ালের মমি করে সমাহিত করত।

তবে মধ্যযুগের ইউরোপে বিড়ালের কপালে জোটে চরম দুর্গতি। বিড়ালের স্বাধীনচেতা স্বভাব এবং রাতের বেলায় ঘোরাফেরার কারণে পোপ গ্রেগরি নাইন ১২৩৩ সালে ফতোয়া দিলেন যে, কালো বিড়াল হলো শয়তানের রূপ এবং ডাইনিদের সঙ্গী। এরপর ইউরোপজুড়ে শুরু হলো বিড়াল নিধন। বস্তায় ভরে বিড়াল পোড়ানো হলো।
তবে প্রকৃতিও হাড়ে হাড়ে এর প্রতিশোধ নিয়েছিল। বিড়াল কমে যাওয়ায় হঠাৎ ইঁদুরের উপদ্রব এত বেড়ে যায় যে, সেই ইঁদুর থেকে ছড়ানো ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা প্লেগ মহামারিতে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়।

আমাদের দেশে হঠাৎ বিড়ালপ্রীতির এই জোয়ারের পেছনে অনেকেই দাবি করেন, এর শেকড়টা আসলে ধর্মীয়। এবং যদি একটু খেয়াল করেন, আমাদের লোকাল পারসপেক্টিভে বিড়াল পালার পেছনে সবচেয়ে বড় গ্রাউন্ডেড রিজনটা হলো ধর্ম।
তবে বিড়াল নিয়া এই শৌখিনতার অনেক আগে থেকেই কিন্তু আমাদের দেশে বিড়াল পালার একটা প্র্যাকটিক্যাল চল ছিল। মূলত বিড়াল হলো আমাদের আদি ‘পেস্ট কন্ট্রোল’ সার্ভিস। কারণ গ্রামে-গঞ্জে বা মফস্বলে মানুষ বিড়াল পালতো ঠিকই কিন্তু মোটেও তা ‘শখের বশে’ না। মূলত কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় ফসল আর গোলার ধান ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচাইতে বিড়াল ছিল একমাত্র ভরসা। শুধু গ্রামে কেন, আজও শহরের অনেক দোকানে বা গুদামে দেখবেন বিড়ালদের রীতিমতো খাতির করে খাওয়ানো হচ্ছে। এই খাতিরের পেছনে ইমোশন যতটা না কাজ করে, তার চেয়ে বেশি কাজ করে দোকানের মালপত্র ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদ।
এদিকে, ইসলাম ধর্মে বিড়ালকে দেখা হয় অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র প্রাণি হিসেবে। এমনকি মসজিদেও এদের অবাধ যাতায়াতের অনুমতি আছে, যা অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে একেবারেই দেখা যায় না। মহানবী (সা.) এর বিড়ালপ্রীতির গল্প এবং তাঁর সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.), যার নামের অর্থই হলো ‘বিড়ালের পিতা’ – এই রেফারেন্সগুলো মুসলিম প্রধান সমাজে বিড়ালকে একটা বিশেষ ডিগনিটি দিয়ে দিছে।
তাই অনেক সময় যারা খুব একটা এনিমেল লাভার না, তারাও ধর্মের প্রতি সম্মান রেখে বিড়ালের প্রতি সফট কর্নার রাখে।
আবার শুধু আমাদের এখানে না, বিড়ালের এই পজিটিভ ইমেজ গ্লোবাল লেভেলেও খুবই পপুলার। জাপানে ‘মানেকি-নেকো’ বা হাত নাড়া বিড়ালের মূর্তি প্রায় সব শোরুম বা রেস্টুরেন্টের ক্যাশ কাউন্টারে দেখা যায়। জাপানিদের বিশ্বাস, এই হাত নাড়া বিড়ালটা হলো সৌভাগ্য আর বাণিজ্যের প্রতীক।

কুকুরের এক্সপ্রেশন খুব ইজিলি রিড করা যায়, কিন্তু বিড়াল সবসময় একটা ডেডপ্যান বা ব্ল্যাংক এক্সপ্রেশন নিয়ে থাকে। ফলে মানুষ খুব সহজেই নিজেদের অ্যাংজাইটি, দুঃখ বা হিউমার বিড়ালের ওপর বসিয়ে 'গ্রাম্পি ক্যাট' টাইপ মিম বানাতে পারে। ওয়েব ২.০ যুগে এসে বিড়াল যেন ইন্টারনেটের অঘোষিত মাসকট।
২০০৮ সালে ইন্টারনেট স্কলার ইথান জুকারম্যান দারুণ একটা থিওরি দেন, কিউট ক্যাট থিওরি। থিওরিটা হলো – ইন্টারনেট মূলত বানানোই হয়েছে বিড়ালের ছবি-ভিডিও বা এই ধরণের কন্টেন্ট শেয়ার করার জন্য। তাঁর যুক্তি ছিল, পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্টরা এই কিউট বিড়ালের প্ল্যাটফর্মগুলোতেই লুকিয়ে কাজ করে।
এখন ধরেন, সরকার চাচ্ছে এই অ্যাক্টিভিস্টদের মুখ বন্ধ করতে। সরকার যদি একটা নির্দিষ্ট পলিটিক্যাল ওয়েবসাইট বা ব্লগ ব্লক করে দিতে পারে, এতে সাধারণ মানুষ খুব একটা বিচলিত হবে না।
কিন্তু যখন তারা ইউটিউব বা ফেসবুক ব্লক করে, তখন সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলার ঝুঁকি থাকে। তাই অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সরকার এসব বড় প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করতে সাহস পায় না। ইথানের মতে, এভাবেই ‘কিউট ক্যাট’ বা সাধারণ কন্টেন্টগুলো রাজনৈতিক কন্টেন্টকেও শিল্ড দিয়ে থাকে ।

ষাটের দশকে, একবার সিআইএ ভাবছিল, বিড়াল যেহেতু এতই শান্ত আর চুপিচুপি হাঁটে, এদেরকে কি কোনোভাবে স্পাই বানানো যায়!
'প্রজেক্ট অ্যাকুস্টিক কিটি' নামে ১৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটা বিড়ালের কানের ভেতর মাইক্রোফোন আর লেজের ভেতর অ্যান্টেনা ফিট করলো তারা। প্ল্যান ছিল, রাশিয়ান অ্যাম্বাসির বাইরে বিড়ালটা ঘুরে ঘুরে সব রেকর্ড করবে।
কিন্তু বিড়াল মহোদয় কি কারো অর্ডার শোনার পাত্র? মিশনে নামার প্রথম দিনই রাস্তা পার হতে গিয়ে ট্যাক্সির নিচে পড়ে মারা যায় বিড়ালটা। পরে বাধ্য হয়ে প্রজেক্টটি ক্যানসেল করে সিআইএ।
ঢাকার গুলশান-বসুন্ধরার মতো এলাকায় এখন গেলে দেখবেন, বিড়ালের জন্য গড়ে উঠছে প্রিমিয়াম সব ‘পেট কেয়ার সেন্টার’। বিড়ালের জন্য স্পা, গ্রুমিং, এমনকি তাদের থাকার জন্য এসি রুমের ব্যবস্থাও আছে! মহল্লার সাধারণ ন্যাড়া বিড়ালকে কেউ পাত্তাও দেয় না, কিন্তু ৫-১০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা সাদা ধবধবে বিদেশি বিড়ালের জন্য আদিখ্যেতার শেষ নাই।
কারণ হয়তো, এই বিড়ালই এখনকার আরবান লাইফস্টাইলে একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হয়া দাঁড়াইছে। আপনার ঘরে একটা বিদেশি বিড়াল থাকা মানে হলো – আপনি আর্থিকভাবে সচ্ছল, আপনার রুচি আধুনিক এবং আপনি অনেক বেশি সেনসিটিভ একজন মানুষ। এই যে দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি বা আইফোন দিয়ে আমরা নিজেদের স্ট্যাটাস জাহির করি, বিদেশি বিড়াল পালন করাটাও এখন অনেকটা সেই লেভেলেই চইলা গেছে।
ইনস্টাগ্রামে নিজের পার্সিয়ান বিড়ালের সাথে কিউট একটা ছবি দেওয়া এখনকার অনলাইন কালচারের বড় অংশ। মনোবিজ্ঞানীরা এই ট্রেন্ডটাকে বলতেছেন কনস্পিকুয়াস কনজাম্পশন; দাঁত ভাঙ্গা বাংলায় প্রদর্শনমূলক ভোগ।
এখানে বিড়ালটা হয়ে যায় আপনার ছবির একটা প্রপস। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে অ্যাস্থেটিক একটা বই আর পাশে একটা দামি জাতের বিড়াল – ব্যস! আপনার লাইফস্টাইল যে কতটা এলিট, সেটা প্রুফ করার জন্য এর চেয়ে বড় ডিজিটাল হাতিয়ার আর নাই।
সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট হলো এর পেছনের সাইকোলজি। বিড়াল কিন্তু কুকুরের মতো হুকুমের গোলাম না। সে স্বাধীন, নিজের খেয়ালখুশি মতো চলে। আমাদের সাথে আমাদের ঘরে থাকে ঠিকই, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি পোষ মানে না। তো এই যে একটা বন্য বা জেদি প্রাণীর ভালোবাসা জয় করতে পারা, এটা মালিককে এক ধরণের মোরাল সুপিরিওরিটি ফিল দেয়। তারা নিজেদের অন্য সবার চেয়ে একটু বেশি দয়ালু আর উচ্চস্তরের মানুষ মনে করেন, কারণ তারা একটা স্বাধীন সত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ বা ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন।
অবশ্যই সবার ক্ষেত্রে যে এটা সত্য– তা না। অনেকেই আছেন যারা জান-পরান দিয়ে বিড়াল ভালোবাসেন।
কিন্তু আমাদের এই ডিজিটাল জমানায় বিড়াল পালন করাটা যেভাবে একটা পণ্য বা ফ্যাশন হয়ে উঠছে, সেটা নিয়ে একটু আধেকটু ভাবার সময়ও আসছে।
রাস্তার অসহায় বিড়ালটাকে পাশ কাটিয়ে যখন আমরা কাটাবন থেইকা ৫০০০ টাকার বিদেশি বিড়াল কিনে তার ছবি দিয়ে এনিমেল লাভার সাজি, তখন বুঝতে হবে ভালোবাসাটা বিড়ালের প্রতি না, বরং সোশ্যাল এক্সেপ্টেন্সের প্রতি।

হিরোসেন্ট্রিক সিনেমাটিক ইউনিভার্সরে ফিল্মবাফরা অনেক আগেই টাটা গুডবাই বইলা দিছেন। আজকাল মাস্ক পরা হিরোর চেয়ে ডার্ক ক্যারেক্টারগুলার প্রতি মানুষ বেশি কিউরিয়াস। আর এই চেইনটা যিনি স্টার্ট করছিলেন, তার নাম হিথ লেজার।
১ দিন আগে
২০২২ সালের নভেম্বর মাসে ‘বাছবিচার’ পাবলিকেশন থেকে কবি ও ক্রিটিক ইমরুল হাসানের বই ‘অ্যা ক্রিটিক্যাল হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা’ পাবলিশ হয়। এই লেখাটা সেই বইটারই প্রথম চ্যাপ্টার ‘ফ্রম এমেচার-আর্ট টু ইন্ডাস্ট্রি’র কিছু অংশ নিয়া সাজানো হইছে। বাংলাদেশের ফিল্ম আর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির আর্লি ডেইজগুলা আসলে কে
২ দিন আগে
ঈদের তৃতীয় দিন। এলাকার সিনেমা হলের অ্যাপে টিকেট বুক করতে গিয়া দেখি সব সিনেমার টিকেট সোল্ড আউট। খালি ‘প্রেশার কুকার’-এর সিট কিছু ফাঁকা আছে। সব সিনেমা দেখার নিয়ত থাকলেও টু বি অনেস্ট, ‘প্রেশার কুকার’ ছিল লিস্টে সবার নিচে।
১০ দিন আগে
১৬ মার্চ ২০২৬। ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ দোস্ত আমেরিকার তথাকথিত বিশ্বসেরা সিনেমঞ্চে ধ্বনিত হইছে ‘নো টু ওয়ার’ এবং ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’। এইটা নিঃসন্দেহে একটা ইতিবাচক দিক। কিন্তু আজকের আলাপ এইসব পপুলিস্ট স্লোগান নিয়া না।
১২ দিন আগে